Shushila-e-Library

Shushila-e-Library This is a Public Library. Anybody can use this library.

সাহিত্যের স্বরূপ...     কবিতা ব্যাপারটা কী, এই নিয়ে দু-চার কথা বলবার জন্যে ফর্মাশ এসেছে।     সাহিত্যের স্বরূপ সম্বন্ধে ব...
27/02/2024

সাহিত্যের স্বরূপ...

কবিতা ব্যাপারটা কী, এই নিয়ে দু-চার কথা বলবার জন্যে ফর্মাশ এসেছে।

সাহিত্যের স্বরূপ সম্বন্ধে বিচার পূর্বেই কোথাও কোথাও করেছি। সেটা অন্তরের উপলব্ধি থেকে; বাইরের অভিজ্ঞতা বা বিশ্লেষণ থেকে নয়। কবিতা জিনিসটা ভিতরের একটা তাগিদ, কিসের তাগিদ সেই কথাটাই নিজেকে প্রশ্ন করেছি। যা উত্তর পেয়েছি সেটাকে সহজ করে বলা সহজ নয়। ওস্তাদমহলে এই বিষয়টা নিয়ে যে-সব বাঁধা বচন জমা হয়ে উঠেছে, কথা উঠলেই সেইগুলোই এগিয়ে আসতে চায়; নিজের উপলব্ধ অভিমতকে পথ দিতে গেলে ওইগুলোকে ঠেকিয়ে রাখা দরকার।

গোড়াতেই গোলমাল ঠেকায় "সুন্দর" কথাটা নিয়ে। সুন্দরের বোধকেই বোধগম্য করা কাব্যের উদ্দেশ্য এ কথা কোনো উপাচার্য আওড়াবামাত্র অভ্যস্ত নির্বিচারে বলতে ঝোঁক হয়, তা তো বটেই। প্রমাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে ধোঁকা লাগায়, ভাবতে বসি সুন্দর কাকে বলে। কনে দেখবার বেলায় বরের অভিভাবক যে আদর্শ নিয়ে কনেকে দাঁড় করিয়ে দেখে, হাঁটিয়ে দেখে, চুল খুলিয়ে দেখে, কথা কইয়ে দেখে, সে আদর্শ কাব্য-যাচাইয়ের কাজে লাগাতে গেলে পদে পদেই বাধা পাওয়া যায়। দেখতে পাই, ফল্‌স্টাফের সঙ্গে কন্দর্পের তুলনা হয় না, অথচ সাহিত্যের চিত্রভাণ্ডার থেকে কন্দর্পকে বাদ দিলে লোকসান নেই, লোকসান আছে ফল্‌স্টাফকে বাদ দিলে। দেখা গেল, সীতার চরিত্র রামায়ণে মহিমান্বিত বটে, কিন্তু স্বয়ং বীর হনুমান - তার যত বড়ো লাঙ্গুল তত বড়োই সে মর্যাদা পেয়েছে। এইরকম সংশয়ের সময়ে কবির বাণী মনে পড়ে, Truth is beauty, অর্থাৎ সত্যই সৌন্দর্য। কিন্তু সত্যে তখনই সৌন্দর্যের রস পাই,অন্তরের মধ্যে যখন পাই তার নিবিড় উপলব্ধি-- জ্ঞানে নয়, স্বীকৃতিতে। তাকেই বলি বাস্তব। সর্বগুণাধার যুধিষ্ঠিরের চেয় হঠকারী ভীম বাস্তব, রামচন্দ্র যিনি শাস্ত্রের বিধি মেনে ঠাণ্ডা হয়ে থাকেন তাঁর চেয়ে লক্ষ্ণণ বাস্তব - যিনি অন্যায় সহ্য করতে না পেরে অগ্নিশর্মা হয়ে তার অশাস্ত্রীয় প্রতিকার করতে উদ্যত। আমাদের কালো-কোলো আধবুড়ো নীলমণি চাকরটা, যে মানুষ এক বুঝতে আর বোঝে, এক করতে আর করে, বকলে ঈষৎ হেসে বলে, "ভুল হয়ে গেছে", সে বেনারসি-জোর প'রে বরবেশে দৃশ্যটা কি রকম হয় সে কথা তুচ্ছ, কিন্তু সে অনেক বেশি বাস্তব অনেক নামজাদার চেয়ে এই প্রসঙ্গে তাঁদের নাম উল্লেখ করতে কুণ্ঠা হচ্ছে। অর্থাৎ, যদি কবিতা লেখা যায় তবে এ'কে তার নায়ক বা উপনায়ক করলে ঢের বেশি উপাদেয় হবে কোনো বাগ্মীপ্রবর গণনায়ককে করার চেয়ে। খুব বেশি চেনা হলেই সে বাস্তব হয় তা নয়, কিন্তু যাকে চিনি অল্প তবু যাকে অপরিহার্যরূপে হাঁ বলেই মানি সেই আমার পক্ষে বাস্তব। ঠিক কী গুণে যে, তা বিশ্লেষণ করে বলা কঠিন। বলা যেতে পারে, তারা জৈব, তারা organic; তাদের আত্মসাৎ করতে রুচি বা ইচ্ছার বাধা থাকতে পারে, অন্য বাধা নেই। যেমন ভোজ্য পদার্থ, তাদের কোনোটা তিতো, কোনোটা মিষ্টি, কোনোটা কটু; ব্যবহারে তাদের সম্বন্ধে আদরণীয়তার তারতম্য থাকলেও তাদের সকলেরই মধ্যে একটা সাম্য আছে - তারা জৈবিক, দেহতন্তুর নির্মাণে তারা কাজে লাগবার উপযোগী। শরীরের পক্ষে তারা হাঁ-এর দলে, স্বীকৃতির দলে, না-এর দলে নয়।

সংসারে আমাদের সকলেরই চার দিকে এই হাঁ-ধর্মীর মণ্ডলী আছে - এই বাস্তবদের আবেষ্টন; তাদের সকলকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে আমাদের সত্তা আপনাকে বিচিত্র করেছে, বিস্তীর্ণ হয়েছে; তারা কেবল মানুষ নয়, তারা কুকুর বেড়াল ঘোড়া টিয়েপাখি কাকাতুয়া, তারা আসশেওড়ার-বেড়া-দেওয়া পানাপুকুর, তারা গোঁসাইপাড়ার পোড়ো বাগানে ভাঙাপাঁচিল-ঘেরা পালতে-মাদার, গোয়ালঘরের আঙিনায় খড়ের গাদার গন্ধ, পাড়ার মধ্য দিয়ে হাটে যাওয়ার গলি রাস্তা, কামারশালার হাতুড়ি-পেটার আওয়াজ, বহুপুরোনো ভেঙেপড়া ইঁটের পাঁজা যার উপরে অশথগাছ গজিয়ে উঠেছে, রাস্তার ধারের আমড়াতলায় পাড়ার প্রৌঢ়দের তাসপাশার আড্ডা, আরও কত কী - যা কোনো ইতিহাসে স্থান পায় না, কোনো ভূচিত্রের কোণে আঁচড় কাটে না। এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে পৃথিবীর চারি দিক থেকে নানা ভাষায় সাহিত্যলোকের বাস্তবের দল। ভাষার বেড়া পেরিয়ে তাদের মধ্যে যাদের সঙ্গে পরিচয় হয় খুশি হয়ে বলি "বাঃ বেশ হল", অর্থাৎ মিলছে প্রাণের সঙ্গে, মনের সঙ্গে। তাদের মধ্যে রাজাবাদশা আছে, দীনদুঃখীও আছে, সুপুরুষ আছে, সুন্দরী আছে, কানা খোঁড়া কুঁজো কুৎসিতও আছে; এইসঙ্গে আছে অদ্ভুত সৃষ্টিছাড়া, কোনো কালে বিধাতার হাত পড়ে নি যাদের উপরে, প্রাণীতত্ত্বের সঙ্গে শরীরতত্ত্বের সঙ্গে যাদের অস্তিত্বের অমিল, প্রচলিত রীতিপদ্ধতির সঙ্গে যাদের অমানান বিস্তর। আর আছে যারা ঐতিহাসিকতার ভড়ং ক'রে আসরে নামে, কারও-বা মোগলাই পাগড়ি, কারও-বা যোধপুরী পায়জামা, কিন্তু যাদের বারো-আনা জাল ইতিহাস, প্রমাণপত্র চাইলে যারা নির্লজ্জভাবে বলে বসে "কেয়ার করি নে প্রমাণ - পছন্দ হয় কি না দেখে নাও"। এ ছাড়া আছে ভাবাবেগের বাস্তবতা - দুঃখ-সুখ বিচ্ছেদ-মিলন লজ্জা-ভয় বীরত্ব-কাপুরুষতা। এরা তৈরি করে সাহিত্যের বায়ুমণ্ডল - এইখানে রৌদ্রবৃষ্টি, এইখানে আলো-অন্ধকার, এইখানে কুয়াশার বিড়ম্বনা, মরীচিকার চিত্রকলা। বাইরে থেকে মানুষের এই আপন-ক'রে-নেওয়া সংগ্রহ, ভিতর থেকে মানুষের এই আপনার-সঙ্গে-মেলানো সৃষ্টি, এই তার বাস্তবমণ্ডলী - বিশ্বলোকের মাঝখানে এই তার অন্তরঙ্গ মানবলোক - এর মধ্যে সুন্দর অসুন্দর, ভালো মন্দ, সংগত অসংগত, সুরওয়ালা এবং বেসুরো, সবই আছে; যখনই নিজের মধ্যেই তারা এমন সাক্ষ্য নিয়ে আসে যে তাদের স্বীকার করতে বাধ্য হই, তখনই খুশি হয়ে উঠি। বিজ্ঞান ইতিহাস তাদের অসত্য বলে বলুক, মানুষ আপন মনের একান্ত অনুভূতি থেকে তাদের বলে নিশ্চিত সত্য। এই সত্যের বোধ দেয় আনন্দ, সেই আনন্দেই তার শেষ মূল্য। তবে কেমন করে বলব, সুন্দরবোধকে বোধগম্য করাই কাব্যের উদ্দেশ্য।

বিষয়ের বাস্তবতা-উপলব্ধি ছাড়া কাব্যের আর-একটা দিক আছে, সে তার শিল্পকলা। যা যুক্তিগম্য তাকে প্রমাণ করতে হয়, যা আনন্দময় তাকে প্রকাশ করতে চাই। যা প্রমাণযোগ্য তাকে প্রমাণ করা সহজ, যা আনন্দময় তাকে প্রকাশ করা সহজ নয়। "খুশি হয়েছি" এই কথাটা বোঝাতে লাগে সুর, লাগে ভাবভঙ্গি। এই কথাকে সাজাতে হয় সুন্দর ক'রে, মা যেমন করে ছেলেকে সাজায়, প্রিয় যেমন সাজায় প্রিয়াকে, বাসের ঘর যেমন সাজাতে হয় বাগান দিয়ে, বাসরঘর যেমন সজ্জিত হয় ফুলের মালায়। কথার শিল্প তার ছন্দে, ধ্বনির সংগীতে, বাণীর বিন্যাসে ও বাছাই-কাজে। এই খুশির বাহন অকিঞ্চিৎকর হলে চলে না, যা অত্যন্ত অনুভব করি সেটা যে অবহেলার জিনিস নয় এই কথা প্রকাশ করতে হয় কারুকাজে।

অনেক সময় এই শিল্পকলা শিল্পিতকে ডিঙিয়ে আপনার স্বাতন্ত্র্যকেই মুখ্য করে তোলে। কেননা, তার মধ্যেও আছে সৃষ্টির প্রেরণা। লীলায়িত অলংকৃত ভাষার মধ্যে অর্থকে ছাড়িয়েও একটা বিশিষ্ট রূপ প্রকাশ পায় - সে তার ধ্বনিপ্রধান গীতধর্মে। বিশুদ্ধ সঁগীতের স্বরাজ তার আপন ক্ষেত্রেই, ভাষার সঙ্গে শরিকিয়ানা করবার তার জরুরি নেই। কিন্তু ছন্দে, শব্দবিন্যাসের ও ধ্বনিঝংকারের তির্যক ভঙ্গিতে, যে সংগীতরস প্রকাশ পায় অর্থের কাছে অগত্যা তার জবাবদিহি আছে। কিন্তু ছন্দের নেশা, ধ্বনি-প্রসাধনের নেশা, অনেক কবির মধ্যে মৌতাতি উগ্রতা পেয়ে বসে; গদ্‌গদ আবিলতা নামে ভাষায় - স্ত্রৈণ স্বামীর মতো তাদের কাব্য কাপুরুষতার দৌর্বল্যে অশ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠে।

শেষ কথা হচ্ছে : Truth is beauty। কাব্যে এই ট্রুথ রূপের ট্রুথ, তথ্যের নয়। কাব্যের রূপ যদি ট্রুথ-রূপে অত্যন্ত প্রতীতিযোগ্য না হয় তা হলে তথ্যের আদালতে সে অনিন্দনীয় প্রমাণিত হলেও কাব্যের দরবারে সে নিন্দিত হবে। মন ভোলাবার আসরে তার অলংকারপুঞ্জ যদি-বা অত্যন্ত গুঞ্জরিত হয়, অর্থাৎ সে যদি মুখর ভাষায় সুন্দরের গোলামি করে, তবু তাতে তার অবাস্তবতা আরও বেশি করেই ঘোষণা করে। আর এতেই যারা বাহবা দিয়ে ওঠে, রূঢ় শোনালেও বলতে হবে, তাদের মনের ছেলেমানুষি ঘোচে নি।

শেষকালে একটা কথা বলা দরকার বোধ করছি। ভাবগতিকে বোধ হয়, আজকাল অনেকের কাছেই বাস্তবের সংজ্ঞা হচ্ছে "যা-তা"। কিন্তু আসল কথা, বাস্তবই হচ্ছে মানুষের জ্ঞাত বা অজ্ঞাত-সারে নিজের বাছাই-করা জিনিস। নির্বিশেষে বিজ্ঞানে সমান মূল্য পায় যা-তা। সেই বিশ্বব্যাপী যা-তা বাছাই হয়ে যা আমাদের আপন স্বাক্ষর নিয়ে আমাদের চারপাশে এসে ঘিরে দাঁড়ায় তারাই আমাদের বাস্তব। আর যে-সব অসংখ্য জিনিস নানা মূল্য নিয়ে হাটে যায় ছড়াছড়ি, বাস্তবের মূল্য-বর্জিত হয়ে তারা আমাদের কাছে ছায়া।

পাড়ায় মদের দোকান আছে, সেটাকে ছন্দে বা অছন্দে কাব্যরচনায় ভুক্ত করলেই কোনো কোনো মহলে সস্তা হাততালি পাওয়ার আশা আছে। সেই মহলের বাসিন্দারা বলেন, বহুকাল ইন্দ্রলোকে সুরাপান নিয়েই কবিরা মাতামাতি করেছেন, ছন্দোবন্ধে শুঁড়ির দোকানের আমেজমাত্র দেন নি - অথচ শুঁড়ির দোকানে হয়তো তাঁদের আনাগোনা যথেষ্ট ছিল। এ নিয়ে অপক্ষপাতে আমি বিচার করতে পারি - কেননা, আমার পক্ষে শুঁড়ির দোকানে মদের আড্ডা যত দূরে ইন্দ্রলোকের সুধাপান-সভা তার চেয়ে কাছে নয়, অর্থাৎ প্রত্যক্ষ পরিচয়ের হিসাবে। আমার বলবার কথা এই যে, লেখনীর জাদুতে, কল্পনার পরশমণিস্পর্শে, মদের আড্ডাও বাস্তব হয়ে উঠতে পারে, সুধাপানসভাও। কিন্তু সেটা হওয়া চাই। অথচ দিনক্ষণ এমন হয়েছে যে, ভাঙা ছন্দে মদের দোকানে মাতালের আড্ডার অবতারণা করলেই আধুনিকের মার্কা মিলিয়ে যাচনদার বলবে, "হাঁ, কবি বটে', বলবে "একেই তো বলে রিয়ালিজ্‌ম্‌"। - আমি বলছি, বলে না। রিয়ালিজ্‌মের দোহাই দিয়ে এরকম সস্তা কবিত্ব অত্যন্ত বেশি চলিত হয়েছে। আর্ট্‌ এত সস্তা নয়। ধোবার বাড়ির ময়লা কাপড়ের ফর্দ নিয়ে কবিতা লেখা নিশ্চয়ই সম্ভব, বাস্তবের ভাষায় এর মধ্যে বস্তা-ভরা আদিরস করুণরস এবং বীভৎসরসের অবতারণা করা চলে। যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দুইবেলা বকাবকি চুলোচুলি, তাদের কাপড়দুটো এক ঘাটে একসঙ্গে আছাড় খেয়ে খেয়ে নির্মল হয়ে উঠছে, অবশেষে সওয়ার হয়ে চলেছে একই গাধার পিঠে, এ বিষয়টা নব্য চতুষ্পদীতে দিব্য মানানসই হতে পারে। কিন্তু বিষয়-বাছাই নিয়ে তার রিয়ালিজ্‌ম্‌ নয়, রিয়ালিজ্‌ম্‌ ফুটবে রচনার জাদুতে। সেটাতেও বাছাইয়ের কাজ যথেষ্ট থাকা চাই, না যদি থাকে তবে অমনতরো অকিঞ্চিৎকর আবর্জনা আর কিছুই হতে পারে না। এ নিয়ে বকাবকি না করে সম্পাদকের প্রতি আমার অনুরোধ এই যে, প্রমাণ করুন, রিয়ালিস্টিক কবিতা কবিতা বটে, কিন্তু রিয়ালিস্টিক ব'লে নয়, কবিতা বলেই। পূর্বোক্ত বিষয়টা যদি পছন্দ না হয় তো আর-একটা বিষয় মনে করিয়ে দিচ্ছি - বহু দিনের বহুপদাহত ঢেঁকির আত্মকথা। প্রাচীন যুগে অশোক গাছে সুন্দরীর পদস্পর্শ-ব্যাপারের চেয়েও হয়তো একে বেশি মর্যাদা দিতে পারবেন, বিশেষত যদি চরণপাত বেছে বেছে অসুন্দরীদের হয়। আর যদি শুকিয়ে-পড়া খেজুর গাছের উপর কিছু লিখতে চান তা হলে বলতে পারবেন, ওই গাছ আপন রসের বয়সে কত ভিন্ন ভিন্ন জীবনে কত ভিন্ন ভিন্ন রকমের নেশার সঞ্চার করেছে - তার মধ্যে হাসিও ছিল, কান্নাও ছিল, ভীষণতাও ছিল। সেই নেশা যে শ্রেণীর লোকের তার মধ্যে রাজাবাদশা নেই, এমন-কি এম।এ। পরীক্ষার্থী অন্যমনস্ক তরুণ যুবকও নেই যার হাতে কব্জী-ঘড়ি, চোখে চশমা এবং অঙ্গুলিকর্ষণে চুলগুলো পিছনের দিকে তোলা। বলতে বলতে আর-একটা কাব্যবিষয় মনে পড়ল। একটুকু-তলানি-ওয়ালা লেবেল-উঠে-যাওয়া চুলের তেলের নিশ্ছিপি একটা শিশি, চলেছে সে তার হারা জগতের অন্বেষণে, সঙ্গে সাথি আছে একটা দাঁতভাঙা চিরুনি আর শেষ ক্ষয় ক্ষয়ে-যাওয়া সাবানের পাৎলা টুকরো। কাব্যটির নাম দেওয়া যেতে পারে "আধুনিক রূপকথা"। তার ভাঙা ছন্দে এই দীর্ঘনিশ্বাস জেগে উঠবে যে, কোথাও পাওয়া গেল না সেই খোয়ানো জগৎ। এই সুযোগে সেদিনকার দেউলে অতীতের এই তিনটি উদ্‌বৃত্ত সামগ্রী বিশ্ববিধি ও বিধাতাকে বেশ একটু বিদ্রূপ করে নিতে পারে; বলতে পারে, "শৌখিন মরীচিকার ছদ্মবেশ প'রে বাবুয়ানার অভিনয় করত ওই মহাকালের নাট্যমঞ্চের সঙ - আজ নেপথ্যে উঁকি মারলে তাকে আর চেনাই যায় না; এমন ফাঁকির জগতে সত্য যদি কাউকে বলা যায় তবে তার প্রতীক বাজার-দরের বাইরেকার আমরা ক'টিই, এই তলানি-তেলের শিশি, এই দাঁতভাঙা চিরুনি আর ক্ষয়ে-যাওয়া পাৎলা সাবানের টুকরো; আমরা রীয়ল, আমরা ঝাঁটানি-মালের ঝুড়ি থেকে আধুনিকতার রসদ জোগাই। আমাদের কথা ফুরোয় যেই, দেখা যায়, নটে গাছটি মুড়িয়েছে।" কালের গোয়ালঘরের দরজা খোলা, তার গোরুতে দুধ দেয় না, কিন্তু নটে গাছটি মুড়িয়ে যায়। তাই আজ মানুষের সব আশাভরসা-ভালোবাসার মুড়োনো নটে গাছটার এত দাম বেড়ে গেছে কবিত্বের হাটে। গোরুটাও হাড়-বেরকরা, শিঙভাঙা, কাকের-ঠোকর-খাওয়া-ক্ষতপৃষ্ঠ, গাড়োয়ানের মোচড় খেয়ে খেয়ে গ্রন্থিশিথিল-ল্যাজ-ওয়ালা হওয়া চাই। লেখকের অনবধানে এ যদি সুস্থ সুন্দর হয় তা হলে মিডভিক্‌টোরীয়-যুগবর্তী অপবাদে লাঞ্ছিত হয়ে আধুনিক সাহিত্যক্ষেত্রে তাড়া খেয়ে মরতে যাবে সমালোচকের কশাইখানায়।

শান্তিনিকেতনের সঙ্গে ছিল নাড়ির টান | বোধহয় তৈরি হয়েছিল জন্মের অব্যবহিত পরেই। রবীন্দ্রনাথ নাম রেখেছিলেন নবনীতা | বয়স তখন ...
10/01/2024

শান্তিনিকেতনের সঙ্গে ছিল নাড়ির টান | বোধহয় তৈরি হয়েছিল জন্মের অব্যবহিত পরেই। রবীন্দ্রনাথ নাম রেখেছিলেন নবনীতা | বয়স তখন মাত্রই তিন মাস। নামকরণের প্রসঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দম্পতি রাধারাণী এবং নরেন্দ্র দেবের কাছে একটি চিঠি লেখেন , তাতে লেখা— ‘যেহেতু তোমার উপহার প্রত্যাখ্যানের বয়স হয়নি তাই এই নামটি তুমি গ্রহণ কোরো...’।

শান্তিনিকেতনে তিনি প্রথম যখন আসেন তখন বয়স মাত্র তিন বছর | রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণেই এসেছিলেন তাঁর পরিবারের সকলে | দুপুরে আশ্রমের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সেখানে উপস্থিত। পাতে সাদা ভাত পড়তেই একরত্তি মেয়ে ফুঁসে উঠল... ‘এ কেমন নেমন্তন্ন! পোলাও নেই কেন?’

উপস্থিত সবাই বিব্রত। দেব দম্পতি লজ্জায় অধোমুখ। মুশকিল আসান হয়ে এগিয়ে এলেন প্রতিমা দেবীর ‘বাবা মশাই’ অর্থাৎ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । পুত্রবধূকে চুপিচুপি পরামর্শ দিলেন কমলা লেবুর কোয়া ছাড়িয়ে ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে। সেই হলদে রঙা ভাত পোলাও ভেবে খেয়ে অবশেষে মেয়ের মন ভরল। এ ভাবেই শান্তিনিকেতনের সঙ্গে ‘দেবকন্যা’র মনবীণার তারটি বাঁধা হয়ে গিয়েছিল। ১৯৪১-এর ২২শে শ্রাবণ মধ্যরাতে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে তিন বছরের ‘খুকু’ দেখেছিল, অসম সাহসী ‘মা’কে বাচ্চা মেয়ের মতো আকুল হয়ে কাঁদতে।

১৯৬০ সালে আশ্রম কন্যা অমিতা দেবীর বিশ্বখ্যাত পুত্র অমর্ত্য সেনকে বিয়ে করে নবনীতা এলেন শান্তিনিকেতনে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও ছেদ পড়েনি শাশুড়ি, ননদের সঙ্গে বন্ধুতায়, তাঁদের প্রতি কর্তব্যবোধে। শান্তিনিকেতন আশ্রমের প্রধান দু’টি অনুষ্ঠান বসন্তোৎসব এবং পৌষমেলাতেও ছিল তাঁর নজরকাড়া উপস্থিতি। অমর্ত্য সেনের সঙ্গে কাটানো বসন্তোৎসবের স্মৃতিচারণায় বলেছেন: ‘একবার দোলপূর্ণিমার আগের রাতে আমরা দু’জনেই শান্তিনিকেতনে, আশ্রমের বৈতালিকে পাশাপাশি হেঁটেছিলুম। ‘সব কুঁড়ি মোর ফুটে ওঠে তোমার হাসির ইশারাতে--!’ গাইতে গাইতে।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর রক্তে। বাংলার রক্ষণশীল সমাজে নবনীতা আজীবন ডানপিটে পরিচয়ে সমুজ্জ্বল ছিলেন। নিজের মতো করে বেঁচেছেন হার না-মানা প্রকৃতিতে। ব্যক্তিত্বের বহুমুখী বিস্তারে নবনীতা মা রাধারানিকেও ছাপিয়ে গিয়েছেন কখনও কখনও।

নবনীতা দেবসেন বহু বছর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন। সামলেছেন ওই বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব। আমেরিকার কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়, ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়েছেন। তুলনামূলক সাহিত্যে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল প্রবাদপ্রতীম। বাংলা, হিন্দি, সংস্কৃত, হিব্রু, ওড়িয়া, অসমিয়া, ফরাসি, জার্মান ভাষায় তাঁর পারদর্শিতা ছিল। গবেষণা এবং অধ্যাপনার পাশাপাশি সমান তালে চালিয়ে গেছেন সাহিত্যচর্চাও। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, রম্যরচনা - সবেতেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ছোটোদের জন্যও লিখেছেন সাবলীলভাবে। নারী ক্ষমতায়ন আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সীতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ‘রামায়ণ’-কে বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীকে নিয়ে তাঁর কাজ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।

আজ নবনীতা দেবীকে স্মরণ করি শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়।

© অহর্নিশ
তথ‍্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার :- শান্তিনিকেতনের ‘সই’ নবনীতা...আনন্দবাজার পত্রিকা, চার নম্বর প্ল‍্যাটফর্ম ডট কম, শ্রেয়ণ - বঙ্গদর্শণ, প্রথম আলো ‘রূপকথা সমগ্র’ - নবনীতা দেবসেন, উইকিপিডিয়া

অবশ্যই সংগ্রহে রাখুন নবনীতা দেবসেন-এর লেখা বই নবনীতা । বইটি ১৯৯৯ সালে সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ।

সিজন আসতে না আসতেই খেজুরের গুড় খাবেন, খান! এই যে দেখুন, চার পাঁচ কেজি চিনি আর গরুর লালি মিক্স(চিটা গুড়) করে হয়ে যায় টস ...
05/12/2023

সিজন আসতে না আসতেই খেজুরের গুড় খাবেন, খান! এই যে দেখুন, চার পাঁচ কেজি চিনি আর গরুর লালি মিক্স(চিটা গুড়) করে হয়ে যায় টস টসে খেজুরের পাটালি গুড়। অর্ডার দেন, খান...বেশি করে খান!

সম্পূর্ণ দোষ কি কেবল ব্যাবসায়ীদের, দোষ কি ভোক্তাদের নেই? আপনারা গুড়ের চাপ ফেলবেন শীত না আসতেই। আমের গুটি ধরার আগেই পাকা আম খাওয়ার জন্যে পাগল হয়ে যাবেন! সিজন শুরু হওয়ার আগেই অর্ডার দেওয়া নেওয়া শুরু করে দিবেন... তাহলে তো এরকম অখাদ্য-কুখাদ্য পেটে যাবেই! আর আপনি কি জানেন, এই ধরনের খাবার আপনার-আমার অকাল এবং আকস্মিক মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সিদ্ধান্ত আপনার.....

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হাওড়া স্টেশনে ছিনতাইবাজদের পাল্লায় পড়েছেন, ছিনতাইবাজদের লক্ষ তাঁর হাতে ধরা রূপনারায়ণের মস্ত ...
05/12/2023

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হাওড়া স্টেশনে ছিনতাইবাজদের পাল্লায় পড়েছেন, ছিনতাইবাজদের লক্ষ তাঁর হাতে ধরা রূপনারায়ণের মস্ত তিন ইলিশ। শরৎচন্দ্র
শোভাবাজারের কাউকে খাওয়াবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে শোভাবাজার নয় রূপনারায়ণের মস্ত সেই তিনটি ইলিশের শেষ পর্যন্ত গন্তব্য হল লিলুয়ায় দেব দম্পতির সংসারে। হ্যাঁ আমরা বলছি কবি, সাহিত্যিক নবনীতা দেবসেনের মা রাধারাণী ও তাঁর স্বামী নরেন্দ্র দেবের কথা। সেই রাধারাণী যার জীবনে অকাল বৈধব্য জীবন -কল্লোলিনীতে প্রাচীর হতে চেয়েও পারে নি,বরং পুনর্বিবাহে তাদের জীবন হয়েছিল মধুর আনন্দময়।
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে

রাধারাণী-নরেন্দ্রর বিবাহ রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্র দুই বটবৃক্ষের আশীষ পেয়েছিল, দম্পতির সংসার তখন আক্ষরিক অর্থে চাঁদের হাট,সাহিত্য জগতের বন্ধুদের আনাগোনা লেগে থাকে। অভিভাবকের মত শরৎচন্দ্র নিয়মিত আসেন সেই বাড়িতে। এটা -ওটা কিনে তিনি গুছিয়ে দেন প্রিয় রাধু'র সংসার। ক্যালেণ্ডারে সেদিন রবিবার। ঘড়িতে তখন প্রায় তিনটের কাঁটা ছুঁই ছুঁই করছে। সকালেও রাধারাণী -নরেন্দ্রর বাড়িতে একদল হৈ হৈ করে আড্ডা দিয়েছে। বাড়ির বারান্দা থেকে প্ল্যাটফর্ম দেখা যায়, রাধারাণী দেখলেন কলকাতা থেকে আসা ট্রেনে নামছেন শরৎচন্দ্র,নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ি,প্রেমাঙ্কুর আতার্থী সহ আরও বেশ কয়েকজন।তাদের দেখে রাধু'র স্বামী মহাখুশী। বললেন ভাগ্যিস তারা বেরিয়ে পড়েন নি।রাধু বলল গুণনিধি কোথায়, শিগগিরই দুটো উনুনে আগুন দিক অনেক বেলা হয়েছে।স্বামী ভদ্রলোকের গলার সুরে উদ্বেগের সেই প্রশ্ন ,এতবেলায় কি না খেয়ে বেরিয়েছে!
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে

ওদিকে শিশির ভাদুড়ি উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করছেন -
"বহুদিন মনে ছিল আশা
ধরণীয় এককোণে রহিব আপন মনে ,
ধন নয়,মান নয়, এতটুকু বাসা-শিশিরবাবুর পাশে শরৎচন্দ্রের মুখে প্রসন্ন হাসি।
আসলে সবাই গিয়েছিলেন শিশির ভাদুড়ির থিয়েটারের আড্ডায়। সেখানে ও তাদের ওঠার জন্য কেউ তাড়া দিয়েছেন চুপিচুপি, হেমেন্দ্রকুমার বিদ্রোহের সুরে বলেছিলেন রবিবার তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলে নাকি তাঁর মুড নুন হয়ে গলে যাবে, তিনি বাগবাজার যাবেন না, লিলুয়ায় যাবেন। সবাই সেই কথায় সন্মত হলেন।

শিশির ভাদুড়িও বললেন তিনি 'ঘরে-বাইরে'বইটা নাটক করতে নরেন কে দিয়েছেন। সেটা তৈরি হয়ে আছে সে খবর দিয়েছে।...চল আমিও তোদের সঙ্গে যাই।
কেউ তখনও স্নান করেন নি, হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছেছেন তাদের দৃষ্টি পড়ল শরৎচন্দ্রের দিকে তিনি সঙ্গী ছোকরার হাতে মস্ত তিনটি ইলিশ দিয়ে স্টেশন থেকে বের হচ্ছেন।আর যায় কোথায় ডাকাত পড়ার মত সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লেন তাঁর উপর,প্রশ্ন ইলিশ যাচ্ছে কোথায়?উত্তর এল শোভাবাজার।

শরৎচন্দ্র বললেন শোভাবাজারে একজনকে ইলিশ খাওয়াবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।চারু, প্রেমাঙ্কুর সমকণ্ঠে বলে উঠলেন আপনি রূপনারায়ণ থেকে ইলিশ ধরে শোভাবাজারে প্রতিশ্রুতি পালনে চলেছেন আমরা ইলিশ সমেত আপনাকে ধরে দেবালয়ে রবিবার পালনে চলেছি। শীঘ্রই ট্রেনে উঠে পড়ুন আমাদের সঙ্গে। শরৎচন্দ্র আর বাক্যব্যয় না করে শিশির ভাদুড়িদের সঙ্গে ট্রেনে উঠে পড়লেন, গন্তব্য লিলুয়া, যেখানে থাকেন রাধারাণী ও নরেন্দ্র তারা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল নবনীতা দেবসেনের বাবা ও মা।
সংকলনে ✍🏻 অরুণাভ সেন।।
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে











পুস্তক ঋণ কৃতজ্ঞতা স্বীকার রাধারাণী দেবী, রত্না মিত্র, রাধারাণী দেবীর রচনা সংকলন, দ্বিতীয় খণ্ড

“গুরুদেব আমাকে বরণ করে নিলেন অর্ঘ্য দিয়ে, আশীর্বাদ করলেন কবিতা পড়ে” - নন্দলাল বসু...চলচ্চিত্র ও শিল্প সমালোচক সত্যজিৎ চৌ...
04/12/2023

“গুরুদেব আমাকে বরণ করে নিলেন অর্ঘ্য দিয়ে, আশীর্বাদ করলেন কবিতা পড়ে” - নন্দলাল বসু...

চলচ্চিত্র ও শিল্প সমালোচক সত্যজিৎ চৌধুরী একবার বলেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার বিচার অর্থহীন হয়ে পড়ে, তেমনি নন্দলালের পর্বে পর্বান্তরে বিস্তৃত কাজের সমীক্ষা এড়িয়ে ভারতীয় আধুনিকতার ধারণা দাঁড় করানো যায় না।” তাঁর এই কথার একটা ভিত্তি রয়েছে। সাহিত্য-শিল্প জগতে রবীন্দ্র-নন্দলাল ঠিক জুটির মতো। তাঁদের এড়িয়ে যাওয়া খুব কঠিন।

নন্দলাল বসুর জন্মদিনে গুরুদেব তাঁকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন, “কল্যাণীয় শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসু,/ রেখার রহস্য যেথা আগলিছে দ্বার/ সে গোপন কক্ষে জানি জনম তোমার।/ সেথা হতে রচিতেছ রূপের যে নীড়,/ মরুপথ শ্রান্ত সেথা করিতেছে ভিড়।” অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর একটি ছবি এঁকেছিলেন আপনমনে। নন্দলাল বসু-ও পরিকল্পনা করেছিলেন একটি ছবি এঁকে দেবেন। তাঁর এতদিনের সঙ্গী, চলার পথের অনুপ্রেরণা এবং সমালোচককে উদ্দেশ্য করে হাতের সূক্ষ্ম রেখায় তিনি অমোঘ করে রাখবেন তাঁর একান্ত গুরুদেবকে। কিন্তু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এঁকে ফেলায় আর কিছু আঁকলেন না নন্দলাল বসু। সেদিন নন্দলাল বসুর জন্মদিনে গুরুদেবের পাঠানো কবিতাখানিই হয়ে উঠেছিল একমাত্র সম্বল।

১৯১৪ সালের এপ্রিল মাসে শান্তিনিকেতনের আশ্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে পদার্পণ করলেন নন্দলাল বসু। ১লা মে তাঁকে বিশেষভাবে সংবর্ধনা জানালেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই অনুষ্ঠানে নন্দলাল বসুকে উৎসর্গ করে নিজের লেখা কবিতা পাঠ করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই কবিতায় লেখা ছিল, “শ্রীমান নন্দলাল বসু পরম কল্যাণীয়েষু,/ তোমার তুলিকা রঞ্জিত করে ভারত-ভারতী-চিত্ত।/ বঙ্গলক্ষ্মী ভাণ্ডারে সে যে যোগায় নূতন বিত্ত।/ তোমার তুলিকা কবির হৃদয় নন্দিত করে, নন্দ!/ তাই তো কবির লেখনী তোমায় পরায় আপন ছন্দ।”

এই অভিবাদনের পর নন্দলাল বসুর অবস্থা কেমন ছিল? তিনি লিখেছিলেন, “এই অভিনন্দনের পরে আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতির ঘটনা হল। গুরুদেব আমাকে বরণ করে নিলেন অর্ঘ্য দিয়ে, আশীর্বাদ করলেন কবিতা পড়ে। ...সহসা আমার মনে হল। আমাতে যেন আমি নেই। আমার দেহটা আছে বটে, তবে অতি স্বচ্ছ হয়ে গেছে। ...কবির ভেতর দিয়ে মহর্ষির আশীর্বাদ যেন আমাকে ছুঁয়ে গেল। আমি যেন শান্তিনিকেতনের আশ্রমের অন্তরে প্রবেশ করলুম।”

আত্মহত্যা করলেন কাদম্বরী, মৃত্যুসংবাদ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা শ্বশুরমশাই দেবেন্দ্রনাথের!তরুণী যেন একটু হেসে উঠলেন। চোখে জ...
02/12/2023

আত্মহত্যা করলেন কাদম্বরী, মৃত্যুসংবাদ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা শ্বশুরমশাই দেবেন্দ্রনাথের!

তরুণী যেন একটু হেসে উঠলেন। চোখে জল, মনে ঝড় চলছে উথালপাথাল। স্বামীও এলেন না; এমনকি যাকে ভরসা করতেন প্রবলভাবে, যার লেখায় বেঁচে উঠতেন, তিনিও এলেন না। আস্তে আস্তে তরুণী এগিয়ে গেলেন দেরাজের দিকে। বের করলেন একটি শিশি - আফিমের। অনেকটা খেয়ে নিলেন একসঙ্গে। আহা, এই ঘুম বড়ো নিশ্চিন্তির! শুয়ে পড়ল শরীরটি। আস্তে আস্তে ঘনিয়ে এল অন্ধকার। ১৮৮৪ সাল, ১৯ এপ্রিল। ঠাকুরবাড়ির তেতলার ঘরে মৃত্যুকে বেছে নিলেন কাদম্বরী দেবী।

কাদম্বরীর আত্মহত্যা নিয়ে বাংলায় এখনও প্রচুর চর্চা হয়। অনেকে অনেকরকম দিকের সন্ধান দেন। সেখানে জড়িয়ে থাকে সত্যি; জড়িয়ে থাকে মিথ, গুজবও। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন স্বামী। রূপে-গুণে ঠাকুর পরিবার তো বটেই, গোটা বঙ্গসমাজ মোহিত। কাদম্বরী দেবীও কম কিছু ছিলেন না। সাহিত্যবোদ্ধা তো ছিলেনই; সেই সঙ্গে ছিলেন দুর্দান্ত অভিনেত্রী। জীবিতকালে ঠাকুরবাড়ির নানা নাটকে সদর্পে অভিনয় করে গেছেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথও স্ত্রীর এমন গুণের প্রশংসা করতেন। সবই ছিল, আবার ছিল না অনেক কিছুই। এত ভিড়ের মধ্যে একপ্রকার একাই ছিলেন কাদম্বরী দেবী। তেতলার ওই ঘরটিই ছিল তাঁর যাবতীয় সব। আর ছিলেন তাঁর প্রিয় বন্ধু, রবীন্দ্রনাথ।

দুজনের বয়সের খুব বেশি তফাৎ ছিল না। সেখান থেকেই বন্ধুত্বের শুরু। শুধু ‘নতুন বউঠান’ই নন, রবি’র কাছে কাদম্বরী ছিলেন তাঁর লেখার সবচেয়ে বড়ো সমালোচক। আর সেটাই ভেতরে ভেতরে অনুপ্রেরণা দিয়ে যেত তাঁকে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আর কাদম্বরীর কাছেই যেন নিজের সবটুকু মেলে দিতে পারতেন রবীন্দ্রনাথ। সে জোড়াসাঁকোই হোক, বা চন্দননগরের মোরান সাহেবের বাগানবাড়ি। তাঁর প্রিয় ‘হেকেটি’ একদিকে ছিলেন বন্ধু, অন্যদিকে অভিভাবকও। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীরও বিশেষ প্রিয় ছিলেন কাদম্বরী। সেটা অবশ্যই তাঁর সাহিত্যের প্রতি অসম্ভব অনুরাগের জন্য।

কাদম্বরী ও ঠাকুরবাড়ির গল্প অনেকেরই জানা। সব জায়গাতেই মূল ব্যাপার একটাই, নিঃসঙ্গতা। একাকিত্ব। হ্যাঁ, এতকিছু থাকতেও ভেতরে ভেতরে যেন অন্য দ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। অবশ্য বিয়ের মুহূর্ত থেকেই কাদম্বরী ঠাকুরবাড়ির একটা বড়ো অংশের কাছে ছিলেন ব্রাত্য। তাঁর বাবা ছিলেন জোড়াসাঁকোর সামান্য একজন কর্মচারী। তাঁর মেয়েকেই কিনা তখনও পর্যন্ত দেবেন্দ্রনাথের সবচেয়ে উজ্জ্বল পুত্রটির সঙ্গে বিয়ে দেওয়া! কিছুতেই মানতে পারেননি জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। শুধু তিনিই নন, অনেকেই একপ্রকার দূরে সরিয়ে রাখতেন কাদম্বরীকে। অবহেলা, অপমান ছিল নিত্যসঙ্গী।

তার ওপর ঘটে দুর্ঘটনা। স্বর্ণকুমারী দেবীর ছোটো মেয়ে ঊর্মিলা ছিল কাদম্বরীর ন্যাওটা। একদিন মুহূর্তের বেখেয়ালে ঊর্মিলা একা একা বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে। তারপর সিঁড়ি থেকে পড়ে যায়। বাঁচানো যায়নি তাকে। সবার সমস্ত রাগ এসে পড়ে কাদম্বরীর ওপর। সব দোষ যেন তাঁর। একে কোনো সন্তান হয়নি, অন্যের সন্তানও রাখতে পারল না— এমন কথাও শুনতে হয়েছিল তাঁকে। সমস্ত কিছু নিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন কাদম্বরী। কফিনে শেষ পেরেকটা পোঁতেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ। নাটক আর জাহাজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি। বাড়ি আসার সময়ই পান না। তার ওপর রবীন্দ্রনাথেরও বিয়ে হয়ে যায়। কাদম্বরী চেয়েছিলেন, নতুন বউ মৃণালিনীকে রবি’র মতো করে তৈরি করে দেবেন। কিন্তু সেটাও পারলেন না; বলা ভালো করতে দেওয়া হল না। শেষ পর্যন্ত ‘সরোজিনী’ জাহাজ উদ্বোধনে পরিবারের সবার সঙ্গে যাবেন বলে উদগ্রীব হয়েছিলেন। সেটাও না হওয়ায়, ধৈর্যের সব তার ছিঁড়ে যায়। অতঃপর, মাত্রাধিক আফিম সেবন এবং…

ঠাকুরবাড়ির পুত্রবধূর আত্মহত্যা— এই খবর তখনকার দিনে কী মারাত্মক আকার নিতে পারত তা বিলক্ষণ জানতেন সবাই। অবশ্য কাদম্বরী দেবী ১৯ এপ্রিলই মারা যাননি। ‘সরোজিনী’ জাহাজ থেকে তড়িঘড়ি সবাই ফেরার পর দেখেন, তখনও দেহে স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে। চিকিৎসা শুরু হলেও, সেসব ছিল বৃথা। ঠিক দুদিন পর, মারা যান কাদম্বরী দেবী। আর বিয়ে করেননি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর সমস্ত ঔজ্জ্বল্যও নিভে আসে…

কিন্তু সেই সময় ঠাকুরবাড়ি, বিশেষ করে দেবেন্দ্রনাথের ভূমিকা নিয়ে পরবর্তীতে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। শোনা যায়, কাদম্বরী দেবী একটি চিঠি লিখেছিলেন মৃত্যুর আগে। দেহ উদ্ধারের পর সেটাও পাওয়া যায়। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্দেশে সেসব পুড়িয়ে ফেলা হয়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে পাঠানো কোনো এক নটীর চিঠিও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। ঠাকুরবাড়ির সমস্ত সদস্যরা অস্বাভাবিক রকমের নীরব ছিলেন এই মৃত্যুর পর। কোনো পোস্টমর্টেম হয়নি; সব আয়োজন, ডেথ রিপোর্ট হয়েছিল ঠাকুরবাড়িতে বসেই, দেবেন্দ্রনাথের সামনে। এমনকি, কোনো খবরের কাগজে যাতে এই খবর না প্রকাশিত হয়, সেই ব্যবস্থাও নিয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। রীতিমতো ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ করান সাংবাদিকদের। এবং লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তখনকার সংবাদপত্রের কোথাও এই নিয়ে সামান্য লাইনও লেখা নেই।

এভাবেই কেটে যায় ইতিহাস। ২৫ বছরের জীবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে অবহেলায়, নিঃসঙ্গে। সঙ্গী বলতে ছিলেন শুধু রবীন্দ্রনাথ। তাঁর লেখাই কাদম্বরী দেবীর জীবনকে সবচেয়ে ভালো ব্যক্ত করে। নতুন বউঠান যে কী ছিলেন তাঁর কাছে, এটা যে একমাত্র রবিই জানেন। বাস্তবিকই, ‘কাদম্বরী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই’…

Goutam Bhattacharyya এর পেজ থেকে সংগৃহীত

01/12/2023
01/12/2023

2024 World Cup:

The final list of qualified teams for the event is as follows:

Afghanistan,
Australia,
Bangladesh,
Canada,
England,
India,
Ireland,
Namibia,
Nepal,
Netherlands,
New Zealand,
Oman,
Pakistan,
Papua New Guinea (PNG),
Scotland,
South Africa,
Sri Lanka,
West Indies,
Uganda,
United States of America (USA).

বাংলার ফল…..
28/04/2023

বাংলার ফল…..

Address

Purba-Kadakati, Assasuni
Satkhira
9400

Telephone

01757744211

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Shushila-e-Library posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Organization

Send a message to Shushila-e-Library:

Share

Category