02/05/2026
✪ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালীন গঠিত প্রথম বাংলাদেশ সরকারকে "মুজিবনগর সরকার" বলা হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল এই সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (বর্তমান মুজিবনগর) শপথ গ্রহণ করে।
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনের ক্ষেত্রে এই সরকারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
সরকারের গঠন কাঠামো:
এই সরকার পরিচালিত হয়েছিল একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মাধ্যমে। এর প্রধান সদস্যগণ ছিলেন:
🔶 পদবী: রাষ্ট্রপতি
নাম: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (পাকিস্তানে বন্দি থাকায় অনুপস্থিত)
🔶 পদবী: অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি
নাম: সৈয়দ নজরুল ইসলাম (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত)
🔶 পদবী: প্রধানমন্ত্রী
নাম: তাজউদ্দীন আহমদ
🔶 পদবী: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
নাম: খন্দকার মোশতাক আহমদ
🔶 পদবী: অর্থমন্ত্রী
নাম: এম মনসুর আলী
🔶 পদবী: স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণমন্ত্রী
নাম: এ এইচ এম কামারুজ্জামান
🔶 পদবী: প্রধান সেনাপতি:
নাম: কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানী
✪ প্রশাসনিক ও সামরিক বিভাগ:
যুদ্ধ জয়ের লক্ষ্যে মুজিবনগর সরকার পুরো দেশ ও সামরিক ব্যবস্থাকে কয়েকটি ভাগে বিন্যস্ত করেছিল:
⇨ প্রধান সেনাপতি: কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানী।
⇨ ১১টি সেক্টর: সারা বাংলাদেশকে ১১টি প্রশাসনিক সেক্টরে ভাগ করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়।
⇨ মন্ত্রণালয়: সচিবালয়, পরিকল্পনা কমিশন এবং তথ্য ও বেতার বিভাগ (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র) গঠন করা হয়েছিল যা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে সহায়ক ছিল।
➤ এই সরকারের গুরুত্ব:
১. বৈধতা প্রদান: এই সরকার গঠনের ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা একটি আনুষ্ঠানিক এবং আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি পায়।
২. মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা: অগোছালো প্রতিরোধ যুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত গেরিলা এবং সম্মুখ যুদ্ধে রূপান্তর করা।
৩. আন্তর্জাতিক সমর্থন: বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে সাহায্য ও স্বীকৃতির জন্য লবিং করা এবং রিফিউজি বা শরণার্থীদের ব্যবস্থাপন করা।
একটি মজার তথ্য: মেহেরপুরের যে আম্রকাননে এই সরকার শপথ নিয়েছিল, ১৭ এপ্রিলের পর থেকে সেই জায়গার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'মুজিবনগর'। মূলত তখন থেকেই এটি বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পায়।
✪ সামরিক নেতৃত্বের প্রধান স্তরে যারা ছিলেন:
★ প্রধান সেনাপতি (Commander-in-Chief):
কর্নেল (পরবর্তীতে জেনারেল) এম.এ.জি. ওসমানী। তিনি সমগ্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন।
★ চিফ অব স্টাফ:
কর্নেল (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) আব্দুর রব।
★ ডেপুটি চিফ অব স্টাফ:
গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকার
✪ সেক্টর গঠন ও তারিখ:
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে ১৯৭১ সালের ১১ থেকে ১৭ জুলাই কলকাতায় অনুষ্ঠিত সেক্টর কমান্ডারদের সম্মেলনে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয় (যা সেক্টর কমান্ডারস কনফারেন্স' নামে পরিচিত)।
যদিও যুদ্ধের শুরু থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তবে এই সম্মেলনের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে সেক্টরগুলোর সীমানা নির্ধারণ এবং দায়িত্ব বণ্টন করা হয়।
★ বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ১১টি সেক্টরে সর্বমোট " ১৬ জন সেক্টর কমান্ডার " বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রাথমিকভাবে ১১ জন কমান্ডার নিয়ে যুদ্ধ শুরু হলেও, যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে পদায়ন, বদলি বা অন্যান্য কারণে বেশ কিছু সেক্টরে একাধিক কমান্ডার দায়িত্ব পালন করেন। নিচে সেক্টরভিত্তিক এলাকা সমূহ এবং কমান্ডারদের তালিকা দেওয়া হলো:
✪ ১ নং সেক্টর:
চট্টগ্রাম ও পাবর্ত্য চট্টগ্রাম এলাকা ছিল ১ নং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। ফেনী নদী থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও ফেনী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই সেক্টর।
★ সেক্টর কমান্ডার:
মেজর জিয়াউর রহমান (এপ্রিল–জুন);
এবং
মেজর রফিকুল ইসলাম (জুন–ডিসেম্বর)
✪ ২ নং সেক্টর:
ঢাকা, নোয়াখালী, ফরিদপুর ও কুমিল্লার অংশবিশেষ ছিল সেক্টর ২ এর অংশ।
★ সেক্টর কমান্ডার:
মেজর খালেদ মোশাররফ (এপ্রিল–সেপ্টেম্বর);
এবং
মেজর এ.টি.এম হায়দার (সেপ্টেম্বর–ডিসেম্বর)
✪ ৩ নং সেক্টর:
কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জ ছিল ৩ নং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। হবিগঞ্জ, আখাউড়া–ভৈরব রেললাইন থেকে পূর্ব দিকে কুমিল্লা জেলার অংশবিশেষ এবং কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল ৩ নং সেক্টর।
★ সেক্টর কমান্ডার:
মেজর কে.এম শফিউল্লাহ (এপ্রিল–সেপ্টেম্বর);
এবং
মেজর এ.এন.এম নূরুজ্জামান (সেপ্টেম্বর–ডিসেম্বর)
✪ ৪ নং সেক্টর:
মৌলভীবাজার ও সিলেটের পূর্বাংশ সেক্টর ৪ এর অংশ ছিল। মূলত সিলেট জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত হয়েছিল ৪ নং সেক্টর।
★ সেক্টর কমান্ডার:
মেজর সি.আর (চিত্তরঞ্জন) দত্ত এবং সাব কমান্ডার হিসেবে ক্যাপ্টেন এ রব (এপ্রিল - ডিসেম্বর) দায়িত্ব পালন করেন।
✪ ৫ নং সেক্টর:
বৃহত্তর ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং সিলেট জেলার অংশ বিশেষ নিয়ে গঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ৫ নং সেক্টর। সেক্টর নং ৫ এর সদর দপ্তর ছিল সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকের বাঁশতলায়।
★ সেক্টর কমান্ডার:
মেজর মীর শওকত আলী (এপ্রিল - ডিসেম্বর)
✪ ৬ নং সেক্টর:
রংপুর বিভাগ ছিল সেক্টর ৬-এর অন্তর্ভুক্ত। দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁও মহাকুমা ও ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী অঞ্চল ব্যতীত সমগ্র রংপুর নিয়ে গঠিত হয়েছিল সেক্টর নং ৬।
★ সেক্টর কমান্ডার:
উইং কমান্ডার এম.কে বাশার
✪ ৭ নং সেক্টর:
রাজশাহী বিভাগ ছিল সেক্টর ৭-এর অন্তর্ভুক্ত। রাজশাহী, পাবনা, ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরবর্তী এলাকা ব্যতীত সমগ্র বগুড়া, দিনাজপুরের দক্ষিণ অঞ্চল ও রংপুরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল
সেক্টর নং ৭।
★ সেক্টর কমান্ডার:
মেজর নাজমুল হক (আগস্ট পর্যন্ত); মেজর কাজী নুরুজ্জামান (আগস্ট-ডিসেম্বর)
✪ ৮ নং সেক্টর:
কুষ্টিয়া, যশোর, দৌলতপুর সাতক্ষীরা সড়ক পর্যন্ত খুলনা জেলা ও ফরিদপুরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল সেক্টর নং ৮।
★ সেক্টর কমান্ডার:
মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (এপ্রিল - আগস্ট); মেজর এম.এ মঞ্জুর (আগস্ট - ডিসেম্বর)
✪ ৯ নং সেক্টর:
সুন্দরবন ও বরিশাল বিভাগ সেক্টর ৯ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। পটুয়াখালী, বরিশাল ও খুলনার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল সেক্টর নং ৯।
★ সেক্টর কমান্ডার:
মেজর এম.এ জলিল (এপ্রিল - ডিসেম্বর পর্যন্ত);
অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন:
মেজর এম.এ মঞ্জুর ও মেজর জয়নাল আবেদীন
✪ ১০ নং সেক্টর:
সকল নৌপথ ও সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল ছিল সেক্টর নং ১০-এর অংশ। সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, নৌ কমান্ডো ও আভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন সেক্টর নং ১০-এর অধীনে ছিল।
★ সেক্টর কমান্ডার:
নৌ-কমান্ডোদের নিয়ে গঠিত (সরাসরি প্রধান সেনাপতির অধীনে ছিল, কোনো নির্দিষ্ট আঞ্চলিক কমান্ডার ছিলেন না)
✪ ১১ নং সেক্টর:
বৃহত্তর ময়মনসিং বিভাগ ছিল সেক্টর নং ১১-এর অন্তর্ভুক্ত। কিশোরগঞ্জ বাদে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা নিয়ে গঠিত হয়েছিল সেক্টর নং ১১।
★ সেক্টর কমান্ডার:
মেজর আবু তাহের (এপ্রিল - ৩ই নভেম্বর); স্কোয়াড্রন লিডার এম. হামিদুল্লাহ খান
(৩ই নভেম্বর - ডিসেম্বর)।
#বাংলাদেশ #জয়বাংলা #জয়বঙ্গবন্ধু #বাংলাদেশআওয়ামীলীগ