29/09/2026
১৯৩০ সালে ব্রিটিশ সরকারের লবণ আইনের বিরুদ্ধে সারা দেশে আন্দোলন শুরু হয়। মেদিনীপুরেও তার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। ক্রমেই ব্রিটিশ বিরোধী এই আন্দোলন গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে যায়। মাতঙ্গিনী ছিলেন এই আন্দোলনের একদম সামনের সারির সংগঠক।। তাঁর বাড়ি হয়ে ওঠে আন্দোলনের কেন্দ্র। সেখানেই স্থাপিত হয় স্বেচ্ছাসেবক শিবির।
পরের বছর ব্রিটিশ সরকারের চৌকিদারী ট্যাক্সের বিরুদ্ধে তমলুকে আন্দোলন শুরু হয়। এই পর্বে বাংলার গভর্নর তমলুক পরিদর্শনে এলে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। 'গভর্নর ফিরে যাও' স্লোগান তোলার 'অপরাধে' ছয় মাসের জন্য কারাবন্দি হন মাতঙ্গিনী।
তিনি অবিভক্ত মেদিনীপুরের বীর যোদ্ধা । মেদিনীপুর জেলার তমলুক থানায় হোগলা গ্রামে জন্ম । দরিদ্র পরিবার। প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ হয়নি । অল্প বয়সে বিয়ে আর মাত্র আঠারোতেই বিধবা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব তাঁর ন্যায়-অন্যায়ের বোধকে কখনও ম্লান করতে পারেনি। তাঁর বাড়ি হয়ে উঠেছিল বিপ্লবীদের এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ব্রিটিশ শাসনের কঠোর নজরদারি ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নির্ভীকভাবে বিপ্লবীদের পাশে দাঁড়াতেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোপনে তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পৌঁছে দিতেন । শুধু রাজনৈতিক সংগ্রামের ময়দানেই নয়, গরীব- অসহায় মানুষের প্রতি ছিল তাঁর গভীর মমত্ববোধ। তিনি হয়ে উঠেছিলেন অগণিত মানুষের আপনজন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ব্রিটিশ সরকারের দমননীতি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। দেশজুড়ে সভা সমিতিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। সংবাদ ও রাজনৈতিক প্রচারের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। যুদ্ধ তহবিলে টাকা দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের উপর ব্যাপক চাপ দেওয়া শুরু হয়। জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি এবং খাদ্য সংকটে মানুষ জেরবার হয়ে যায়। তারপর শুরু হয় ৪২ এর ঐতিহাসিক ভারতছাড়ো আন্দোলন। গোটা দেশজুড়ে আন্দোলনের নেতাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করে। আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে বাংলা জুড়েও। তমলুক ও তার আশপাশের এলাকাতেও স্বাধীনতার দাবিতে প্রতিরোধ ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে।
২৮ সেপ্টেম্বর তমলুককে বাইরের যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রাস্তার উপর বড় বড় গাছ ফেলে পথ অবরুদ্ধ করা হয়। টেলিগ্রাফ এবং টেলিফোন লাইন কেটে দেওয়া হয়। নদীপথে যোগাযোগ বন্ধ করতে নৌকো ডুবিয়ে দেওয়া হয়। পরেরদিন ২৯ সেপ্টেম্বর তমলুক মহকুমার তমলুক, মহিষাদল এবং সুতাহাটা তিনটি থানায় একযোগে অভিযান করা হয়। পাঁচদিক থেকে পাঁচটি বিশাল মিছিল তমলুক শহরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। কিছুক্ষণ পরেই শুরু হয় ব্যাপক পুলিশি আক্রমণ। লাঠি, গুলি বাদ যায় না কিছুই। পশ্চিম দিক থেকে আসা মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন রামচন্দ্র বেরা।
উত্তরদিক থেকে আসা মিছিল তমলুক দেওয়ানী আদালতের কাছে এসে পৌঁছলে পুলিশ শুরু করে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ। ছত্রভঙ্গ জনতা। কিন্তু দৃপ্তপদে এগিয়ে চলেছেন ৭৩ বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী । কণ্ঠে স্লোগান "ইংরেজ ভারত ছাড়ো"। বয়সের বাধা দেশ মুক্তির আহ্বানকে রুদ্ধ করতে পারেনি। হাতের ঋজু মুষ্টিতে জাতীয় পতাকা। প্রথমে দুটি হাত লক্ষ্য করে গুলি চালালো পুলিশ। সবশেষে কপাল ভেদ করে গুলি বেরিয়ে গেল। দেশের সন্তানদের পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের জন্য অকুতোভয় পদক্ষেপে বুক পেতে দিলেন ইংরেজের গুলির সামনে। স্বাধীনতার স্বপ্নকে বুকে লালন করে, সেদিন তমলুকের মাটিতে শহীদের মৃত্যু বরণ করেন মাতঙ্গিনী হাজরা।
ভারত ছাড়ো আন্দোলন ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সারা দেশের মানুষ একযোগে সেদিন রাস্তায় নেমেছিলেন। গ্রেপ্তারি বরণ করেছিলেন, শহীদ হয়েছিলেন। এই লড়াইয়ে হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ ছিল না। অথচ এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের সরাসরি বিরোধীতা করেছিল একগুচ্ছ সংগঠন। হিন্দু মহাসভার কার্যকরী সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তৎকালীন বাংলার গভর্নর হার্বার্টকে চিঠি লিখে "ব্রিটিশ সরকারের এই বিপদের সময় তাদের পাশে থাকার" প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সরকারের প্রতি আবেদন করেছিলেন, 'ভারত ছাড়ো আন্দোলন যাতে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে না পারে, তার জন্য ব্রিটিশ প্রশাসন যেন ব্যবস্থা নেয়।'
১৯৪২ সালেই হিন্দু মহাসভার একটি সভায় সাভারকার Responsive Co-operation এর নামে দেশবাসীকে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য হাত বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। আরএসএস নেতা গোলওয়ালকর ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে 'বিপর্যয়' আখ্যা দিয়ে দেশের মানুষকে ব্রিটিশ সরকারের আইন মেনে চলার আহ্বান রেখেছিলেন।
আর আজ আমাদের রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর শ্যামাপ্রসাদ, সাভারকার, গোলওয়ালকরের উত্তরসূরী হিসেবে যারা পরিচিত তারা গোটা রাজ্য জুড়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে তাণ্ডব চালাচ্ছে। বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করতে দখলদারীর রাজনীতি কায়েম করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের বিভেদের রাজনীতির বিরোধীতা করতে গিয়ে ছাত্রছাত্রীরা আক্রান্ত হচ্ছেন।
ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের দেশের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের উজ্জ্বল ইতিহাসে এদের কোনো স্থান নেই। স্থান রয়েছে মাতঙ্গিনী হাজরার। স্থান রয়েছে আরো অনেক নাম জানা, নাম অজানা মানুষের। অথচ নতুন করে ইতিহাস লেখার নাম করে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে সেদিনের বিশ্বাসঘাতকদের নায়ক হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে, আমাদের দেশের গৌরবের ইতিহাসকে বিকৃত করবার বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া উঁচু করে লড়াই করার দায়িত্ব আজ এদেশেরই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাঁধে অর্পিত হয়েছে।