15/11/2025
⭐ “প্রবাসীর শেষ বাড়ি” — আজকের গল্প
রাত প্রায় ২টা।
দুবাইয়ের লেবার ক্যাম্পের ছোট্ট ঘরটায় সবাই ঘুমিয়ে।
কিন্তু একজন জেগে আছে—
রহিম।
মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে, পরিবারের ঋণের বোঝা কমাতে,
একটা ছোট্ট সুখের ঘর বানাতে—
রহিম সাত বছর আগে দেশ ছেড়েছিল।
দেশে সবাই ভাবে—
“রহিম তো বিদেশে!
নিশ্চয়ই সুখেই আছে!”
প্রতিমাসে টাকা পাঠানো মানেই নাকি সুখ।
কিন্তু কেউ জানে না ওর রাতগুলো কতটা কঠিন—
৪৫ ডিগ্রি গরমে কাজ,
একই মালিকের লাঞ্ছনা, গালিগালাজ,
অতিরিক্ত কাজ করানোর চাপ…
তবুও কাউকে কিছু বলে না।
মা ফোন দিলে শুধু বলে—
“মা, আমি খুব ভালো আছি। তোমরা শুধু দোয়া করো।”
মায়ের কণ্ঠে হাসি আসে—
সেই হাসির কারণে প্রতিদিন নিজের কষ্ট গোপন রাখে রহিম।
প্রতিমাসে টাকা পাঠায়।
ঋণ শোধ হয়।
বাড়ির ভিটায় নতুন টিনের ঘর ওঠে।
ভাইয়ের দোকান হয়।
জমি কেনা হয়।
সবই রহিমের ঘামে গড়া টাকা দিয়ে।
রহিম ভাবে—
“যা করলাম পরিবারে জন্যই করলাম।
দেশে ফিরলে নিশ্চয়ই সবাই আমাকে জড়িয়ে ধরবে।”
তারপর একদিন দেশে ফেরার সময় হলো।
সাত বছর পর…
স্বপ্ন নিয়ে, বুক ভরা আশা নিয়ে।
বাড়ির সামনে নামতেই দেখে—
নতুন দোতলা বাড়ি, গেটে রঙ, উঠানে টাইলস…
সবই তার টাকায় তৈরি।
কিন্তু আশ্চর্য—
কেউ তাকে ভেতরে ডাকল না।
সবাই পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
ভাই বলল—
“ওই ঘরটা তো আমাদের।
তুই তো বিদেশেই থাকবি।
এবার তো আবার চলে যাবি।
তোর থাকার জন্য পিছনে একটা কুঁড়েঘর আছে।”
রহিম অবাক।
সেই একই কুঁড়েঘর—
যেটা সে ভেঙে নতুন ঘর তুলেছিল পরিবারের জন্য।
আজ সেই জায়গায়ই তাকে থাকতে বলা হলো।
কথা বলতে গিয়েও থেমে গেল।
কারণ বিদেশে থাকার সময় সবাই তার টাকাকে সম্মান করেছে,
কিন্তু তাকে নয়।
রহিম কুঁড়েঘরে ঢুকে চুপচাপ বসল।
নিজের নামেই যে ব্যাংকে টাকা আছে—
সেটাও জানে।
কিন্তু সেই টাকায় যেসব ঘর, জমি, দোকান তৈরি হয়েছে—
সেগুলোর মালিকানা এখন অন্যের হাতে।
সে কাউকে দোষ দিল না।
শুধু নিজের বুকের ভেতরটা খুব ভারী হয়ে গেল।
কয়েক সপ্তাহ পর রহিম অসুস্থ হয়ে পড়ে।
বিদেশের কষ্ট, দেশের অবহেলা—
সব মিলিয়ে শরীর আর টিকতে পারল না।
এক ভোরে তার নিঃশ্বাস থেমে গেল।
কেউই পাশে ছিল না।
শুধু গ্রামের মসজিদের ইমাম বললেন—
“এই ছেলেটা না হলে তোমাদের বাড়ি এমন হত?”
কেউ উত্তর দিল না।
কালো পলিথিনে মোড়ানো একটা জানাজা শেষ হলো নিঃশব্দে।
রহিমের গল্প শেষ।
কিন্তু এমন রহিম—
হাজার হাজার।
যারা বিদেশে থাকে,
হাসি মুখে টাকা পাঠায়,
কিন্তু দেশে ফিরে নিজের জন্য একটু জায়গাও পায় না।
প্রবাসীরা টাকা পাঠায়—
শুধু ঋণ শোধ করার জন্য নয়,
পরিবারের মুখে হাসি দেখার জন্য।
তারা সুখের জন্য বিদেশে যায় না।
সুখ তো তারা পাঠিয়ে দেয়—
দেশে থাকা আপনজনদের কাছে।
#মধ্যবিত্তের_গল্প #স্টোরিটেলিং #গল্পপোকা