19/07/2026
বিশ্বকাপ ফুটবল :২০২৬
আজকের রাতটি শুধু একটি ফাইনাল নয়; এটি কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনের রাত। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন রেফারির প্রথম বাঁশি বাজবে, তখন মাঠে নেমে আসবে মাত্র বাইশজন ফুটবলার। কিন্তু তাদের প্রতিটি দৌড়ের সঙ্গে ছুটবে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, প্রার্থনা আর আবেগ। গ্যালারিতে বসে প্রায় বিরাশি হাজার দর্শক ইতিহাসের সাক্ষী হবেন। অথচ সত্যিকারের স্টেডিয়ামটি থাকবে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। বাংলাদেশের কোনো গ্রামের চায়ের দোকান, ঢাকার কোনো ছাদ, লন্ডনের একটি ছোট্ট ঘর কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো শ্রমিক ক্যাম্প—সবখানেই একই মুহূর্তে থেমে যাবে অসংখ্য হৃদয়ের স্পন্দন। একটি বল তখন শুধু মাঠে গড়াবে না, মানুষের অনুভূতির ভেতর দিয়েও গড়িয়ে যাবে।
বাংলাদেশেও আজ রাতের আলাদা এক রূপ আছে। কোথাও রাতের খাবার একটু আগেই শেষ হবে। কোথাও শিশুটি ঘুমিয়ে পড়বে বাবার কাঁধে, কিন্তু বাবা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকবেন । কোথাও বৃদ্ধ দাদা নাতিকে বলছেন, "এমন ফাইনাল বারবার আসে না।" বন্ধুদের আড্ডা জমেছে, বড় পর্দার সামনে ভিড় বেড়েছে, আকাশে উড়ছে নানা দেশের পতাকা। কিন্তু এই সব রঙের ওপরে আছে আরেকটি রং—ফুটবলের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
আজ কেউ মেসির দিকে তাকিয়ে একটি যুগের শেষ মহাকাব্য দেখতে চান। আবার কেউ লামিন ইয়ামালের চোখে ভবিষ্যতের সূর্যোদয় খুঁজে পান। একজন বহু স্বপ্ন পূরণ করে কিংবদন্তি হয়েছেন, অন্যজন স্বপ্ন নিয়েই কিংবদন্তি হওয়ার পথে হাঁটছেন। ফুটবল এমনই—এক প্রজন্ম বিদায় নেয়, আরেক প্রজন্ম নিঃশব্দে দায়িত্ব তুলে নেয়।
কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের মাঝেও একটি প্রশ্ন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। একটি গোলের আনন্দ কি কোনো মায়ের কান্নার চেয়ে বড়? একটি ট্রফি কি হারিয়ে যাওয়া একটি জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে? অতীতের বিভিন্ন বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশে দুর্ঘটনা, সংঘর্ষ ও উন্মত্ততায় কিছু পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। সেই শূন্যতা কোনো বিজয় পূরণ করতে পারেনি। তাই মনে রাখতে হবে, খেলার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য প্রতিপক্ষকে হারানো নয়; নিজের ভেতরের বিদ্বেষকে হারানো।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, "খেলাধুলা পারে পৃথিবীকে একসূত্রে বাঁধতে" সেই পরিবর্তনের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণ হয়, যখন খেলা আমাদের আরও বিনয়ী, আরও সহনশীল এবং আরও মানবিক মানুষ করে তোলে। জয় তখন শুধু স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না; মানুষের চরিত্রেও লেখা থাকে।
আজ রাতের শেষে ট্রফি এক দলের হাতে উঠবে। ইতিহাস বিজয়ীর নাম লিখে রাখবে। কিন্তু মানুষের হৃদয় মনে রাখবে সেই খেলোয়াড়কে, যে জয়ের মুহূর্তেও প্রতিপক্ষকে সম্মান করেছে, আর পরাজয়ের মুহূর্তেও মাথা নত করেনি। কারণ সময় ট্রফির সংখ্যা গুনে আর মানুষ চরিত্রের শক্তি মনে রাখে।
আগামীকাল ভোর হবে। সূর্যের আলো আবার জানালায় এসে পড়বে। স্কুল খুলবে, অফিস চলবে, কৃষক মাঠে যাবেন, দোকানের শাটার উঠবে। জীবন আবার তার চিরচেনা ছন্দে ফিরে যাবে। কিন্তু আজকের রাতের কিছু মুহূর্ত বহু বছর পরও মানুষের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করবে। হয়তো একটি গোল, হয়তো একটি সেভ, হয়তো ম্যাচ শেষে দুই প্রতিপক্ষের একটি আলিঙ্গন। কখনো কখনো একটি ছোট্ট দৃশ্যই একটি পুরো প্রজন্মের স্মৃতি হয়ে যায়।
তাই আজকের রাতটি হোক উৎসবের, কিন্তু উন্মত্ততার নয়। হোক প্রতিদ্বন্দ্বিতার, কিন্তু ঘৃণার নয়। হোক আবেগের, কিন্তু বিভেদের নয়। আমরা যে দলেরই সমর্থক হই না কেন, খেলা শেষ হলে যেন গর্ব করে বলতে পারি—আমরা শুধু ভালো সমর্থক নই, আমরা ভালো মানুষও।
স্বপন কুমার ঘোষ
১৯.০৭.২৬ ইং