14/07/2026
বিশ্ব হাঙর সচেতনতা দিবস (World Shark Awareness Day) ২০২৬ উপলক্ষে মৎস্য অধিদপ্তরে কর্মশালা অনুষ্ঠিত
বিশ্ব হাঙর সচেতনতা দিবস (World Shark Awareness Day) ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে আজ ১৪ জুলাই ২০২৬ মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়, ঢাকায় একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোঃ খালেদ কনক এর সভাপতিত্বে আয়োজিত কর্মশালায় মৎস্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দেশের মৎস্য ও সামুদ্রিক বিজ্ঞানবিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-গবেষক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণকারী বাণিজ্যিক ট্রলার ও আর্টিস্যানাল নৌযান-সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা প্রদান করেন মৎস্য অধিদপ্তরের ব্লু ইকোনমি শাখার সহকারী পরিচালক জনাব শাকিলা জাহান এবং BRAC Fisheries-এর জেনারেল ম্যানেজার জনাব মোঃ মোশাররফ হোসাইন। উপস্থাপকেরা দিবসটির উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য তুলে ধরে হাঙর ও শাপলাপাতা মাছের (Rays) পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এসব প্রজাতির সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, হাঙর সামুদ্রিক খাদ্যজালের শীর্ষ ও মধ্যবর্তী শিকারি হিসেবে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য এবং পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অতিরিক্ত আহরণ, নির্দিষ্ট প্রজাতির লক্ষ্যভিত্তিক শিকার, অনাকাঙ্ক্ষিত আহরণ বা বাইক্যাচ (Bycatch), অবৈধ, অনুল্লিখিত ও অনিয়ন্ত্রিত (IUU) মৎস্য আহরণ, আবাসস্থল ধ্বংস, সামুদ্রিক দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী হাঙর ও শাপলাপাতা মাছের স্টক উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
কর্মশালায় উপস্থিত আলোচকগণ উল্লেখ করেন যে, IUCN Red List-এর ২০২০ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী বিশ্বের তালিকাভুক্ত হাঙর ও শাপলাপাতা মাছের প্রায় ৩৬ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে এবং প্রায় ১৭ শতাংশ অতি সংকটাপন্ন (Critically Endangered) শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমায় কমপক্ষে ৮৮ প্রজাতির হাঙর ও শাপলাপাতা মাছের উপস্থিতি রয়েছে—এর মধ্যে ৩০টি হাঙর এবং ৫৮টি শাপলাপাতা মাছ। এসবের মধ্যে ৫৪টি প্রজাতি বিশ্বব্যাপী হুমকির মুখে; যার মধ্যে ১০টি অতি সংকটাপন্ন এবং ২২টি বিপন্ন (Endangered) হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশে সাধারণভাবে হাঙরকে লক্ষ্য করে পৃথক বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণ পরিচালিত না হলেও ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ আহরণের সময় হাঙর ও শাপলাপাতা মাছ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাইক্যাচ হিসেবে ধরা পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে মৎস্য অধিদপ্তর ২০২৩ সালে ‘National Plan of Action for Conservation and Management of Sharks and Rays (NPOA-Sharks) 2023–2027’ প্রণয়ন করেছে। কর্মশালায় আরও জানানো হয় যে, দীর্ঘমেয়াদে দেশে অবতরণকৃত হাঙরের পরিমাণ ও গড় আকার কমেছে এবং বড় আকারের প্রজাতিগুলোর ক্ষেত্রে অবতরণকৃত নমুনার প্রায় ৯৮ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক পর্যায়ের—যা অতিরিক্ত আহরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। NPOA-Sharks-এ জেলে, ব্যবসায়ী, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিকে অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোঃ খালেদ কনক World Shark Awareness Day ২০২৬ উদযাপনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় হাঙর ও শাপলাপাতা মাছের ভূমিকা অপরিসীম। এসব প্রজাতির কার্যকর সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক গবেষণার সম্প্রসারণ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, হাঙর ও শাপলাপাতা মাছ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনার কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, জেলে সম্প্রদায় এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, প্রজাতি শনাক্তকরণ, সক্ষমতা উন্নয়ন, বাইক্যাচ হ্রাস এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
মহাপরিচালক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুস্থ ও উৎপাদনশীল সামুদ্রিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার, গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে হাঙর ও শাপলাপাতা মাছ সংরক্ষণে কার্যকর অগ্রগতি অর্জিত হবে এবং দেশের সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা আরও সুসংহত হবে।
কর্মশালাটি আয়োজনে ব্র্যাক সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে।