23/01/2025
অনেকেই জানেন না যে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী(রঃ)। এবং নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে জাপানে পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনিই। মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী মাওলানা আবুল কালাম আজাদের- (রঃ)ও আদর্শিক গুরু ছিলেন।
মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী(রঃ) (১৮৭২-১৯৪৪)
বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অবিসংবাদিত নেতা, কিংবদন্তীতুল্য ব্যক্তিত্ব মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধীর(রঃ) নাম ইতিহাসের পাতা থেকে একরকম মুছে ফেলা হয়েছে। প্রকৃত ইতিহাস চেপে রাখা হয়েছে। আজকের তরুণ প্রজন্মের প্রধান করণীয় হ’ল, বৃটিশ ও উৎকট ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রে দু'শ' বছর ধরে চেপে রাখা ইতিহাস পুনরুদ্ধার করে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরা।
ইঙ্গ-ব্ৰাহ্মণ্যবাদী ইতিহাসবিদরা তাদের রচিত— ভারতবর্ষের বৃটিশবিরোধী লড়াইয়ের ইতিহাসে মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধীর (সিন্ধু প্রদেশের বাসিন্দা বলে সিন্ধী বলা হয়) যথার্থ স্থান না হলেও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে হাতেগোণা যে কয়জন উচ্চতম মর্যাদাসম্পন্ন নেতার নাম প্রকৃত ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণীক্ষরে লেখা থাকবে তাদের মধ্যে উবায়দুল্লাহ সিন্ধীকে অন্যতম না বলে শ্ৰেষ্ঠতম বলে বিবেচনা করা হয়।
মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী(রঃ) সম্পর্কে গোলাম আহমাদ মোর্তজা লিখেছেন, "ইতিহাস খ্যাত হঠাৎ নেতার দলেরা স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষে উদিত হয়ে ইংরেজদের সাথে লড়াই না করে হিন্দু-মুসলমানের লড়াই করেছেন, আর শাসক ইংরেজ হাসি চাপা রেখে গম্ভীর মুখে ঐ মারামারিকে স্বাধীনতা যুদ্ধ, আর ওইসব মোড়লদের স্বাধীনতা যোদ্ধা বলে “টাইটেল’ দিয়েছেন। সুভাষ বসুকে কংগ্রেস দলে গ্রহণ না করার শ্রেষ্ঠ কারণ হচ্ছে এই, তিনি মুসলমানদের আন্দোলনের ফর্মুলা গ্ৰহণ করেছিলেন। আর তাঁর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী(রঃ)। বৃটিশ সরকার যখন বুঝতে পারল যে উনি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যেখানে থাকবেন সেখানেই বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠবে- তখন তাঁর ওপর আদেশ চাপানো হলো যে, তাঁকে চিরদিন ভারতবর্ষে প্রবেশ করা চলবে না। বাধ্য হয়েই তাঁকে ভারতবর্ষ ছেড়ে যেতে হয়। কিন্তু ইংরেজরা যদি- ভারতের বাইরে তিনি কতটা সংগঠন ও বিপ্লবীদের সাহায্য এবং ভারত ত্যাগী মুজাহিদদের পথ চলার পাথেয় পরিবেশনা করতে পারেন চিন্তা করত ,তবে তাকে ভারতেই আটকে রেখে বরং বহির্ভারতে যাতায়াত বন্ধ করে দিত।”
জনাব মোর্তজা সাহেব অতঃপর লিখেছেন--
মাওলানা উবাইদুল্লাহ বৃদ্ধ বয়সে দেশে আসার অনুমতি পান। প্রথমেই তিনি আসেন কলকাতায়। ওখানে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অধিবেশনে। নেতাজী সুভাষ বসু আগে থেকেই তাঁর যোগ্যতা, দৃঢ়তা ও ভারতপ্রেমের কথা জানতেন, কিন্তু শিষ্য হওয়ার মতো, বিশেষভাবে পরামর্শ করার মতো সুযোগ পাননি। নেতাজী এবার মাওলানার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, তাঁর পরামর্শ চাইলেন এবং তাঁর শিষ্যত্ব বরণ করতে চাইলেন। তিনি (সুভাষচন্দ্র) জানালেন, ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাসী এবং ভারতের জন্য জীবন দিতে তিনিও প্ৰস্তুত।
মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধী তাঁকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং আস্তে আস্তে বললেন, “আজ রাত্ৰে তৈয়ব ভাই জরিফের বাড়ীতে গোপন আলোচনা হবে।".. রাত্ৰিতে গোপন কথা হয়েছিল। সেখানে ছিলেন চৌধুরী আশরাফুদ্দিন আর বর্ধমানের মাওলানা আবুল হায়াত প্রমুখ বিখ্যাত প্রকৃত নেতা।
ওখানে উবাইদুল্লাহ সিন্ধী(রঃ) সুভাষচন্দ্র বসুকে নির্দেশ দেন। “অত্যন্ত চুপিচুপি তুমি মাওলানা জিয়াউদ্দীন নাম নিয়ে ১৭ জানুয়ারী (১৯৪১) রওনা হও”। তারপর মাওলানা উবাইদুল্লাহ সাহেব নিজের হাতে অনেক চিঠিপত্র লিখে দিলেন এবং জানালেন, কোন জায়গায়, কোথায়, কী নামে, কী বেশে, কী পদে, কোন রাষ্ট্রে তার শিষ্য-ভক্ত কমীরা আছেন। হয়েছিলও তাই।”
বাস্তবেও দেখা যায়, সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর গুরু, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধীর একান্ত অনুগত শিষ্য হিসেবে ভারতের মুসলিম বিপ্লবীদের মতো ইংরেজদের বিরুদ্ধে পূর্ণ স্বাধীনতার লড়াইকেই আমৃত্যু অনুসরণ করেছেন। দেখা যায়, সুভাষচন্দ্র বসুর আযাদ-হিন্দ ফৌজের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান। যেমন ক্যাপ্টেন শাহনাওয়াজ, ক্যাপ্টেন বুরহানুদ্দিন, ক্যাপ্টেন আবদুর রশীদ এবং জমাদার ফতেহ খান প্রমুখ।
মওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী(রঃ) বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতার লড়াইয়ে তাঁর পরিকল্পনা ও প্রস্তাব সুভাষচন্দ্র বসুকেও দিয়েছিলেন, কংগ্রেসকেও দিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন কংগ্রেস নেতারা এবং গান্ধীজিও তা অস্বীকার করেছিলেন, আর সুভাষচন্দ্র বসু মৃত্যু পর্যন্ত তা পালন করেছিলেন। ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠতম বিপ্লবী অশীতিপর বৃদ্ধ এই মাওলানাকে বৃটিশরা গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায় এবং সেখানেই কাপুরুষোচিতভাবে বিষপ্রয়োগে তাঁকে হত্যা করে। এটি ছিল বিশ্বের ইতিহাসে নিকৃষ্টতম কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ডের একটি।
নেতাজি সুভাষ বসুর ওপর মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধীর প্রভাবের বিষয়ে এবং বিপ্লবী উবায়দুল্লাহ সিন্ধী সম্পর্কে মওলানা আবুল কালাম আজাদ (রঃ) তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মওলানা জহীরুল হককে যে পত্র লিখেছিলেন তার বাঙলা তর্জমার কিছু অংশ গোলাম আহমাদ মোর্তজার ‘ইতিহাসের ইতিহাস’ গ্রন্থের বরাতে এখানে তুলে ধরা হ’ল।-
দিল্লি ১৫ই সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭ 'স্নেহের মৌলবী জহীরুল হক (দ্বানপুরী) আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ। আযাদী উপলক্ষে আপনার প্রেরিত পত্রের জন্য শুভেচ্ছা জানাই। পত্র পড়ে স্মৃতিপটে ভাসে শুধুই মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধীর(রঃ) স্মৃতি। সেই ঘটনা অনেক লম্বা, সংক্ষেপ করলেও যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্ধের সময় শাহ ওয়ালীউল্লাহর (র.) কাফেলার নেতা। হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (র.) অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধীকে কাবুল প্রেরণ করেন। সেখানে মাওলানা উবাইদুল্লাহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করেন। তন্মধ্যে জার্মান, ফ্রান্স ও জাপানের এমন সব নেতা-কর্মী ছিলেন, যারা পরবর্তীকালে শাসনক্ষমতার উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
পঁচিশ বছর নির্বাসন ভোগ করে ১৯৩৯ সালে তিনি যখন দেশে আসেন। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তিনি তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনা কংগ্রেসের কাছে পেশ করে সর্বভারতীয় সংগ্রামের প্রোগ্রাম রচনা করেন, সেই সময় গান্ধীজি পর্যন্ত ঐ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। তাহলেও “ভারত ছাড়’ আন্দোলনটুকু অনুমোদন লাভ করে। একদিন চায়ের মজলিশে তাঁর (উবাইদুল্লাহ সিন্ধীর) সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তাঁর চোখ ও চেহারায় চিন্তার চিহ্ন দেখে আমার মনে অনুসন্ধিৎসুর প্রশ্ন জাগে। আমি প্রশ্ন করতেই কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে তিনি তাঁর বাসা উখলায় ফিরে যান।
দ্বিতীয় দফায় উখলা হতে দিল্লি পর্যন্ত আট মাইল সড়কের কোন একটি জনমানবশূন্য স্থানে তাঁর সঙ্গে সুভাষের সাক্ষাৎ সংঘটিত হয়। তার পরের সাক্ষাৎটি হয়েছিল কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায়। এইখানে তিনি সুভাষকে জাপান যাত্রার জন্য রওনা করান। জাপান সরকারের নামে একটি ব্যক্তিগত বিশেষ বার্তাও পাঠান। তাই সুভাষ সেখানে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে জাপান সরকারের সৈন্য বিভাগও তাঁর প্রতি আস্থা স্থাপন করতে পেরেছিল।
শেষ পর্যন্ত ভয়ংকর বিষ প্রয়োগ করে মাওলানা সাহেবের জীবন শেষ করা হয়। ১৯৪৪ সালের ২২শে আগস্ট তিনি মহামিলনে শামিল হলেন মহান মাওলা স্রষ্টার সঙ্গে। সেদিন আকাশ হতে অশ্রু ঝরেছিল। সারা পৃথিবী শোকে মুহ্যমান হয়েছিল। ভারত সরকার এ সংবাদ গোপন রেখেছিল। ...
অবশেষে সাধারণের ধারণা সত্য বলে প্রমাণিত হয়। ১৯৪৫ সালে পুরো একবছর নয়দিন পর সরকারীভাবে স্বীকার করা হয় মাওলানা সাহেব নিহত হয়েছেন। বাস্তবিক এমন একজন বিপ্লবীকে ওজনের তুলাদণ্ডে এক পাল্লায় রেখে অন্য পাল্লায় সারা পৃথিবী চাপালেও এই বিপ্লবীর সমান হয় না। এখন রয়ে গেছে তাঁর অপরূপ স্মৃতি ও অপূর্ব বিরহ-বেদনা। দুঃখ শুধু এজন্য নয়। যে, তিনি চলে গেছেন। এজন্য দুঃখ যে, তিনি এ জগতের মানুষ ছিলেন তা আজ প্রায় অবলুপ্ত। আমরা সেই দলেরই পশ্চাৎবতীর্ণ কমী, সেই কাফেলার অনুরূপ দল আর পাইনা, আর পাচ্ছিনা গন্তব্যস্থলের ঠিকানা। আমাদের কেউ চিনে না, আর অন্যদেরও আমরা চিনতে পারছি না। সেই শহীদদের উপর স্বাধীনতার গৌরব অৰ্পিত হউক । আলহামদুলিল্লাহ (আল্লাহর প্রশংসা)। আমি সুস্থই আছি। আপনার কুশল জানাবেন। আপনার সম্মানিয়া মাতার প্রতি রইলো আন্তরিক সালাম।".......
এই পত্রের মাধ্যমে পরিষ্কার বোঝা যায়- মাওলানা আবুল কালাম আজাদ(রঃ) তাঁর মতাদর্শিক গুরু মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধীর(রঃ) প্রতি এতটাই গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেছেন এবং তাঁকে এমন উচ্চতম মর্যাদার আসনে স্থান দিয়েছেন, যা তিনি তাঁর রাজনৈতিক গুরু মহাত্মা গান্ধীকেও কখনও দেননি।
যাই হোক, মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধীর(রঃ) সাথে সুভাষচন্দ্র বসু ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের(রঃ) ঘনিষ্ঠ গুরু-শিষ্য সম্পর্কের কথা কথিত ঐতিহাসিকেরা কখনই উল্লেখ করেন না। দুঃখজনক ব্যাপার হ’ল, স্বাধীনতার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মোৎসর্গকারী এবং সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী মহান বিপ্লবী উবাইদুল্লাহ সিন্ধীর(রঃ) নাম বৃটিশ ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের চক্রান্তে ইতিহাসের পাতায় প্রায় অনুপস্থিত। এরকম ন্যাক্কারজন ভাবেই ভারতবর্ষের মুসলমানদের বহু গৌরবময় ইতিহাস ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।
-মূল লেখাটি এখানে দেখুন।
"বৃটিশ-বিরোধী লড়াইয়ে বিস্ময়কর দুই মাওলানা"
https://www.istishon.com/?q=node/25902
পরিমার্জনা/ সক্ষিপ্তসার ..।
স্মৃতির পাতা থেকে. আরমিন খাতুন।।