08/03/2025
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আরো বিশদে বলতে গেলে " আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস।" আজকের এই বিশেষ দিনে আমার প্রতিবেদন সেই সকল বেতন হীন, অবসর বিহীন, নারী শ্রমিকদের নিয়ে যাদের পোশাকি নাম " হাউস ওয়াইফ" বা আরেকটু উন্নত ভাষায় " হোম মেকার"। জানি, এঁদের কে শ্রমিক আখ্যা দিলে অর্থনীতিবিদরা হাঁ হাঁ করে উঠবেন কারণ দেশের জাতীয় আয় পরিমাপের সময় " গৃহবধূর শ্রম" ( Household Service) বিষয়টি কে সযত্নে বাদ দেওয়া হয়, কারণ এর কোনো অর্থকরী দিক নেই। তবু আজ এই বিশেষ দিনটিতে এই সকল অকিঞ্চিৎকর, টেকেন ফর গ্ৰান্টেড , সমাজ সংসারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ মানুষগুলো কে নিয়ে কথা বলা না হলে দিনটির মাহাত্ম্য- ই অসূম্পর্ণ থেকে যাবে।
একজন গৃহবধূ ঠিক কি কি কাজ করেন? রান্নাবান্না? সেলাই ফোঁড়াই? ঘর গোছানো? শ্বশুর শাশুড়ির সেবা? সংসার খরচের হিসাব রাখা? ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া দেখা? বাচ্চাকে স্কুলের জন্য তৈরি করা?টিউটরের কাছে নিয়ে যাওয়া? বাচ্চাদের পেরেন্ট টিচার মিটিং অ্যাটেন্ড করা? প্রয়োজনে দোকান বাজারে যাওয়া? বাড়ির যে কাজ বাকি সদস্যরা ভীষণ ব্যস্ত বলে করার কথা ভাবতেই পারেন না, সেই কাজটি এই " কর্মহীন" মহিলাটিরই অবশ্যকর্তব্য ভেবে করা? সরি। আপনি সম্পূর্ণ সিলেবাসের মাত্র দশ শতাংশ পড়লেন। এ এক অন্তহীন সিলেবাস, জীবন ব্যাপী পরীক্ষা, আর অগণিত পরীক্ষক _ স্বামী, সন্তান, শ্বশুরবাড়ি, বাপের বাড়ি, আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী _ কে নেই সেই পরীক্ষকের তালিকায়! প্রত্যেকেই খুব কড়া পরীক্ষক, সামান্য পাশ মার্ক টুকু দিতেও বড়ই কার্পণ্য।ছেলেমেয়েরা ভালো কিছু করলে শুনবেন " আহা! অমুক বাবুর ছেলেটি একেবারে ব্রিলিয়ান্ট!" আর খারাপ কিছু হলেই " হবেনা? মায়ের কোনো শিক্ষা আছে নাকি?" ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদানে মায়ের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে যে মানুষটি সবচেয়ে তৎপর, তিনি হলেন " স্বামী"। কোনোরকম বেচাল দেখলেই সটান আক্রমণ _ " যেমন তোমার শিক্ষা, তেমনিই তো হবে!" শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সে ভদ্রলোকেরও যে কিছু ভূমিকা আছে সেকথা বেমালুম ভুলে গিয়ে তিনি এ বিষয়ে সমস্ত কৃতিত্ব টা স্ত্রীকেই দিতে চান! কারণ সে ভদ্রমহিলা তো সংসারের জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ অবধি সবকিছুই করলেও দিনের শেষে কোনো কাজের সামান্যতম ত্রুটিতে ও শুনতে বাধ্য _ " সারাদিন বাড়ি বসে বসে কি কর? এটুকুও করে রাখতে পারনা? কাজের মধ্যে তো শুধু ওই সিরিয়াল দেখা"।কখনো বা কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে রাজ্যজয়ী রাজার স্টাইলে মন্তব্য - " রোজগার তো করতে হলনা কোনোদিন, বুঝবে কি করে! বেশ আছো পায়ের উপর পা তুলে।" এসকল ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই ভদ্রলোক ভুলে যান যে পূর্ণ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও স্ত্রী চাকরি করেননি তাঁর স্বামীর বা শ্বশুরবাড়িরই একান্ত অনিচ্ছার কথা জানতে পেরে। না, আজকের স্বামীরা অনেক উদার, ভদ্র। তাঁরা কখনোই স্ত্রীর ইচ্ছার উপর সেই অর্থে জোর করে মতামত চাপিয়ে দেন না, শুধু চাকরি করলে সংসারে কি কি অসুবিধা হতে পারে সেটা বিশদে জানিয়ে দেন।আরো নির্দিষ্ট ভাবে বলতে গেলে মা চাকরি করলে সন্তানের কি কি অসুবিধা হবে সেটা জানিয়ে দেন। তিরটা ঠিক জায়গাতেই বেঁধে কারণ সন্তানের চেয়ে বড় দুর্বলতা একজন মহিলার আর কি-ই বা আছে! অতএব তিনিও " সংসার ধর্ম, সংসার কর্ম" এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে নিজের শখ- আহ্লাদ - ভালোলাগা - খারাপ লাগা সব কিছু শিকেয় তুলে নিজের জানপ্রাণ সব সঁপে দেন। হাঁ, এসব অবশ্য তিনি ভালোবেসেই করেন, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই ফাঁকি টা ধরা পড়ে। " তুমি ছাড়া সংসার অচল" বা " তোমার- ই তো সংসার" জাতীয় মধুর বাক্যে ভিজে যে ভদ্রমহিলা একদিন নিজেকে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন, হঠাৎ- ই তিনি বুঝতে পারেন তাঁর আসলে কিছুই নয়। তিনি হলেন বাড়ির বেতন হীন রাঁধুনি, মেড সার্ভেন্ট, ছেলেমেয়েদের গৃহ শিক্ষক এবং সর্বোপরি যাবতীয় দায় কাঁধে নেওয়ার লোক। সোজা কথায়, সংসারের যেদিকেই জল পড়ে সেদিকেই ছাতা ধরাই হল বাড়ির গৃহিণীর কাজ। এই কাজের কোনো নির্দিষ্ট পরিমাপ নেই, তাই এই কাজের কোনো শেষও নেই।
এর প্রতিদানে তিনি অবশ্যই তাঁর ভরণপোষণ, চিকিৎসা ইত্যাদি বেসিক সুযোগ সুবিধা গুলি পেয়ে থাকেন। আজকের উদার স্বামীরা তো আবার স্ত্রীদের হাত খরচের টাকাও দেন ( কোনো কোনো অতি হিসাবী স্বামী আবার এই হাত খরচেরও হিসাব চান, যদিও তাদের সংখ্যাটা ঠিক ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না )। ব্যাপারটা মন্দ নয় _ আলাদা আলাদা করে ওই সমস্ত কাজের জন্য পেমেন্ট করতে হলে যে বিপুল খরচ, সেটা যদি সামান্য দু' চার হাজার হাতখরচের উপর দিয়ে চলে যায় তবে মোটের উপর লাভের- ই। উপরি পাওনা অত্যন্ত দায়িত্ব সহকারে সমস্ত কাজ করা, যেটা সর্বোৎকৃষ্ট কোনো পেইড লোকও করবে না।
তা বলে এটাকে কি অত্যাচার বা শোষণ বলে অভিহিত করা যায়? কখনোই নয়। শুধু পুরুষরা কেন, অনেক মহিলাও মনে করেন যে তিনি সংসারের প্রতি বিশুদ্ধ ভালোবাসা থেকেই এইসব করে থাকেন এবং একইসঙ্গে নিজের ত্যাগ, তিতিক্ষার কথা মনে করে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। নারীকে " অতি মানবী " করে দেখাবার প্রচলন অতি প্রাচীন এবং নারীদের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজ -সংসার তাকে দিয়ে অনেক কিছুই করিয়ে নিয়েছে _সে পৌরাণিক সময়ের অসুর নিধন- ই হোক বা বর্তমানে দশভূজা রূপে সবদিক সামাল দেওয়াই হোক। কিন্তু এই আরোপিত " দেবীত্ব " যে শুধুই কার্যসিদ্ধির জন্য, সেই সত্যটা বুঝতে বুঝতে নারী কখন যেন মধ্যবয়সে পৌঁছিয়ে যায়। তখন আর ছেলে মেয়ের হোম টাস্ক করানো নেই, স্কুলে কোচিং এ পৌঁছে দেওয়ার দায় নেই,ছেলে মেয়ের খাওয়া দাওয়া , লেখা পড়া কোনো কিছুতেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই _ তখন সর্বত্রই তুমি শুধু ' বাড়তি ', ' কিচ্ছু বোঝো না ' টাইপ। আর এই সময় থেকেই শুরু হয় " মিডল এজ ক্রাইসিস" _ ডিপ্রেশন, ফ্রাসট্রেশন। শরীর মন কোনো কিছুইআর তখন ভালো লাগে না, সবকিছুতেই চূড়ান্ত হতাশা, কেবলই নেগেটিভ চিন্তা। মনে হয়, জীবন টা যদি আরেকবার নতুন করে শুরু করা যেত, হয়ে যাওয়া ভুল গুলোকে যদি শুধরে নেওয়ার উপায় থাকত! আজকে সোশ্যাল মিডিয়ার সৌজন্যে অনেকেই আবার পুরণো বন্ধু বান্ধবের সাথে সংযোগ স্থাপন করেন, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন, নিজেকে ভালো রাখার আরো অনেক কিছু উপায় খুঁজে বার করেন _ কিন্তু আদতে পুরোটাই " দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো", ভুলে থাকার চেষ্টা। তাই আজকের বিশেষ দিনে সবার কাছে অনুরোধ _ নিজেকে ভালোবাসুন, নিজেকে সময় দিন, নিজের জন্য একটা খোলা জানলা রাখুন , নিজেকে দেবী না ভেবে মানুষ ভাবতে শিখুন_ কারণ মনে রাখবেন,আপনি নিজে ভালো না থাকলে অন্যকেও কিন্তু ভালো রাখতে পারবেন না। তাই এখনের স্লোগান হোক " সংসার সুখের হয় রমণীর সুখে" । তবেই তো আমরা বলতে পারব " হ্যাপি উইমেন্স ডে "।