26/08/2026
আজ ১২ রবিউল আউয়াল। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের পুণ্য স্মৃতিময় দিন।
মহান আল্লাহ প্রেরিত ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন। তাওহিদের মহান বাণী নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন তিনি। প্রচার করেছেন ইসলাম। একইসঙ্গে, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন শান্তির বাণী।
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের একই দিনে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাবা আবদুল্লাহ ও মা আমিনা। জন্মের পূর্বেই মহানবী (সা.) হারান বাবাকে এবং ছয় বছর বয়সে মাতৃহারা হন তিনি। তার জন্মের সময়ে সমগ্র আরব নিমজ্জিত ছিল আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে। অর্থাৎ অজ্ঞতার যুগ, অন্ধকার যুগ কিংবা তমসাচ্ছন্ন যুগ। মহানবীর আগমনের সময়ে চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, হত্যা, ধর্ষন, লুন্ঠনসহ যাবতিয় অনাচার ভরপুর ছিলো সেই সমাজ।
সেই আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সারা বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা:) এমন একজন প্রেরিত রাসুল যিনি অকল্পনীয় সহনশীলতা, ধৈর্য্য শক্তি, চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, শিষ্টাচার, সুমধুর ব্যতিক্রমী ব্যবহার, নিষ্ঠাবান সংগ্রামী জীবন, তার পর্যবেক্ষণ পারদর্শিতা, বিচক্ষণতা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা, নারী অধিকার, মানবাধিকার, রাজনৈতিক মনোভাব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সকল ধর্মের মানুষের প্রতি সমত্ববোধ ভালোবাসা এবং সেগুলোর চুল ছেড়া বিশ্লেষণ করে অমুসলিম মনীষীরা মহানবী (সা:)-এর প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন। এসব বিশ্বজোড়া খ্যাতনামা মনীষীরা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন তিনিই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মহামানব। তিনিই জগৎ গুরু বা বিশ্বনবী। বিশেষ করে বিশ্বের সকল ধর্মের মানুষের প্রতি তার নিদারুণ সমত্ববোধ ভালোবাসা সকলের দৃষ্টি কেড়েছে। মানবপ্রেমের এমন নজির সহসাই মেলে না বলেও মন্তব্য করেছেন।
সর্বযুগের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। পৃথিবীর বুকে এমন কোন বিবেকবান মানুষ নেই- যার দৃষ্টিতে তিনি মহামানব নন। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অনেক অমুসলিম মনীষীরাও অকপটে স্বীকার করেছেন। ................
১৯৭৮ সনে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাইকেল এইচ হার্ট “ THE Hundred” নামের একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইটিতে যুগ যুগান্তের ইতিহাশের শ্রেষ্ঠতম একশজন ব্যক্তির জীবন তথা ধর্ম সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। সেই লেখক ও ইতিহাস অনুসন্ধান করে সেই সকল ব্যক্তির এই গ্রন্থে স্থান দিয়েছে- সে সকল ব্যক্তি বিশ্বের মানবজাতির ওপর সবচাইতে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। এ গ্রন্থখানায় আইজ্যাক নিউটন অশক, এরিস্টটল, গৌতমবুদ্ধ, কনফুচিয়াছ, যীশু, হিটলার, প্লেটো এবং মহাত্মা গান্ধীরসহ বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি তবু এই একশ’ জন তালিকা করেই তার দায়িত্ব পালন শেষ করেননি। বরং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সাথে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাদের জীবন তথা কর্মের উল্লেখযোগ্য বিষয়সমূহ একত্রিত করে তার যথার্থ মূল্যায়নও করেছেন এবং সেই দিক থেকে যাকে যেভাবে পরিচিতি করা প্রয়োজন ঠিক তাই করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো- এই বিখ্যাত গ্রন্থে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়ন করে যে স্থানটি নির্ধারণ করেছে তার মধ্যে হজরত মুহাম্মদ (সা:)-এর স্থান হচ্ছে প্রথম। একজন অমুসলিম নেতৃত্বাধীন একদল গবেষকরা গভীরভাবে তথা নিরপেক্ষ গবেষণায় নবী মুহাম্মদ (সা:)ই বিশ্বের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। ধর্মের দিক দিয়ে মাইকেল হার্ট ছিলেন একজন খৃস্টান তাই তার নবী হযরত ঈসা (আঃ) এর নামটাই তালিকার শীর্ষেূ রাখা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি। এ ব্যাপারে তিনি তার গ্রন্থে ব্যাখ্যা দিয়েছেন,
“My choice of Muhammad to lead the list of the world's most influential persons may surprise some readers and may be questioned by others, but he was the only man in history who was supremely successful on both the religious and secular level.” অর্থাৎ
‘মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় শীর্ষস্থান দেওয়াটা অনেক পাঠককে আশ্চর্যান্বিত করতে পারে এবং অন্যদের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সেক্যুলার এবং ধর্মীয় উভয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ সফল ছিলেন।
স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায় হযরত মোহাম্মদ (সা:) ছিলেন - Mohammed was the Prophet of equality, of the brotherhood of man, the brotherhood of all Mussulmans.”
অর্থাৎ
আমার দৃষ্টিতে মহানবী (সা:)ই হচ্ছেন- সেই মহাপুরুষ যিনি বিশ্বজগতে সাম্যভাবের বার্তাবহন করে এনেছেন। তিনি হলেন, সাম্যবাদের প্রবাদপুরুষ। তিনিই মানবজাতির ভাতৃভাবের এনে দিয়েছিলেন ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে গভীর শ্রদ্ধা করতেন।
১৯৩৬ সালের এক শুভেচ্ছাবার্তায় তিনি লিখেছিলেন, "যিনি মহোত্তম এর মধ্যে অন্যতম সেই পবিত্র পায়গম্বর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্দেশ্যে আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি"। তিনি মনে করতেন, মুহাম্মদ (সা.) মানুষের ইতিহাসে এক নতুন জীবনশক্তি এনেছিলেন এবং তাঁর আদর্শ ছিল মানবতাবাদী।
তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামাও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “The Prophet Muhammad’s (PBUH) life is the best example for the entire humanity.”
“We should follow the path shown by the Prophet Muhammad (PBUH) in order to establish global peace and to end terrorism and tyranny from the world. The Prophet Muhammad’s (PBUH) message of Peace, love, justice and religious tolerance will always be a leading light for the whole humanity” অর্থাৎ
“হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।
“বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস ও অত্যাচারের অবসান ঘটাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দেখানো পথে চলতে হবে। শান্তি, প্রেম, ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় সহনশীলতার মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বদাই আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
বিশ্ব বিখ্যাত ইংরেজ পন্ডিত জর্জ বার্নার্ড শ’ বলেছেন,
I believe if a man like him were to assume the dictatorship of the modern world he would succeed in solving its problems in a way that would bring much needed peace and happiness.
I have studied him - the man and in my opinion is far from being an anti–Christ. He must be called the Savior of Humanity.
I have prophesied about the faith of Mohammad that it would be acceptable in the Europe of tomorrow as it is beginning to be acceptable in the Europe of today.
আমার বিশ্বাস, যদি তার মতো একজন মানুষ আধুনিক বিশ্বের একনায়কত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে তিনি এর সমস্যাগুলি এমনভাবে সমাধান করতে সফল হবেন যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শান্তি ও সুখ বয়ে আনবে।
আমি তাকে অধ্যয়ন করেছি - এই ব্যক্তি এবং আমার মতে তিনি খ্রীষ্টবিরোধী নন। তাকে মানবতার ত্রাণকর্তা বলা উচিত।
আমি মুহাম্মদের ধর্ম সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছি যে, আজকের ইউরোপ যেমন গ্রহণযোগ্য হতে শুরু করেছে, তেমনি আগামীকালের ইউরোপও গ্রহণযোগ্য হবে।
সর্বোপরি তাঁরা এটাও অকপটে স্বীকার করেছেন যে, মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) এর আদর্শই মানবতার মুক্তির একমাত্র পথ যা বিশ্ব শান্তিকে নিশ্চিত করতে পারে।
তবে, মহানবী (সা.)-কে স্মরণ করার জন্য এটিই একমাত্র দিন নয় বলে মনে করেন ইসলামিক স্কলাররা। বিশ্বনবীর দেখানো পথ, আদর্শ এবং শিক্ষা প্রতিদিনই অনুসরণ করতে হবে।