02/07/2025
# # Dutton barir bou@@
ভোরের আলো ফুটতেই দত্তবাড়ির ছোটোগিন্নি বনমালার নিত্যদিনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। তার উপর গতকাল বনমালার একমাত্র ননদ এবং ভাসুরের মেয়ে, তারা তাদের বাপের বাড়িতে এসেছে। কাজের চাপটাও বেড়েছে বনমালার। দত্তবাড়ির জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সমস্ত কাজ একা হাতে বনমালাকেই সামলাতে হয়। হাতে হাতে সাহায্য দেওয়ার কেউ নেই! কলের পুতুলের মতো সংসারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব নিজের হাতে পালন করে যাচ্ছে বনমালা। বনমালার ভাসুর এবং তার ছেলে দোকানে যাবে। দত্তদের অনেক বড় সোনার ব্যবসা রয়েছে। পারিবারিক ব্যবসা। বাড়ির ছেলেরা বংশানুক্রমে সেই ব্যবসাতেই গিয়ে বসে।
সকালের জলখাবার খাওয়ার জন্য খাবার টেবিলে এসে উপস্থিত হলো বাড়ির সকলে। বনমালার ভাসুর প্রদীপ, প্রদীপের স্ত্রী শিউলি, তাদের দুই ছেলেমেয়ে ছেলে সুজয় ও সৃজিতা, সুজয়ের স্ত্রী অঙ্কিতা এবং প্রদীপের একমাত্র বোন পাপিয়া সবাই একসাথে খেতে বসেছে। এদিকে দক্ষ হাতে এদের খাবার পরিবেশন করে চলেছে বনমালা। লুচির টুকরোটা মুখে ঢুকিয়ে শিউলি বনমালার উদ্দেশ্যে বলল,
"বুঝলি ছোটো, কাল রাতে হৈমন্তী ফোন করেছিল। তারা এবার বিয়ের ডেটটা ফিক্সড করতে চাইছে। বিয়েটা পুজোর আগেই হবে সম্ভবত! তুই ঝুমরিকে বলে দিস।"
হাতের কাজ থামিয়ে বড় জায়ের দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে বনমালা। শিউলি খেতে খেতেই তার বাকি কথাটা শেষ করে,
"আজ ঝুমরিকে কলেজ পাঠাতে হবে না। হৈমন্তীর ছেলে ঝুমরির সাথে দেখা করতে চায়। আজ ওরা একটা কফি শপে বসে কথা বলবে! ছেলে তো এখনও আমাদের মেয়েকে সামনা-সামনি দেখেনি। আজ দেখে নিক! ওরা আজকাল যুগের ছেলেমেয়ে, ওদেরও বিয়ের আগে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে নেওয়া ভালো।"
সঙ্কোচ ভরা চোখে ভাসুরকে একবার দেখে নেয় বনমালা। তারপর একটু ঢোক গিলে মনে সাহস জুগিয়ে সে শিউলিকে বলল,
"দিদি, ঝুমরি ভীষণ কান্নাকাটি করছে। কাল সারারাত কেঁদেছে। আসলে বয়সটা তো খুবই কম। এখনই ওর বিয়ে দেওয়াটা কী ঠিক হবে? আগে অন্তত কলেজ পাশ করুক তারপর না হয়..."
বনমালার কথা অসম্পূর্ণ রেখেই মাঝ পথে প্রদীপ বলে উঠে,
"প্রকাশ চলে যাওয়ার পর আমিই ঝুমরিকে নিজের হাতে করে বড় করলাম। আমি থাকতে থাকতেই ঝুমরির একটা স্থায়ী ব্যবস্থা হয়ে যাওয়া ভালো! আমার বয়স বাড়ছে। নিজের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়েছে, ঝুমরির বিয়ে দেওয়াটাও আমার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। ছেলের বাবা-মা দু'জনেই তো বললেন, বিয়ের পর ঝুমরি যতদূর ইচ্ছে পড়তে পারবে! তাহলে অসুবিধে কোথায়? সংসারও করবে, পড়াশোনাও করবে।"
এইবার সুজয় বলল,
"কিন্তু বাবা, ঝুমরি এখনও অনেক ছোটো! এখনকার দিনে কুড়ি বছর বয়সে কোন মেয়ে বিয়ে করে? মেয়েটা আছে আমাদের মধ্যে, থাকুক না! ওর পড়াশোনার দায়িত্ব আমরাই নিতে পারি। তাতেও তো কোনো অসুবিধে নেই!"
সুজয়ের কথা শুনে ঝাঁঝ দেখিয়ে পাপিয়া বলে উঠে,
"নিজের মায়ের পেটের বোনের জন্য তোর এতো ভাবনা নেই যতটা খুড়তুতো বোনের জন্য আছে! কেন রে? বিয়ে দিলে কী হবে? বিয়ে দেওয়ার মধ্যে এখনকার-তখনকার বলে কিছু হয় না! ঝুমরি যথেষ্ট বড় হয়েছে, এবার ওকে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে। ওর বয়সে আমি মা হয়ে গেছিলাম! এই শিউলি, তোর বান্ধবীকে বল বিয়ের তারিখ ঠিক করতে। সেরকম হলে আমরা আজ থেকেই বিয়ের আয়োজন শুরু করে দেবো।"
সুজয় ফের কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তৎক্ষণাৎ চোখের ইশারায় ওকে থামিয়ে দেয় ওর স্ত্রী অঙ্কিতা। পরিবেশটাকে পুনরায় সচল করার জন্য প্রদীপের মেয়ে সৃজিতা একগাল হেসে বনমালার দিকে তাকাল,
"বাচ্চা মেয়ে! এখন কান্নাকাটি করছে, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি ওতো ভেবো না ছোটমা। হৈমন্তী কাকি আর ওনার স্বামী দু'জনেই খুব ভালো মানুষ। ওনারা তো ঝুমরিকে খুব পছন্দ করেছেন। ঝুমরির সাথেই ওনারা ওনাদের ছেলের বিয়ে দেবেন।"
ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বনমালার। ওর আর কিছু বলার নেই! স্বামী মারা যাওয়ার পর মেয়েকে নিয়ে ভাসুরের সংসারেই বনমালা পড়ে আছে। পারিবারিক ব্যবসায় বনমালার স্বামী প্রকাশের একটা ভাগ ছিল, সেটা বোধহয় বনমালা আর পাবে না। ননদ এবং ভাসুরের পরিবার কোনমতে বনমালার মেয়েকে ঘাড় নামাতে চাইছে। এর ফলে ব্যবসার পুরো অধিকারটাই তারা খুব সহজে হাতিয়ে নিতে পারবে। মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে, এ সংসারের এক কোণে পড়ে থাকবে বনমালা। যতদিন বাঁচবে, বাঁচবে! না বাঁচলেও ক্ষতি নেই। মেয়ের একটা ভালো ঘরে বিয়ে হয়ে গেলে, বনমালার মৃত্যুটা অন্তত সুখের হবে।
বেশিদূর লেখাপড়া জানে না বনমালা, পাড়া-গাঁয়ের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে সে। তার বাপের বাড়ির আর্থিক অবস্থা এখনও ভীষণ খারাপ। তবুও দেখতে একটু সুন্দর বলে শাশুড়ি নিজে পছন্দ করে বনমালাকে ছোটছেলের বৌ করে দত্ত বাড়িতে এনেছিলেন। তবে সুখ বেশিদিন বনমালার কপালে ছিল না। বিয়ের দশ বছরের মাথায় একটা রোড অ্যাকসিডেন্টে প্রকাশের মৃত্যু ঘটে। মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার দুঃসাহস বনমালার ছিল না। কোথায় যাবে? বরাবরই ঘরকুনো সে। বাইরে কাজ করে খাওয়ার মুরোদ তার নেই, এদিকে বাপের বাড়ির অবস্থাও তেমন ভালো না। অগত্যা বড় জা এবং ভাসুরের সংসারে চারবেলা পরিশ্রম করে মেয়েকে নিয়ে এই দত্তবাড়িতে পড়ে আছে বনমালা।
কষ্টে বুকটা ফেটে যায় বনমালার। ও এমনই হতভাগী যে নিজের পেটের সন্তানের ভালমন্দের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বনমালার নেই। ঝুমরির ব্যাপারে এতকাল প্রদীপ আর শিউলি যা বলে এসেছে, সেটাই হয়েছে শেষ কথা। তাদের উপর গলা চড়ানোর ক্ষমতা বনমালার কোনকালে ছিল না এবং আজও নেই। তাই নীরবে সবকিছু মেনে নিল বনমালা।
*******
মেয়ের জন্য খাবার নিয়ে দোতলার শেষপ্রান্তের ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল বনমালা। দরজার সামনে দাঁড়াতেই বনমালা দেখে, ঝুমরি আয়নার সামনে বসে চুল বাঁধছে। কলেজ যাবে সে। বছর কুড়ির ঝুমরি একেবারে ওর মায়ের মতো দেখতে। পাকা গমের মতো গায়ের রঙ, রয়েছে এক মাথা ঈষৎ বাদামী রঙের কোকড়ানো চুল। চোখদুটো টানা টানা নয়, গোল মতন। একটু গোলগাল চেহারার মেয়ে সে। তথাকথিত রোগা তাকে বলা যায় না। রসগোল্লার মতো ফুলো ফুলো গাল আর ঠোঁট! এবং ছোট্ট মুখের মধ্যেখানে বিরাজ করছে ফুটবলের মতো গোলাকার দু'খানা চোখ। এইধরনের সৌন্দর্য্যগুলোও বড্ড নজর কাড়ে। ঝুমরির ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়।
শিউলির বাপের বাড়ি ব্যারাকপুরে। ছোটবেলায় একই পাড়ায় শিউলি আর হৈমন্তী থাকত। যদিও হৈমন্তী শিউলির চেয়ে তিন বছরের ছোটো। হৈমন্তী তার একমাত্র ছেলের বিয়ে দেবে বলে মেয়ে খুঁজছে, সেই সময় শিউলি নিজের দেওরের মেয়ের সঙ্গেই বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক করে। দু'দিন আগে হৈমন্তী আর ওর স্বামী দত্তবাড়িতে এসে ঝুমরিকে দেখে গেছে। ঝুমরিকে দেখেই তারা সিদ্ধান্ত নেয়, এই মেয়ের সাথেই তারা তাদের ছেলের বিয়ে দেবে। বিশেষ করে হৈমন্তীর স্বামী অতুল, ঝুমরিকে খুব পছন্দ করেছে। শিক্ষিত, সুশ্রী, শান্ত ঘরোয়া মেয়ে ঝুমরি। এমন মেয়েকেই বক্সী দম্পতি নিজেদের পুত্রবধূ বানাতে চেয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যে তারা তাদের মনের মতো মেয়ে পেয়েও গেছে।
সবই তো ঠিক আছে কিন্তু বনমালার মনের অস্থিরতা একটুও কমেনি। এতো কম বয়সে মেয়েটাকে পর করে দিতে হবে ভেবে বড় কষ্ট হয় তার। নিজেও তো কোন ছোটো বয়সে এ বাড়িতে বিয়ে হয়ে এসে সংসারের ঘানি টেনে যাচ্ছে! ঝুমরিরও বোধহয় ভাগ্যে এমনকিছুই লেখা আছে। সত্যি বলতে কি স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে নিজের একমাত্র সন্তানের জন্য বনমালা কিচ্ছু করেনি, করার সুযোগই পায়নি! ঈশ্বর যে এতখানি অক্ষম কাউকে করতে পারেন, তা বনমালাকে দেখে বুঝতে হয়। বরাবরের মতো এবারও নিরুপায় বনমালা। মেয়ে কান্নাকাটি করছে কিন্তু তার সামনে বনমালা নিজে কাঁদতে বসলে চলবে না তাই নিজেকে সংযত করে ঘরে ঢুকে হাসতে হাসতে বনমালা বলল,....