20/12/2025
টাকা দিয়ে সবাইকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসাতে ফাঁসাতে টাকার যোগান দিতে মরিয়া হয়ে ভীমগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আতিউর রহমান মডেল ডিগ্রি কলেজের সরকারি স্থাপনার প্রাচীর ভেঙে ৩ কোটি টাকার ধ্বংসযোগ্য মামলায় প্রধান আসামি থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মহিলা নেত্রী পপি আক্তার
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | ভীমগঞ্জ
ভীমগঞ্জে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে প্রাচীর ভাঙচুর, দখলচেষ্টা ও কোটি টাকার সরকারি সম্পদ ধ্বংসের একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। ভীমগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আতিউর রহমান মডেল ডিগ্রি কলেজের সীমানা প্রাচীর ভেঙে প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতিসাধনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহিলা নেত্রী পপি আক্তারকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার, স্থানীয় সূত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বিশ্লেষণে উঠে আসে— এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চক্রের অংশ। অভিযোগ রয়েছে, এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করা হতো। সেই অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জোগান দিতেই সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জমি ও স্থাপনায় নজর পড়ে এই চক্রের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গভীর রাতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর সংগঠিত আক্রমণ।
একজন স্থানীয় শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“দিনের আলোয় সাধারণ কেউ সাহস পেত না। বিএনপি নেত্রী পপি আক্তারের কিশোর গ্যাং বাহিনী ও তার নেতৃত্বে ঘটনাটি ঘটেছে। এটি সাধারণ দখল নয়, পুরোপুরি শক্তির মহড়া।”
মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ ধ্বংস, বেআইনি অনুপ্রবেশ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও আর্থিক ক্ষতিসাধনের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও ক্ষতিপূরণযোগ্য অপরাধ।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহিলা নেত্রী পপি আক্তারের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত একটি শক্তিশালী চক্র পরিচালনা করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তিনি নিয়মিতভাবে অনুসারীদের মাধ্যমে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের নির্দেশ দিয়ে থাকেন বলেও দাবি করেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পপি আক্তারের নির্দেশে একাধিক ব্যক্তিকে মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস না পেলেও অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“এলাকায় কেউ তার কথার বাইরে গেলে বিপদে পড়তে হয়। মামলা, মারধর আর চাঁদাবাজির ভয় দেখিয়ে সবাইকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব অপকর্মের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এক ধরনের ‘সন্ত্রাসী মাফিয়া নেটওয়ার্ক’ ভীমগঞ্জের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনাকে এই ধারাবাহিক অপরাধের সর্বশেষ ও ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন তারা।
এলাকাবাসী ও সচেতন মহল দ্রুত পপি আক্তারসহ তার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এলাকায় অপরাধ আরও বেপরোয়া রূপ নিতে পারে।
বর্তমানে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে আশা করছে এলাকাবাসী।
এদিকে অভিযুক্ত পপি আক্তার গতকাল রাত থেকেই আত্নগোপনে আছে বলে জানা যায়। অনুসন্ধানে উঠে আসা নথিপত্র, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বিষয়টিকে সাধারণ রাজনৈতিক মামলার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের গুরুতর অভিযোগে পরিণত করেছে।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছেন—
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে, সেখানে এই ধরনের দখল ও ধ্বংসযজ্ঞ হলে রাষ্ট্র কীভাবে নিশ্চুপ থাকে?
বর্তমানে মামলাটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামও বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।
সরকারি সম্পদ রক্ষায় এই মামলার পরিণতি কী হয়— সেদিকেই এখন নজর ভীমগঞ্জবাসীর।