21/07/2026
বর্ষা এলেই বই-খাতা ছেড়ে ঘরে বন্দি শিশুরা, টাঙ্গুয়ার হাওরে শিক্ষার সংকট চরমে
নিজস্ব প্রতিবেদক | তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)
বর্ষা মৌসুম এলেই টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের শিশুদের শিক্ষাজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। উত্তাল নদী, নৌকানির্ভর যাতায়াত এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কার কারণে বছরের একটি বড় সময় অনেক শিক্ষার্থীকে বই-খাতা ছেড়ে ঘরেই থাকতে হয়। ফলে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের জয়পুর ও গোলাবাড়ি গ্রামের অসংখ্য শিশু শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা এই জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, হাওরাঞ্চলের শিশুদের জন্য নিরাপদ ও টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে জয়পুর ও গোলাবাড়ি গ্রামের শিক্ষার্থীদের পাটলাই নদীর প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার উত্তাল জলরাশি পেরিয়ে ছিলানী তাহিরপুরে অবস্থিত জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে হতো। বর্ষা মৌসুমে নদীতে প্রবল ঢেউ ও স্রোতের কারণে শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে ভয় পান অভিভাবকরা। অনেক সময় কয়েকদিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না শিক্ষার্থীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় বছরের পর বছর ধরে এ অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা চরম সংকটে রয়েছে। অনেক শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে না পেরে মাঝপথেই লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। কেউ পরিবারের জীবিকার তাগিদে কাজে নেমে পড়ে, আবার কেউ টাঙ্গুয়ার হাওরে আসা পর্যটকদের সামনে গান গেয়ে সামান্য আয়ের চেষ্টা করে। শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে তাদের শৈশব ক্রমেই সংগ্রামের বাস্তবতায় হারিয়ে যাচ্ছে।
এই সংকট নিরসনের লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মাধবদীর একদল দ্বীনি শিক্ষানুরাগীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মা'হাদুদ দা'ওয়া আল ইসলামিয়া চারগাঁও জয়পুর মাদরাসা। প্রতিষ্ঠানটি চালু হওয়ার পর স্থানীয় অনেক শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগও পাচ্ছে তারা। তবে শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষের অভাব এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনের তুলনায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেই হবে না; বরং হাওরাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় নিরাপদ যাতায়াত, পর্যাপ্ত শিক্ষক, মানসম্মত শিক্ষা উপকরণ এবং টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে শিশুদের নিরাপদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, টাঙ্গুয়ার হাওরের শিশুরাও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের শিশুদের মতো সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার রাখে। তাদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বও।
প্রশ্ন উঠছে—স্বাধীনতার এত বছর পরও যদি বর্ষা এলেই টাঙ্গুয়ার হাওরের শিশুরা বই-খাতা ছেড়ে ঘরে বন্দি থাকতে বাধ্য হয়, তাহলে সমান শিক্ষার অধিকার কতটা নিশ্চিত হয়েছে? এখন স্থানীয়দের একটাই প্রত্যাশা—হাওরাঞ্চলের শিশুদের জন্য এমন কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক, যাতে বর্ষা আর তাদের শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে না থাকে।