10/07/2026
মা ফাতেমা ও ঈমাম সাহেবদ্বয়ের প্রতি অবর্ণণীয় মহব্বত ও মা ফাতেমা হইতে বেলায়েত লাভ :
বড় পীর আম্মা খাতুনে জান্নাৎ মা ফাতেমা ও তদীয় নয়ন পুত্তলি, রসূলের দীনের চেরাগ ঈমাম হাসান হোসায়েন ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতি যে গভীর মহব্বত পোষণ করিতেন তাহা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নহে। মহরম চান্দ্র মাস আসিলেই পীরমা শোকে অভিভূত হইয়া পড়িতেন ও নিজের ছেলে মেয়ে সদ্য মারা গেলে মায়ের প্রাণে যেমন গভীর শোক ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ঈমামদ্বয়ের মহব্বতেও পীরমার মনের অবস্থা তদ্রূপ হইয়া পড়িত। আশুরার কয়দিন রোজা রাখা ছাড়াও তিনি প্রায় মাসটাই প্রায় না খাইয়া কাটাইতেন। গোসল করা ও ভাল কাপড় পরা হইতে পরহেজ থাকিতেন। মেয়ে মুরিদানদিগকে আশুরার দিনে রোজা করাইতেন এবং উপস্থিত মেয়ে মন্ডলীর মধ্যে তিনি অতি প্রাণস্পর্শী ভাষায় ঈমাম সাহেবদের মহব্বত ও তাহাদের শোকাবহ ঘটনা বর্ণনা করিতেন। তখন এত অধিক ফায়েজ ওয়ারেদ হইত যে উপস্থিত মেয়ে মন্ডলী কাঁদিয়া আকুল হইয়া যাইত। পীরমা কিছুক্ষণ এইভাবে মা ফাতেমা ও হযরত ঈমাম সাহেবদ্বয়ের ফায়েজ বাতানোর পর তাহার নিজের কণ্ঠই কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িত। যাহারা উক্ত মজলিসে উপস্থিত থাকিতেন তাহারাই সম্যক অবগত হইয়া পরিতেন যে পীরমার অন্তরে মা ফাতেমা ও ঈমামদের মহব্বত কি পরিমাণ বিদ্যমান আছে। এইভাবে খাজা হুজুরের জীবনকাল পর্যন্ত তিনি প্রতি বৎসর মহরম মাসে শোক পালন করিতেন এবং নিজ হাতে উত্তম খানা রান্না করিয়া ঈমাম সাহেবদের হুজুরে ছোয়াব রেছানীর নিয়তে মোমেন লোকদিগকে খানা খাওয়াইতেন। মা ফাতেমা জগৎ জননী প্রায়ই স্বপ্ন ও মোরাকাবায় পীরমাকে দেখা দিতেন। দোরে মাকনুন সাহেবার মতো খাতুনেজান্নাৎ মা ফাতেমাও পীর আম্মার যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাজে আত্মিকভাবে উপস্থিত থাকিয়া তাহাকে সাহায্য করিতেন ও শিশু মেয়েদের মতো বুকে লাগাইয়া গলা জড়াইয়া পেয়ার করিতেন। মজহাব ও ওরশ শরীফের পূর্বে হইতে সর্বদা পীরমা জগৎ জননী মা ফাতেমাকে হাজের নাজের পাইতেন। তিনি যেন অতি আপনজনের মতো পীরমার সঙ্গী হইয়া প্রতিটি কাজ নিজ হাতে সমাধা করিয়া দিতেন। এইভাবে বহু বৎসর অতিক্রান্ত হইল। পীরমার জীবনেও মা ফাতেমার দর্শন ও মদদ তাঈদ একটা নেশা ও অভ্যাসের মতো হইয়া দাঁড়াইল। ইচ্ছা হইলেই তিনি মা ফাতেমা (রঃ) কে দেখিতে পাইতেন। কিন্তু পীরমার জীবনের কোনও এক পর্যায় হঠাৎ ইহার একবার ব্যতিক্রম হইল। মাকে তিনি স্বপ্ন বা কাশফে আর দেখিতে পাইলেন না। পীরমার চিরদিনের নেশা ও অভ্যাসের উপর একটা নিদারুণ আঘাত পড়িল। মা ফাতেমাকে কোনও অবস্থাতেই আর পীরমা দেখেন না। তাহার মনের অবস্থা প্রাণান্তকর হইল। আহার নিদ্রা কমিয়া গেল, মুখের হাসি বিদায় নিল, কত সাধনা, কত আরজু, কতই ক্রন্দন, কতই আকুল মিনতি কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হইতেছে না। তবে সত্যি কি মা তাহাকে ভুলিয়া গেলেন? তাহাকে কি তবে ত্যাগ করিলেন? এইভাবে ত্যাগই যদি করিতে হয় তবে এত দিনের এত দরদ, এত ভালবাসা, এত মমতা স্নেহ, সঙ্গী হইয়া তাহার ও মজহাবের কত কাজ করিয়া দেওয়া এ সবই কি ছলনা, প্রতারণা? মরিচিকার পেছনে কি তাহাকে চালিত করা হইয়াছে? কিন্তু রসূল দুহিতার পক্ষে কি এই ধরনের ছলনা সম্ভব? পীরমা চিন্তা করিলেন যে রসূলের প্রিয় দুলালীর পক্ষে কিছুতেই ইহা সম্ভব নহে! নিশ্চয়ই ইহার পেছনে কোনও রহস্য আছে, নিশ্চয়ই তিনি ঈমান ও অন্তরের মহব্বতের পরীক্ষা গ্রহণ করিয়াছেন, এই ভাবিয়া তিনি সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করিলেন কিন্তু চেষ্টা করিলে তো প্রাণ বাচেনা। পীরমার আশঙ্কা হইল যে এইভাবে আর দিন কাটিতে পারে না।
মা ফাতেমার মহব্বত ও জুদায়ীতে তাহার কলিজা ফাটিয়া যাইবে। জান কবজ হইয়া যাইবে। এই সমস্ত চিন্তা করিতে করিতে কোনও এক রাতে তিনি ক্লান্ত হইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন। তাহার পরীক্ষাও বোধহয় শেষ হইয়া গেছে। মা জগৎ জননীর কলেজাতেও আরও আশেকার দুঃখী প্রাণের অগ্নিবৎ জ্বালার তাপ আর সহ্য হইল না। মাশুকা হইয়া আশুকার প্রাণে আর কত দুঃখ দিবেন। এমতেহান শেষ হইয়া গেল। জগৎ জননী অধির হৃদয়ে এত দেল খুলিয়া পীরমার সঙ্গে দেখা দিলেন। আশেকার হৃদয়ে এত দিনের জ্বালার পরিসমাপ্তি করিতে মাসুক ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। দুই হস্ত প্রসারিত করিয়া মা ফাতেমা পীরমার দিকে দৌড়াইলেন। যেন শোকার্ত মাতা বহুদিন পর তাহার হারানো বুকের ধন খুজিয়া পাইয়াছেন। তাহাকে বুকে লইবার জন্য মা দুই হাত প্রসারিত করিয়া তাহার রুহানী আওলাদ পীরমার দিকে ছুটিয়াছেন। পীরমাও দীর্ঘদিন পর তাহার প্রাণের প্রতিমা মাশুকাকে পাইয়া তাহার বুকে আশ্রয় লইবার জন্য ছুটিয়াছেন। চুম্বকের মতো দুইজন দুইজনের দিকে ধাবিত হইয়াছেন। মা তাহার রুহানী মেয়েকে সজোরে বুকের সঙ্গে চাপিয়ে ধরিলেন যেন বুকের মধ্যে ভরিয়া লইবেন। বহুক্ষণ এইভাবে উভয়ের চোখের পানিতে কাটিল। তৎপর মা জগৎ জননী তাহার পরম আশেকার সমস্ত শরীর ও দেহের সঙ্গে মিশিয়া একাকার হইয়া পীরমার মধ্যে অদৃশ্য হইয়া গেলেন। অপার আনন্দ সুখ শান্তিতে পীরমার দেল, আত্মা, শরীর মহা পুলকিত হইয়া উঠিল। এত দিনের সমস্ত দুঃখ বিরহ বেদনা ধুইয়া মুছিয়া সেখানে পরম অনাবিল শান্তি আশ্রয় লইল। এইভাবে হযরত মা ফাতেমা পীরমাকে তাহার বাতেনী নেয়ামত ও বেলায়েতের পূর্ণ উত্তরাধিকারী করিলেন। মা ফাতেমাকে এমনভাবে লাভকরার সৌভাগ্য সমস্ত পৃথিবীতে কয়জন মেয়ে লোক লাভ করিয়াছেন?
গ্রন্থঃ #দোর্রে_একতা (হযরত বড় পীরমা)
লেখকঃ হযরত শাহসুফি খাজা মোজাম্মেল হাক এনায়েতপুরী আল-ওয়েসী (রঃ)।