31/05/2026
শৈশবের স্বপ্ন
------------
ঈদের ছুটিতে কদিন গ্রামে কাটালাম। অনেক বছর পর বিলে ঝিলে জঙ্গলে জোনাকি দেখলাম, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনলাম, ব্যাঙ কতো সুন্দর করে ডাকতে পারে, সারাদিন কোকিলের কুহুকুহু, আর নানা ধরনের পাখির কলকাকলি। পূর্ণিমার সাদা চাঁদ, ঠান্ডা গোলগাল। আহা! এতো সুন্দর - মনোমুগ্ধকর।
ছোটবেলায় এরচেয়েও আরো প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় হয়েছি, বেড়ে উঠেছি। সারাদিন পুকুরে লাফঝাপ, বর্ষায় বানের জলে ভেলা ভাসানো, ফটাং দিয়ে মারামারি, চাঁদনী রাতে দোপাটি খেলা, দাড়িয়াবান্ধা , ফুটবল, ক্রিকেট, মুরা-টিলায় ঘুরাঘুরি , হেমন্তে ধান কুড়ানো, বসন্ত বা বৈশাখের ঠাঠা রোদ উপেক্ষা করে কিংবা বর্ষার ঝুম বৃষ্টিতে খেলাধুলা, জৈষ্ঠ্যমাসে গাছে গাছে বানরের মতো ঝুলাঝুলি, আম-জাম-কাঁঠালের মাঝে হারিয়ে যাওয়া, আরো কতো কি!
একদম ছোটবেলার যে স্বপ্নের কথা মনে আছে তা হচ্ছে বড় হয়ে 'আইসক্রিমওয়ালা হবো'। সারাদিন আইসক্রিম খাওয়ার লোভ, চিন্তা ,পরিকল্পনা থেকে আইসক্রিমওয়ালা হওয়ার স্বপ্ন। নিঃসন্দেহে এই স্বপ্নে কাজ করেছে নির্ভেজাল লোভ, সহজ - সরল চিন্তা এবং অতি সাধারণ পরিকল্পনা।
এরপর ভাবতাম বড় হয়ে শুটকির ব্যবসা করবো। মানে 'হুনির ব্যবসা'। এটা অদ্ভুত। কারণ বাড়িতে যে লোকটি শুটকি এবং অন্যান্য নানা ধরনের জিনিস কাঁধে করে বিক্রি করতো তার যে নোটবুকটা ছিলো ওটা আমার ভাল্লাগতো। সাদা খাতা কেটে কেটে ওরকম নোটবুক বানিয়ে পালংকের নীচে বসে বসে আমিও শুটকি বিক্রি করতাম। আমার ভাল্লাগতো!
এরপর স্কুলে পড়া শুরু করলাম। ক্লাসের ফার্স্ট বয়। প্রতিবছর ফার্স্ট হচ্ছি, বড় হচ্ছি। ক্লাস ফাইভে যখন পড়ি এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রিয় বড় ভাই একদিন জিগেস করলেন আমি বড় হয়ে কি হতে চায়। আমি একটু অবাক হলাম এই প্রশ্নে। বড় হয়ে আবার কি হওয়ার কী আছে! এলাকার সবাই, আত্নীয় স্বজনের সব ভাই বড় হয়ে বিদেশ যায়। উনাকে বললাম আমি বড় হয়ে বিদেশ যাবো। এইতো। আমার উত্তরে উনি মজা পেলেন। বললেন তুমি ক্লাসের ফার্স্ট বয়, ভালো ছাত্র। বড় হয়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার জজ ব্যারিস্টার কতো কি হতে পারো। তখন আমি বললাম, ঠিকাছে, আমি তাইলে পুলিশ অফিসার হবো। তখন প্রতি শুক্রবার বাংলা সিনেমা দেখার একটা যুগ ছিলো আমাদের। বাংলা সিনেমার পুলিশ অফিসার হতে চেয়েছিলাম সেইসময়। এটা কি গোন্ডাদের সাথে মারপিঠ করার লোভ থেকে? ন্যায়, নীতি, ত্রাতা, গোন্ডাদের শায়েস্তা করা ইত্যাদি। হতে পারে। তবে যদি জানতাম বড় হয়ে কিছু হওয়া যায় তাইলে হয়তো ঐসময় আর্মি অফিসার হতে চাইতাম!
অদ্ভুত মজার একটা বিষয় হলো গাছগাছালি পাখপাখালি ভরা প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় হওয়া এই আমি স্কুল জীবনে প্রায় প্রতিদিন কমপক্ষে একটা করে কবিতা/ছড়া লিখতাম, পত্রিকায় আমার কবিতা ছাপা হয়েছে কতোবার! । কিন্তু সেই আমি কখনো কবি হতে চাইনি। কেনো হতে চাইনি জানিনা। নিশ্চয়ই তখন বুঝেছি চাইলেই কবি হওয়া যায়না। অথবা আসলে কেউ কবি হতে চায়না। কবি বিষয়টা বড় হয়ে হওয়ার জিনিস না। তবে ডায়রীতে রবীন্দ্রনাথ নজরুল, বেগম রোকেয়া, বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু এর মতো মহাপুরুষদের ছবি কেটে কেটে লাগাতাম। কিন্তু এদেশে কেউ কবি হতে চায়না কেনো?
অথবা আমরা সবাই কবি হয়েই জন্মগ্রহণ করি, বাঙালি মাত্রই কবি। কে জানে!
তারপর আসলো কি হবো তার সিদ্ধান্ত নেয়ার পালা। ক্লাস এইট শেষ। তদ্দিনে আমি আব্দুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দিনের জনপ্রিয় বিজ্ঞানের অনেকগুলো বই পড়ে ফেলেছি। মুহম্মদ জাফর ইকবালের অনেকগুলো সায়েন্স ফিকশন পড়েছি। গণিত বিজ্ঞান নিয়ে বিভিন্ন সাময়িকী - লেখালেখি পড়েছি। জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিভিন্ন মহামানবের অবদান, নোবেল প্রাইজ ইত্যাদি সম্পর্কে জেনেছি। পত্রিকা বিশেষ করে প্রথম আলো পড়ছি ক্লাস সিক্স থেকে, কারেন্ট এফেয়ার্স , সায়েন্স ওয়ার্ল্ড পড়ছি ক্লাস সিক্স থেকে। বিজ্ঞানের জগতে, মহাকাশের জগতে ঘুরতে ঘুরতে পার হতো আমার বন্ধের দিনের দুপুরগুলো।
আমি তাই সিদ্ধান্ত নিলাম বিজ্ঞান পড়বো। বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু দুর্ভাগা বা বাস্তবতা যাই বলি না কেনো আমি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইলাম, কে বা কারা আমাকে বুঝালে বড় হতে হলে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। জানপ্রাণ দিয়ে পড়লাম মেট্রিক-ইন্টারমিডিয়েটে। আমি তখন আরো বাস্তব জীবনে চলে এলাম। জীবনের লক্ষ্য ডায়েরিতে লিখে ফেললাম। কি কি অপশনে ফেলা যায় কর্মজীবনকে। এইচএসসি ফলাফলের আগে ঠিক করলাম কি পড়বো, কি হবো এবং কি হতে না পারলে কি হবো😀,
নিয়্যত করলাম-
১। বুয়েটে পড়বো(এটা দেশের ১ নাম্বার) আর্কিটেক্ট হবো, বইয়ের পাতায় লিখে রাখলাম নিজের নামের সাথে, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, স্বপ্ন দেখলাম একদিন এফ আর খান হবো, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এর স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেন এর মতো বিখ্যাত হবো, আর না পারলে
২। ডাক্তার হবো, এটাও বিশাল ব্যাপার স্যাপার অবশ্যই, জাতীয় অধ্যাপক ডাক্তার নুরুল ইসলাম এর মতো, তা না পারলে
৩। পদার্থ বিজ্ঞানী (কিছু একটা করতে পারলে নোবেল প্রাইজ। পদার্থ না পারলে
৪। রসায়ন বিজ্ঞানী ( রসায়নে নোবেল ডাবল পাওয়ার নজির আছে😀)। রসায়নে না পারলে
৫। অর্থনীতিবিদ ( এখানেও নোবেল আছে) আর যদি তা না পারি তাহলে
৬। ম্যাজিস্ট্রেট ( এখানে এসে আমার নোবেলের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়েছে নিশ্চিত, কিন্তু আমার নোবেল জয়ের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়নি তখন) 😀
ম্যাজিস্ট্রেট মানে যে আমলা- কামলা হওয়ার একটা প্রবেশদ্বার আমার তখন সেটা জানা ছিলো না। মনে হয় এই জায়গায় এসে আমি শৈশবে আবার ফিরে গিয়েছি। শৈশবে যে জন্য পুলিশ হতে চেয়েছি, বড় হয়ে সে জন্য ম্যাজিস্ট্রেট হতে চেয়েছি। তাহলো 'দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন', মানুষের খেদমত, সমাজে সম্মান- মর্যাদা ইত্যাদি। নইলে ঐ বয়সে পেশাজীবন সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণাই ছিলো না।
তবে ছোটবেলা থেকে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি সেটা হচ্ছে বড় হওয়া। আর আমি বড় হওয়া মানে বুঝতাম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বেগম রোকেয়া, বিজ্ঞানী কুদরত এ খোদা, জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমুখ মানুষের মতো বড় হওয়া। ছোটবেলা থেকে যা করার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা করেছি তা হচ্ছে মানুষের খেদমত করা, দেশ ও দশের সেবা করা।
আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমার দোয়া কবুল করেছেন বলে আমার বিশ্বাস। রিযিক বা কর্মজীবন মহান আল্লাহ আমার জন্য যেটা নির্ধারণ করেছেন তাতে মানুষের খেদমত করার দারুণ একটা সুযোগ আমি দেখছি চাকরির শুরু থেকেই।
আমিও খেদমতের মধ্যেই আছি। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ যাতে আমাকে মানুষের খেদমতে কবুল করেন সবসময়। আমীন।
(সিভিল সার্ভিসে ১০ বছর পূর্তিতে ভাবনা।)
৩১ মে ২০২৬, কক্সবাজার।
#খেদমত