12/06/2026
কল্পনা চাকমা অপহরণের ৩০ বছর
জুম্ম নারীর উপর সহিংসতা বন্ধ কর-কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার নিশ্চিত কর
অবিলম্বে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ কর
হিল উইমেন্স ফেডারেশনের বিবৃতি
প্রিয় দেশবাসী,
আজ ১২ জুন ২০২৬ কল্পনা চাকমা অপহরণের ৩০ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। বলাবাহুল্য, এই অপহরণ ঘটনা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে জুম্ম নারী তথা জুম্ম জনগণের উপর চরম অমানবিকতা, বর্বরোচিত সহিংসতা ও মানবাধিকারের উপর নগ্ন হস্তক্ষেপের প্রতীক নয়, এটি একই সাথে সরকার ও প্রশাসনের এবং বিশেষ করে সেনাবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের জন্য অত্যন্ত কলঙ্কের ও লজ্জাজনক একটি দিন। উপরন্তু বিগত ৩০ বছরেও অপহৃত কল্পনা চাকমার হদিশ দিতে না পারা এবং অভিযুক্ত ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করতে না পারার ঘটনা জুম্ম নারীদের প্রতি সরকার, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের বৈষম্যকেই সুস্পষ্ট করে তুলেছে।
১৯৯৬ সালের আজকের এইদিনে দিবাগত রাতে (আনুমানিক ১:৩০ ঘটিকা থেকে ২:৩০ ঘটিকার মধ্যে) রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলাধীন বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমাকে পার্শ্ববর্তী কজইছড়ি সেনাক্যাম্পের কমান্ডার লে. ফেরদৌসের (মোঃ ফেরদৌস কায়ছার খান) নেতৃত্বে একদল সেনা ও ভিডিপি সদস্য কর্তৃক সুপরিকল্পিতভাবে অপহরণ করা হয়। সেই ঘটনার আজ ৩০টি বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্র তার সুষ্ঠু বিচার এবং দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। উল্লেখ্য যে, ঐ সময় অপহরণকারীরা কল্পনার দুই বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা ও লাল বিহারী চাকমাকেও বাড়ির বাইরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন। কল্পনার দুই ভাই টর্চের আলোতে স্পষ্টতই অপহরণকারীদের মধ্য থেকে বাড়ির পাশ্বর্বর্তী কজইছড়ি সেনাক্যাম্পের কমান্ডার লে. ফেরদৌস এবং তার পাশে দাঁড়ানো ভিডিপি প্লাটুন কমান্ডার মোঃ নুরুল হক ও মোঃ সালেহ আহমদকে চিনতে পারেন। ঘটনার পর ভোর হওয়ার সাথে সাথে ১২ জুন, সকাল পৌনে ৭ টায় কল্পনার বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা স্থানীয় মুরুব্বি সম্রাটসুর চাকমা ও ইউপি চেয়ারম্যান দীপ্তিমান চাকমাকে নিয়ে বাঘাইছড়ি থানা নির্বাহী কর্মকর্তা (টিএনও) হাসান জাহাঙ্গীর আলমের কাছে যান। সেখানে কালিন্দী কুমার চাকমা জবানবন্দি দেন। জবানবন্দী দেয়ার সময় ঘটনাস্থলে পাওয়া পাঁচটি বন্দুকের গুলিও টিএনও’র কাছে জমা দেন। কিন্তু টিএনও লিখিত জবানবন্দী কালিন্দি কুমারকে পড়ে শোনাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে কালিন্দি কুমার চাকমা থানায় গিয়ে উক্ত লে. ফেরদৌস, পিসি নুরুল হক ও সালেহ আহমেদের নামে এফআইআর (মামলা নং ২/৯৬১, তাং ১২/৬/১৯৯৬ ধারা-৩৬৪) দায়ের করেন। কিন্তু ওসি শহিদুল্লাহ বাদীর জমাকৃত প্রমাণাদি লোপাটসহ প্রদত্ত জবানবন্দী বিকৃত করে অভিযুক্তদের নাম বাদ দিয়ে সাধারণ একটি এফআইআর দায়ের করেন।
প্রিয় পার্বত্যবাসী,
সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাতে কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার পর দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। দেশে-বিদেশে তুমুল প্রতিবাদের মুখে সরকার অবশেষে ঘটনার তিন মাস পর ৭ সেপ্টেম্বরে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আব্দুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়। কমিটি ৯৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে ১৯৯৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৪০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু কোনো সরকার অধ্যাবধি তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেনি। ১৯৯৮ সালের ১৭ জানুয়ারি মামলাটি বাঘাইছড়ি থানা থেকে রাঙ্গাামটি জেলার বিশেষ শাখায় হস্তান্তর করা হয়। আট বছর পর ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর আবার জেলা থেকে বাঘাইছড়ি থানায় পুনঃ হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০১০ সালের ২১ মে চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় বাঘাইছড়ি থানা পুলিশ। পুলিশের এই তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকৃত অভিযুক্তদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রেখে দেওয়া হয়।
উক্ত তদন্ত প্রতিবেদনের উপর অভিযোগ এনে কালিন্দি কুমার চাকমা আদালতে নারাজী আবেদন করেন। বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত ২০১০ সালের ২ সেপ্টেম্বর মামলা তদন্তে সিআইডি’র চট্টগ্রাম জোনকে নির্দেশ দেন। সিআইডি দুই বছর তদন্ত করে ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। সিআইডি’র প্রতিবেদনও পূর্বের দাখিলকৃত দুটি প্রতিবেদনের মতোই থেকে যায়। সিআইডি’র প্রতিবেদনের উপরও বাদী কালিন্দি কুমার চাকমা নারাজী আবেদন করলে আদালত ১৯ অক্টোবর ২০১৬ রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার সৈয়দ তারিকুল হাসানকে এ মামলার তদন্তভার দেন। তিনি দুই বছর পর ২০১৮ সালে কারও বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তিনিও পূর্বের তদন্ত রিপোর্টের পুনরাবৃত্তি করে তার প্রতিবেদনে বলেন- ‘আমার তদন্তকালে ভিকটিমের অবস্থান নিশ্চিত না হওয়ায় তাহাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় নাই। ....বিধায় মামলার তদন্ত দীর্ঘায়িত না করিয়া বাঘাইছড়ি থানার চুড়ান্ত রিপোর্ট সত্য নং ০৩, তারিখ ৭/৯/২০১৬ দ: বি: বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করিলাম। ভবিষ্যতে কল্পনা চাকমা সম্পর্কে কোনও তথ্য পাওয়া গেলে বা তাহাকে উদ্ধার করা সম্ভব হইলে যথানিয়মে মামলাটির তদন্ত পুনরুজ্জীবিত করা হইবে।’
এ প্রতিবেদনেও নারাজি দেন কল্পনার ভাই কালিনী কুমার চাকমা এবং উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত করে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। এবিষয়ে আদালত একের পর এক শুনানির দিন ধার্য্য করে সময় ক্ষেপণ করতে থাকে। গত বছরের ২৩ এপ্রিল ২০২৪ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফাতেমা বেগম মুক্তা বাদী কালিন্দী কুমার চাকমার নারাজী আবেদন খারিজ করে ২০১৮ সালে তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপার দ্বিতীয় দফায় তদন্ত শেষে আদালতে যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন সেটিই বহাল রাখেন। বাদীপক্ষ ২০২৪ সালের ৮ জুলাই কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলাটি পুনর্বিবেচনা বা রিভিশনের জন্য রাঙ্গামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আবেদন করেন। আদালত আবেদনটি গ্রহণ করলেও বিচারিক প্রক্রিয়ায় অদ্যাবধি কোনো অগ্রগতি নেই, উপরন্তু নানাভাবে বিচারিক প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার মনোভাব লক্ষণীয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার প্রতিবাদে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে ডাকা ২৭ জুন ১৯৯৬ অর্ধদিবস সড়ক অবরোধ চলাকালে আবার তৎকালীন বাঘাইছড়ি সেনা কর্তৃপক্ষের মদদে স্থানীয় ভিডিপি ও সেটেলারদের সাম্প্রদায়িক হামলায় বাবুপাড়া ও মুসলিম বøক এলাকায় গুলি করে রূপন চাকমাকে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে সুকেশ, মনোতোষ ও সমর বিজয় চাকমাকেও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এক্ষেত্রেও সরকার বা প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
প্রিয় সংগ্রামী জুম্ম জনগণ,
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ট আসনে বিজয়ী হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হয়েছে। সরকার গঠনের পরপরই ২৯৯ পার্বত্য রাঙ্গামাটি সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও উদ্বেগজনকভাবে চুক্তি লঙ্ঘন করে চট্টগ্রাম-৫ সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু তিন মাসের ব্যবধানে গত ১ জুন পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগে মন্ত্রণালয়ে নিঃসন্দেহে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, তাতে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের ভ‚মিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া, এখনো পর্যন্ত সরকার পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতি এবং চুক্তির আলোকে গঠিত বিশেষ শাসনব্যবস্থার সর্বোচ্চ সংস্থা আঞ্চলিক পরিষদের সাথে কোনো আলোচনা করেনি এবং চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহ পুনর্গঠন করা হয়নি।
বস্তুত পার্বত্য সমস্যার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের জন্য পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই এবং পার্বত্য চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত না হওয়া ও চুক্তির আলোকে এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ার কারণে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো সামরিক কর্তৃত্ব বজায় থাকার কারণেই পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও আদিবাসী জুম্ম নারীর উপর নির্মম সহিংসতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। তাই কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনার সুবিচার নিশ্চিতকরণসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর সমমর্যাদা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তার স্বার্থে সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের নিকট নিম্নোক্ত দাবি জানাচ্ছি-
১. অবিলম্বে কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত করা এবং যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা।
২. অভিযুক্ত কল্পনা অপহরণকারীদের এবং রূপন, সুকেশ, মনোতোষ ও সমর বিজয় চাকমার হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩. জুম্ম নারী সমাজের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিতকল্পে এবং পার্বত্য সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অবিলম্বে সময়সীমা ভিত্তিক রোডম্যাপ ঘোষণাপূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
১২ জুন ২০২৬, কল্পনা চাকমা ৩০তম অপহরণ দিবসে হিল উইমেন্স ফেডারেশন কর্তৃক রাঙ্গামাটির কল্যাণপুর থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত