21/08/2026
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
নিরাপত্তার নামে নারী শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা খর্বের অপচেষ্টার প্রতিবাদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোতে বৈষম্যমূলক ‘সান্ধ্য আইন’, অসঙ্গতিপূর্ণ আবাসিক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিনিষেধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রী হলে দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষার্থীদের চলাচল, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও আবাসিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক বৈষম্যমূলক ও অসঙ্গতিপূর্ণ নীতিমালা আরোপ করা হচ্ছে। গত ১৯ আগস্ট থেকে জাহানারা ইমাম হল প্রশাসনের রাত ১১টার মধ্যে হলে প্রবেশ বাধ্যতামূলক করা, রাত ১১টার পর হল ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং মূল ফটকে তালা লাগানোর সিদ্ধান্ত যেমন এই নিয়ন্ত্রণমূলক প্রবণতার প্রকাশ, তেমনি গত ১৮ আগস্ট প্রীতিলতা হল প্রশাসনের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে প্রাধ্যক্ষকে অবহিত না করে কোনো আবাসিক শিক্ষার্থীর কক্ষে রাতে অতিথি অবস্থান করতে না দেওয়ার নির্দেশও একই ধরনের অতিরিক্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের উদাহরণ। প্রীতিলতা হলে দীর্ঘদিন ধরেই রাত ১০টার পর হলে প্রবেশ ও হল থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে। এছাড়া, প্রীতিলতা হলের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে যে, হলে উপস্থিতি ৫০ শতাংশের নিচে থাকলে পরীক্ষার ফরমে স্বাক্ষর দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে টালবাহানা করা হয়। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ এসব সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। নিরাপত্তার অজুহাতে গৃহীত এই সিদ্ধান্ত নারী শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্বাভাবিক একাডেমিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকারের পরিপন্থী।
এক যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাবি সংসদের সভাপতি অদ্রি অংকুর এবং সাধারণ সম্পাদক ফাইজান আহমেদ অর্ক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত জ্ঞানচর্চা, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সমান নাগরিক মর্যাদার ক্ষেত্র। সেখানে নারী শিক্ষার্থীদের চলাচলের ওপর আলাদা বিধিনিষেধ আরোপ করে তাদের স্বাধীন চলাচল, সাংগঠনিক কার্যক্রম, গবেষণা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে সংকুচিত করা হয়। নিরাপত্তাহীনতার সমাধান নারী শিক্ষার্থীদের বন্দি করে রাখা নয়; বরং ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা, কার্যকর টহলব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রী হলে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম কার্যকর রয়েছে। কোনো হলে রাত ১০টার পর বের হতে বাধা, কোথাও উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা, কোথাও আবার গেট বন্ধ করে দেওয়ার মতো নীতিমালা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অযৌক্তিক বৈষম্য তৈরি করছে। কোনো হলে একটি নিয়ম চালু হলে তা পরবর্তীতে অন্য হলগুলোতে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও অতীতে দেখা গেছে। ফলে একটি হলে আরোপিত বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত শুধু ওই হলের শিক্ষার্থীদের সমস্যা নয়; বরং তা সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার সংকুচিত করার পূর্বাভাস। জাহানারা ইমাম হলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই বৈষম্যকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার রাস্তা তৈরি করেছে।
আমরা মনে করি, একজন প্রাপ্তবয়স্ক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর চলাচলের স্বাধীনতা খর্ব করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, বৈষম্যমূলক এবং পিতৃতান্ত্রিক। অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে নারীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতারই বহিঃপ্রকাশ। আবার, একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের নিয়ম এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন নিয়ম চালু রাখা সরাসরি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য। নিরাপত্তার নামে এই দ্বৈতনীতি সংবিধানের সমতার চেতনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মনে করে, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার প্রশ্নকে নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধের যুক্তিতে পরিণত করা গ্রহণযোগ্য নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব; সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বোঝা শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। নারী শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত করে নয়, বরং একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তুলেই প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের দাবি:
- জাহানারা ইমাম হলের রাত ১১টার গেট-লক সংক্রান্ত বৈষম্যমূলক নির্দেশনা অবিলম্বে প্রত্যাহার;
- প্রীতিলতা হলসহ সকল ছাত্রী হলে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পরিসর ও স্বাভাবিক আবাসিক জীবনকে অযৌক্তিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এমন সকল নির্দেশনা পুনর্বিবেচনা ও প্রত্যাহার;
- সকল ছাত্রী হলে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ‘সান্ধ্য আইন’ ও চলাচলে বাধাস্বরূপ সব বিধিনিষেধ বাতিল;
- নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর সমান চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ;
- ক্যাম্পাস ও আবাসিক এলাকায় ২৪ ঘণ্টা কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সতর্ক করে বলতে চাই, নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার খর্ব করে পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে “নিরাপত্তা নিশ্চিত করার” কুযুক্তিকে এই ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তসমূহ অবিলম্বে প্রত্যাহার না করা হলে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন নারী শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্রসমাজকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলবে এবং এই অন্যায় সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে।
বার্তা প্রেরক
মো. রেদওয়ান সিকদার
দপ্তর সম্পাদক