29/03/2024
বাংলাদেশের পিডিবির মাঠ পর্যায়ের বিতরণ চাকুরির মতো এত চ্যালেঞ্জিং ইঞ্জিনিয়ারিং জব খুব কম ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরেই করে। মাঠ পর্যায়ে নিজের প্রথম বছরটা আর পরের প্রায় চার বছর এনার্জি অডিটে থেকে নিজ অধিক্ষেত্রের বৃহত্তর ময়মনসিংহের পিডিবির ৩২ টা অফিসকে খুব কাছ থেকে দেখার বদৌলতে অনেকটাই বলতে পারি।
যে মাসে আমি পিডিবিতে জয়েন করি সেই সপ্তাহেও আমি জানতাম বিদ্যুৎ ইচ্ছা করেই অফিস থেকে নিয়ে যায়, হালকা বাতাস হলেই বন্ধ করে দেয়, সারাদিন এরা খালি মই নিয়ে ঘুরে। জয়েন করার চতুর্থ দিনের মাথায় কালবৈশাখী ঝড় হয়। অনেক কয়টা ইউক্যালিপটাস গাছ ভাঙ্গে আর সাথে আমার এসব মোহ।
একটা বিভাগ চলছে প্রায় ৭০% কাজে অনিচ্ছুক, নিয়ন্ত্রণহীন লোকবল নিয়ে। এরই মাঝে কিছু কর্মচারী আছেন যাদের কাজের শক্তি, পরিমাণ আর দক্ষতা অবাক করার মতো। এই কিছু লোকবল নিয়েই অফিসাররা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
কারেন্ট ইচ্ছা করে অফ রাখবে তো দূরের কথা শিডিউল লোডশেডিং ছাড়া একজন দপ্তরপ্রধান বা ফোকাল কর্মকর্তা বিদ্যুতের লাইন অফ থাকলে তার ফোনে যে পেইনটা খায় এইটা বাইরের একটা মানুষ একদিন পেলে দ্বিতীয় দিন আর প্রশ্ন করতো না।
এমনও এলাকা আছে যেখানে ২০-৩০ কিলোমিটার সোর্স লাইন যেখানে একটা গাছ আঘাত করলেই পুরো এলাকা অন্ধকার - এই বাস্তবতায় যে লেভেলের বিদ্যুৎ সেবা দেয় সেটা এর ভেতরে না থাকলে বোঝা যায় না। একজন গ্রেড-৫ নির্বাহী প্রকৌশলী মোটরসাইকেলের পিছে উঠে, হেটে সেচ দেখতে যায় প্রত্যন্ত এলাকায়, লাইনের অবস্থা দেখতে- এটা কোন অবাক করা দৃশ্য না এখানে।
বিদ্যুৎ বিভাগকে কয়েকটা কাজ করতে হয় একসাথে। ওয়াইফাই আসার আগে মানুষ বিদ্যুৎ ছাড়া আধাঘন্টা থাকতে পারতো কিন্তু ওয়াইফাই আসার পর মানুষ বিদ্যুৎ ছাড়া দশ মিনিট অপেক্ষা করতে রাজি না। এই বাস্তবতা অন্য কোন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নেই। এই সার্ভিস পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলে মেনে নেয়া যেত। এর সাথে রাজস্ব আদায়ের যৌক্তিকভাবে অসম্ভব টার্গেট। সিডনি, নিউইয়র্কের মতো শহরের চেয়ে কম সিস্টেম লস টার্গেটে কাজ করে মফস্বলের অনেক দপ্তর! নাম নিতে চাই না দেশের অনেক রাজস্ব-বকেয়া ঋণ আদায়কারী সংস্থার লোকজনের মাঠে নামার ঘটনা প্রায় বিরল হলেও বিদ্যুতের ৯০% এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার-সাব এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার এর দিনের প্রথম হাফটা কাটে মাঠে রাজস্ব আদায়ে। এরই মাঝে কেউ এসে যদি দেখে অফিসার অফিসে নাই, তাইলে আমার চাকরি আগের ধারণার মতো সুন্দর করে বলে দেবে - এরা হুদাই অফিস করে না কিচ্ছু না।
পিডিবিতে কিছু স্টাফ বা অফিসার আছেন যারা লাখ টাকার প্যানেল, ব্রেকার নরমাল ইকুইপমেন্ট ওয়েল্ডিং করে, জোড়া-টোড়া দিয়ে ঠিক করে ফেলে নিজের তাগিদেই। ধরা যাক, ২০-২৫ লাখ টাকার নষ্ট ইকুপমেন্ট হয়তো দুই তিন হাজার টাকার নরমাল জিনিস ইউজ করে ঠিক করে ফেললো। এমন ঘটনা অহরহ দেখেছি। এই কৃতিত্বগুলো আলোর মুখ দেখেনা। অপব্যয়ই যেখানে দেশে সাধারণ ঘটনা সেখানে একটা বিভাগে এগুলো প্রতিনিয়ত হচ্ছে যেগুলো অনেকে জানেই না।
তারপরেও এটা পুরোটাই থ্যাংকলেস জব। এটা সমস্যার কিছু না, রাষ্ট্রীয় সেবার বিনিময়ে বেতন পাই, ধন্যবাদ দেয়ার বিধান নাই। কিন্তু সমস্যা অন্যত্র - কোন সেফটি নাই। কপালে থাকলে কোন প্রভাবশালী লোকের লাঞ্চনার শিকার হতে পারেন। মৌখিক লাঞ্চনা হলে কপাল ভালো। শারীরিক হলে দুই দিকে ক্ষতি। খুব সন্তর্পণে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ আপনাকে চেক এন্ড ব্যালান্স করতে পারেন না বলে এহেন আচরণের শিকার বলে দ্বিতীয় লাঞ্চনাটা সেরে নেবেন। হয়তো আইইবি/আইডিইবি থেকে স্মারকলিপি নিয়ে প্রতিবাদী প্রকৌশলীগোষ্ঠী রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে। অটোরিকশা দিয়ে যাওয়ার সময় লোকজন দাত কেলিয়ে কেলিয়ে যাবে - "বেশ করেছে, এদের মাইর দেয়াই উচিত" টাইপ হাসি দিয়ে। যে লাঞ্চনার শিকার হয় তার ফলাফল শূণ্য। এত সব কিছুর পরও সেই অফিসার পরের সপ্তাহেই আবার একই কাজে বের হবে।
উন্নত বিদ্যুৎ চাইবে কিন্তু লোকজন তার বাসায় সামনে খুটি বসাতে দেবে না। গ্রামের লোকটা খুটি বসাতে দেবে তার আবর্জনার (পড়ুন টাট্টি) সাথে যেখানে মই রাখাই দায়। যার ক্ষেতের উপর দিয়ে লাইন যায় সে এই জায়গা তো আমার গেলই - ভেবে সুপারিগাছ, ইউক্যালিপটাস গাছ লাগায়া দেয় ভ্যালু এড করতে। এই গাছই বড় হয়ে লাইন ট্রিপ করায় বাতাসে। রুটিন মাফিক ডাল কাটতে গেলে আবার বৃক্ষপ্রেম জেগে যায় সবার।
তার পরেও আমাদের অনিয়ম আছে। আত্মশুদ্ধির প্রচুর সুযোগ আছে। কিন্তু বাইরে থেকে যা দেখা যায় অতটা সহজ না।
দুনিয়ার সকল কাজ বাইরে থেকে সুন্দর। শুধু সুন্দর না, সহজও। সবাই পারে। আমিও পারতাম তবে চাকরিতে জয়েন করার আগে! দশটা গরু থেকে বিশ লিটার দুধ দোয়ানো সহজ কিন্তু ষাটটা ষাড় থেকে দুই লিটার দুধ দোয়ানোর কাজটা সহজ না...........
কার্টেসি: কৌশিক ভদ্র
সহকারী প্রকৌশলী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।