04/09/2026
জন্মাষ্টমী ও মাতৃত্ব।
সন্তান জন্মানোর পর একজন মা প্রথমে কী দেখে?
মুখ?চোখ? নাকি হাতের আঙুল? আমি কিছুই দেখিনি।আমি প্রথমে দরজার দিকে তাকিয়েছিলাম। কারণ আমার সাতবারের অভ্যাস। সন্তান জন্মালেই আমার চোখ দরজায় চলে যায়। কখন পায়ের শব্দ হবে। কখন লোহার শিকল নড়বে। কখন কেউ এসে বলবে—রাজা খবর পেয়েছেন। আজও তাই হলো।
শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। পাথরের মেঝেতে বিছানো কাপড়টা ভিজে আছে। দেওয়ালের প্রদীপটা বাতাস না থাকা সত্ত্বেও কাঁপছে। বাইরে এমন বৃষ্টি, মনে হচ্ছে মথুরার সমস্ত আকাশ আজ কারাগারের ছাদের উপর এসে পড়েছে।
আর আমার পাশে আমার সন্তান।আমি তাকাতে ভয় পাচ্ছিলাম।
অদ্ভুত না? যে সন্তানকে এতদিন ধরে নিজের শরীরের ভিতরে রেখেছি, যার নড়াচড়ায় রাতের পর রাত ঘুম ভেঙেছে, যার জন্য প্রতিদিন প্রার্থনা করেছি—
তাকে দেখতেই আমার ভয় করছে। কারণ মুখ দেখলে মায়া হয়।
আমি সেটা জানি। প্রথমবার জানতাম না। দ্বিতীয়বার একটু বুঝেছিলাম। তারপর থেকে প্রতিবার নিজেকে বলেছি—দেবকী, বেশি করে তাকিও না।
লাভ নেই। কিন্তু মা কি নিজের সন্তানকে না দেখে থাকতে পারে?
আমি তাকালাম। ছেলেটা চুপ করে আছে। এত চুপ কেন? আমি হাত বাড়িয়ে ওর বুক ছুঁলাম। তারপর নাকের কাছে হাত নিয়ে গেলাম। শ্বাস পড়ছে। আমার বুকের ভিতরে জমে থাকা বাতাসটা একসঙ্গে বেরিয়ে গেল।
বললাম, “আছিস?”
কী বোকার মতো কথা।
সদ্য জন্মানো একটা শিশুকে তার মা জিজ্ঞেস করছে—তুই আছিস?
কিন্তু আমার জীবনে ‘আছে’ কথাটা কখনও খুব বেশিক্ষণ সত্যি থাকে না। তাই নিশ্চিত হতে ইচ্ছে করছিল। আমি ওকে কোলে নিলাম। শরীরটা গরম। ছোট্ট মাথাটা আমার কনুইয়ের কাছে এসে ঠেকল।আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কী আশ্চর্য শান্ত।
বাইরে বাজ পড়ছে। কারাগারের ছাদ কেঁপে উঠছে।
দূরের কোথাও প্রহরীরা চিৎকার করছিল, তারপর হঠাৎ সব চুপ হয়ে গেছে। আর ছেলেটা এমনভাবে শুয়ে আছে যেন পৃথিবীতে তার কোনও তাড়া নেই। আমি আস্তে করে বললাম, “তুই জানিস কোথায় জন্মেছিস?” কোনও উত্তর নেই। “এটা রাজপ্রাসাদ নয়। এটা তোর মামার কারাগার।” ও একটু নড়ল। আমি হাসলাম কি না জানি না। অনেক বছর পরে মুখের পেশিগুলো হয়তো হাসতে ভুলে গেছে। বললাম, “আর আমি তোর মা।” এই কথাটা বলতে গিয়েই গলা আটকে গেল। মা! শব্দটার উপর আমার অধিকার কতক্ষণ? এক ঘণ্টা? আধঘণ্টা? তারও কম? আমি চোখ বন্ধ করলাম। না। আজ কাঁদব না। প্রতিবার কেঁদেছি।আজ না। আজ আমার ছেলেকে আমার মুখটা দেখতে হবে। মায়ের মুখ বলতে যদি কখনও কিছু মনে রাখে, কান্নায় ভেজা মুখটা যেন না রাখে। আমি আঁচল দিয়ে চোখ মুছে ওর কপালের চুল সরিয়ে দিলাম।
ঠিক তখন বসুদেব আমার পাশে এসে বসলেন। এতক্ষণ তিনি কিছু বলেননি। আমি তাকিয়েই বুঝলাম কিছু একটা হয়েছে।
তাঁর পায়ের শিকল মাটিতে পড়ে আছে। দরজা খোলা। আমি প্রথমে কিছু বুঝতে পারলাম না। এত বছর এই কারাগারে আছি।
এই দরজাকে বন্ধ ছাড়া কখনও দেখিনি। বললাম, “দরজা…?”
তিনি খুব আস্তে বললেন, “খুলে গেছে।” আমি তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। “কীভাবে?” তিনি উত্তর দিলেন না। বাইরে আবার বাজ পড়ল। সেই আলো এক মুহূর্তের জন্য ঘরের মধ্যে এসে পড়তেই দেখলাম প্রহরীরা বাইরে মাটিতে পড়ে ঘুমোচ্ছে। ঘুম?
আজ? এই রাতে? আমি ছেলেটাকে আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরলাম। “কী হচ্ছে?” বসুদেব বললেন, “আমাকে ওকে নিয়ে যেতে হবে।” শুনেও বুঝতে পারলাম না। “কোথায়?” “গোকুল।”
আমি হাসলাম। সত্যি হাসলাম। মানুষ যখন খুব ভয় পায় তখন মাঝে মাঝে হাসে। বললাম, “এই বৃষ্টিতে?” তিনি চুপ। “যমুনা পেরিয়ে?"
চুপ।
“একটা সদ্যোজাত শিশুকে নিয়ে?”
তখন তিনি আমার চোখের দিকে তাকালেন। কথাটা আর বলতে হলো না। আমি বুঝলাম।ওকে এখানে রাখলে সকাল পর্যন্ত বাঁচবে না। আর নিয়ে গেলে— হয়তো বাঁচবে।
হয়তো!
মায়েদের জীবনে কখনও কখনও পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তগুলো এই ‘হয়তো’ শব্দটার উপর নিতে হয়।
আমি নিচে তাকালাম। ছেলেটা আমার বুকের সঙ্গে মুখ ঠেকিয়ে আছে। আমি ভাবলাম, একটু আগে তোকে বললাম আমি তোর মা। এখনই তোকে অন্য কারও কাছে পাঠিয়ে দেব?
এত তাড়াতাড়ি?
আমি এখনও তোকে ঠিক করে দেখিইনি।
তোর পায়ের আঙুল গুনিনি।
তোর কানের পাশে যে ছোট্ট ভাঁজটা আছে সেটা ছুঁয়ে দেখিনি।
তুই ক্ষুধা পেলে কীভাবে কাঁদিস তাও জানি না।
তোর কান্না থামাতে আমি পারি কি না, সেটাও জানলাম না।
আর এর মধ্যেই তোকে দিয়ে দিতে হবে?
আমি বসুদেবকে বললাম,
“আর কোনও উপায় নেই?”
তিনি উত্তর দিলেন না।
উত্তরটা দুজনেই জানতাম।
আমি ছেলেটার মুখের দিকে তাকালাম।
“শোন।”
জানি, ও শুনতে পাবে না। তবু বললাম। “তোর ছয়জন দাদাকে আমি বাঁচাতে পারিনি।” কথাটা বলতে গিয়ে থামলাম।অনেকদিন আমি ওদের নাম মনে মনে বলতাম। পরে নাম বলা বন্ধ করে দিয়েছি।নাম বললে মুখ মনে পড়ে। মুখ মনে পড়লে ঘুম আসে না। “তুই যদি বেঁচে থাকিস, আমি তোকে দেখতে পাব কি না জানি না।” বসুদেব মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
আমি বললাম,
“হয়তো তোকে অন্য কেউ কোলে নেবে।” কথাটা মুখ দিয়ে বেরোনোর পরই বুকের মধ্যে যেন কিছু একটা ছিঁড়ে গেল।
অন্য কেউ।
কেউ ওকে খাওয়াবে।
কেউ ঘুম পাড়াবে।
কেউ ওর প্রথম হাসিটা দেখবে।
কেউ ওর প্রথম হাঁটা দেখবে।
ও অসুখ করলে কেউ রাত জেগে মাথায় হাত রাখবে।
ও ভয় পেলে অন্য একজনের আঁচল ধরবে।
আর একদিন হয়তো সেই মানুষটাকেই ‘মা’ বলে ডাকবে।
আমি? আমি তখন এই পাথরের ঘরে বসে থাকব। এই প্রথম আমার মনে হলো কংস শুধু আমার সন্তানদেরই আমার কাছ থেকে নেয়নি। সে আমার মাতৃত্বটাও একটু একটু করে কেড়ে নিয়েছে। আমি হঠাৎ ছেলেটাকে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম যে বসুদেব বললেন, “দেবকী…”
বললাম,
“একটু।”
শুধু এটুকুই।
একটু।
পৃথিবীকে আর কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে বলছিলাম।
দেবতাদেরও।
ভবিষ্যদ্বাণীকেও।
ধর্ম, অধর্ম, রাজা, রাজ্য—সবাই একটু অপেক্ষা করুক।
একজন মা তার সন্তানকে আর একবার কোলে নেবে।
এতটুকু সময় কি আমার প্রাপ্য নয়?
আমি ওর মাথায় মুখ রাখলাম। কী সুন্দর একটা গন্ধ। সদ্য জন্মানো শিশুর গন্ধের কোনও নাম আছে? থাকলে আমি জানি না। শুধু মনে হলো এই গন্ধটা মনে রাখতে হবে। অনেকদিন। হয়তো সারাজীবন। আমি চোখ বন্ধ করে মনে রাখার চেষ্টা করলাম। তার মাথার ওজন। গালের উষ্ণতা। আমার আঙুলের চারপাশে ওর ছোট্ট আঙুল।।সব।
তারপর ওকে বসুদেবের হাতে দিলাম।
না।।ঠিক দিলাম না। প্রথমবার তিনি হাত বাড়ানোর পর আমি ছাড়িনি। আমার হাত তখনও ওর পিঠের নিচে। তিনি অপেক্ষা করলেন। আমি জানি না কতক্ষণ।
শেষে নিজের আঙুলগুলো একে একে সরালাম। এইভাবে কি সন্তান ছাড়া যায়? একটা একটা আঙুল সরিয়ে?
শেষ আঙুলটা সরানোর সময় মনে হলো, আমি যদি এখন বলি—না, কোথাও যাবে না—
তাহলে?
আমি কি খুব স্বার্থপর মা হব?
হোক।
এক মুহূর্তের জন্য সত্যিই মনে হয়েছিল, দরজা বন্ধ করে দিই।
শিকল আবার পরে নিই। আমার ছেলে আমার কাছেই থাকুক।
সকালে যা হবে হোক। তারপর ওর মুখটা দেখলাম। না। সন্তানকে ভালোবাসা আর সন্তানকে নিজের কাছে রাখা সবসময় একই কথা নয়।
কখনও কখনও ভালোবাসার অর্থ—
ছেড়ে দেওয়া।
বললাম, “নিয়ে যাও।”
বসুদেব ছেলেটাকে বেতের ঝুড়িতে শুইয়ে দিলেন। আমি উঠে বসার চেষ্টা করলাম। শরীর পারল না। দেওয়াল ধরে কোনওরকমে মাথা তুললাম। তিনি দরজার কাছে পৌঁছে গেছেন।
বললাম,
“শোনো।”
তিনি ফিরে তাকালেন। কত কথা বলতে চেয়েছিলাম।
ওকে ভিজতে দিয়ো না।
মাথাটা সাবধানে রেখো।
ক্ষুধা পেলে?
কাঁদলে?
যমুনার জল বেড়ে গেলে?
গোকুলে পৌঁছে কার হাতে দেবে?
সে কি আমার ছেলেকে ভালোবাসবে?
সে কি জানবে, এই ছেলের একটা মা আছে যে এই মুহূর্তে পাগলের মতো কারাগারে বসে আছে?
কিছুই বলতে পারলাম না।
শুধু বললাম, “ওকে বলো…”
থেমে গেলাম। সদ্যোজাত একটা শিশুকে আবার কী বলবে? যে তার মা তাকে ছেড়ে দেয়নি? যে তার মা তাকে বাঁচানোর জন্য দূরে পাঠিয়েছিল? যে কোনওদিন যদি সে ভাবে তাকে কেউ চায়নি, তাহলে সেটা যেন বিশ্বাস না করে? আমি শেষ পর্যন্ত বললাম, “কিছু বলার দরকার নেই।” বসুদেব চলে গেলেন।
দরজার বাইরে অন্ধকার। একটু পর তাঁকে আর দেখা গেল না।
আমি তাকিয়ে রইলাম। তারপর প্রথমবার বুঝলাম, সন্তান জন্মানোর পর কোলে হঠাৎ কোনও ওজন না থাকাটা কত ভারী।
দুই হাত আমার ফাঁকা। আমি হাত দুটো বুকের কাছে তুলে রাখলাম। যেন এখনও ও আছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। আমি জানি না আমার ছেলে তখন কোথায় ছিল। কারাগারের উঠোন পেরিয়েছে? মথুরার রাস্তা? যমুনার কাছে পৌঁছেছে? জল কি খুব বেড়েছে? ও কি কাঁদছে?প্রতিটা বাজ পড়ার সঙ্গে আমার মনে হচ্ছিল—এই বুঝি কিছু হলো।
আমি চোখ বন্ধ করে বললাম,
“যে-ই হও তুমি, যে আমার সন্তানকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছ—আজ তাকে তুমি নিজেই দেখো।”
তারপর একটু ভেবে যোগ করলাম,
“দেবতা বলে নয়।”
“আমার ছেলে বলে।”
ভোরের কিছু আগে দরজায় আবার শব্দ হলো।
আমি তাকালাম। বসুদেব ফিরেছেন। তাঁর সমস্ত শরীর ভেজা।
কোলে একটি শিশু। আমি প্রথমে নিশ্বাস নিতে ভুলে গেলাম।
তারপর বুঝলাম— মেয়ে।
তিনি মেয়েটিকে আমার পাশে শুইয়ে দিলেন। আমার ছেলে নেই। তার জায়গায় অন্য একজনের সন্তান। আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেও তো কারও মেয়ে। তারও তো একটা মা আছে। হয়তো এই মুহূর্তে সেই মা ঘুমিয়ে আছে, জানেই না তার সন্তান কোথায়। আমি হাত বাড়িয়ে মেয়েটার গাল ছুঁলাম। ও চোখ বন্ধ করেই আমার আঙুল ধরল। আমার বুক আবার কেঁপে উঠল। আজ রাতে শুধু আমি সন্তান হারাইনি।
আরও একজন মা হারিয়েছে। শুধু সে এখনও জানে না।
আমি মেয়েটাকে খুব সাবধানে কোলে নিলাম। বললাম, “তোর কোনও দোষ নেই মা।”
বাইরে তখন বৃষ্টি ধীরে ধীরে থামছিল। পুব আকাশে আলো ফুটছে। খুব শিগগিরই প্রহরীরা জেগে উঠবে। খুব শিগগিরই খবর যাবে। খুব শিগগিরই দরজার ওপারে পরিচিত পায়ের শব্দ শোনা যাবে। আমি জানতাম। তবু সেই কয়েকটা মুহূর্ত আমি শুধু মেয়েটাকে বুকে ধরে বসে রইলাম।আমার নিজের ছেলে কোথাও অনেক দূরে। এই মেয়েটার মা-ও কোথাও অনেক দূরে।
আর মাঝখানে আমরা দুজন— একজন সন্তানহারা মা, আর একজন মায়ের কাছ থেকে দূরে চলে আসা সন্তান। আমি ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে খুব আস্তে বললাম, “আজ রাতে কে কার মা, সেটা আমি আর বুঝতে পারছি না।”
মেয়েটা নড়ল। আমি তাকে আরেকটু কাছে টেনে নিলাম।
তারপর দরজার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ভোর আসছিল। আর সেই প্রথম আমার মনে হলো—
হয়তো জন্মাষ্টমী শুধু একটি শিশুর জন্মের রাত নয়।
কিছু মায়ের জন্য,
এই দিন সন্তানকে পৃথিবীর হাতে তুলে দেওয়ার রাতও।
AI generated image.