30/06/2026
বোস আইনস্টাইন তত্ত্ব কোয়ান্টাম প্রযুক্তি জগতে বাংলাদেশ জার্মান সহযোগিতাকে উৎসাহ যোগাবে - রাস্ট্রদূত মোহাম্মদ জুলকার নায়েন।
একশত বছরের কিছু আগে (১৯২৪) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক সত্যেন বোস কিছু উপপারমাণবিক কণাকে (subatomic particles) চরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি নিয়ে গেলে এগুলো গতিশীলতা (Loss of kinetic energy) হারাতে পারে -এ বিষয়টি উল্লেখ করে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকে পত্র লেখেন । আইনস্টাইন সত্যেন বোসের সাথে একমত হন এবং পরবর্তীতে তার সাথে যৌথভাবে বোস আইনস্টাইন কনডেনসেট তত্ত্ব প্রবর্তন করেন যাকে পদার্থের পঞ্চম অবস্থা বলা হয়ে থাকে ।
একাত্তর বছর পরে অর্থাৎ ১৯৯৫ সালে বোস আইনস্টাইন কনডেন্সেট তত্ত্বের বাস্তবিক প্রমাণ মেলে । চরম শূন্য তাপমাত্রায় এই উপপারমাণবিক কণা (Sub atomic particles) সুপার কন্ডাক্টিভিটি অর্জন করে যা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মূল চালিকা শক্তি। প্রচলিত কম্পিউটারের শূন্য এবং এক বিটের সিকোয়েন্সের পরিবর্তে কোয়ান্টাম কম্পিউটারে কণা গুলি একই সাথে একাধিক অবস্থায় (Superposition) থেকে অন্যান্য কিউবীটের সাথে যুক্ত হয়ে (Entanglement) অত্যন্ত দ্রুততার সাথে উচ্চ কঠিন গাণিতিক এবং বিশ্লেষণাত্মক সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম ।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর কিছু সীমাবদ্ধতা যেমন অসামঞ্জস্যতা (Decoherence), স্কেলেবিলিটি এবং ভূল সংশোধনের মতো জটিল বিষয়াদির সম্ভাব্য সমাধান অর্জনে বোস আইনস্টাইন কনডেনসেট তত্ত্ব বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত ।এ ছাড়া , এ তত্ত্ব অনুযায়ী বোসন কণাকে পরমশূন্য তাপমাত্রা কাছাকাছি নিয়ে গেলে এগুলো একত্রিত হয়ে একটা সুপার অ্যাটম হিসেবে কাজ করবে এবং এর গঠন শৈলীর কারণে এটি কম জায়গা গ্রহণ করে অর্থাৎ কম কিউবিট প্রয়োজন হয় । স্বাভাবিকভাবে এই সুপার এটম কোয়ান্টাম কম্পিউটারের গতি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
ওষুধ, লজিস্টিক, সাইবার নিরাপত্তা সিমুলেশন সর্বোপরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ।কেননা প্রচলিত প্রযুক্তির তুলনায় এটি অনেক অনেক গুণ (exponential processing power) শক্তিশালী । কোয়ানটাম কম্পিউটিং এখন তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই । বাস্তবের দরজায় কড়া নাড়ছে। ২০১৯ সালের গুগলের Sycamore quantum processor দুই মিনিটের যে গণনা করেছিল তা সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের জন্য ৪৭ বছর প্রয়োজন ছিল । সন্দেহ নেই যে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কল্যাণে বর্তমানে প্রচলিত চিরায়ত উন্নয়ন গতিপথের চেয়ে আগামীর গতিপথ ভিন্নভাবে বিকশিত হবে।
তবে বাস্তবিক সুবিধা ভোগ করবে কোন দেশের এই বিষয়ে কতদূর প্রস্তুতি রয়েছে এবং তা অবশ্য নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রীয় নীতি এবং মানবসম্পদসহ অন্যান্য সম্পদ সমাবেশের সক্ষমতার উপরে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিক পরিমণ্ডলেও কোয়ান্টাম বৈশ্বিক বিভাজনের উপরে উদ্বেগ যথেষ্ট বাড়ছে। বিশ্বের ধনী দেশগুলো অস্বাভাবিকভাবে সুবিধা ভোগ করবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার চালানোর জন্য যে চরম শূন্য তাপমাত্রার (cryogenic atmosphere) প্রয়োজন হয় সেটা অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশেরই নেই। এছাড়া, যথারীতি মানব সম্পদের যথেষ্ট অভাব আছে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটারের উন্নয়নের কাজ বিশ্বব্যাপী জোরেসোরে চলছে । এরই মধ্যে উন্নত বিশ্ব কোয়ান্টাম গবেষণা লক্ষ্য নিয়ে ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে কিভাবে অদূর ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকীকরণ করা সম্ভব সে বিষয়ে এই মুহূর্তে লন্ডনে কনফারেন্স চলছে।
কোয়ান্টাম নীতিমালার আওতায় এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে কোয়ান্টাম শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কোয়ান্টাম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কোয়ান্টাম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইত্যাদি । কোয়ান্টাম বিষয়ক নূন্যতম প্রস্তুতি না থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলো তারা একদিকে যেমন এর সুবিধা ভোগ করতে পারবে না অন্যদিকে তাদের কম্পিউটার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে ।এর ফলে ব্যাংকিং এবং আর্থিক কাজের সমস্ত গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে । কেননা প্রচলিত কম্পিউটারের মাধ্যমে তৈরিকৃত গোপন পাসওয়ার্ড (cryptographic password) এর গাণিতিক ভিত্তিকে (encryption algorithm) অতি সহজেই রিভার্স হ্যাশিং ( Shor’s algorithm reverse hashing) এর মাধ্যমে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ধ্বংস করে দিতে সক্ষম । এজন্য পোস্ট কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং পোস্ট কোয়ান্টাম আলগরিদম এর উপর জোর দেওয়া খুবই জরুরি । কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর চ্যালেঞ্জকে বিবেচনায় না এনে ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশে কোন ডিজিটাল অবকাঠামোর পরিকল্পনা করা উচিত নয় । শিক্ষা কারিকুলাম এর মধ্যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং কোয়ান্টাম সাইন্স অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন ।এর পাশাপাশি জাতীয় কোয়ান্টাম নীতি আবশ্যক ।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর চাকরির বাজার বেশ ভালো। ২০২১ সালের ম্যাককিনজির প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর ক্ষেত্রে যোগ্য আবেদনকারী তুলনায় চাকরির বিজ্ঞাপনের সংখ্যা ৩ গুণ বেশি ছিল এবং এই ব্যবধান আরো বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে। সুতরাং যারা ভবিষ্যতে পেশাগত জীবনের সফলতা এবং সন্তুষ্টি অর্জন করতে চান তারা এখন হতেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন। এ অর্জন খুবই স্বাচ্ছন্দে করা সম্ভব। স্পষ্টভাবে আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস যে পূর্বসূরী সত্যেন বোস এক গৌরবময় অধ্যায় তৈরি করে গেছেন।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং অধ্যয়নের জন্য জার্মানি একটি অন্যতম সেরা গন্তব্য। এখানে ইংরেজি পাঠক্রম, বিশ্বমানের প্রোগ্রাম, প্রায় টিউশন-মুক্ত শিক্ষা (শুধুমাত্র সামান্য সেমিস্টার ফি) এবং ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক সোসাইটি ও ফ্রাউনহফার-গেজেলশাফটের মতো শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে ব্যাপক সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। অন্যান্যদের মধ্যে যেখানে মাস্টার্স এবং পিএইচডি পর্যায়ে অধ্যায়ন ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে:
মিউনিখ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি (TUM): মিউনিখ সেন্টার ফর কোয়ান্টাম সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (MCQST)-এর সহযোগিতায় কোয়ান্টাম সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (QST)-তে একটি গবেষণা-কেন্দ্রিক মাস্টার্স প্রোগ্রাম অফার করে।
Leibniz University Hanover: অত্যন্ত প্রযুক্তিগত এম.এসসি. কোয়ান্টাম ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি যেখানে আণুবীক্ষণিক পদার্থবিদ্যার সাথে ব্যবহারিক প্রযুক্তিগত উন্নয়নের উপর বিশেষ জোর দেয়া হয়।
কোয়ান্টাম ইনিশিয়েটিভ রাইনল্যান্ড-প্যালাটিনেট (QUIP) একটি গবেষণা নেটওয়ার্ক, যা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, সেন্সর, যোগাযোগ এবং সিমুলেশন ক্ষেত্রে মৌলিক বিজ্ঞান থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক প্রয়োগ পর্যন্ত বিস্তৃত।
TU Chemnitz (পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট): এই বিশ্ববিদ্যালয়টি কোয়ান্টাম প্রযুক্তি গবেষণার একটি স্বীকৃত কেন্দ্র। গবেষকরা ঘনীভূত পদার্থবিজ্ঞান, নিম্ন-মাত্রিক সিস্টেম (যেমন গ্রাফিন এবং দ্বি-মাত্রিক পদার্থ), এবং একক-ফোটন উৎস ও কোয়ান্টাম এমিটারের বিকাশের উপর মনোনিবেশ করেন।
TU Braunschweig: ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ কোয়ান্টাম টেকনোলজিস-এ এম.এসসি. ডিগ্রি প্রদান করে, যা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ভৌত এবং ইলেকট্রনিক গঠন উপাদানগুলোর উপর ব্যাপকভাবে আলোকপাত করে।
ডিএলআর কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ইনিশিয়েটিভ (DLR QCI) পরিমাপযোগ্য, ট্র্যাপড-আয়ন কোয়ান্টাম কম্পিউটার নির্মাণের জন্য সক্রিয়ভাবে একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে।
Forschungszentrum Jülich (FZJ) কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম, হার্ডওয়্যার আর্কিটেকচার এবং আপেক্ষিক কোয়ান্টাম তথ্যের একটি উচ্চমানের কেন্দ্র।
QUTAC: কোয়ান্টাম টেকনোলজি অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশন কনসোর্টিয়ামটি জার্মানির প্রধান কর্পোরেশন (যেমন, BASF, BMW, Volkswagen, Siemens) নিয়ে গঠিত, যারা কোয়ান্টাম প্রযুক্তির শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার নিয়ে সক্রিয়ভাবে গবেষণা ও উন্নয়ন করছে।
Baden Wuttemberg: সমন্বিত কোয়ান্টাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কেন্দ্র (IQST) কোয়ান্টাম ফোটোনিক্স এবং জীববিজ্ঞানের উপর জোর দেয়।
STEM বিষয়ভিত্তিক যেমন পদার্থ বিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, তড়িৎ প্রকৌশল ডিগ্রিধারীগণ আবেদন করতে পারেন । যাদের কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর উপরে পড়াশুনা এবং গবেষণা আছে তারা অগ্রাধিকার পেতে পারেন। তবে স্কলারশিপের জন্য সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজার প্রফেসরের সাথে আগে হতেই যোগাযোগ এবং বোঝাপড়া প্রয়োজন ।
সম্প্রতি রাষ্ট্রদূত জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে কোয়ান্টাম গবেষণা এবং শিক্ষার উপর মত বিনিময় করেন । তার কিছু অংশ এখানে আলোকপাত করা হল। এখানে উল্লেখিত শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও আরো প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলোর সাথেও যোগাযোগ করা যেতে পারে।