30/08/2026
"আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। এরা আমাকে মেরে ফেলবে।"
প্রসবের কয়েক ঘণ্টা আগে পরিবারের কাছে এমনই কাতর আর্তি করেছিলেন ২৫ বছরের কল্পনা মিশ্র। হাসপাতালের ভিতরের সেই মুহূর্তের একটি ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মধ্যপ্রদেশের রেওয়ার সরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হলো কল্পনা এবং তাঁর সদ্যোজাত সন্তানের। ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তুলেছে পরিবার। ইতিমধ্যেই দুই নার্স এবং দুই মহিলা চিকিৎসককে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
কল্পনা মিশ্রের সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং বেদনাদায়ক ঘটনা, যার দায় একক কোনো ব্যক্তি বা বিষয়ের ওপর না চাপিয়ে সমাজ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা (সিস্টেম) উভয়ের গাফিলতি ও কাঠামোগত ব্যর্থতা হিসেবেই দেখা উচিত।একটি প্রসবকালীন মৃত্যু কখনোই কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এর পেছনে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা সামাজিক অবহেলা এবং স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা জড়িয়ে থাকে।
এই দায় মূলত সরকারি ক্ষেত্রে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবক্ষয় ও পারিবারিক স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব হিসেবে দেখা যেতে পারে।
🔴১. চিকিৎসা ব্যবস্থা বা সিস্টেমের দায় -
📌 জরুরি সেবার অভাব: গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে আজও প্রসবকালীন জটিলতা (যেমন- অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা এক্লাম্পসিয়া) সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি, আইসিইউ (ICU) বা সিসিইউ (CCU) সুবিধা থাকে না।
📌 দক্ষ চিকিৎসকের অনুপস্থিতি: অনেক সময় প্রান্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ২৪ ঘণ্টা দক্ষ প্রসূতি বিশেষজ্ঞ (Gynecologist) বা অ্যানেস্থেটিস্ট পাওয়া যায় না। অথবা বেশিরভাগ সরকারি ডাক্তার অনেকসময় তার দায়িত্ব অবহেলা বা 'manage' করে বেশি উপার্জনের লোভে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত থাকে।
📌রেফারেল সিস্টেমের জটিলতা: রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে করতেই মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়, যা রোগীর মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
📌 রক্তের অভাব: প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ (PPH) রোধে তাৎক্ষণিক রক্তের ব্যবস্থা করার মতো কার্যকর ব্লাড ব্যাংক বা ডোনার নেটওয়ার্কের অভাব ব্যবস্থার বড় একটি ত্রুটি।
🔴 ২. পরিবার বা সমাজের দায় -
📌 অসচেতনতা : আজও সমাজের একটি বড় অংশ প্রাতিষ্ঠানিক বা হাসপাতালে প্রসবের জন্য সময়মত পৌঁছতে পারে না অথবা গর্ভাবস্থায় নির্দিষ্ট সময়অন্তর চিকিৎসকের পরামর্শ না নেওয়া। অনেকেসময় প্রসব সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়ে গর্ভবতী মা বা তার পরিবারের অজ্ঞতাও অনেক অংশে দায়ী।
📌 নারীর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যে অবহেলা: গর্ভাবস্থায় একজন নারীর যে ধরনের পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত ডাক্তারি পরীক্ষার (ANC Checkup) প্রয়োজন, অর্থনৈতিক বা সামাজিক কারণে অনেক পরিবারেই তা অবহেলিত হয়।
📌 সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিলম্ব: প্রসূতির কোনো শারীরিক সমস্যা হলে তাকে কখন হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই দেরি করে ফেলেন।
তাই কল্পনা মিশ্রের মতো মায়েদের অকাল মৃত্যু ঠেকাতে আমাদের যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনই সরকারকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিকাঠামো উন্নত করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা দক্ষ চিকিৎসকের উপস্থিতি এবং জরুরি রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে এই সিস্টেমিক ব্যর্থতার দায় এড়ানো সম্ভব নয়।
লেখনে🖊️ Sebananda Roy