10/08/2026
রামপুর হাই স্কুলের ফলাফল: আমরা কি সত্যিই চিন্তিত?
এবার রামপুর হাই স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেখে সত্যিই হতাশ হতে হয়। পাশের হার মাত্র ২২.৫%। একটি প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এই ফলাফল নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং আমাদের সবার জন্যই আত্মসমালোচনার বিষয়।
সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, এই বৃহত্তর রামপুর থেকেই সময়ের পরিক্রমায় অনেক মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষ তৈরি হয়েছেন। এই এলাকার মানুষের মেধা ও সক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তাহলে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই আসে, আমাদের নিজেদের এলাকার একটি স্কুলের শিক্ষার মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে কেন?
রামপুর হাই স্কুলকে ঘিরে রাজনীতির কোনো কমতি নেই। কিন্তু সেই রাজনীতি যদি হতো শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রতিযোগিতা, কে বেশি ভালো শিক্ষক আনতে পারে, কে ভালো ফলাফল করতে পারে, কে শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারে, কে স্কুলকে আরও এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে হয়তো আমরা আনন্দের সঙ্গে সেই প্রতিযোগিতা দেখতাম।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বছরের পর বছর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষ দায়িত্ব পেয়েছেন। কমিটি হয়েছে, নেতৃত্ব এসেছে, পরিবর্তনের কথা হয়েছে। অথচ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। তাহলে এখন সময় এসেছে দোষারোপ না করে নিজেদের কাছে কিছু কঠিন প্রশ্ন করার।
আরেকটি বিষয় আমাকে আরও বেশি ভাবায়।
আমাদের বৃহত্তর রামপুরে অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষ আছেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত মানুষ আছেন। আমাদের সাবেক শিক্ষার্থী সমাজও নিশ্চয়ই ছোট নয়। কিন্তু নিজেদের শিকড়ের প্রতি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা কি কেবল বছরে একবার ইফতার পার্টি আয়োজন, মিলনমেলা কিংবা স্কুলে চাঁদা তুলে কয়েকটি ফ্যান-লাইট কিনে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
ফ্যান-লাইট অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একটি স্কুলের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ভালো শিক্ষক, নিয়মিত ক্লাস, শিক্ষার্থীদের প্রতি নজরদারি, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, মেধাবীদের বিকাশের সুযোগ, আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা।
আমরা যদি সত্যিই রামপুর হাই স্কুলকে ভালোবাসি, তাহলে এখন শুধু কে কমিটিতে থাকবেন, কে সভাপতি হবেন, কে কার লোক, কে কোন পক্ষের, এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময় নয়।
এখন প্রতিযোগিতা হোক ফলাফল নিয়ে।
প্রতিযোগিতা হোক শিক্ষার মান নিয়ে।
প্রতিযোগিতা হোক মেধা তৈরির ক্ষেত্রে।
প্রতিযোগিতা হোক আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে।
একটি স্কুলের ফলাফল শুধু শিক্ষকদের ব্যর্থতা নয়, এটি সেই স্কুলের ব্যবস্থাপনা, অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
২২.৫% পাশের হারকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এই ফলাফল নিয়ে আমাদের আবেগ নয়, পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ দরকার।
আমাদের মধ্যে যারা সামর্থ্যবান, যারা উচ্চশিক্ষিত, যারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত, তাদের কাছে অনুরোধ থাকবে, বছরে একদিন ইফতার বা একটি অনুদানের বাইরে এসে নিজেদের স্কুলের জন্য সময় দিন, পরামর্শ দিন, একটি কার্যকর শিক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করতে সহযোগিতা করুন এবং প্রয়োজনে জবাবদিহি দাবি করুন।
কারণ একটা কথা মনে রাখা দরকার,
আমরা হয়তো রামপুর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যেতে পারি, কিন্তু আমাদের শিকড় রামপুরেই। আর সেই শিকড়ের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি পিছিয়ে পড়ে, তাহলে শুধু স্কুল নয়, পিছিয়ে পড়বে আমাদের পুরো সমাজ।
এখনই সময় রামপুর হাই স্কুলকে নিয়ে নতুন করে ভাবার।
রাজনীতির নয়, শিক্ষার প্রতিযোগিতা শুরু হোক।