14/04/2026
বৈসাবির উৎসবের আড়ালে মাদকের অশুভ ছায়া! বিপন্ন যুবসমাজ, বিলীন হতে বসেছে জাতিসত্তার ঐতিহ্য,,,
পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বৈসাবি-যা বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু এই তিনটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সম্মিলন-দীর্ঘদিন ধরে শান্তি, সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এই উৎসব শুধুমাত্র একটি আনন্দ আয়োজন নয়, বরং এটি ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও জীবনচর্চার প্রতিফলন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই মহৎ উৎসবের পবিত্রতা মারাত্মকভাবে কলুষিত হচ্ছে মাদক ও নেশার ভয়াবহ আগ্রাসনে। বিশেষ করে যুবসমাজের একটি বড় অংশ এখন বৈসাবিকে আনন্দ ও সংস্কৃতির উৎসব হিসেবে না দেখে, বরং উন্মুক্ত মাদক সেবন ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক ও বিপজ্জনক প্রবণতা।
এক সময় বৈসাবির মাঠ ছিল রঙিন পোশাক, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, সুরেলা গান ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে ভরপুর। সেখানে এখন দৃশ্যমান হচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র-যেখানে প্রকাশ্যে মাদক সেবন, অশালীন নৃত্য এবং অসংযত আচরণ দিন দিন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। যুবক-যুবতীদের একটি অংশ যেন নৈতিকতার সীমারেখা অতিক্রম করে এক ধরনের উন্মাদনায় লিপ্ত হচ্ছে, যা কেবল তাদের ব্যক্তিগত জীবনই নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোকেও বিপর্যস্ত করছে। এ যেন এক নীরব সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র, যার ভয়াবহতা দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে।
পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার (বার্মা) ও ভারতের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে অবৈধভাবে প্রবেশ করা মাদকদ্রব্য এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। সীমান্তের দুর্বল নজরদারি ও আইন প্রয়োগের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিরা সহজেই ইয়াবা, গাঁজা, বিদেশি মদসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক নেশাদ্রব্য বাজারজাত করছে। বৈসাবির মতো বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে এসব মাদকদ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, এবং সেই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এতে করে যুবসমাজ খুব সহজেই এসব মাদকের নাগালে চলে যাচ্ছে।
অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, উপজাতীয় ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতিতে যেখানে মাদক সেবন করতে পারলেও ধর্মীয়ভাবে সভ্য সামাজিকভাবে তারা নিরুৎসাহিত করছে। সেখানে বর্তমান প্রজন্মের একটি অংশ সেই মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে উল্টো চরম মাত্রায় মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। পূর্বে নিজেদের উৎপাদিত সীমিত পরিমাণ ঐতিহ্যবাহী পানীয় গ্রহণের মধ্যে যে নিয়ন্ত্রিত সংস্কৃতি ছিল, তা এখন বিলুপ্তপ্রায়। তার পরিবর্তে স্থান করে নিয়েছে বিদেশি ও উচ্চমাত্রার নেশাদ্রব্য, যা শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক তিন দিক থেকেই ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতির ফলে সামাজিক অবক্ষয় যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি বাড়ছে অপরাধ প্রবণতাও। মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে অনেক যুবক-যুবতী অসামাজিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যা সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে হুমকির মুখে ফেলছে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত হচ্ছে। এটি কেবল একটি উৎসবের অবক্ষয় নয়, বরং একটি জাতিগত ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
বৈসাবির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসবকে ঘিরে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। এটি প্রমাণ করে যে, সমাজের অভ্যন্তরে এক ধরনের নৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা দ্রুত পূরণ না করা গেলে ভবিষ্যতে এর পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ। তাই এখনই সময় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার, যাতে করে এই অবক্ষয়ের ধারা রোধ করা যায় এবং যুবসমাজকে সুস্থ ও সুশৃঙ্খল জীবনের পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।
এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা, মাদক পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম আরও সক্রিয় করা জরুরি। পাশাপাশি বৈসাবি উৎসবকে কেন্দ্র করে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে করে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রয় ও সেবন বন্ধ করা যায়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় নেতৃত্বকে একযোগে কাজ করতে হবে, যাতে করে যুবসমাজকে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত করা যায়।
তদুপরি, পরিবার ও সমাজের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে এবং সন্তানদের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে। সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তাদের বিকল্প আনন্দের পথ তৈরি করতে হবে। একই সাথে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে তাদের মধ্যে মূল্যবোধ জাগ্রত করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, বৈসাবির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসবকে তার প্রকৃত রূপে ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং একটি জাতির পরিচয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। তাই এই উৎসবকে মাদক ও নেশার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। অন্যথায়, আমরা কেবল একটি উৎসবই হারাবো না, বরং হারাবো আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড় ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনা।
অতএব, এখনই সময় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের-রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি-সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাদকমুক্ত বৈসাবি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই কেবল আমরা আমাদের ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারবো এবং একটি সুস্থ, সচেতন ও আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।