09/04/2026
🖋️নরোত্তমপুর ইউনিয়নের বীর পুরুষব্রিটিশ বিরোধী বালাকোট আন্দোলনের অগ্রজ মরহুম গাজী ইমাম উদ্দীন বাঙ্গালী (রহ)।
🖋️ জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ ব্রিটিশকবলিত বাংলা-ভারত উপমহাদেশজুড়ে পরিচালিত স্বাধীনতা সংগ্রাম বা জিহাদ আন্দোলনের তিনি ছিলেন প্রথম সারির একজন কান্ডারি। ১৮২০ সাল থেকে ১৮৩১ সাল পর্যন্ত তিনি সে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে; নিবেদন, সমর্পণ, সংগঠন ও নেতৃত্ব নিয়ে। আজাদির সংগ্রামে নিবেদিত এই মহান পুরুষের জন্মভিটা ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের নোয়াখালীর হাজীপুরে। উনবিংশ শতকের এই দরবেশ বিপ্লবী তার জীবনের শেষ প্রায় দুটি যুগ কাটান নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার ১ নং নরোত্তমপুর ইউনিয়নের ৯ ওয়ার্ড সাদুল্লাপুর গ্রামে।
🖋️ তৎকালীন এক দ্বীনদার দারোগা (ভূস্বামী) সাবের খাঁ স্বেচ্ছায় তার বহু খেদমত করেছেন। ঠাঁই গোজার জন্য তাকে কিছু জায়গা-জমি দিতে চেয়েছেন। তিনি তাতে সম্মত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ওই দারোগা তার স্ত্রীর নামে এক প্রকার জোর করে সাদুল্লাপুরের জায়গাটুকু দান করেন। তখন থেকেই তার পরিবার ও বংশধরের বসবাস সাদুল্লাপুরে।
🖋️ মাওলানা গাজী ইমামুদ্দীনের ভিটার মুখে প্রাচীন মসজিদের সামনে এসে দাঁড়ালাম। সামনে ছোট মাঠ ও পুকুর। দক্ষিণ পাশে ঘন গাছ-গাছালিতে ঢাকা অপ্রশস্ত কবরস্থান। সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরাও করা। এই কবরস্থানে শুয়ে আছেন তার স্ত্রী, মেয়েরা। শুয়ে আছেন শত বছর আগে চলে যাওয়া তার পরিবারের আরও ক’জন মুরবিব। কিন্তু তিনি এখানে নেই।
🖋️এ মসজিদ তার আমলে তাকে কেন্দ্র করেই নির্মিত। এই ভিটা তাকে ঘিরেই এখন জনবসতি। তার জীবন ও জীবনের ঘটনা নিয়ে বহু কিংবদন্তি এই দহলিজে বিচরণ করছে। এর সবকিছুর সঙ্গেই তার স্মৃতির পরশ আছে, কেবল তার কবরটি এখানে নেই। তিনি আর কেউ নন, বিখ্যাত আলেম-দরবেশ ও যোদ্ধা মাওলানা গাজী ইমামুদ্দীন বাঙ্গালী (রহ)
🖋️ দিল্লীতে থাকাকালে প্রায় ত্রিশ বছর বয়সী যুবক ইমামুদ্দীন সাইয়েদ আহমদ শহীদের সঙ্গে দেখা করেন। তখন অনেকেই তার কাছে মুরিদ হচ্ছিলেন। ইমামুদ্দীন সে সময়ে মুরিদ হননি। তিনি তার মুরিদ হন লাখনৌর এক বাইয়াতের মজলিসে, আকস্মিক সিদ্ধান্তে। এরপর ৩ সাইয়্যেদ আহমদ শহীদের সঙ্গে তিনি সার্বক্ষণিক ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। প্রায় সব সফর, সব অভিযান ও সংগ্রামে তিনি তার সঙ্গেই ছিলেন; একদম ১৮৩১ সালের বালাকোট পর্যন্ত। ১৮২২ সালের কলকাতা সফর এবং সেখান থেকে হজ্বের সফরেও তার উপস্থিতির বর্ণনা রয়েছে। দিন কাটে তার প্রায় বেহুশের মতো, মজযুব অবস্থায়। তখন থেকেই তার মুর্শিদ সাইয়েদ আহম্মেদ বাঙ্গালী (রহ.)।
🖋️১৭৮৮ সালে নোয়াখালীর হাজীপুরে ইমামুদ্দীনের জন্ম। ৩ বছর বয়সে এতীম হয়ে যান। তার আম্মার আবার বিয়ে হয়। অবহেলা ও বঞ্চনার জীবন কাটে তার শৈশব-কৈশোরে। মমতাময়ী মায়ের চোখের পানিতে অনুমোদনের রোদ দেখে দ্বীনী শিক্ষা অর্জনের জন্য পথে নামেন। নোয়াখালী, ঢাকা হয়ে কলকাতায় যান। কোন কোন মাদরাসায় পড়েছেন এখন আর জানা যায় না। লেখাপড়ার শেষ প্রান্তে তিনি শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন দিল্লীর মাদরাসায়ে রহিমিয়ায় উপমহাদেশের শীর্ষ আলেম শাহ আবদুল আযীয (রহ.)-এর। এই শাহ আবদুল আযীযের শিষ্য সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.) নিজেও।
🖋️ বালাকোটের পর তিনি নোয়াখালী ফিরে আসেন। তখন তিনি ছিলেন অর্থ-বিত্তহীন, নাম-ডাকমুক্ত অতি সাধারণ প্রায়-পৌঢ় একজন মানুষ। তার ভেতরের অবস্থা তাকে দেখে বোঝা যেত না। তিনি ছিলেন বড় আলেমে দ্বীন, বড় বিপ্লবী-মুজাহিদ, বড় আল্লাহওয়ালা দরবেশ। তার স্বরূপ যখন ধীরে ধীরে প্রকাশ হতে থাকে তখন তার চারপাশে দ্বীনপাগল মানুষেরা এসে ভিড় করেন। তার জীবন যাপন ও দ্বীনী কাজে সহায়ক হিসেবে বহু মানুষ নিজেদের নিবেদন করেন। নোয়াখালী ফিরে আসার পর তার কামাল ও মহত্বের বিষয়টি কিছুদিনের মধ্যে সংশ্লিষ্টজনদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। তার জীবনের বহু কারামতের ঘটনা তাই লোকের মুখে মুখে চর্চা হয়।
🖋️ ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে বৃহত্তর নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা অঞ্চলে ধর্মপ্রাণ মানুষকে উদ্দীপ্ত ও সংগঠিত করার পেছনে তিনি আজীবন ভূমিকা রেখে গেছেন। তার প্রকাশ্য তৎপরতা ছিল ইসলামী শিক্ষা বিস্তার ও শুদ্ধ, সুস্থ দ্বীনী জীবনে মানুষকে দীক্ষাদান। একজন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাধক দরবেশ হিসেবে তার নাম এখনও বৃহত্তর নোয়াখালীর ধর্মপ্রাণ মানুষের ঘরে ঘরে উচ্চারিত হয়।
🖋️ সাইয়েদ আহমদ শহীদের আরেক খলীফা কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.) বাংলা অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াতের কাজে এলে পরবর্তী সময়ে প্রবীণ এই পীর ভাইয়ের কাছে উপদেশ ও সংস্রব গ্রহণ করতেন। তার কাছে ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ গ্রন্থের পাঠও গ্রহণ করতেন। নৌকায় চড়ে তিনি সাদুল্লাপুরে এসে উঠতেন। ১৮৫০ সালের দিকে নোয়াখালী অঞ্চলে গাজী ইমামুদ্দীনের বহু মুরিদ-অনুসারী, খলীফা গড়ে ওঠেন। এদেরই একজন ছিলেন এদেশের বরেণ্য বুযুর্গ হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর দাদা লক্ষ্মীপুরের লুধুয়া নিবাসী মাওলানা আকরামুদ্দীন মিয়াজী (রহ.)।
🖋️ মৃত্যু ও দাফনঃ ১৮৫৮ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে সংগঠিত কাফেলা নিয়ে দ্বিতীয়বার হজ্বে যান এবং ফেরার পথে ১৮৫৯ সালে এডেনের কাছে জাহাজে তার ইন্তেকাল হয়। জাহাজের মধ্যে সফরসঙ্গী হাজী সাহেবগণ ইহরামের কাপড়ের কাফন পরিয়ে নামাযে জানাযা পড়ে পাথর বেঁধে তার লাশ সমুদ্রে নামিয়ে দেন। জিহাদ আন্দোলনে পূর্ববঙ্গের প্রধান কান্ডারি এই বিপ্লবী দরবেশের সলিলসমাধি হয় আরব সাগরের এক অজ্ঞাত জায়গায়। তার কবর খুঁজে বের করার এবং কবরের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাধ্য আর কারও নেই। লোক পরম্পরায় শোনা যায়, শেষ জীবনে তিনি প্রকাশ্যে দুআ করেছেন ও আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছেন তার কবর যেন লোকেরা খুঁজে না পায়। আল্লাহ তার দুআ কবুল করেছেন।
🖋️ জানা যায়, একই দুআ করেছিলেন তার মুর্শিদ সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.)। এ জন্য বালাকোটে শহীদ হওয়ার পর তার লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। একদল মানুষ বহুদিন পর্যন্ত বিশবাস করত, তিনি বেঁচে আছেন, আত্মগোপন করে আছেন, সময় হলেই প্রকাশ হবেন।বালাকোটে শহীদ বিপ্লবী মুজাহিদদের তালিকায় বেশ কয়েকজন বাঙ্গালীর নাম রয়েছে। এদের বেশিরভাগই ছিলেন গাজী ইমামুদ্দীনের রিক্রুট। এদেরই একজন ছিলেন তার আপন ভাই-আলীমুদ্দীন শহীদ (রহ.)। ধারণা করা হয় হাজীপুরের এই আলীমুদ্দীন ছিলেন তার বৈপিতৃয় ভাই।