14/08/2026
আজকের এই দিনে ইসলামী শিক্ষাকে জাতীয় শিক্ষানীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র জনপ্রিয় ছাত্রনেতা আব্দুল মালেক ভাই সন্ত্রাসীদের হাতে ১৯৬৯ সালের ১২ আগষ্ট আহত হয়ে ১৫ আগষ্ট শাহাদাত বরণ করেন।
একজন মানুষ এ ভূবনে স্ব-মহিমায়,জ্ঞানে,ধ্যানে,চিন্তা-চেতনায় কত উজ্জ্বল ভাস্বর হতে পারে শহীদ আব্দুল মালেক তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে অনাগত পৃথিবীর কাছে। একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো শিক্ষা,সেই ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রনায়ক,বীর সেনানী শহীদ আব্দুল মালেক। একটি উন্নত নৈতিক চরিত্র সম্পন্ন যুব -ছাত্রসমাজ ছাড়া একটি জাতির এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। এরাই জাতির মূল চালিকা শক্তি। শহীদ আব্দুল মালেক সেটি উপলব্ধি করেছেন বলেই তিনি শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তনের ভিত্তি আবিস্কার করেছেন,সে লড়াইয়ে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজের প্রাণ। এদেশ ঋণী হয়ে থাকবে শহীদ আব্দুল মালেকের আত্নার কাছে যুগের পর শতাব্দীর পর শতাব্দী। বিশেষ করে আজকের আধুনিকতার নামে নব্য জাহিলিয়াতের যাতাকলে পিষ্ট তরুণ প্রজন্মকে শহীদ আব্দুল মালেক দিয়েছেন এক অনন্য পথের দিশা। তাই আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে শহীদ আব্দুল মালেক একটি প্রেরণা,একটি বিশ্বাস, একটি আন্দোলন,একটি ইতিহাস,একটি মাইলস্টোন। শহীদ আব্দুল মালেককে হত্যা করে ইসলামী আদর্শকে স্তদ্ধ করা যায়নি। বরং এক মালেকের রক্ত বাংলার ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে ছড়িয়ে একটি আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। লক্ষ-কোটি মালেক আজ একই আদর্শের ছায়াতলে সমবেত। সুতরাং শহীদ আব্দুল মালেকের খুনীরা আজ অভিশপ্ত, ঘৃণিত এবং পরাজিত। জাতি তাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে।
মূলত ইংরেজরা সুকৌশলে চিন্তার বিভ্রান্তি ও বিভাজন সৃষ্টির জন্যই সাধারণ শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষা এই দুই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে গিয়েছিল। স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়কে মাস্টার এবং ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মাদরাসা থেকে মোল্লা তৈরির একটি ব্যবস্থা ইংরেজ সরকার প্রবর্তন করেন। লক্ষ্য ছিল জাতির উন্নতি অগ্রগতির মূল স্রোত থেকে মুসলমানদের আলাদা রাখা। অথচ আজাদী লাভের পর পরই প্রয়োজন ছিল দুই বিপরীত ধর্মী শিক্ষা ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি বহুমুখী সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা। সরকারি এই ভ্রান্তনীতির কারণেই শিক্ষা সংস্কারের বিষয়টি একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। পাকিস্তান আমল থেকেই অনেকগুলো কমিশন গঠিত হয়। এসব শিক্ষা কমিশনের কোনো রিপোর্টে জাতীয় আদর্শ ইসলামের প্রতিফলন ঘটেনি। পক্ষান্তরে সেক্যুলার,নাস্তিক্যবাদী ও ধর্মবিমুখ সমাজতন্ত্রীরা মুসলিম জাতিসত্তার বিলোপ সাধন করে সেক্যুলারিজম বা ধর্মহীনতা চাপিয়ে দেয়ার জন্য সর্বাত্নক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যে ষড়যন্ত্র এখনো অব্যাহত। আজকের মতো সে সময়েও রাম-বাম আর সেক্যুলারিস্ট বুদ্ধিজীবীরা ইসলাম ধর্ম আর মুসলমানদের বিরোধিতা একটি কর্মসূচিতে পরিণত হয়। তা স্পষ্ট হয় ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেন তখন। এই ঘোষণা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মুসলমানরা শিক্ষিত হয়ে উঠলে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবে,তখন আর তাদের সেবাদাস করে রাখা যাবে না। এই ভয়ে রবীন্দ্রনাথের মতো মনীষী পর্যন্ত এর বিরোধিতা করেন। ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতায় গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে তারা সভা করলো। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং বিশ্বকবি। তার মুসলমান প্রজারা শিক্ষিত হয়ে উঠলে জমিদারের শাসন ও শোষণ চালানো হয়ত বাধাগ্রস্ত হবে,এই ভয়ে তিনি চাননি মুসলমানরা শিক্ষিত হয়ে উঠুক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে হিন্দু সংবাদপত্রগুলো বিষোদগার করতে থাকে। বাবু গিরীশচন্দ্র ব্যানার্জী,ড. স্যার রাম বিহারী ঘোষ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোশ মুখার্জীর নেতৃত্বে বাংলার এলিটগণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ১৮ বার স্মারকলিপি সহকারে তদানীন্তন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। বড়লাটের কাছে এই বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন করলেন যে,পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ অধিকাংশই কৃষক। অতএব,বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করলে তাদের কোনো উপকার হবে না। ঢাকার হিন্দুরা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করতে লাগলেন। ‘এ হিস্ট্রি অব ফ্রীডম মুভমেন্ট’গ্রন্থে তারই উল্লেখ আছে।
কিন্তু সকল যড়যন্ত্র আর বিরোধিতা ছাপিয়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,আর ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রপথিক এখন শহীদ আব্দুল মালেক। সুতরাং শহীদ আব্দুল মালেক আজ একটি সফল আন্দোলনের নাম। একটি প্রেরণার বাতিঘর। যে ঘরে আশ্রয় নেয়া তরুণ-যুবক, বৃদ্ধ-বনিতা সবার উপলদ্ধি আর শূন্যতা যেখানে, শহীদ আবদুল মালেক ১৯৬৯ এর ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপা আয়োজিত মুক্ত আলোচনা সভায় Milton প্রদত্ত শিক্ষার সংজ্ঞাটির বিশ্লেষণ করেছেন ঠিক এভাবেই- ‘Harmonious development of body, mind and soul কখনো কোনো আদর্শের ভিত্তি ছাড়া হতে পারে না।’ এই উচ্চারণ এখন জাতীয় শ্লোগানে পরিণত হয়েছে। সেই কালজয়ী শ্বাসত বিধান আল-ইসলাম। সেরা দায়ীর উজ্জ্বল নজির স্থাপন করেছেন শহীদ আব্দুল মালেক। আজকের আধুনিক পৃথিবী এ কথাই প্রমাণ করছে যে মানুষের শান্তির জন্য প্রধান হুমকি অনুন্নয়ন ও দরিদ্রতাই নয় বরং অনৈতিকতাও একটি বড় সমস্যা। Morality, Manner বা Ethics.আর সেই জিনিস মানুষের মধ্যে কেবলমাত্র জাগ্রত করতে পারে ইসলামী শিক্ষা। পশ্চিমারা তার গগণচুম্বী উন্নতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দূরতিক্রম্য অগ্রযাত্রা সত্ত্বেও মানবিকতার এক করুণ সঙ্কট (Crisis) মোকাবেলা করছে। Education does not necessary mean mare acquisition of Degrees and Diplomas. It emphasizes he need for acquisition of knowledge to life a worthy life. শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র কিছু ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা অর্জন নয় বরং সম্মানজক জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন।’
আমরা শিক্ষাব্যবস্থাকে ধর্ম ও নৈতিকতাবিহীন একটি কারখানায় পরিণত করেছি। ধর্মবোধ তথা স্রষ্টার প্রতি আনুগত্যই মানুষকে দায়িত্ববোধ সম্পন্ন,কর্তব্যনিষ্ঠ,ন্যায়পরায়ণ,সৎকর্মশীল,জবাবদিহিতা ও বিনীয় হতে শেখায়। বিখ্যাত মনীষী Sir Stanely Hull -এর মতে, ‘If you teach your children three R’s : Reading, Writing and Arithmetic and leave the fourth ‘R’ : Religion, then you will get a fifth ‘R’ : Rascality.’ অর্থাৎ ‘যদি আপনি আপনার শিশুকে শুধু তিনটি ‘R’ (Reading, Writing, Arithmetic) তথা পঠন,লিখন ও গণিতই শেখান কিন্তু চতুর্থ ‘R’ (Religion) তথা ধর্ম না শেখান তাহলে এর মাধ্যমে আপনি একটি পঞ্চম ‘R’ (Rascality) তথা নিরেট অপদার্থই পাবেন।
আলবার্ট সিজার তার Teaching of Reference of or Life গ্রন্থে শিক্ষা সংক্রান্ত আলোচনা রাখতে গিয়ে বলেছেন, ‘Three kinds of progress are significant. These are progress in knowledge and technology, progress in socialization of man and progress in spirituality. The last one is the most important’.তার ভাষায় ‘আধ্যাত্মিকতার বিকাশই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’তাহলে আমরা সামগ্রিকভাবে বলতে পারি যে,শিক্ষার ল্য হচ্ছে আমাদের আত্মার বিকাশ,আধ্যাত্মিকতার বিকাশ,মানসিক বিকাশ। শিক্ষা মানুষকে মনুষ্যত্ব দান করে,মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে,চরম সভ্যতায় উন্নীত করে,পরম আলোকে পৌঁছে দেয়। শহীদ মালেক সেদিন ক্ষুরধার তথ্য ও যুক্তিপূর্ণ উপায়ে ইসলামী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।