15/08/2026
মালিবাগের চার শহীদ: তোমাদের রক্তই চূড়ান্ত বিপ্লবের প্রেরণা।
জিয়াউল আশরাফ
আমরা তোমাদের ভুলে যাইনি। ভুলে যাইনি সেদিনের ভয়াবহ দিনের কথা। চারদিকে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। বুলেটের বিকট আওয়াজ। আর আমরা ছিলাম নিরস্ত্র। ওদের ছুঁড়ে মারা ইট-পাথরগুলোই আমাদের সম্বল। ওরা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এমন হায়েনার রুপ নেবে আমরা ভাবতেও পারিনি। আমাদের আয়োজন তো ছিলো শুধু প্রতিবাদ জানানো। আল্লাহর ঘর মসজিদ রক্ষার জন্য সমেবেত হওয়া। কাউকে আঘাত করা নয়। কিন্তু, কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওরা উন্মত্তপাগল হলো। সম্পদের লোভে মসজিদের জায়গা দখলের জন্য বেপরোয়া, সমাজে প্রতিনিয়ত মুখ দেখা মানুষগুলো হলো সন্ত্রাসি, খুনি। ওদের মানসিকতা হলো নাস্তিকতার সরস জমি। উন্মোচিত হলো ওদের মুখোশ। ইসলামী ভাবধারার ছদ্মাবরণে মুসলিম উম্মাহকে ওরা দেখিয়ে দিলো বৃদ্ধাংগুলি। মানুষ নয় যেন কিছু পশুর অভয়ারণ্য ছিলো দেয়ালের পশ্চিম পাশে। ওরা ছিলো ক্ষুধার্ত, রক্তের জন্য পিপাসিত। ওরা বুঝেনি রক্ত কতটা লাল হতে পারে...
আমি বদর দেখিনি! বদরের সেই ঈমান নেই আমাদের মাঝে! বদর, উহুদ, খায়বার বা খন্দকের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ইতিহাস শুধু জানা ছিলো। অনেকবার কল্পনা করেছি, চোখ বন্ধ করে যেতে চেয়েছি মদিনায়। কিন্তু না! দেখলাম ঈমানের ডানা ততটা শক্ত নয়। অবুঝ শিশুর মনের পাখাগুলো শুধু উড়তে জানে কিন্তু ঠিকানা জানে না। আনচান করে মন! কেবলই যেন কানের কাছে বাতাস এসে ফিস ফিস করে বলে যায় বন্ধু জেগে উঠো বদরের চেতনায়। দেখ! দেখ! জাহিলিয়াতের পাপাচারে আজ ডুবে যায় ঈমানের সাম্পান। তবুও কেন যেন আমরা জাগতে পারি না। কেন যেন হারিয়ে গেছে ঈমানের তেজ, শক্তি। হৃদয় বলে না আমি মুসলিম, আমি অপরাজেয়, আমি দুর্ভেদ্য সীসাঢালা প্রাচীর। আমি বদরের তরোবারি, খন্দকের খাল, খায়বারের ঝড়। যখন হৃদয় মরচে ধরে গেলো! কমে গেলো ঈমানের তেজ ঠিক তখনি বদরের শক্তি নিয়ে, ঈমানের বলে বলিয়ান হয়ে হাজির হতে হলো বায়তুল আজিম (শহীদি) মসজিদ রক্ষার আন্দোলনে। বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে পান করতে হলো শাহাদাতের অমিয় শুধা। বিশ্ববাসী দেখেছে মুসলিমের ঈমান, বিশ্বাস। তারুণ্যের চেতনা।
শহীদ রেজাউল করীম ঢালী, শহীদ হাফেজ আবুল বাশার, শহীদ ইয়াহইয়া, শহীদ জয়নাল আবেদীন। আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তারা চির ভাস্বর, চির স্মরণীয়। এক মুক্তির নাম, এক বিশ্বাসের নাম। চেতনার আকাশে ঈমানের স্ফূলিঙ্গ জ্বালানোর এক অসীম শক্তি। জান্নাতের ফুটন্ত গোলাপ। ঈমানের যজবা। নতুন বদরের নতুন উপমা। তোমাদের সাথে আমিও ছিলাম! তোমাদের সাথে আমিও ছিলাম! তোমাদের সাথে আমিও ছিলাম! কিন্তু দয়ময় মহান প্রভু তোমাদেরকে খুব বেশি ভালোবেসেছিলেন তাই জান্নাতের ফুলেল বিছানায় তোমাদের বিচরণ। তোমরা কি ঘুরে বেড়াও পাখা মেলে, জান্নাতের বাগান জুড়ে। আহ্! তোমরা কত ভাগ্যবান, তোমরা কত সুখি! শহীদ, শহীদ, শহীদ! তোমরা তো শহীদ। লক্ষ কোটি শহীদানের সাথে জেগে উঠবে হাশর মাঠে। রহমতের ছায়ায় থাকবে তোমরা। মুলাকাত করবে বদরের শহীদানের সাথে। সায়্যেদুস শুহাদা আমিরে হামজার সাথে। হ্যাঁ বন্ধু! তোমরাই সফল যারা জীবন দিয়েছ সত্যের জন্য, ইসলামের জন্য। তথা আল্লাহর রাহে...
মালিবাগ বাইতুল আজীম মসজিদ। তখনো শহীদি মসজিদ হয়নি। ছোট্ট একটি মসজিদ। রাস্তার সাথে। হাজার হাজার মানুষের প্রিয় মসজিদ। সুরেলা কণ্ঠে আজান হয়। নামাজ পড়া হয়। আশপাশের লোকজনের মসজিদে আসার রাস্তা একটিই। হঠাৎ করেই তাতে তোলে দেয়া হলো দেয়াল। মসজিদ বন্ধ। সেখানে হবে মাকের্ট। কত নিমর্ম, কত পৈশাচিক, যেন ইসরাঈলের দোসর। কিন্তু ঈমান! যাদের অন্তরে ঈমান আছে এমন মুসলিম কি তা মেনে নিতে পারে। পারে না। তাই আমরা নেমে এসেছিলাম রাজপথে। আর ওরা ছিলো দেয়ালের ওপারে। মালিবাগের রেলগেটের যে ডি আই টি রোড তাতেই ছিলো আমাদের অবস্থান। মালিবাগ জামিয়া শারইয়্যাহ, চৌধুরীপাড়ার শেখ জনূরুদ্দীন রহ. দারুল কুরআন মাদরাসার ছাত্রসহ এলাকার মুজাহিদ ভায়েরা উপস্থিত। কিন্তু শান্তিপূর্ণ মিছিলে তৌফিকগংদের গুলিবর্ষণ ছিলো নিতান্তই অনাকাঙ্খিত।
শাঁ শাঁ করে ছুটে আসতে থাকলো গুলি। প্রকম্পিত আকাশ বাতাস। মুহূর্তেই থেমে গেলো, নিস্তব্ধ হলো প্রকৃতির খেলা। তখনো শ্লোগান হচ্ছে আমাদের দাবী একটাই মসজিদের গেট খুলে দাও। আমার পাশে শ্লোগানরত রেজাউল করীম ততক্ষণে ঢলে পড়েছে রাস্তায়। হায়েনার বুলেট ঝাঁঝরা করে দিয়েছে ওর বুক। রক্তাক্ত রাজপথ। আমরা ওকে নিয়ে গেলাম পাশের একটি ক্লিনিকে। তারপর কি হলো আমরা কিছুই জানি না। একটু পরেই শুনতে পেলাম আবুল বাশার, ইয়াহইয়া ও জয়নাল আবেদিনের শাহাদাতের সংবাদ।
তখনো রাস্তার কংক্রিটে রক্তেরদাগ। শেষ হয়ে যায়নি হাতে লাগা শহীদের রক্তের গন্ধটুকু। যখন দ্বিতীয় শ্লোগানের জন্য মুষ্ঠিবদ্ধ হচ্ছে হাত। জেগে উঠছে তরুণ, যুবক, বয়বৃদ্ধ মুসলিম। বিচারের দাবীতে, শহীদের রক্তের বদলা নিতে। তারুণ্য চেতনা যখন বদরের হাতিয়ারের রুপ নিতে যাচ্ছে তখনি আমরা শুনলাম পর্দার আড়ালের দরবার শেষ। আপোষরফা হয়ে গেছে ম্যাডামের সাথে। ঈমান নয় ম্যাডামের আঁচলটাই যাদের প্রিয়। আমরা বাকরুদ্ধ, হতব্বিহবল। আমাদের থামিয়ে দেয়া হলো। তারপর কাকডাকা ভোরে শহীদানের লাশ চলে গেলো ঢাকার বাইরে। যার যার গ্রামের বাড়িতে। আহ! কতটা নিচে নামতে পারেন আপনারা। আমরা দেখেছি, দেখেছে এ জাতি! কংক্রিটের পাথরগুলো কেঁদেছে, কেঁদেছে আকাশ বাতাস। আর আপনারা সংগ্রাম করেছেন জেগে উঠা ঈমানকে দাফন করার জন্য।
সবাই ভুলে যাক। যেতে পারে। কিন্তু তোমরা ভুলে যেতে পারো না। তোমরা যারা তারুণ্য দ্বীপ্ত দূরন্ত কাফেলার সাথি। ইশা ছাত্র আন্দোলনের সদস্য, কর্মী, মুবাল্লিগ। কারণ একাফেলার জন্মই হলো- হয় শাহাদাত নয়তো ইসলামী হুকুমাত। শহীদি তামান্না নিয়ে যাদের জন্ম, যাদের কাজ, যারা জেগে উঠে, যারা পথ চলে! তারা কি ভুলে যেতে পারে শহীদদেরকে? আজ কতবছর পরেও তোমরা মনে রেখেছ প্রিয় শহীদদের। যারা তোমাদের প্রেরণা, আগামীর শক্তি। তাঁদের মনে রেখ, শক্তি পাবে প্রতিটি সংকটে, সংগ্রামে। তাঁদের দেখানো পথেই বিজয় আসবে চূড়ান্ত লাড়াইয়ে।
আজও পেছনে তাকিয়ে দেখি সেই ১৫ আগস্ট ২০০২। আর সব দিনের মতই একটি দিন ছিলো। আমি চৌধুরীপড়া মাদরাসার ছাত্র। পড়ি মিজান জামাতে। হটাৎই শুনলাম বাইতুল আজিম মসজিদের গেট বন্ধ। এর প্রতিবাদে মিটিং হবে। শহীদ আল্লামা ইসহাক ফরীদি রহ. তখন মুহতামিম। হুজুর নির্দেশ দিয়েছেন বড়দের যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি ছিলাম খুব ছোট। তবুও সব হুজুরদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে গেলাম বড়দের সাথে। সব কিছু স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই ক্ষমতার দাপটে বি এন পি নেতা তৌফিক গংদের গুণ্ডাবাহীনি আমাদের উপর বুলেট চালায়। চার শহীদের বিনিময়ে আমরা শুধু পেয়েছি একটি মসজিদ। না ভুল বললাম! কেননা মসজিদ তো আমাদেরই ছিলো, বলা যায় মসজিদে নামাজ পড়ার অধিকার পেয়েছি। তখন ক্ষমতায় চার দলীয়জোট। ইসলামী মূল্যবোধের সরকার। আফসোস! আফসোস! আফসোস। থাক আফসোস করে লাভ নেই। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে কাংখিত মাঞ্জিলের দিকে। চুড়ান্ত সফলতার জন্য।
প্রকাশ- ছাত্র সমাচার (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর ২০১৫) সংখ্যা