31/05/2017
মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি (2য় খন্ড )
-----------------------------------
পূজনীয়া দিদি,
প্রণাম নেবেন।
আপনার সেই ছোট্ট ভাইটি বলছি।
-
কাগজে পড়লাম, আপনি নাকি শিল্প বান্ধব পরিবেশ গড়তে, আপনার ভাই-বোনদের ধমক দিয়ে বলেছেন- "শ্রমিক সংগঠনের নামে, জঙ্গিপনা আমি মানব না"।
-
আপনি কি জানেন- আপনার এ কথা শুনে ; কেউ কেউ মুখ চেপে হাসছে, কেউ কেউ আবার দন্ত বিকশিত করে হাসছে ? হাসবে না-ই বা কেন ? যে সব বঙ্গবাসীর মগজে, অন্তত একটু হলেও ঘিলু আছে, তারা সবাই জানে- এও এক প্রহসন ! একটা বাঁদর যদি বলে, সে কলা চপা খাবে না ; তা শুনতে- যেমন এক প্রহসন লাগে, আপনার শিল্প বান্ধব পরিবেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি- তার চেয়েও বড় এক প্রহসন লাগে।
-
মানুষের দুর্ভাগ্য, মানুষের চরিত্রকে কাপড় কাচা সাবান দিয়ে ধুয়ে ইস্ত্রি করলে, তা আর ঝাঁ চকচকে দেখায় না। চরিত্রে, একবার গোবরের দাগ লাগলে, তা থেকেই যায়। আমি ভেবেছিলাম- আপনি এই সত্যটা জানেন। আর সে জন্যই আপনি একজন কেউকেটা মুখ্যমন্ত্রী ! কিন্তু এখন দেখছি- আপনি তা জানেন না।
-
অথবা- এও, আপনার এক স্বভাব সুলভ খেলা ? ইচ্ছে করলে আপনি খেলতেই পারেন। আপনার মাঠ, আপনার রেফারি, আপনার টিম মেম্বার, আপনার জমিদারি- তা আপনি খেলতেই পারেন। খেলুন- যত খুশি ছক্কা আর চৌকা মারুন। আপনার- কপালে বৃহস্পতি, পকেটে বুদ্ধিজীবী, আঁচলে মিডিয়া। তারা আপনার ছক্কা আর চৌকাতে, করতালি দেওয়ার জন্য- গামছায় মুড়ি বেঁধে, আগের রাত থেকে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ! তো আপনি যত খুশি খেলুন।
-
ইতিহাস- একটু আধটু আপনি পড়েছেন, তাই না ? চোখের সামনে এও দেখেছেন- ইতিহাসকে কলা দেখাতে গেলে, কলা চপাতে কেমন পা হড়কে পড়তে হয় ! বুদ্ধবাবুরা ইতিহাসকে কলা দেখাতে গিয়ে- আপনার রাখা কলা চপাতে, পা হড়কে চিৎ হয়ে পড়েছেন। এবার আপনার জন্যও কেউ কেউ কলা গাছের বীজ বুনে রেখেছে। ফল ধরতে, হয়তো বা একটু দেরী হতে পারে, কিন্তু ফল তো একদিন ফলবেই।
-
আপনি হয়তো জিজ্ঞেস করবেন- তুই ছোঁড়া কে রে ? তুই এসবের আবার কি বুঝিস ? আমার মতো যারা মাথা মোটা, তাদের অসুবিধা অনেক। তারা তেল দিয়ে কথা বলতে পারে না বলে, খেতে পায় না। কিন্তু তাদের আবার সুবিধাও অনেক। আমার মতো মাথামোটা লোকেরা- পৃথিবীটাকে, পৃথিবীই দেখে ; সত্যকে সত্যই দেখে ; ন্যাংটোকে ন্যাংটোই দেখে।
-
কি সেই সত্য ?
"যাহা উপরে উঠে, তাহাই ধপাস করে পড়ে।
যাহা জমা হয়, তাহাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিক ওদিক ছিটকে ছিটকে পড়ে।"
-
আপনারও সিংহাসনের চূড়া এখন আকাশে ঠেকেছে। তাও একদিন ধূলিসাৎ হবে। আপনার কাছে, অনেক ইঁদুর বেঁজি চামচিকে জমা হয়েছে, তারাও একদিন ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিক ওদিক ছিটকে ছিটকে পড়বে। প্রকৃতির এই নিয়মকে, কি বলে জানেন ? একে বলে- "Law Of Impermanence" । যারা বুদ্ধিমান, তাদের বিপদ এই যে- তারা ভাবে, তারা বুঝি- এই নিয়মের ব্যতিক্রম ! কিন্তু সত্যটা হলো- কেউই এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। আপনার আগে বুদ্ধিমান লোক যেমন- হিটলার, স্তালিন, মাও সে তুঙ, জ্যোতি বাবু, বুদ্ধবাবু - সকলেই ভেবেছিলেন, তারা বুঝি এই নিয়মের ব্যতিক্রম ! কিন্তু আপনি ভালোই জানেন- তাদের কি দশা ঘটেছে !
-
যা বলছিলাম- মানুষের চরিত্রে যে দাগ লেগে যায়, তা হয়তো উঠানো যায় না ; কিন্তু ভবিষ্যতে, যাতে আর দাগ না লাগে, সেই ব্যবস্থা মানুষ চাইলে কিন্তু করতে পারে।
-
আচ্ছা দিদি, এতো হাজার হাজার মিথ্যে বলতে, আপনার কোন অনুশোচনা হয় না ? মনে একটু খস খস, বুকে একটু চিনচিনে ব্যথা ? অথবা- রাজনৈতিক চরিত্র হলে মানুষ পাথর হয়ে যায় ? আপনিও কি তবে পাথর হয়ে গেছেন ? লোকে তাই বলে, কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় না। আমার যে অনেক ভরসা ছিলো আপনার উপর, দিদি ! কেউ কেউ মরলে, আপনি মাঝে মাঝে তাদের পরিবারের সাথে, দুঃখী মুখে ছবি তুলেন ! আপনার সেই দুঃখ কি তবে সত্য নয় ? সে সবও কি তবে নাটক ? আপনি মানুষের মৃত্যু, আর তাদের বিধবা স্ত্রীর চোখের জল দিয়ে রাজনীতির ঘুঁটি সাজান ? আপনি আমার দিদি, না অন্যকিছু ?
-
অবশ্য মাঝে মাঝে আপনার সততার উপর আমার যে সন্দেহ হয় না, তা নয়। সুজেট জর্ডন ধর্ষিত হওয়ার পর আপনি বললেন- "এ তো সামান্য ব্যাপার !" সত্যি দিদি, কি অসামান্য আপনার উদারতা ! আপনি আপনার মহৎ গুনে, সব কিছু মাপ করে দেন। সুজেটের ধর্ষক আপনার কৃপায়, আজও আইনের ছোঁয়ার বাইরে। গিরিশ পার্কের খুনীরা, আপনার কৃপায় আজও আইনের বাইরে। আমরি হাসপাতালের খুনীরা, আপনার কৃপায় আজও বেকসুর খালাস। কি অসামান্য উদারতা আপনার !
-
অথচ কেউ একটু উল্টো সুরে গাইলে, আপনি তাকে মাওবাদী, বিজেপি বা হিন্দু বলে গালি দেন ! বা তাকে শূলে চড়িয়ে দেন ! সেটা কেন দিদি ? আপনি তো এক চোখা নন। কাগজে আপনার যে ছবি দেখি- তাতে তো বেশ, ডাগর ডাগর দুটো চোখ দেখতে পাই। তবে আপনি এক চোখা কেন ? আপনি কেবল চোরেদের 'মা'। আপনি সাধুদের 'মা' নন কেন ?
-
জানেন দিদি- আপনাকে এরকম খান কতক চিঠি লিখলে বুকটা একটু হাল্কা হয়, তাই লিখি। আজ বড় ঘুম পাচ্ছে, তাই আপনাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে, আজকের চিঠি শেষ করছি। কিন্তু কথা দিলাম- আপনাকে মাঝে মাঝে আমি লিখবো। আপনি যতদিন পর্য্যন্ত না- চোর আর সাধু দুজনেরই 'দিদি ; হন, ততদিন আপনাকে আমি চিঠি লিখেই যাব।
-
প্রণাম।
-
আপনার ছোট্ট ভাই
বুদ্ধদেব