02/08/2026
জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা— দেশ বিক্রি হবে না, বৈষম্য থাকবে না
ফতুল্লা বটতলায় বাসদের পথসভা
অসম বাণিজ্য চুক্তি বাতিল, জাতীয় সম্পদ বিদেশিদের ইজারা প্রদান বন্ধ এবং খুন-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান
নারায়ণগঞ্জ, ২ আগস্ট ২০২৬:
আগামী ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ফতুল্লা আঞ্চলিক শাখার উদ্যোগে আজ রবিবার (২ আগস্ট) বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে ফতুল্লা বটতলা রেললাইনে এক পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
পথসভায় সভাপতিত্ব করেন বাসদ ফতুল্লা থানা কমিটির সদস্য ও রি-রোলিং স্টিল মিলস শ্রমিক ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি জামাল হোসেন। বক্তব্য রাখেন বাসদ নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সদস্য সচিব আবু নাঈম খান বিপ্লব, গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি সেলিম মাহমুদ, বাসদ নারায়ণগঞ্জ জেলা বর্ধিত ফোরামের সদস্য রুহুল আমিন সোহাগ, বাসদ ফতুল্লা থানা কমিটির সদস্য ও সেঞ্চুরি অ্যাপারেলস লিমিটেড শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, ফতুল্লা আঞ্চলিক শাখার গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ রানা, সফিকুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
বক্তারা বলেন, আগামী ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। সে সময় দেশের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, নারী, যুবক, পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষ বৈষম্য, দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমেছিলেন। অসংখ্য শহিদের আত্মত্যাগ এবং হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটলেও জনগণের প্রত্যাশিত বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তারা বলেন, দেশের মানুষ আজ গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, মব সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ব্যবসা, নারী ও সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং দুর্নীতির বিস্তার সমাজকে ক্রমাগত অস্থিতিশীল করে তুলছে। জনগণ যে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল, সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
বক্তারা অভিযোগ করেন, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বিদায়ের প্রাক্কালে জাতীয় নির্বাচনের কয়েকদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অসম বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি, স্বাধীন বাণিজ্যনীতি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে বলে তারা দাবি করেন। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের লালদিয়া চর টার্মিনাল, কেরানীগঞ্জের পানগাঁও টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা প্রদান এবং লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগকে তারা জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে অভিহিত করেন।
বক্তারা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য GSOMIA ও ACSA সামরিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। এসব চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত করার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্প, কৃষি, ওষুধশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত বিদেশি প্রতিযোগিতার মুখে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন বক্তারা।
নেতৃবৃন্দ বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে শ্রমজীবী মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, অথচ সেই অনুপাতে মজুরি বৃদ্ধি করা হচ্ছে না। অনেক শ্রমিক মাস শেষে বেতন পেলেও ব্যাংকের এটিএম বুথে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকায় দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও নিজের উপার্জিত অর্থ তুলতে না পারা শ্রমিকদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা অবিলম্বে শ্রমিকদের জন্য নির্বিঘ্ন ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বক্তারা শিল্পাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তারা বলেন, নিরাপদ পানির অভাবে সাধারণ মানুষ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশুদ্ধ খাবার পানি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলেও এ ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট।
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, এটিকে দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থান খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়নি। অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা আরও বাড়বে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বক্তারা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল— "বৈষম্য থাকবে না।" কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হয়েছে। একদিকে অল্প কয়েকজনের হাতে সম্পদ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ঘটছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
তারা বলেন, বাংলাদেশের জনগণ কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আধিপত্য মেনে নেবে না। জাতীয় সম্পদ, বন্দর, নদী, জ্বালানি, শিল্প ও অর্থনীতিকে বিদেশি করপোরেট স্বার্থের কাছে সমর্পণ করা যাবে না। একই সঙ্গে ধর্মীয় উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস ও গণতন্ত্রবিরোধী সব অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
পথসভা থেকে অবিলম্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত অসম বাণিজ্য চুক্তি বাতিল, চট্টগ্রাম বন্দরসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশিদের ইজারা প্রদান বন্ধ, খুন, সন্ত্রাস, অপহরণ, মাদক, জমি দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিশুদ্ধ খাবার পানির নিশ্চয়তা, শ্রমিকদের নির্বিঘ্নে বেতন উত্তোলনের জন্য সব ব্যাংকের এটিএম বুথে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ এবং জনগণের জীবন-জীবিকা রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
সমাবেশের শেষে নেতৃবৃন্দ বলেন, শুধু সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। শোষণ, বৈষম্য, লুটপাট ও মুনাফাভিত্তিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই প্রকৃত গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব। তাই মুক্তিযুদ্ধের সাম্য, মানবিকতা ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, যুব, নারীসহ সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে বাসদ ও বামপন্থী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিকে আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ, গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম জোরদার করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।