Nilphamari

Nilphamari অনলাইন সারাদিন

পুরাই মালায়াম সিনেমার মত কাহিনীঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে। তখন একটি রহস্যময় লোককে ঝিনাইদহ শহরের অলিতে গলিতে...
02/03/2026

পুরাই মালায়াম সিনেমার মত কাহিনী

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে। তখন একটি রহস্যময় লোককে ঝিনাইদহ শহরের অলিতে গলিতে ঘুরতে দেখা যেত। লোকটি বাক ও শ্রবণশক্তিহীন এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। তার চেহারা কিছুটা রোহিঙ্গাদের মতো। সারাদিন সে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াত, আর ক্ষুধা লাগলে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের সামনে গিয়ে করুণ চোখে চেয়ে থাকত।
এতে রেস্টুরেন্টের মালিকরা লোকটির বিরক্ত হতো। ওই মালিকদেরই একজন অতি উৎসাহী হয়ে বিষয়টি নিয়ে ঝিনাইদহ সদর থানায় অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে সদর থানার অফিসার ইনচার্জ লোকটিকে হেফাজতে নিয়ে সংশ্লিষ্ট সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে উপস্থাপন করেন। আদালত তখন লোকটির পরিচয় সনাক্তকরণের জন্য নির্বাচন কমিশনে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিংয়ের আদেশ প্রদান করেন। অর্থাৎ তার আঙ্গুলের ছাপ বাংলাদেশের কোনো ভোটারের সাথে মেলে কিনা এটা যাচাই বাছাই করে দেখতে বলেন।
লোকটির আঙ্গুলের ছাপ কার্টিজ পেপারে সংগ্রহ করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগে প্রেরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি আদালতকে অবহিত করে যে, কার্টিজ পেপারে সংগৃহীত আঙ্গুলের ছাপ দ্বারা এই ম্যাচিং সম্ভব নয়, তবে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে WSQ পদ্ধতিতে আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করা হলে ম্যাচিং করা যেতে পারে।
যাই হোক, সেটা আর হয়ে ওঠেনি। লোকটির পক্ষে আদালতে কেউ কখনো শুনানিও করেনি। সময় বহমান। আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ভিড়ে এই ব্যাপারটা সবার চোখের আড়ালে হারিয়ে যায়।
এরপর পেরিয়ে যায় দীর্ঘ ৩২ টি মাস। ২০২২ সালের জুলাই মাস। আমি তখন ঝিনাইদহের অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গোড়া থেকেই আমি একটা সুঅভ্যাস গড়ে তুলেছি। সেটা হচ্ছে, প্রত্যেকটি নথি, তা যতো গুরুত্বহীনই হোক না কেন, একবার হলেও উল্টেপাল্টে দেখা। ধার্য তারিখে (২৭/৭/২০২২ ইং) একটি নথি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। একটি লোক প্রায় ৩ বছর ধরে বিনা বিচারে কারাগারে বন্দী।
আগেই বলেছি, লোকটি কথা বলতে পারে না। সে মুখ দিয়ে এক ধরনের দুর্বোধ্য শব্দ করে বটে, তবে সেটাকে ঠিক ভাষা বলা যায় না। আর তর্কের খাতিরে সেটাকে যদি ভাষা বলে ধরেও নেওয়া যায়, তাহলেও সেটা যে ঠিক কোন ভাষা তা অনুমান করা কঠিন। পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে আমি কয়েকটা যুক্তিপূর্ণ হাইপোথেসিস দাঁড় করালাম:
১. লোকটি যদি বাংলাদেশের নাগরিক হয় এবং কোনোভাবে যদি ভোটার তালিকায় তার নাম উঠে থাকে তাহলে ভোটারদের সাথে তার আঙ্গুলের ছাপ ম্যাচিং করলে তার পরিচয় পাওয়া যেতে পারে।
২. লোকটি যদি রোহিঙ্গা হয় তাহলে বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে তার ছবি পাঠালে তার নাম ঠিকানার খোঁজ পাওয়া যেতে পারে।
৩. বাংলাদেশে মোট কয়টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প আছে এবং সেগুলো কার তত্ত্বাবধানে আছে তার লিস্ট করতে হবে।
৪. তাৎক্ষণিকভাবে লোকটাকে রোহিঙ্গা ভাষা বোঝে এরকম কারো সাথে ভিডিও কলে কথা বলানো যেতে পারে।
৫. আঙ্গুলের ছাপ ম্যাচিংয়ের জন্য অত্যাধুনিক ডিজিটাল ডিভাইস বা WSQ প্রযুক্তি বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলা নির্বাচন অফিসে আছে কিনা তা খোঁজ নিতে হবে।
৬. লোকটার নাম ঠিকানার সন্ধান যদি কিছুতেই না পাওয়া যায় তাহলে তাকে জেলখানায় আসামীদের সাথে না রেখে সেফ হোম বা অন্য কোথাও রাখা সমীচীন হবে।
আমি আর দেরী না করে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি, কক্সবাজারের টেকনাফ আমলী আদালতের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে ফোন করে লোকটির ব্যাপারে সবকিছু বললাম। ওনারা এ বিষয়ে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আমাকে কথা দিলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ আমাকে ফোন করল। আমি তাকে পরদিন সকাল ১০:০০ টায় রোহিঙ্গা ভাষা বোঝে এমন কোনো বাঙালিকে টেকনাফ থানায় উপস্থিত রাখতে বললাম। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা লোকটিকে ওই সময়ে আদালতে উপস্থিত রাখার জন্য জেল সুপার, ঝিনাইদহকে নির্দেশ দিলাম।
পরের দিন লোকটাকে যখন আমার সামনে আনা হলো, আমি বেশ অবাক হলাম। সে যেন এই বন্দী জীবনের সাথে নিজেকে অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায়, চোখের তারার গভীরে কোথায় যেন অব্যক্ত কিছু কথা — অগম্য কোনো যন্ত্রণার ছায়া!
আমি সময় নষ্ট না করে আসল কাজ শুরু করে দিলাম। অপর প্রান্তে দোভাষী প্রস্তুত ছিল। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে দুইজনের মধ্যে ভাবের আদান প্রদানের চেষ্টা ধৈর্য ধরে নিরীক্ষণ করলাম। দোভাষীটি একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে আমাকে বলল, "স্যার, লোকটার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সে রোহিঙ্গা হতে পারে, তবে আমি সিওর না।"
আমি বুঝলাম এভাবে চেষ্টা করে এর চাইতে বেশি কোনো ফল পাওয়া যাবে না।
আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম এমন একটা আদেশ দিতে হবে যাতে সবাই নড়েচড়ে বসে। বলা বাহুল্য, আমি এর মধ্যেই বের করে ফেলেছি যে, বাংলাদেশে মোট ৩৪ টা রোহিঙ্গা ক্যাম্প আছে এবং এগুলো দেখভাল করে বাংলাদেশ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। ৩ টি থানা মিলিয়ে এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো অবস্থিত — কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া এবং নোয়াখালীর ভাসানচর। ৪ টি এপিবিএন এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর দায়িত্বে আছে: এপিবিএন ৮, এপিবিএন ৯, এপিবিএন ১৪ এবং এপিবিএন ১৬। এগুলোর অফিস প্রধান পুলিশ সুপার পদের একজন কর্মকর্তা। ইতোমধ্যে আমি এটারও খোঁজ পেয়েছি যে আঙ্গুলের ছাপ ম্যাচিং করার মতো ডিজিটাল ডিভাইস বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এখন ঝিনাইদহ জেলা নির্বাচন অফিসে আছে।
৩১/৭/২০২২ ইং তারিখের আদেশবলে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিটি রোহিঙ্গা কিনা তা যাচাই বাছাইয়ের জন্য এপিবিএনগুলোর পুলিশ সুপার এবং টেকনাফ, উখিয়া ও ভাসানচর থানার অফিসার ইনচার্জদেরকে আদেশ দিলাম। এই বিষয়ে তাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য কক্সবাজার ও নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক আর পুলিশ সুপারদেরকে নির্দেশ দিলাম। লোকটির আঙ্গুলের ছাপ ম্যাচিং করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ঝিনাইদহের জেলা নির্বাচন অফিসারকে নির্দেশনা দিলাম। এরপর লোকটির ছবিসহ আদেশের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট সবার কাছে পাঠিয়ে দিলাম।
পুরো বিষয়টি ব্যাপকভাবে মিডিয়া কাভারেজ পেল এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হলো। ঝিনাইদহের সাংবাদিকরা এবিষয়ে আমাকে দারুণ সহযোগিতা করলেন।
অবশেষে ৩/৮/২০২২ ইং দুপুরে একটা সূত্র থেকে জানতে পারলাম লোকটির আসল পরিচয়। লোকটির নাম মৃণাল। তার বাড়ি নীলফামারী সদর উপজেলার দক্ষিণ চাওড়া গ্রামে। তথ্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য আমি তখনই রংপুর রেঞ্জের ডিআইজিকে ফোন করলাম। ৫ মিনিটের মধ্যে নীলফামারী জেলার পুলিশ সুপার এবং নীলফামারী সদর থানার অফিসার ইনচার্জ আমাকে ফোন করলেন। অবিলম্বে লোকটির নিকটাত্মীয় কারো সাথে যোগাযোগ করে পরিচয়ের সমর্থনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে আমি তাদেরকে নির্দেশনা দিলাম।
পুলিশ সর্বোচ্চ তৎপরতার সাথে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই লোকটির মামাকে নীলফামারী সদর থানায় হাজির করল। তিনি নিশ্চিত করলেন, ছবির লোকটি তার হারিয়ে যাওয়া ভাগ্নে। দাবীর সমর্থনে তিনি ভাগ্নের জন্ম নিবন্ধন সনদ সহ অন্যান্য ডকুমেন্ট উপস্থাপন করলেন।
যা জানতে পারলাম তা গল্প উপন্যাসকেও হার মানায়। লোকটি প্রায় ৬/৭ বছর যাবৎ বাড়ি থেকে নিখোঁজ। তার পরিবার বহু ভাবে বহু জায়গায় তার খোঁজ করেছে, কিন্তু সফলতার মুখ দেখেনি। ছেলে হারানোর শোকে ইতোমধ্যেই তার গর্ভধারিনী মা মৃত্যুবরণ করেছেন, অসুস্থ বাবাও শয্যাশায়ী। বাবার শেষ ইচ্ছা, মৃত্যুর আগে একবার হলেও ছেলের মুখ দেখা।
বাড়ি থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রতিবন্ধী একজন মানুষকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে পেরেছি এ যে কত বড় পাওয়া তা বলে বোঝাতে পারব না। নাম পরিচয়হীন এই মানুষটার কষ্ট আমার মনে গভীর ছাপ রেখে গেছে। মানুষটা কন্ঠ বোবা হতে পারে, কিন্তু তার অন্তরটা কোনোভাবেই বোবা নয়। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হলেও সে আমার আপনার মতোই মানুষ। তাকে তার বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া আমার কাছে কোনো অর্থেই তার প্রতি দয়া দেখানো নয়, বরং এটি আমার নৈতিক এবং আইনগত দায়বদ্ধতা — যে দায়বদ্ধতার শপথ আমি বিচারক জীবনে প্রবেশের মুহূর্তে নিয়েছিলাম।

বৈজয়ন্ত বিশ্বাস ভিক্টর
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট

Address

Nilphamari Sador
Rangpur
5300

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Nilphamari posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share