15/09/2019
তখন সদ্য পাশ করা বেকার আমি।চাকরি-বাকরির জন্য পড়াশুনা করছি, আর কিছু সময় জীবন নিয়ে ভাবি।পড়ন্ত বিকেলে প্রায় সময় অারশীনগর যাই, ফ্রি তে বাতাস, আর সাথে ৫ টাকার এক কাপ লাল চা, ৫ টাকার বাদাম, ৪ টা বেনসন ভালোই কাটে সময়।সেদিনের চা টা ভালো হয় নি মোটেও, অতিরিক্ত চিনির কারনে শরবতের মতো লাগছিলো,তাই না খেয়ে পাশে রেখে দিলাম।
হঠাৎ পিছন থেকে মেয়েলী গলায় কেউ একজন ডাক দিলো,
কমল ভাইয়া !!! কেমন আছেন, আমাকে চিনতে পেরেছেন??
-হ্যা, চিনবো না কেন! কেমন আছো বাসন্তী ???
-জ্বী, আমি ভালো ! তিন বছর পর দেখা।! মিট মাই হাজবেন্ড ,আর আমার ছেলে ।
-বাহ, ছেলেতো খুব কিউট!! বয়স কতো ওর?
-১ বছর । চলেন আজকে আপনাকে ফুচকা খাওয়াবো..
-ফুচকার প্রতি আগ্রহটা এখনো কমে নি তোমার!!
-নাহ,কিছু অভ্যাস আর ভালোলাগা কি কখনো বদলায়, বলেন...!!
বাসন্তীর সাথে পরিচয় প্রায় ৪ বছর আগে। তখন আমার সেকেন্ড সেমিস্টার চলে। ফার্স্ট ইয়ারের শুরুতে সুমার সাথে ব্রেকআপটা তখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তার ওপর রাগের মৌসুম তখনো শেষ হয় নি। ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে রাগ আর ব্রেকআপ এই দুইটা ব্যাপার খুবই কমন।
সবমিলিয়ে খুব অগোছালো একটা সময়ে আমার জীবনে বাসন্তীর আগমন।
মেয়েটা খুবই উৎসুক টাইপের, কোনকিছুতেই বিরক্ত হয় না। অনর্গল কথা বলে, আর অনেক হাসে, এক কথায় বললে প্রানবন্ত একটা মেয়ে।
তখনো আমি বাসন্তীকে দেখিনি,শুধু শুনেছি।
ও আমার কলেজর জুনিয়র, যদিও কলেজ লাইফে আমি ও কে চিনতামনা, কিন্তু ও আমাকে চিনতো। তারপর বন্ধুদের কাছ থেকে আমার ফোন নাম্বারটা ম্যানেজ করে একদিন আমাকে নক করে সে। সেই থেকেই পরিচয়।
ওর সাথে কথা বলতে ভালো লাগতো। আমার অগোছালো জীবনটা একটু একটু করে গোছানোর চেষ্টা করতো সে।ব্যাপারটা আমার ভালো লাগতো।সত্যি বলতে, ঘোর অন্ধকারে এক কাঠি দিয়েশলাইয়ের আগুন ও আপনার মাঝে আশার সৃষ্টি করবে। আমারবেলায়ও তাই হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো আমি আর হারাবো না।
পরিচয়ের মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই কিভাবে যেনো মেয়েটা আমার কাছে একগাদা ফুচকা ট্রিট পাওনা হয়ে গেল। অতঃপর ফুচকা খাওয়াবো ভেবে ওর ক্যাম্পাসে গেলাম। সেদিনই ওর সাথে আমার প্রথম দেখা। বাবার অনেক টাকা স্বত্বেও ইরা অনেক সাধারন একটা মেয়ে,আভিজাত্য কিংবা চাকচিক্য থেকে অনেক দুরে। ওর চুলগুলো খুব সুন্দর, গায়ের রঙটা একটু ময়লা, কিন্তু চেহারায় একটা মায়া মায়া ভাব আছে।
বাসন্তীর সাথে অনেকক্ষন হাটলাম, কিন্তু ওইদিন একটা ফুচকাওয়ালাকেও পেলাম না। কপালটাই খারাপ, শেষ পর্যন্ত আইসক্রিম খেয়েই ফিরতে হলো।
ওর খুব ইচ্ছে ও একদিন রোলার কোস্টারে চড়বে। কিন্তু ওর ফ্যামিলির কেউ ও কে কখনোই এসবে চড়তে দেয় না।কেননা, রোলার কোস্টারের প্রতি ওর আগ্রহ আর ভয় দুইটাই অনেক বেশি।
তারপর একদিন যমুনা ফিউচার পার্কে গেলাম, ওতো খুবই এক্সাইটেড। তবে আমি মোটেও স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। কারন আমার মাঝারী ধরনের এক্রোফোবিয়া আছে, সহজভাবে বললে উচ্চতা ভয় লাগে আর কি। কিন্তু মেয়েটার এতো আগ্রহ দেখে ফোবিয়ার কথাটা আর বলা হয় নি। রোলার কোস্টারে ওঠার সময় আমি নিজেকে নরমাল দেখানোর অনেক চেষ্টা করলাম, যাতে ও ভয় না পায়। কিন্তু ঝামেলাটা বাঁধলো রোলার কোস্টার কিছুক্ষন চলার পর, ও এমনভাবে কান্না শুরু করবে আমি ভাবতেও পারিনি।"আমি মরে যাবো,আমি মরে যাবো" বলে চিৎকার শুরু করলো। মজার ব্যাপার হচ্ছে ওর ভয় আর কান্না দেখে আমার ভয়টা একটু কমে গেলো।
তারপর রোলার কোস্টার থেকে নেমে বললাম
-" আজকে বুঝলাম তোমার ফ্যামিলি কেন তোমাকে এইসবে চড়তে দেয় না,আরও চড়বা রোলার কোস্টারে? "
আমি আর একটা কথা বললেই আবার কেদেঁ দিবে, এমন একটা অবস্থা। তাই হাসিমুখে বললাম-
-চলো, তোমাকে ফুচকা খাওয়াবো।
এভাবেই ওর সাথে দেখা হতো,কথা হতো,সবকিছু ভালোভাবেই চলতে লাগলো।আমার জীবনটাও ততদিনে অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছি।
অতঃপর পহেলা বৈশাখে আমাকে আমার প্রতি ওর ভালোবাসার কথা জানায়।
ও অনেক ভালো একটা মেয়ে। আর ও আমাকে সত্যিকারেই ভালোবাসতো। আর সত্যিকারে ভালোবাসতো বলেই ওকে আমি ঠকাতে চাই নি। সুমাকে আমি তখনো ভুলতে পারি নি, কখনো ভুলতে পারবো বলে মনেও হয়নি।
ফিরিয়ে দিলাম,..
কোনরকম অভিযোগ না করেই ও চলে গেল।
অনেক কষ্ট পেয়েছিলো, তাই হয়তো আর কখনো যোগাযোগ করে নি।
প্রায় তিন বছর পর আজকে আবার দেখা। ফুচকা খেতে খেতে এই তিন বছরের অনেক গল্প করলো । স্বামী সংসার নিয়ে বেশ ভালোই আছে সে। শেষে খানিক কুশলাদি করে বিদায় নিলো। যাবার সময় ওর চোখের কোনে একফোটা জল এসেছিলো হয়তো,কিংবা সেটা কেবলই আমার দেখার ভুল।
জীবন থেমে থাকে না, হয়তো ক্ষনিকের জন্য আমরাই থেমে যাই, তারপর আবার চলতে শুরু করি।
সুমাকে কি আমি এখনো ভুলতে পেরেছি !!! হয়তো পারিনি।
বাসন্তীর সাথে কি এটাই আমার শেষ দেখা!!!
নাকি আবার কখনো দেখা হবে,
কোন এক বেলাশেষে.....।?