23/08/2026
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনে শিক্ষকসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে পাওয়া খাওয়া খেজুরের বিচি, কামড়ানো শসা ও পোড়ানো চুড়ির আলামত এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে উদ্ধার করা খেজুরের বিচিটি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
রবিবার (২৩ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি যে বাসায় ঘটেছে, সেখানে আমরা ইয়াবা সেবনের আলামত পেয়েছি। এতে আমাদের সন্দেহ হয় যে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরা ঘটনার আগে বা পরে ইয়াবা ও খেজুর খেয়েছে। সেখান থেকে উদ্ধার করা খেজুরের বিচিটি আমরা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি।’
তিনি আরও জানান, ‘হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায়, যার একটি অংশে কামড়ের দাগ ছিল। তাদের স্বীকারোক্তির সঙ্গে এই আলামত মিলে গেছে। তারা জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল বিধায় শসা বের করে খায় এবং এরপর গোসল করে। তা ছাড়া তারা বাসা থেকে একটি অলংকার (চুড়ি) পেয়ে সেটিকে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে সেটি সোনার কি না। এতে ধারণা করা হয়, স্বর্ণালংকারের বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই তদন্তে অগ্রগতি হয় এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।’
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার দুই আসামি সম্পর্কে মামাতো ভাই এবং নিহত শিক্ষকের প্রতিবেশী। তারা চারজনকেই হত্যার কথা স্বীকার করেছে। গ্রেপ্তার মুগ্ধর (২৩) বাবার নাম কানুদাস এবং সিদ্ধার্থর (১৯) বাবার নাম বিনয়চন্দ্র দাস। তাদের বাড়ি কোতোয়ালি থানা এলাকার মাছুয়াপাড়াতেই।
সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ আরও বলেন, ‘নিহত গণপতি চক্রবর্তী এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। গ্রেপ্তারকৃতদের সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক পরিচিতি ছিল এবং কারো সঙ্গেই কোনো শত্রুতা বা বিবাদ ছিল না। গণপতি চক্রবর্তী বাসা তৈরি করার সময় পাশের ভবনের ছাদ ব্যবহার করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ তাঁর ভবনের ছাদে আসে।’
তিনি জানান, ‘বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে দুই মামাতো ভাই ছাদে এসে ইয়াবা সেবন করছিল। সে সময় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছাদে শব্দ শুনে উপরে যান এবং রাতে ছাদে বসে আড্ডা দেওয়ার কারণ জানতে চান। খালি গায়ে কাঁধে গামছা পরিহিত অবস্থায় তিনি তাদের চ্যালেঞ্জ করলে, আসামিরা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে প্রথমে তাঁকে এবং পরবর্তীতে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করে।’
ডিআইজি বলেন, ‘সিদ্ধার্থ পেশায় স্বর্ণের দোকানের কারিগর। চুরি করা একটি অলংকার সে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছিল। এই আলামত দেখেই আমরা অনুমান করেছিলাম যে স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ কেউ এতে জড়িত। আমাদের সেই ধারণা সঠিক প্রমাণিত হয়। এরপর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে চালিয়ে দিতে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখে। এমনকি বের হয়ে যাওয়ার আগে বাসার দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো বালতির পানিতে ভিজিয়ে রেখে যায়, যাতে আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) মুছে যায়। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুরু করে সারা দিন ধরে তারা এই হত্যাকাণ্ড চালায়।’
তদন্তের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানে নামে। অভিযানের একপর্যায়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়। পুলিশের উপস্থিত টের পেয়ে তাদের একজন রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগানে লুকিয়ে ছিল, পরে পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতের ভিত্তিতে আমরা স্থানীয়ভাবে খোঁজখবর নিই। আমাদের গোপন সূত্রের দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর আত্মীয়স্বজনের বক্তব্যের মিল পেয়ে মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই।’
আসামিরা হত্যার দায় স্বীকার করেছে জানিয়ে ওসি বলেন, ‘তাদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ল্যাব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিরা হলেন—রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী (১২)। গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। এরপর থেকে তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিলেন।
তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর (মাষ্টার্স) সম্পন্ন করেছিলেন। আর ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।