25/08/2026
আজ মহারাণী স্বর্ণময়ীর ১২৯তম জন্মদিন।
মহারাণী স্বর্ণময়ী ও উলিপুর: শিক্ষা, জমিদারি ও জনকল্যাণের ইতিহাস
কুড়িগ্রামের উলিপুর শুধু নদী-নালা, কৃষি ও লোকজ সংস্কৃতির জনপদ নয়; এর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমিদারি, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও জনহিতৈষী কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ ঐতিহ্য। সেই ইতিহাসে মহারাণী স্বর্ণময়ীর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। উলিপুরের একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজও তাঁর নাম বহন করছে—উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৬৮ সাল হিসেবে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহারাণী স্বর্ণময়ী কে ছিলেন?
মহারাণী স্বর্ণময়ী ছিলেন কাশিমবাজার এস্টেটের জমিদার পরিবারের একজন প্রভাবশালী নারী। কৃষ্ণনাথ নন্দীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী স্বর্ণময়ী জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। স্থানীয় ইতিহাসবিষয়ক সূত্রে তাঁকে শিক্ষানুরাগী ও প্রজাদরদী জমিদার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
উনিশ শতকের বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও কিছু জমিদার শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, জনকল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। স্বর্ণময়ী তাঁদের অন্যতম ছিলেন বলে বিভিন্ন স্থানীয় ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
উলিপুরের সঙ্গে সম্পর্ক
উলিপুরের জমিদারবাড়ির ইতিহাসে মহারাণী স্বর্ণময়ীর নাম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৮৮৪ থেকে ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত কৃষ্ণকান্ত নন্দীর স্ত্রী মহারাণী স্বর্ণময়ী জমিদারি পরিচালনা করেন। একই সূত্রে বলা হয়েছে, তাঁর সময়েই উলিপুরে উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয় এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির নাম তাঁর নামে রাখা হয়।
তবে বিভিন্ন উৎসে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়কাল সম্পর্কে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশি ঐতিহাসিক ও সরকারি-শিক্ষা সংক্রান্ত সূত্রগুলোতে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৬৮ সাল উল্লেখ করা হয়েছে।
উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী বিদ্যালয়
উলিপুরের শিক্ষা-ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠান একটি মাইলফলক। ১৮৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে উলিপুরের বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কুড়িগ্রাম জেলার উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাতেও প্রতিষ্ঠানটির নাম রয়েছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে পরিচিত এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাম্প্রতিক নথিতেও প্রতিষ্ঠানটির নাম ও উলিপুরের ঠিকানা পাওয়া যায়।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি অঞ্চলের সামাজিক পরিবর্তন কতটা সম্ভব, উলিপুরের এই প্রতিষ্ঠান তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ। উনিশ শতকে যখন গ্রামবাংলায় আধুনিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল, তখন একটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল।
শিক্ষানুরাগী জমিদার হিসেবে স্বর্ণময়ী
মহারাণী স্বর্ণময়ীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিচয়ের একটি হলো তাঁর শিক্ষানুরাগিতা। স্থানীয় ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় তাঁকে শিক্ষার প্রসারে আগ্রহী জমিদার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তৎকালীন সমাজে শিক্ষার সুযোগ মূলত শহর ও অভিজাত শ্রেণিকেন্দ্রিক ছিল। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা তাই শুধু একটি ভবন নির্মাণের ঘটনা ছিল না; এর মাধ্যমে একটি নতুন সামাজিক চিন্তার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিল।
উলিপুরে তাঁর নামাঙ্কিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগের স্মারক হয়ে আজও টিকে আছে।
উলিপুর মুন্সিবাড়ী ও স্বর্ণময়ীর সময়
উলিপুরের মুন্সিবাড়ীও স্বর্ণময়ীর সময়কার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষক বাতায়নের একটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, কাশিমবাজার এস্টেটের জমিদার কৃষ্ণনাথ নন্দীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী মহারাণী স্বর্ণময়ী জমিদার হন। তাঁর অধীনে বিনোদী লাল নামের একজন মুন্সি/হিসাবরক্ষক কাজ করতেন। পরবর্তীকালে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উলিপুরের মুন্সিবাড়ীর ইতিহাস গড়ে ওঠে।
মুন্সিবাড়ীকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে নানা কাহিনি ও লোকগাথাও প্রচলিত রয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি পুরোনো বাড়ি নয়; উলিপুরের জমিদারি ও প্রশাসনিক ইতিহাসেরও একটি অংশ।
প্রজা ও জনকল্যাণ
জমিদারদের ইতিহাস সাধারণত খাজনা আদায় ও জমিদারি প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হলেও স্বর্ণময়ীকে স্থানীয় সূত্রগুলোতে প্রজাদরদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষা ও জনকল্যাণের প্রতি তাঁর আগ্রহের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তাঁর স্মরণে উলিপুরে আয়োজিত স্মরণসভাগুলোতেও তাঁকে শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে তাঁর ১২৮তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে উলিপুরে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।
কেন আজও স্মরণীয় মহারাণী স্বর্ণময়ী?
একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় কারণ তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান ও প্রভাব। মহারাণী স্বর্ণময়ীর ক্ষেত্রে উলিপুরের সঙ্গে তাঁর নামের সম্পর্ক আজও দৃশ্যমান।
একদিকে রয়েছে তাঁর নাম বহনকারী প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; অন্যদিকে রয়েছে উলিপুরের জমিদারি ও মুন্সিবাড়ীর ইতিহাসে তাঁর উপস্থিতি। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর নামটি উলিপুরের শিক্ষা-ঐতিহ্যের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।
১৮৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ পথচলা প্রমাণ করে যে উলিপুরে আধুনিক শিক্ষার ইতিহাস অনেক পুরোনো। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায়ও প্রতিষ্ঠানটির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইতিহাসের পাতায় উলিপুর ও স্বর্ণময়ী
উলিপুরের ইতিহাসকে শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে বোঝা যায় না। এখানকার শিক্ষা, জমিদারি, স্থাপত্য, লোকসংস্কৃতি ও জনকল্যাণ—সব মিলিয়েই উলিপুরের ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে।
সেই ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মহারাণী স্বর্ণময়ী। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে তাঁর অবদান কেবল অতীতের কোনো জমিদারি ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; তা বর্তমান উলিপুরের সামাজিক ও শিক্ষাগত পরিচয়েরও অংশ।
মহারাণী স্বর্ণময়ীর জীবন ও কর্মের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—ক্ষমতা ও সম্পদের প্রকৃত মূল্য তখনই সৃষ্টি হয়, যখন তা মানুষের কল্যাণে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়।
উলিপুরের মাটিতে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাই শুধু একটি বিদ্যালয় বা কলেজ নয়; এটি একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক স্মৃতি, একটি শিক্ষাবিপ্লবের স্মারক এবং উলিপুরের গৌরবময় অতীতের জীবন্ত নিদর্শন।
তথ্যসূত্র
- কুড়িগ্রাম জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ক প্রতিবেদন।
- বাংলাদেশ জাতীয় তথ্যভিত্তিক শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য ও বাংলাপিডিয়ার কুড়িগ্রাম জেলা নিবন্ধ।
- উলিপুর মুন্সিবাড়ী ও মহারাণী স্বর্ণময়ী সম্পর্কিত শিক্ষক বাতায়নের ঐতিহাসিক বর্ণনা।
- মহারাণী স্বর্ণময়ীর প্রয়াণ দিবসের স্মরণসভা সম্পর্কিত প্রতিবেদন।