05/08/2026
শান্তির আহ্বান
কোনো গ্রামের প্রকৃত পরিচয় তার ঘরবাড়ি, রাস্তা, বাজার কিংবা ভূসম্পদের প্রাচুর্যে নয়; তার সত্যিকার পরিচয় নিহিত থাকে মানুষের হৃদয়ের বন্ধনে। যে জনপদে একজনের আনন্দ সবার আনন্দে রূপ নেয়, একজনের বেদনা সবার হৃদয়কে স্পর্শ করে, বিপদে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায় এবং প্রতিবেশীর সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করা হয়—সেই গ্রামই প্রকৃত অর্থে একটি জীবন্ত পরিবার। মানুষের এই অদৃশ্য আত্মিক বন্ধনই একটি জনপদকে কেবল বসবাসের স্থান নয়; বরং বিশ্বাস, ভালোবাসা, মমতা ও পারস্পরিক আস্থার চিরসবুজ ঠিকানায় পরিণত করে।
আমাদের গ্রামও তেমনই এক সৌভাগ্যবান জনপদ। আমাদের জামে মসজিদ একটিই—যেখানে ধনী-গরিব, ছোট-বড়, প্রভাবশালী কিংবা সাধারণ সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে নিজেদের সমর্পণ করি। আমাদের মাদ্রাসা ও বিদ্যালয় আমাদের সন্তানদের একই আলোয় মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়। আমাদের বাজার শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এটি সৌহার্দ্য, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সম্পর্কেরও মিলনকেন্দ্র। আর আমাদের খেলার মাঠ শিশু-কিশোরদের শেখায় প্রতিযোগিতা, কিন্তু শত্রুতা নয়; জয়ের আনন্দ, কিন্তু পরাজিতকে ঘৃণা নয়; বন্ধুত্ব, বিভেদ নয়।
হয়তো এটাই মহান আল্লাহ তাআলার অপূর্ব প্রজ্ঞার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। আমাদের ইবাদত, শিক্ষা, জীবিকা ও সামাজিক জীবনকে তিনি এমনভাবে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছেন, যেন আমরা কখনো ভুলে না যাই—আমরা একে অপরের আপনজন। একই আকাশের নিচে বেড়ে ওঠা, একই বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া, একই মাটিতে জীবন গড়া এবং একদিন একই মাটির বুকে শায়িত হব—এমন মানুষ কখনো প্রকৃত অর্থে একে অপরের শত্রু হতে পারে না।
তবুও আজ আমাদের প্রিয় গ্রামের আকাশে যেন এক অদৃশ্য উদ্বেগের মেঘ জমতে শুরু করেছে। সামান্য ভুল বোঝাবুঝি, গোষ্ঠীগত উত্তেজনা কিংবা ক্ষণিকের আবেগ—এর যেকোনো একটি স্ফুলিঙ্গ বহু বছরের সম্প্রীতিকে মুহূর্তেই ক্ষতবিক্ষত করে দিতে পারে। একটি সম্পর্ক ভাঙতে সময় লাগে কয়েক মুহূর্ত, কিন্তু সেই ভাঙা বিশ্বাস পুনর্গঠনে লেগে যায় বছরের পর বছর, কখনো কখনো প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাই আমরা অশান্তি চাই না। আমরা এমন এক গ্রামের স্বপ্ন দেখি, যেখানে মানুষের পরিচয় হবে সৌহার্দ্যে, ভ্রাতৃত্বে ও ভালোবাসায়; প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজনে নয়।
হে যুবসমাজ! ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো সংঘাত কখনো কেবল দুই পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি অসংযত বাক্য কিংবা হঠকারী সিদ্ধান্ত মুহূর্তেই শত মানুষের শান্তি কেড়ে নিতে পারে। সহিংসতার আগুন অপরাধী-নিরপরাধ কাউকেই আলাদা করে না; তা পুড়িয়ে দেয় মানুষের স্বপ্ন, সম্পর্ক, নিরাপত্তা এবং আগামী দিনের সম্ভাবনাকে। তাই আবেগকে বিবেকের অধীন করো, রাগকে ধৈর্যের নিয়ন্ত্রণে রাখো এবং সংযমকেই তোমার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত করো। মনে রেখো, প্রকৃত বীর সে-ই, যে নিজের ক্রোধকে জয় করতে পারে; যে প্রতিশোধ নয়, শান্তিকেই বিজয়ী করে।
একবার শুধু তোমার মায়ের মুখের দিকে গভীরভাবে তাকাও। তাঁর সবচেয়ে বড় চাওয়া ধন-সম্পদ, সম্মান কিংবা প্রভাব নয়; তিনি শুধু চান, তাঁর সন্তানেরা সুস্থ, নিরাপদ ও হাসিমুখে ঘরে ফিরে আসুক। তোমার পদধ্বনিতেই তাঁর হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসে, তোমার হাসিতেই তাঁর ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। কিন্তু তুমি যদি সংঘাতের পথে পা বাড়াও, তবে তাঁর প্রতিটি দোয়া উৎকণ্ঠায় কেঁপে উঠবে, প্রতিটি রাত নির্ঘুম হয়ে যাবে। মনে রেখো, পৃথিবীর কোনো প্রতিশোধ, কোনো ক্ষমতার প্রদর্শন কিংবা সাময়িক অহংকার একজন মায়ের একফোঁটা অশ্রুর সমান মূল্যও বহন করে না।
একটিবার তোমার বাবার জীবনসংগ্রামের কথা স্মরণ করো। অগণিত ত্যাগ, পরিশ্রম আর নির্ঘুম রাতের বিনিময়ে তিনি তোমার জন্য একটি সম্মানজনক ভবিষ্যতের স্বপ্ন গড়ে তুলেছেন। নিজের অসংখ্য ইচ্ছা নীরবে বিসর্জন দিয়ে তোমার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন। তোমার সৎ চরিত্রই তাঁর সবচেয়ে বড় গর্ব, আর তোমার শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনই তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের সর্বোত্তম প্রতিদান। তাই এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিও না, যা মুহূর্তের আবেগে তাঁর আজীবনের স্বপ্নকে ভেঙে দিতে পারে।
তোমার ছোট ভাইটির কথাও ভাবো। সে হয়তো এখনও জীবনের জটিলতা বোঝে না, কিন্তু তোমাকেই নিজের প্রথম আদর্শ মনে করে। তোমার আচরণ, কথাবার্তা ও সিদ্ধান্তই তার নীরব শিক্ষা। তুমি যদি ধৈর্য, ক্ষমা ও সংযমকে আপন করে নাও, সেও সেই পথেই চলতে শিখবে। আর তুমি যদি ক্রোধ ও প্রতিশোধকে শক্তি মনে করো, তবে সেই আগুন একদিন তার মনেও ছড়িয়ে পড়বে। তাই শুধু নিজের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্যও শান্তির পথেই অবিচল থাকো।
তোমার ছোট বোনটির কথাও ভুলে যেয়ো না। তার দুটি চোখে জেগে আছে অসংখ্য স্বপ্ন। সে নিরাপদে পড়াশোনা করবে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে এবং পরিবার, সমাজ ও দেশের গর্ব হয়ে উঠবে—এই আশাতেই সবাই দিন গোনে। তোমার দায়িত্বশীল উপস্থিতিই তার নিরাপত্তার আশ্রয়। তাই এমন কোনো কাজ করো না, যা তার মুখের হাসি কেড়ে নেয় বা তার ভবিষ্যতের ওপর ভয়ের ছায়া ফেলে। একজন ভাইয়ের প্রকৃত শক্তি তার ক্রোধে নয়; বরং তার বোনের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা করার মধ্যেই নিহিত।
যদি তুমি বিবাহিত হও, তবে মনে রেখো—ঘরে এমন একজন মানুষ তোমার প্রতীক্ষায় থাকেন, যিনি নিজের জীবন, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ তোমার সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটি শান্ত, নিরাপদ ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ সংসার। সংসারের প্রকৃত সুখ বড় কোনো অর্জনে নয়; বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং একে অপরের পাশে থাকার নিশ্চয়তায়। একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত মুহূর্তেই সেই স্বপ্নকে অশ্রু, শূন্যতা ও অনিশ্চয়তায় ডুবিয়ে দিতে পারে। তাই এমন কোনো পথে পা বাড়িও না, যার মূল্য তোমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে সারাজীবন বহন করতে হয়।
এবার তোমার পরিবারের প্রবীণ মানুষগুলোর কথা ভাবো—দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা বার্ধক্যে উপনীত বাবা-মা। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ তাঁরা তোমাকেই তাঁদের ভরসা, আশ্রয় ও সাহস মনে করেন। তাঁদের সবচেয়ে বড় সম্পদ তোমার ভালো থাকা; সবচেয়ে বড় শান্তি তোমার নিরাপদে ঘরে ফেরা। তাঁরা চান না তুমি কারও ওপর প্রভাব বিস্তার করো; তাঁরা শুধু চান তুমি একজন সৎ, বিনয়ী, শান্তিপ্রিয় ও সম্মানিত মানুষ হিসেবে জীবন কাটাও। মনে রেখো, যে সন্তান তার পরিবারকে নিশ্চিন্ত রাখে, সে-ই প্রকৃত অর্থে সফল। তাই এমন জীবন বেছে নাও, যাতে তোমার কারণে প্রিয়জনের চোখে অশ্রু নয়, গর্ব ও প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে।
প্রিয় স্বজনেরা, প্রতিশোধের আগুন কখনো ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে না; বরং শেষ পর্যন্ত নিজের ঘরকেই দগ্ধ করে। ইতিহাসের শিক্ষা একটাই—অন্যায়ের প্রতিশোধে জন্ম নেওয়া ক্রোধ অনেক সময় নতুন অন্যায়ের পথ তৈরি করে, কিন্তু ক্ষমা মানুষের হৃদয়ে নতুন বিশ্বাসের আলো জ্বালায়। উত্তেজনা সাময়িক শক্তির ভ্রম সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সংযম এমন এক শক্তি, যা পরিবারকে রক্ষা করে, সমাজকে স্থিতিশীল রাখে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। তাই আজ আমাদের প্রয়োজন উসকানির ভাষা নয়, প্রজ্ঞার ভাষা; বিদ্বেষের নয়, সহমর্মিতার; সংঘাতের নয়, সংলাপের।
আসুন, আমরা সবাই একটি দৃঢ় অঙ্গীকার করি—গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে গ্রামের বৃহত্তর কল্যাণকে আপন করে নিই। মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব যেন সৃষ্টি না হয়; মতপার্থক্য থাকলেও সম্পর্ক যেন ভেঙে না যায়। কারণ একটি গ্রামের প্রকৃত শক্তি তার ঐক্যে, বিভক্তিতে নয়; পারস্পরিক বিশ্বাসে, বিরোধে নয়।
একটি গ্রামের সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য তার জমি, দালান কিংবা অর্থ-সম্পদ নয়; তার প্রকৃত সম্পদ মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্প্রীতি। এই অমূল্য ঐতিহ্য পূর্বপুরুষদের প্রজ্ঞা, ত্যাগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের ফসল। তাই এমন কোনো কাজ আমরা করব না, যা এই উত্তরাধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তুলব, যেখানে বিচার হবে ন্যায়ের ভিত্তিতে, মতভেদ মিটবে আলোচনার মাধ্যমে এবং মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হবে তার চরিত্র, সততা ও মানবিকতার আলোকে।
আসুন, আমরা এমন একটি গ্রাম গড়ে তুলি, যেখানে আজানের ধ্বনি মানুষকে একই কাতারে দাঁড় করায়, বিদ্যালয় জ্ঞানের আলো ছড়ায়, খেলার মাঠে প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু শত্রুতা নয়, আর বাজারে লেনদেনের পাশাপাশি আন্তরিকতার হাসিও বিনিময় হবে। প্রতিটি ঘর হবে নিরাপত্তার প্রতীক, প্রতিটি পরিবার ভালোবাসা ও সহযোগিতার আশ্রয়, আর প্রতিটি হৃদয় ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার আলোয় উদ্ভাসিত থাকবে। এটাই হোক আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার।
আসুন, আজ আমরা হাতে হাত রাখি, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয় মিলাই। যে ভুল বোঝাবুঝি আছে, তা আলোচনার মাধ্যমে দূর করি; যে অভিমান আছে, তা ক্ষমার উষ্ণতায় গলিয়ে দিই; যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা ভালোবাসার স্পর্শে মুছে ফেলি। আমরা একই গ্রামের মানুষ, একই ইতিহাসের উত্তরাধিকারী এবং একই ভবিষ্যতের নির্মাতা। আমাদের আগামী প্রজন্ম যেন গর্বের সঙ্গে বলতে পারে—“আমাদের পূর্বপুরুষেরা আমাদের জন্য বিভেদের নয়, ঐক্যের; প্রতিশোধের নয়, ক্ষমার; ঘৃণার নয়, ভালোবাসার উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।”
পরিশেষে মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা—হে পরম করুণাময়! আমাদের গ্রামকে সব ধরনের ফিতনা, বিভেদ, বিদ্বেষ, অন্যায় ও রক্তপাত থেকে হেফাজত করুন। আমাদের অন্তরগুলোকে ভালোবাসা, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, প্রজ্ঞা ও ভ্রাতৃত্ববোধে পরিপূর্ণ করে দিন। আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল রাখুন, পারস্পরিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করুন এবং আমাদের সন্তানদের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সম্প্রীতিময় সমাজ রেখে যাওয়ার তাওফিক দান করুন।
শান্তি, সম্প্রীতি ও ঐক্য হোক আমাদের পথচলার মূলমন্ত্র; ন্যায়, ক্ষমাশীলতা ও মানবিকতাই হোক আমাদের শক্তি; আর এই মহৎ উত্তরাধিকারই আমরা আগামী প্রজন্মের হাতে অর্পণ করে যাই। আল্লাহ তাআলার রহমত ও হেফাজতই আমাদের শান্তি ও নিরাপত্তার সর্বোত্তম অবলম্বন। মহান আল্লাহ তাআলাই আমাদের সর্বোত্তম আশ্রয় ও সাহায্যকারী। আমীন।
মুনীরুল ইসলাম
সভাপতি
পুর্ব জাওয়ার মানব কল্যাণ সংঘটন।