03/09/2024
পর্ব 2
বৃষ্টিতে ভিজে হাঁচি আরম্ভ হয়ে গেছে। মা গরম চা নিয়ে এলো। আঃ গরম গরম চা পেয়ে মন জুড়িয়ে গেল। আমি চা খেতে খেতে বাবার কথা আর অন্ন্যেষার কথা মেলানোর চেষ্টা করছিলাম। বাবা বলল ছেলেটা ভালো। এদিকে অনু বলে অর্থাৎ অন্ন্যেষা বলে, ওই রকে বসা ছেলেগুলো একটাও ভালো নয়। সবগুলোই নেশা করে, মেয়েদের টোন কাটে। কিন্তু আজকে আমার সাথে তো কোন খারাপ ব্যাবহার করে নি। তাহলে বাবার কথাই মনে হয় ঠিক। ছেলেটা খুব একটা খারাপ নয়।
দূর ! আমি কিসব ভাবছি ! ওর কথা ভাবছি কেন ? রাস্তায় একা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম তাই ও সাহায্য করেছে। এটা তো যে কেউ করতো। আর চিন্তা করব না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মলে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নিলাম। রেনকোর্ট টা নিয়ে নিলাম। যদি রাস্তায় দেখা হয় তো ফিরিয়ে দেব আর থ্যাঙ্কস বলে দেব কালকের জন্য। নাহলে মনে ভাবতে পারে যে রাত্রে বাড়ি পৌঁছে দিলাম, ধন্যবাদও দিল না।
যেই চায়ের দোকানটায় ওই ফালতু ছেলেগুলোর আড্ডা, সেইদিকে যাবার পথে দেখলাম বাকী ছেলেগুলো ছিল, সঞ্জয় ছিলনা। এখন কি হবে ? রেনকোর্টটা কাকে দেব ? অন্য কারোর হাতে দিলে তারা যদি অন্য কিছু ভাবে ! থাক দরকার নেই, ওর জিনিস ওকেই দেব। আমি বাসে চেপে শপিংমলে চলে গেলাম।
সন্ধ্যেতে বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম ওই চা দোকানটায় বসে এক হাতে চায়ের কাপ আরেক হাতে সিগারেট। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম, ওকে ডাকবো কি ডাকবো না ভেবে পাচ্ছি না। রেনকোর্টটাও ফেরত দিতে হবে। এতো লোকের সামনে ওর সাথে কথা বললে লোকজন কি ভাববে ? এমন সময় ওর এক বন্ধু আমাকে দেখে সঞ্জয়কে বলল, মেঘনা এখানে দাঁড়িয়ে আছে কেনরে ! ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল
আরে ! তুই এখানে দাঁড়িয়ে কি করিস ?
আমি বললাম তোমার রেনকোর্টটা।
ও উঠে এল, একটু মুচকি হেসে আমার হাত থেকে রেনকোর্টটা নিয়ে বলল, যা বাড়ি চলে যা, রাত হচ্ছে।
আমি বললাম কালকে বাড়ি পৌঁছনোর জন্য ধন্যবাদ।
ও মুচকি হেসে চলে গেল।
আমি বাড়ির পথে রওনা দিলাম। কি অভদ্র ছেলে রে বাবা! মেয়েদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটাও জানেনা। গজগজ করতে করতে বাড়ি চলে এলাম। মা বলল কিরে কি হয়েছে ? মুখটা ওরকম ভার কেন ?
আমি বললাম, কিছুনা, শরীরটা টায়ার্ড লাগছে।
ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর ফোন ঘাটছি এমন সময় অনুর ফোন আসে। অনেক কথা হল। রাতে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাটাও বললাম। ও বলল সাবধানে থাকিস ওইসব বখাটে ছেলেগুলোদের কাজই হলো একটা উপকার করার পর পেছনে পড়ে রয়ে যাওয়া। এগুলো সব মেয়ে পটানোর কৌশল।
আমি বললাম, ও বললেই আমি পটে যাব নাকি। আমাকে চেনে না তো !
মলে যাবার পথে রোজ দেখি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেয়। একটা তো কাজেরও সন্ধান করতে পারে। বসে বসে বাপের হোটেলে খেতে লজ্জাও করে না নাকি কে জানে !
একদিন আমি সন্ধ্যেই বাড়ি ফিরছি। দেখছি এদিকেই সঞ্জয় হেঁটে হেঁটে আসছে। আমি আর থাকতে পারলাম না। ওকে বললাম, শোনো।
ও আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, কি
তোমার কি লাজ লজ্জা কিছুই নেই। সারাদিন চায়ের দোকানটায় পড়ে থাকো। নেশা করো। বাপের হোটেলে আর কতদিন বসে বসে খাবে ! ভাতগুলো গলা দিয়ে নামে কীকরে ! আমি একজন মেয়ে হয়ে কাজ করছি আর তুমি সারাদিন লোফার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বেড়াও, লজ্জা করে না।
ও আমার দিকে অবাক দৃষ্টতে তাকিয়ে আছে। আমি আর কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম।
বাড়ি এসে ফ্রেশ হয়ে বসলাম। মনটা খুব শান্তি লাগছে। আজকে আচ্ছাটি করে বকেছি। যদি মানুষের চামড়া গায়ে থাকে তো একটা কাজের চেষ্টা করবে।
পরদিন ওকে আর চায়ের দোকানে দেখতে পেলাম না। একবার ভাবলাম ভালোই হয়েছে। তাহলে কথায় কাজ হয়েছে। বয়স বাড়ছে, একটা কাজ না করলে কি চলে ? কিন্তু ওকে দেখতে না পেয়ে মনে যেন একটু ব্যাথা পেলাম। এরপর থেকে ওকে আর চায়ের দোকানে দেখতে পেতাম না। ওকে না দেখতে পেয়ে মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠছে। কাওকে কিছু বলতেও পারছি না, জিজ্ঞেস করতেও পারছি না যে, ও কোথায় গেছে ? ওকে আর দেখতে পারছি না কেন ?
এদিকে দেখতে দেখতে ভাইয়েরও কলেজ শেষ হয়ে গেল। একটা অফিসে কাজও পেয়ে গেল। স্যালারী ভালো।
ভাই আমাকে বলল দিদি তোকে আর মলে কাজ করতে যেতে হবে না।
আমি বললাম, না রে ভাই, তোর একার ওপর চাপ পড়ে যাবে।
না। তুই অনেক কষ্ট করেছিস, আর কষ্ট করতে হবে না।
আমি হেসে বললাম, না রে কষ্ট হয় না।
তবুও, তোকে আর কাজ করতে যেতে হবে না।
ভাইয়ের জেদের সামনে আমাকে হার মানতে হল। কাজটা ছেড়ে দিলাম।
আমাদের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে এল। বাবাও এখন অনেকটা সুস্থ।
একদিন দেখি কিছু মানুষজন আমাদের বাড়ি এসে হাজির। বাবা আমাকে বলল, যা মা একটু ভালো করে সেজে এদের সামনে আয়। এনারা তোকে দেখতে এসেছে।
আমি বললাম, দেখতে এসেছে মানে !
মানে কি মা। তোর বিয়ে দিতে হবে না !
বাবা আমি বিয়ে করতে চায়না।
তা বললে কি হয় মা। আমাদের বয়স হচ্ছে। আমরা আর কতদিন বাঁচব বল। মরার আগে তোর বিয়ে দিয়ে যেতে চাই মা।
আমার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। কি জন্য জল পড়ছে সেটা জানিনা। আমি কোনরকমে একটু সেজে মাথা নিচু করে ওদের সামনে গিয়ে বসলাম। আমি মাথা তুলতে পারছি না। আমার চোখগুলো ছলছল করছে। ওদের আমাকে পছন্দ হয়ে যায়। ওরা আমার হাতে আঙ্গটি পরিয়ে দেয়। আমার হাত পা কাঁপছে। কি জন্য কাঁপছে বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে আমি যেন একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হারিয়ে ফেলছি !
ওরা চলে গেলে ভাই আমার কাছে এসে বসল। বলল, দিদি তোর এ বিয়েতে মত আছে তো ? যদি না থাকে তো আমাকে বল আমি বাবাকে বলে মানা করে দেব।
এরা যে আমাকে দেখতে আসছে তুই আগে বলিস নি কেন ?
আমিও জানতাম না। আমাকে সকালে বাবা বলল, যা কিছু মিষ্টি নিয়ে আয়। আমার বন্ধু ওর ফ্যামিলি নিয়ে আসছে।
আমি তো নিজেই না করে দিতাম। কিন্তু বাবার হাসিখুশি মন দেখে আর কিছু বলতে পারলাম না। বাবাকে অনেকদিন পর হাসতে দেখলাম।
জানিস দিদি আজকে না সকালে সঞ্জয় দার সাথে দেখা হল।
ওর নাম শুনতেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো।
ভাই বলল, আজকে সঞ্জয় দা আমেরিকা চলে যাচ্ছে।
আমার যেন দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকে ব্যাথা অনুভব করছি।
এদিকে ভাই বলতে থাকল, আমার জীবনে সঞ্জয় দার অনেক বড়ো অবদান রয়েছে। ও না থাকলে কলেজের ফাইনাল পরীক্ষাও দিতে পারতাম না আর চাকরিও হতো না।
আমি শুধু ভাইয়ের কথাগুলো শুনে যাচ্ছি। আমার মুখ থেকে কথা বেরচ্ছেনা। এখন বুঝতে পারছি আমি কোন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হারিয়ে ফেলছি অনুভব করছিলাম।
জানিস দিদি, কলেজে একটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিঙ্গ এর জন্য আমাদের কয়েকজন কে পরীক্ষায় বসতে দেবে না বলছিল। আমি তো তোকে কিছুই বলি নি তুই কষ্ট পাবি বলে। তারপর একদিন রাস্তায় সঞ্জয় দা জিজ্ঞেস করল কেমন আছি। তখন ওকে সব বললাম। ও তখন বলল ঠিক আছে কাল আমি কলেজ যাব, আমার সঙ্গে যাবি। সঞ্জয় দা প্রিন্সিপালের সাথে কি কথা বলল কে জানে আমাদের পরীক্ষায় বসতে দিল। তারপর পরীক্ষায় পাশ করলে চাকরীটাও সঞ্জয় দার মারফতেই হয়। আমি বলেছিলাম কি খেতে চাও বলো তাই খাওয়াব। তখন বলেছিল তোর দিদি অনেক কষ্ট করে। শপিংমলে প্রচুর খাটতে হয়। বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যায়। এখন তো রাস্তা ঘাট ভালো না। তোর দিদিকে আর কষ্ট করতে দিস না।
আমি ভাইয়ের কথা শুনছি আর চোখ দিয়ে অশ্রুধারা গড়িয়েই পড়ছে।
ভাই আমাকে কাঁদতে দেখে বলল, এই দিদি তুই কাঁদছিস কেন ?
আমি ভাইকে বললাম, আমাকে ওর কাছে নিয়ে চল। ওর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে !
এখন আর কীকরে সম্ভব ? এতক্ষণে তো ফ্লাইট ছেড়ে দিয়েছে।
ভাই বলল, দিদি, তুই কি ওকে...
আমি বললাম, জানিনা। তবে ও চলে যাচ্ছে শুনে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ভাই !
# পথ #