02/09/2026
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের কথা¹: ভিহেল্ম লিবনেখট
[ফ্রেডরিখ এঙ্গেল্স: জন্ম ২৮ নভেম্বর, ১৮২০; মৃত্যু: ৫ আগস্ট ১৮৯৫। ৫ আগস্ট মার্কসবাদের অন্যতম রূপকার ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস এর ১৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ জার্মানির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা, মার্কস-এঙ্গেলস-এর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ভিলহেল্ম লিবনেখট-এর লেখা ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস কথা নামক সংক্ষিপ্ত জীবনীটি প্রকাশ করছি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসাবে। সম্পাদক]
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের মস্তিষ্কটি ছিল স্বচ্ছ ও সু-আলোকিত, সব রকম রোমান্টিক বা ভাবপ্রবণ কুহেলিকা থেকে মুক্ত। মানুষকেও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টি রঙিন চশমা অথবা স্বপ্নবাষ্পের আস্তরণের মধ্যে দিয়ে দেখতেন না তিনি, দেখতেন নির্মল প্রোজ্জ্বল চোখ মেলে, সর্বদাই স্বচ্ছ উজ্জ্বল বায়ুস্তর ভেদ করে, স্পষ্ট করে, স্বচ্ছভাবে। তাঁর দৃষ্টি বস্তুবিশ্বের উপরিতলে মাত্র সীমাবদ্ধ থাকত না, প্রতিটি বস্তুর মর্মে পুরোপুরি প্রবেশ করে একেবারে তার শেষ দেখে ছাড়ত ওই স্বচ্ছ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, কথাটির সত্যিকার ও স্বাভাবিক মানবিক অর্থে ওই 'অলোকদৃষ্টি', জননী প্রকৃতি খুব অল্প লোককেই জন্মসূত্রে যা দান করে থাকেন সেই মুক্ত দৃষ্টি ছিল এঙ্গেলসের চরিত্রের একটি মৌল লক্ষণ। প্রথমবার তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ামাত্রই তাঁর এই বিশেষ চারিত্র্যলক্ষণটি আমার কাছে ধরা পড়ে।
নীল জেনেভা হ্রদের তীরে ১৮৪৯ সালে গ্রীষ্মের শেষাশেষি তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। রাইখ সংবিধানের সপক্ষে আন্দোলনের ব্যর্থতার পর জেনেভায় আমরা কয়েকটি শরণার্থী কলোনি বসিয়েছিলাম।
এর আগে নানা ধরনের কয়েকজন 'মহৎ ব্যক্তি'র সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হবার সুযোগ ঘটেছিল আমার। এঁরা হলেন রুগে, হাইন্সেন, ইউলিউস ফ্রোবেল দ্রুভে এবং বাডেন ও স্যাক্সনি 'বিপ্লব'-এর অন্য বহুবিধ 'জননেতা'। কিন্তু এঁদের সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় যতই ঘনিষ্ঠতর হয়েছিল ততই এঁদের গরিমা ম্লান হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে, ক্ষুদ্রতর ঠেকেছিল লোকগুলিকে।
আবহাওয়া যত ধোঁয়াশাচ্ছন্ন থাকে, মানুষ ও বস্তুকে ততই বড়ো দেখায়। ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের সেই বিশেষ গুণটি ছিল যার বলে তাঁর স্বচ্ছ সুচোখের সামনে থেকে সকল ধোঁয়াশা লুপ্ত হয়ে যেত, মানুষ আর বস্তুকে হুবহু মানুষ আর বস্তুর মতোই দেখাত। এই গুণজাত তাঁর সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টিকে এবং তীক্ষ্ণ ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির দ্যোতক সেই প্রখর বিচারক্ষমতায় প্রথম-প্রথম আমার অস্বস্তি জাগত, এমনকি মাঝে-মাঝে আহতও বোধ করতাম। এটা ঠিক যে রাইখ সংবিধানের সপক্ষে আন্দোলনের 'বীরবৃন্দ' যে এঙ্গেলসের চেয়ে আমাকে বেশি প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন তা নয়, তবু আমার মনে হয়েছিল ওই আন্দোলনে বহু মূল্যবান শক্তির উপাদান এবং প্রচুর সোৎসাহ আত্মত্যাগ নিহিত থাকা সত্ত্বেও তিনি যেন গোটা আন্দোলনকেই খাটো করে দেখছেন।
আবার ওই একই সঙ্গে, দক্ষিণ জার্মানির লোক না হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণদেশীয় জার্মানের শান্তসহিষ্ণু ভাব-এর যে-অবশেষ তখনও পর্যন্ত আমার মধ্যে বিদ্যমান ছিল (যা পরে ইংল্যান্ডে থাকার সময় আমার মধ্যে থেকে ঝেড়েপুঁছে সম্পূর্ণ সাফ হয়ে যায়) তা-ও ব্যক্তি ও বস্তু সম্পর্কে সাধারণ ধারণা গঠনের ক্ষেত্রে আমাদের ঐকমত্যে উপনীত হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। অবশ্য সব সময়েই যে সঙ্গে সঙ্গে আমরা একমত হতাম তা নয়। ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা বিষয়ে এঙ্গেলসের বইখানি আমি এর অনেক আগেই পড়েছিলাম এবং তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত সংযোগ স্থাপিত হওয়ার ফলে তাঁর জ্ঞানের ঐশ্বর্য ও বৈচিত্র্যের ব্যাপারে সম্যক উপলব্ধি অর্জনেও সক্ষম হয়েছিলাম। ফলে এ-ব্যাপারটি লক্ষ্য করতে আমার বেশি দেরি হয়নি যে এঙ্গেলসের প্রতিটি মতামতের পিছনে দৃঢ় ও সুনির্দিষ্ট যুক্তি থাকত।
নিচে থেকে উঁচুতে তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে মনে হতো, বহু অসাধ্যসাধনের নায়ক এই ব্যক্তিটি আমার চেয়ে মাত্র বছর পাঁচেকের বড়ো। বস্তুত পাঁচটা বছর ছিল এক্ষেত্রে গোটা একটা শতকের সমান।
শিগগিরই এটাও আমার নজরে পড়ল যে সামরিক ব্যাপারে তিনি রীতিমতো পারদর্শী। আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে আমি জানতে পারলাম যে ইতিপূর্বে নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউন পত্রিকায় হাঙ্গেরির বৈপ্লবিক যুদ্ধ সম্পর্কে যে-প্রবন্ধাবলি প্রকাশিত হয়েছিল, এবং যে-সব প্রবন্ধের বিশ্লেষণ ইত্যাদি সর্বদা সঠিক প্রমাণিত হওয়ায় সেগুলি হাঙ্গেরির সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ অফিসারের রচনা বলে একটা ধারণা চালু হয়ে গিয়েছিল, তা আসলে ছিল এঙ্গেলসেরই লেখা। অথচ তিনি নিজেই একদিন হাসতে হাসতে আমায় বলেছিলেন যে প্রবন্ধগুলি লেখার সময় অন্য খবরের কাগজের কাছে তথ্যের যে-মালমশলা ছিল তাঁর হাতে তার বেশি আর কিছুই ছিল না। আর ওই মালমশলা প্রায় সম্পূর্ণতই পাওয়া গিয়েছিল একমাত্র অস্ট্রিয়ান গভর্নমেন্টের কাছ থেকে, যে-গভর্নমেন্ট একেবারে জলজ্যান্ত মিথ্যে তথ্য সরবরাহ করছিল। বর্তমান স্প্যানিশ গভর্নমেন্ট কিউবার ব্যাপারে যা বলছে² হাঙ্গেরির ব্যাপারে অস্ট্রিয়ান গভর্নমেন্টও ঠিক সেই কথাই বলে চলেছিল তখন-অর্থাৎ কিনা, তারাই হরদম একতরফা জিতে চলেছে। কিন্তু এঙ্গেলস এক্ষেত্রে তাঁর সেই অলোকদৃষ্টিটি কাজে লাগালেন, লম্বাচওড়া বাতচিতের দিকে দৃকপাতমাত্র করলেন না। তাঁর মস্তিষ্ক থেকে তখনই রঞ্জনরশ্মি বিকিরিত হতে শুরু করেছে; আর আমরা জানি, ওই রশ্মিগুলি প্রতিসরণের তির্যকীকরণের অধীন নয়, 'ক' অক্ষরকে তারা 'গ' করে দেখায় না। সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে কোন-কোন বস্তু অপ্রয়োজনীয় মস্তিষ্কের রঞ্জনরশ্মির সাহায্যে এঙ্গেলস তা বুঝে ফেললেন এবং কোনো ধোঁয়াশা বা মরীচিকাকে তাঁকে পথভ্রষ্ট করতে দিলেন না, তিনি সেঁটে রইলেন যা প্রকৃত যা বাস্তব তার সঙ্গে-অর্থাৎ তথ্যের সঙ্গে। মৃত্যুর মুখে যতই তুড়ি বাজিয়ে মস্ত বীরপনা ফলিয়ে অস্ট্রিয়ান গভর্নমেন্ট তার 'ঘনাদা' সুলভ ঘোষণাপত্রগুলি প্রচার করুক না কেন, কিছু কিছু তথ্যের উল্লেখ না করে তাদের উপায় ছিল না। যেমন তাদের উল্লেখ করতে হতো যে-সব জায়গায় সংঘর্ষগুলো ঘটছে সে-সব জায়গার নাম, যুদ্ধের সূচনায় ও শেষে সৈন্যরা কোথায় ছিল ও কোথায় আছে তার খবর, সংঘর্ষের সময়নির্ঘণ্ট, সৈন্যচলাচলের খবর, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আর খবরের এইসব টুকরোটাকরা আর খণ্ড ভগ্নাংশগুলো দিয়ে, এগুলোকেই জুড়ে জুড়ে স্বচ্ছ ও প্রোজ্জ্বল-দৃষ্টি চক্ষুষ্মান আমাদের ফ্রেডরিখ শিল্পী ক্যুভিয়ের মতো রণক্ষেত্রের ঘটনাবলির সত্যিকার চিত্রটি তুলে ধরতেন। রণক্ষেত্রের ভালো একটি মানচিত্রের সাহায্যে ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত তারিখ ও জায়গার নাম থেকে একেবারে গাণিতিক নির্ভুলতায় এই সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়েছিল যে 'বিজয়ী' অস্ট্রিয়ানরা ক্রমাগত পিছনে 'এগিয়ে যাচ্ছে' আর 'পর্যুদস্ত' হাঙ্গেরিয়ানরা ক্রমশ সামনে 'হটে যাচ্ছে'! ওই আঙ্কিক হিসেব এতই সঠিক ছিল যে কাগজপত্রে যেদিন প্রকাশিত হলো অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনী হাঙ্গেরিয়ানদের চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করেছে তার পরদিনই অস্ট্রিয়ান বাহিনীকে সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ অবস্থায় হাঙ্গেরি ছেড়ে পালাতে দেখা গেল। ...
প্রসঙ্গত বলি, মনে হয় এঙ্গেলস যেন সৈনিক হবার জন্যে জন্মেছিলেন। তাঁর ছিল স্বচ্ছ দৃষ্টি, দ্রুত উপলব্ধির ক্ষমতা এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনার মূল্য যাচাইয়ের শক্তি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য এবং অবিচল ধীরস্থির ভাব। পরবর্তীকালে সামরিক সমস্যাদি নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ লিখেছিলেন এবং ছদ্মনামে লিখলেও তার জন্যে প্রথম শ্রেণির সামরিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। ওই বিশেষজ্ঞদের অবশ্য কোনোই ধারণা ছিল না যে আলোচ্য পুস্তিকাগুলির অজ্ঞাতপরিচয় লেখক-ব্যক্তিটি ছিলেন তখনকার দিনের সবচেয়ে 'কুখ্যাত' বিদ্রোহীদের একজন। ...
লন্ডনে থাকতে আমরা ঠাট্টা করে এঙ্গেলসকে ডাকতাম 'জেনারেল' বলে। তাঁর জীবদ্দশায় যদি আর একটা বিপ্লব ঘটত তাহলে এঙ্গেলসের মধ্যে আমরা পেতাম সেনাবাহিনীর ও সামরিক বিজয়ের সংগঠক, সমরবিদ্যায় ধীমান কার্নোকে³।
সুইজারল্যান্ডে সেবার অল্প কিছুকাল এঙ্গেলসের সঙ্গে কাটানোর পর পরের বছর লন্ডনে আবার তাঁর সঙ্গে দেখা। প্রথমে তিনি লন্ডনে চলে এসেছিলেন। এর পর থেকে তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ সর্বদা অক্ষুণ্ণ ছিল।
বস্তুত, এঙ্গেলস লন্ডন ছেড়ে ১৮৫০ সালে ম্যানচেস্টারে চলে যান (আমি তখন বাস করছিলাম লন্ডনে) তাঁর বাবার ব্যবসায় যোগ দিতে। রাইনের অন্যান্য ব্যবসায়ীদের মতো এঙ্গেলসের বাবারও ইংল্যান্ডে একটি ব্রাঞ্চ অফিস ছিল। এঙ্গেলস কিন্তু প্রায়ই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন লন্ডনে, কখনও কখনও কিছুটা দীর্ঘ সময়ের জন্যেও। মার্কসকে তিনি চিঠি লিখতেন প্রায় প্রতিদিন, আর ওই সব চিঠির যতখানি অংশ নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপারে সীমাবদ্ধ থাকত না ততখানি মার্কস নিয়মিতভাবে আমাদের পড়ে শোনাতেন-আমাদের মানে, প্রায়ই পরিবর্তনশীল মার্কস গোষ্ঠীর অপেক্ষাকৃত বিশ্বাসযোগ্য সদস্যদের।
এটা অবশ্য সত্যি যে মার্কসের সঙ্গে আমার সম্পর্ক যতখানি ঘনিষ্ঠ ছিল এঙ্গেলসের সঙ্গে কখনোই তা ছিল না। বারো বছর মার্কসের বাড়িতে আমি ছিলাম প্রায় প্রাত্যহিক অতিথি, পরিবারেরই প্রায় একজন সদস্য। তবে মার্কসের মৃত্যু আমাকে এঙ্গেলসের আরও নিকটবর্তী করে তুলেছিল।
এঙ্গেলসকে তখন মার্কসের স্থানাধিকারী হওয়া ও তাঁর অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা ও আরব্ধ কর্ম পূরণের দ্বৈত কর্তব্য পালন করতে হচ্ছিল।
আর একমাত্র তখনই তিনি, যিনি তার আগে পর্যন্ত (তাঁর নিজের ভাষায়) 'দোহার' মাত্র ছিলেন, দেখিয়ে দিলেন তিনি কতদূর কী করতে পারেন। দেখিয়ে দিলেন, তিনি 'মূল গায়েন'ও হতে সমর্থ।
তার আগে বছর বিশেক সময় ধরে যে-কর্মশক্তিকে তিনি প্রধানত ব্যবসার কাজে লাগাতে বাধ্য হয়েছিলন, তা এখন পুরোপুরি পূর্বোক্ত দ্বৈত কর্তব্য সম্পাদনে নিয়োগ করলেন। পুঁজি বইটি যথাসাধ্য সম্পূর্ণ করলেন তিনি, তাঁর নিজস্ব বৈজ্ঞানিক রচনার কাজে আশ্চর্য কর্মশক্তির উদ্বোধন ঘটালেন এবং কাজ করার অসামান্য ক্ষমতার দরুণ এরই ফাঁকে-ফাঁকে তাড়াতাড়ি আন্তর্জাতিক চিঠিপত্র লেখালেখিরও উপযোগী সময় করে নিতে সক্ষম হলেন। আর, বলা বাহুল্য, এঙ্গেলসের সে-সব চিঠি সাধারণ চিঠি ছিল না, প্রায়ই সেগুলি হয়ে দাঁড়াত রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ, পথনির্দেশ ও পরামর্শদানের নামান্তর।
যেখানেই তাঁকে দরকার পড়ত সেখানেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন তিনি; চারপাশের সবাইকেই তিনি উদ্বুদ্ধ করে তুলতেন। উপদেশ দিয়ে, উপরোধ-অনুরোধ করে, সতর্কবাণী উচ্চারণ করে মৃত্যুর অল্প আগে পর্যন্তও সক্রিয় সৈনিক হিসেবে এঙ্গেলস অংশগ্রহণ করে গেছেন মহান আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনে। আর সেই আন্দোলন কার্যকর করে তুলছিল এমন একটি আদর্শকে, তিনি ও তাঁর বন্ধু মার্কস ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের অগ্রদূত ভোরের হাওয়ার আভাস পেয়ে ১৮ ৪৮ সালের সূচনায় শ্রমিকদের কাছে একদা ঘোষণা করেছিলেন যার কথা, বলেছিলেন দুনিয়ার মজদুর এক হও!
তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। দুনিয়ায় এমন কোনো শক্তি নেই যা বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ প্রলেতারিয়েতের গতি রোধ করতে পারে।
১৮৯০ সালের ২৮ নভেম্বর আমরা লন্ডনে এঙ্গেলসের সত্তরতম জন্মদিবস উদ্যাপন করেছিলাম। সবচেয়ে খুশির, সর্বাপেক্ষা প্রাণোচ্ছল যৌবনকালে যতখানি তরতাজা, রঙ্গরসিকতায় ভরপুর আর লড়াইখেপা ছিলেন তিনি সত্তর বছরেও ছিলেন তা-ই। আর এর তিন বছর পরে কনকর্ডিয়া-হলে যখন তিনি বার্লিনের শ্রমিকদের বললেন⁴, 'কমরেডস, এ-বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে ভবিষ্যতেও আপনারা আপনাদের কর্তব্য পালন করে যাবেন!' তখন যে হাজার-হাজার মানুষ উৎসাহভরে তাঁর কথা শুনছিলেন এবং ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় বিগলিত হয়ে দেখছিলেন তাঁকে, তাঁদের মধ্যে এমন একজনও ছিলেন না যিনি অবাক হয়ে বলেননি:
'এই যুবাপুরুষটির কি ৭৩ বছর বয়স হতে পারে?'
এর পর পুরো দুটো বছরও কাটল না। ১৮৯৫ সালের ৬ আগস্ট ব্রেমেনের বিরাট ট্রেড ইউনিয়ন উৎসব থেকে ফিরে এসে দেখলাম ফরওয়ার্ডস-এর সম্পাদকীয় দপ্তরে আমার ডেস্কের উপর পড়ে রয়েছে এই মর্মান্তিক টেলিগ্রামখানা:
'গতকাল রাত্রি ১০:৩০-এ জেনারেল মারা গেছেন। দুপুর থেকে অচৈতন্য ছিলেন। দয়া করে ওল্ডেট ও জিঙ্গারকে খবরটা জানান।'
ওল্ডেট (সৈনিক) মানে, আমি⁵।
তার আগেই বসন্তকাল থেকে আমরা, অর্থাৎ জার্মানিতে তিন ব্যক্তি, জানতাম যে 'জেনারেল' গলনালির দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত। তাই এই আঘাত অপ্রত্যাশিত না হলেও এ ছিল বড়ো কঠিন আঘাত, বড়ো ভয়ঙ্কর আঘাত।
এইভাবে নীরব হয়ে গেলেন তিনি, সেই বিরাট পুরুষ, মার্কসের সঙ্গে একত্রে যিনি বিজ্ঞানসম্মত সমাজতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছেন, প্রলেতারিয়েতকে শিক্ষা দিয়েছেন সমাজতন্ত্রের রণকৌশল, চব্বিশ বছরের তরুণ বয়সে যিনি রচনা করেছেন ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা শীর্ষক ধ্রুপদী গ্রন্থ, কমিউনিস্ট ইশতেহার-এর যুগ্ম-রচয়িতা যিনি, কার্ল মার্কসের 'দ্বিতীয় সত্তা' হিসেবে যিনি তাঁকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংঘের প্রাণদানে সহায়তা করেছেন, অ্যান্টি-ডুরিং বা চিন্তাশক্তির অধিকারী যে-কোনো মানুষের বোধগম্য স্ফটিক-স্বচ্ছ বিজ্ঞানের সেই বিশ্বকোষের রচয়িতা যিনি, পরিবারের উৎপত্তি ও অন্যান্য বহু গ্রন্থ, প্রবন্ধ ও সংবাদপত্রের নিবন্ধের যিনি প্রণেতা, সেই বন্ধু, উপদেষ্টা, নেতা ও যোদ্ধা মানুষটি আর নেই-তিনি প্রয়াত।
কিন্তু যেখানেই শ্রেণি-সচেতন প্রলেতারিয়ানরা বেঁচে আছেন আর লড়াই করছেন সেইখানেই বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে তাঁর মর্মবাণী।
সম্পাদকীয় টীকা:
১. সংশ্লিষ্ট রচনাটি ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। -সম্পা.
২. ১৮৯৫ সালে তৎকালীন স্প্যানিশ উপনিবেশ কিউবা দ্বীপে যে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় তা দমন করার ব্যাপারে স্প্যানিশ গভর্নমেন্টের ব্যর্থতার কথাই এখানে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করছেন লেখক। -সম্পা.
৩. লাজার নিকোলা কার্নো (১৭৫৩-১৮২৩) ফ্রান্সে বুর্জোয়া বিপ্লব সংগঠনের কালে ফরাসি রাজনীতিবিদ ও সেনানায়ক, বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রী। -সম্পা.
৪. ১৮৯৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বার্লিনে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের এক সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে এঙ্গেলস এই কথাগুলি বলেন। -সম্পা.
৫. এই তিন ব্যক্তি হলেন যথাক্রমে ভিলহেলম লিবনেষ্ট, ফার্দিনান্দ অগাস্ট বেবেল এবং প. জিঙ্গার। -সম্পাদক।