06/08/2026
একজন মানুষের ভেতরে কতটা মানসিক দেউলিয়াত্ব আর অন্ধ অহংকার থাকলে বিপুল রক্তপাতের পরও নির্বিকারভাবে সব অস্বীকার করে তাকে "মেটিকুলাস ষড়যন্ত্র" বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, তা সাধারণ সুস্থ মস্তিষ্কের চিন্তার অতীত!
শুধু তিনি একা নন, তাঁর দলের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের কর্মী-সমর্থকরা এখন সেই একই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের অন্ধ চর্চায় ব্যস্ত। অনুশোচনার সামান্যতম লেশমাত্র নেই তাদের মধ্যে!
কী এক আশ্চর্য অন্ধত্ব! নেত্রী যা বলবেন, অনুসারীরা নাকি তা-ই চোখ বন্ধ করে গিলে নেবে! অথচ কেয়ামতের সেই বিচারালয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের বিবেক ও বুদ্ধির হিসাব নেবেন। বিবেক তো মানুষের ভেতরের সেই পরম ছাঁকনি, যা দিয়ে ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য চিনতে হয়। সেদিন নেত্রী বা দল রক্ষা করবে না, নিজের হিসাব নিজেকেই দিতে হবে।
বাস্তবতা তো দুনিয়াতেই স্পষ্ট; নিজের অগুনতি নেতা-কর্মীকে চরম বিপদের মুখে ফেলে, আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে বিদেশে পাড়ি জমালেন নেত্রী! আর সেই অন্ধ অনুসারীদের দিন কাটছে এখন জঙ্গলে, আর রাত কাটছে নৌকায়। গোটা বিশ্ব স্বচক্ষে দেখল, সামরিক হেলিকপ্টারে চেপে তিনি দেশ ছেড়ে পালালেন। আর আজ মিথ্যাচারের বয়ান তৈরি করা হচ্ছে ; তিনি নাকি পালাননি, ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন!
পালিয়ে না গিয়ে থাকলে দীর্ঘ সময় ধরে ভারতে কোন 'রাষ্ট্রীয় সফরে' বহাল আছেন তিনি? ডিসেম্বরের অপেক্ষায় কেন? এখনই চলে আসুন না! ১৫ই আগস্টের শোক দিবসে নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়ালে তারাও হয়তো নতুন করে উজ্জীবিত হতে পারত!
আসলে, অহংকারই পতনের মূল। তিনি চরম অহংকারে প্রকাশ্যে গর্জন করে বলতেন “বাংলাদেশে এমন কোনো শক্তি নেই যে আওয়ামী লীগকে ফেলতে পারে!” মুখে কখনো একটা 'ইনশাআল্লাহ' বলার প্রয়োজনও বোধ করেননি। বলতেন “শেখ হাসিনা পালায় না!” বিশ্বজগতের পরম মালিক তাঁর এই দুটি অহংকারকেই স্বয়ং তাঁর মুখের ওপর চূর্ণ-বিচূর্ণ করে মিলিয়ে দিলেন ধূলোয়।
মনে রাখা দরকার, এটা ১৯৭১ ছিল না, এটা ছিল ২০২৪। মানুষের হাতে হাতে ছিল স্মার্টফোন, ইন্টারনেটের খোলা জানালা। চোখের সামনে যা ঘটেছে, ইতিহাসের পাতা থেকে তা মুছে ফেলা অসম্ভব। জাতিসংঘের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে; জুলাই আন্দোলনের দিনগুলোতে সারাদেশে অন্তত ১,৪০০ মানুষ জীবন হারিয়েছেন। এটা কোনো রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষের বানানো মনগড়া রিপোর্ট নয়।
পুলিশের সাঁজোয়া যান (আর্মার্ড ভেহিকল) থেকে গুলিবিদ্ধ ছাত্রের নিথর দেহ রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলার দৃশ্য আমরা দেখেছি। লাশের স্তূপ দেখেছি। এমনকি স্তূপীকৃত লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার অমানবিক নজিরও দেখতে হয়েছে। গুলিবিদ্ধ মানুষকে বাঁচানোর জন্য রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সেই প্রাণপণ আকুতি বিশ্ব দেখেছে। শিশু, যুবক, বৃদ্ধ; কারো রেহাই মেলেনি।
এত রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ের পর এখন দাবি করা হচ্ছে, “আমার তিন হাজার পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে!” অথচ সরকারি দাপ্তরিক হিসেব অনুযায়ী নিহত পুলিশের সংখ্যা ৪৪ এবং কর্মস্থলে অনুপস্থিত বা পলাতক পুলিশের সংখ্যা ১৮৭। তাহলে কোন সমীকরণে সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে একে “মেটিকুলাস ষড়যন্ত্র” বলে আখ্যা দেন আওয়ামী নেত্রী? মানুষ ভুল করলে ক্ষমা চায়, আর শয়তান ভুলের ওপর অনড় থাকে!
অন্ধ সেজে থাকলে তো আর প্রলয় থেমে থাকে না। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে এমন এক চাটুকারিতার দেয়াল গড়ে উঠেছিল, যেখানে অপ্রিয় সত্য পৌঁছানোর কোনো সুযোগ ছিল না। সত্য বলার মতো সাহস কারো ছিল না। অথচ একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে রাগ ও অনুরাগের ঊর্ধ্ব থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর অতিরিক্ত রাজনৈতিক আনুগত্যের খেসারত দিতে গিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নিজ ভূমে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছিল। তারা একধরণের অপরাধবোধে ভুগেছে 'কেন আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারলাম না!' এবার না হয় তাদের বয়স নির্বিশেষে সেই আক্ষেপের অবসান ঘটার সুযোগ এলো!
সমগ্র জাতিকে তিনি এমন এক বিভাজনের মুখে দাঁড় করিয়ে গেছেন যে, আজ জাতীয় ঐক্যই চরম সংকটে। দেশের অসংখ্য তরুণ প্রথম সুযোগেই চিরতরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাঁচতে চায়। তাঁর ও তাঁর দলের দৃষ্টিতে একমাত্র তারাই দেশপ্রেমিক, আর বাকি সবাই যেন সমাজের নিগৃহীত হরিজন সম্প্রদায়! দেশপ্রেম কি কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিবারের জমিদারি বা বাজারের কোনো বিক্রিযোগ্য পণ্য?
বাস্তবতা হলো; এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, খামারি, জেলে আর ঘামঝরা সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক। তাদের কোনো দ্বিতীয় দেশ বা বিকল্প পাসপোর্ট নেই। এই মাটিতেই তারা ফসল ফলায়, মাছ ধরে, শ্রম দিয়ে দেশকে টিকিয়ে রাখে। আর রাজনীতির নামে আমরা বিগত দিনে উপহার পেয়েছি; চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট আর মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপ!
তবুও বলব, এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। বয়সের ভার চেপেছে, ওপারে পাড়ি দেওয়ার সময় সমাগত প্রায়। ইতিহাসের ভুল থেকে শিক্ষা নিন। মহাকালের মুখোমুখি হওয়ার আগে জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। নির্দ্বিধায় বলুন 'ভুল হয়েছে, অন্যায় হয়েছে, নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরেছে।' সত্য স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে মানুষ ছোট হয় না, বরং পাপের বোঝা হালকা হয়।
আজ ঐতিহাসিক ৫ই আগস্ট; দীর্ঘ ষোলো বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের দিন। ছাত্র-জনতা ও মেহনতি মানুষের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের এক অনন্য বিজয়ের দিন। ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে আত্মোৎসর্গকারী সকল শহীদ ও নির্যাতিত মানুষের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অশেষ ভালোবাসা।
আল্লাহ তাঁদের প্রতি ন্যায়বিচার করুন এবং যারা জুলুম ও রক্তের ওপর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের প্রত্যেকের প্রাপ্য বিচার সুনিশ্চিত করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন।
#এনপি