চোখের আলোয়

চোখের আলোয় social issues

08/03/2025

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আরো বিশদে বলতে গেলে " আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস।" আজকের এই বিশেষ দিনে আমার প্রতিবেদন সেই সকল বেতন হীন, অবসর বিহীন, নারী শ্রমিকদের নিয়ে যাদের পোশাকি নাম " হাউস ওয়াইফ" বা আরেকটু উন্নত ভাষায় " হোম মেকার"। জানি, এঁদের কে শ্রমিক আখ্যা দিলে অর্থনীতিবিদরা হাঁ হাঁ করে উঠবেন কারণ দেশের জাতীয় আয় পরিমাপের সময় " গৃহবধূর শ্রম" ( Household Service) বিষয়টি কে সযত্নে বাদ দেওয়া হয়, কারণ এর কোনো অর্থকরী দিক নেই। তবু আজ এই বিশেষ দিনটিতে এই সকল অকিঞ্চিৎকর, টেকেন ফর গ্ৰান্টেড , সমাজ সংসারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ মানুষগুলো কে নিয়ে কথা বলা না হলে দিনটির মাহাত্ম্য- ই অসূম্পর্ণ থেকে যাবে।

একজন গৃহবধূ ঠিক কি কি কাজ করেন? রান্নাবান্না? সেলাই ফোঁড়াই? ঘর গোছানো? শ্বশুর শাশুড়ির সেবা? সংসার খরচের হিসাব রাখা? ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া দেখা? বাচ্চাকে স্কুলের জন্য তৈরি করা?টিউটরের কাছে নিয়ে যাওয়া? বাচ্চাদের পেরেন্ট টিচার মিটিং অ্যাটেন্ড করা? প্রয়োজনে দোকান বাজারে যাওয়া? বাড়ির যে কাজ বাকি সদস্যরা ভীষণ ব্যস্ত বলে করার কথা ভাবতেই পারেন না, সেই কাজটি এই " কর্মহীন" মহিলাটিরই অবশ্যকর্তব্য ভেবে করা? সরি। আপনি সম্পূর্ণ সিলেবাসের মাত্র দশ শতাংশ পড়লেন। এ এক অন্তহীন সিলেবাস, জীবন ব্যাপী পরীক্ষা, আর অগণিত পরীক্ষক _ স্বামী, সন্তান, শ্বশুরবাড়ি, বাপের বাড়ি, আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী _ কে নেই সেই পরীক্ষকের তালিকায়! প্রত্যেকেই খুব কড়া পরীক্ষক, সামান্য পাশ মার্ক টুকু দিতেও বড়ই কার্পণ্য।ছেলেমেয়েরা ভালো কিছু করলে শুনবেন " আহা! অমুক বাবুর ছেলেটি একেবারে ব্রিলিয়ান্ট!" আর খারাপ কিছু হলেই " হবেনা? মায়ের কোনো শিক্ষা আছে নাকি?" ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদানে মায়ের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে যে মানুষটি সবচেয়ে তৎপর, তিনি হলেন " স্বামী"। কোনোরকম বেচাল দেখলেই সটান আক্রমণ _ " যেমন তোমার শিক্ষা, তেমনিই তো হবে!" শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সে ভদ্রলোকেরও যে কিছু ভূমিকা আছে সেকথা বেমালুম ভুলে গিয়ে তিনি এ বিষয়ে সমস্ত কৃতিত্ব টা স্ত্রীকেই দিতে চান! কারণ সে ভদ্রমহিলা তো সংসারের জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ অবধি সবকিছুই করলেও দিনের শেষে কোনো কাজের সামান্যতম ত্রুটিতে ও শুনতে বাধ্য _ " সারাদিন বাড়ি বসে বসে কি কর? এটুকুও করে রাখতে পারনা? কাজের মধ্যে তো শুধু ওই সিরিয়াল দেখা"।কখনো বা কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে রাজ্যজয়ী রাজার স্টাইলে মন্তব্য - " রোজগার তো করতে হলনা কোনোদিন, বুঝবে কি করে! বেশ আছো পায়ের উপর পা তুলে।" এসকল ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই ভদ্রলোক ভুলে যান যে পূর্ণ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও স্ত্রী চাকরি করেননি তাঁর স্বামীর বা শ্বশুরবাড়িরই একান্ত অনিচ্ছার কথা জানতে পেরে। না, আজকের স্বামীরা অনেক উদার, ভদ্র। তাঁরা কখনোই স্ত্রীর ইচ্ছার উপর সেই অর্থে জোর করে মতামত চাপিয়ে দেন না, শুধু চাকরি করলে সংসারে কি কি অসুবিধা হতে পারে সেটা বিশদে জানিয়ে দেন।আরো নির্দিষ্ট ভাবে বলতে গেলে মা চাকরি করলে সন্তানের কি কি অসুবিধা হবে সেটা জানিয়ে দেন। তিরটা ঠিক জায়গাতেই বেঁধে কারণ সন্তানের চেয়ে বড় দুর্বলতা একজন মহিলার আর কি-ই বা আছে! অতএব তিনিও " সংসার ধর্ম, সংসার কর্ম" এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে নিজের শখ- আহ্লাদ - ভালোলাগা - খারাপ লাগা সব কিছু শিকেয় তুলে নিজের জানপ্রাণ সব সঁপে দেন। হাঁ, এসব অবশ্য তিনি ভালোবেসেই করেন, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই ফাঁকি টা ধরা পড়ে। " তুমি ছাড়া সংসার অচল" বা " তোমার- ই তো সংসার" জাতীয় মধুর বাক্যে ভিজে যে ভদ্রমহিলা একদিন নিজেকে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন, হঠাৎ- ই তিনি বুঝতে পারেন তাঁর আসলে কিছুই নয়। তিনি হলেন বাড়ির বেতন হীন রাঁধুনি, মেড সার্ভেন্ট, ছেলেমেয়েদের গৃহ শিক্ষক এবং সর্বোপরি যাবতীয় দায় কাঁধে নেওয়ার লোক। সোজা কথায়, সংসারের যেদিকেই জল পড়ে সেদিকেই ছাতা ধরাই হল বাড়ির গৃহিণীর কাজ। এই কাজের কোনো নির্দিষ্ট পরিমাপ নেই, তাই এই কাজের কোনো শেষও নেই।
এর প্রতিদানে তিনি অবশ্যই তাঁর ভরণপোষণ, চিকিৎসা ইত্যাদি বেসিক সুযোগ সুবিধা গুলি পেয়ে থাকেন। আজকের উদার স্বামীরা তো আবার স্ত্রীদের হাত খরচের টাকাও দেন ( কোনো কোনো অতি হিসাবী স্বামী আবার এই হাত খরচেরও হিসাব চান, যদিও তাদের সংখ্যাটা ঠিক ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না )। ব্যাপারটা মন্দ নয় _ আলাদা আলাদা করে ওই সমস্ত কাজের জন্য পেমেন্ট করতে হলে যে বিপুল খরচ, সেটা যদি সামান্য দু' চার হাজার হাতখরচের উপর দিয়ে চলে যায় তবে মোটের উপর লাভের- ই। উপরি পাওনা অত্যন্ত দায়িত্ব সহকারে সমস্ত কাজ করা, যেটা সর্বোৎকৃষ্ট কোনো পেইড লোকও করবে না।
তা বলে এটাকে কি অত্যাচার বা শোষণ বলে অভিহিত করা যায়? কখনোই নয়। শুধু পুরুষরা কেন, অনেক মহিলাও মনে করেন যে তিনি সংসারের প্রতি বিশুদ্ধ ভালোবাসা থেকেই এইসব করে থাকেন এবং একইসঙ্গে নিজের ত্যাগ, তিতিক্ষার কথা মনে করে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। নারীকে " অতি মানবী " করে দেখাবার প্রচলন অতি প্রাচীন এবং নারীদের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজ -সংসার তাকে দিয়ে অনেক কিছুই করিয়ে নিয়েছে _সে পৌরাণিক সময়ের অসুর নিধন- ই হোক বা বর্তমানে দশভূজা রূপে সবদিক সামাল দেওয়াই হোক। কিন্তু এই আরোপিত " দেবীত্ব " যে শুধুই কার্যসিদ্ধির জন্য, সেই সত্যটা বুঝতে বুঝতে নারী কখন যেন মধ্যবয়সে পৌঁছিয়ে যায়। তখন আর ছেলে মেয়ের হোম টাস্ক করানো নেই, স্কুলে কোচিং এ পৌঁছে দেওয়ার দায় নেই,ছেলে মেয়ের খাওয়া দাওয়া , লেখা পড়া কোনো কিছুতেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই _ তখন সর্বত্রই তুমি শুধু ' বাড়তি ', ' কিচ্ছু বোঝো না ' টাইপ। আর এই সময় থেকেই শুরু হয় " মিডল এজ ক্রাইসিস" _ ডিপ্রেশন, ফ্রাসট্রেশন। শরীর মন কোনো কিছুইআর তখন ভালো লাগে না, সবকিছুতেই চূড়ান্ত হতাশা, কেবলই নেগেটিভ চিন্তা। মনে হয়, জীবন টা যদি আরেকবার নতুন করে শুরু করা যেত, হয়ে যাওয়া ভুল গুলোকে যদি শুধরে নেওয়ার উপায় থাকত! আজকে সোশ্যাল মিডিয়ার সৌজন্যে অনেকেই আবার পুরণো বন্ধু বান্ধবের সাথে সংযোগ স্থাপন করেন, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন, নিজেকে ভালো রাখার আরো অনেক কিছু উপায় খুঁজে বার করেন _ কিন্তু আদতে পুরোটাই " দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো", ভুলে থাকার চেষ্টা। তাই আজকের বিশেষ দিনে সবার কাছে অনুরোধ _ নিজেকে ভালোবাসুন, নিজেকে সময় দিন, নিজের জন্য একটা খোলা জানলা রাখুন , নিজেকে দেবী না ভেবে মানুষ ভাবতে শিখুন_ কারণ মনে রাখবেন,আপনি নিজে ভালো না থাকলে অন্যকেও কিন্তু ভালো রাখতে পারবেন না। তাই এখনের স্লোগান হোক " সংসার সুখের হয় রমণীর সুখে" । তবেই তো আমরা বলতে পারব " হ্যাপি উইমেন্স ডে "।

26/02/2025

কয়েক বছর আগেও বেশ কিছু বাড়িতে গেলে দেওয়ালে একটি সূচী শিল্প বাঁধানো দেখা যেত, যাতে লেখা থাকত _ " সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে" । সাধারণতঃ যিনি বাড়ির প্রবীণা সদস্যা তিনি তার বিবাহের প্রস্তুতি পর্বে পাত্রপক্ষের কাছে নিজের গুণাবলীর প্রমান স্বরূপ এই শিল্পকলার চর্চা করে থাকতেন। এছাড়াও " পতি পরম গুরু"বা " পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য " জাতীয় লেখাও কোথাও কোথাও দেখতে পাওয়া যেত। অর্থাৎ সংসার সুখে রাখার দায়িত্ব শুধুই রমণীর, রমণরা সে দায়িত্ব থেকে মুক্ত, স্বামীরা সংসারে স্ত্রীর সহযোদ্ধা নন, তিনি উচ্চাসনে বসে থাকা
স্ত্রীর গুরু স্থানীয় ব্যক্তি এবং স্ত্রীর পৃথক কোনো স্বত্বা নেই, স্বামীর পুণ্যেরই তিনি অংশীদার _ ( স্বামীর " পাপ" এর কথাটা আর তুললাম না, কারণ স্বামীরা কোনো পাপ করেন না ) এইসব সুশিক্ষা একটি মেয়েকে অতি ছোটবেলা থেকেই দিয়ে তার মনে ধারণাগুলো কে স্থায়ী করে দেওয়া হত।বর্তমানে অবশ্যই এই জাতীয় ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে, স্ত্রীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বামীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জীবনযুদ্ধ চালাচ্ছেন, তাঁদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন ও সামাজিক সম্মান উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে, তবু আজও সংসারে সম যোগ্যতার নারী - পুরুষ সম মর্যাদা পান কি? আসুন, একটু দেখে নেওয়া যাক।
আমাদের সামাজিক পরিকাঠামোয় আজও মানুষের মনে বদ্ধ ধারণা আছে যে মেয়েরা যতই লেখাপড়া শিখুক বা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে যতই কৃতিত্বের পরিচয় দিক না কেন, গৃহস্থালীর কাজ তাকে শিখতেই হবে। গৃহস্থালীর কাজ শেখার মধ্যে কোনো আপত্তির ব্যাপার নেই, আবার এটাকে মহিমান্বিত করারও তেমন কোনো প্রয়োজন নেই।যেটা আপত্তিজনক সেটা হল যে এই কাজটি মেয়েদের ক্ষেত্রে যেমন আবশ্যিক, ছেলেদের ক্ষেত্রে নয় কেন? "*গৃহ*"টা তো দুজনেরই, তবু আজও এই বিষয়ের মূল দায়টা শুধু মেয়েদের উপরই চাপিয়ে দেওয়া হবে কেন? আজকের পুরুষরা অনেকেই স্ত্রীদের সাথে গৃহকর্মে হাত লাগান ঠিকই, কিন্তু সেটা হল তাদের স্ত্রীদের "*সাহায্য*" করা, অবশ্যপালনীয় কর্তব্য নয়। পরিবার প্রতিবেশীরা কিঞ্চিৎ ঈর্ষান্বিত সুরে বলেন - " ভাগ্য করে স্বামী পেয়েছ! তোমাকে কত সাহায্য করে! " কই, কখনো তো কোনো স্ত্রী সাংসারিক কাজ করলে এর উল্টো কথা বলতে শুনিনা! সেদিনও একজন ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা দুজনেই একসাথে অফিস থেকে ফিরছিলেন। স্টেশনে নামার পর ভদ্রলোকের এক বন্ধু তাকে চায়ের দোকানে চা খেতে আমন্ত্রণ জানালে ভদ্রলোক স্ত্রী কে ইশারায় দেখিয়ে জানান যে সঙ্গে স্ত্রী থাকায় আজ আর অফিস ফেরৎ দৈনন্দিন চায়ের আসরে বসা সম্ভব নয়। সাথে সাথে মন্তব্য ভেসে আসে " ও, আজকে তো চা করার লোক সঙ্গে করেই নিয়ে যাচ্ছিস।"হয়তো নিছকই মজা করেই বলা, কিন্তু মনের মধ্যে কি বদ্ধমূল ধারণা যে একই সময়ে একই ধরণের পরিশ্রম করে ফেরা স্বামী স্ত্রীর মধ্যে, চা করার দায়িত্ব টা শুধু স্ত্রী- রই। এক ব্যস্ত সন্ধ্যায় স্টেশনে দাঁড়িয়ে পরপর কয়েকটি ট্রেন থেকে নামা যাত্রীদের লক্ষ্য করছিলাম। অফিস ফেরতা ক্লান্ত নারী পুরুষের ঢল _ খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম যে মহিলারা প্রত্যেকেই পড়ি কি মরি করে ছুটছে টোটো বা অটো ধরার জন্য যাতে যত তাড়াতাড়ি পারে বাড়ি পৌঁছতে পারে। সেখানে পুরুষরা বেশিরভাগই দাঁড়িয়ে হয় গল্প করছেন, নয়তো চায়ের দোকানে ছোটখাটো আড্ডা জমাচ্ছেন। সারাদিন পরিশ্রম করে এসে এটুকু রিলাক্সেশন তো তাদের প্রাপ্য হয়, তাই না? মহিলাদের অবশ্য কোনো ক্লান্তি লাগে না_ একে তো বেশিরভাগই যায় সব শখের চাকরি করতে, বরের যথেষ্ট রোজগারের পরও স্বাবলম্বনের পোকা মাথায় ঢুকলে তার দায় তো নিজেকেই নিতে হবে, এই ছুতোয় তো আর ঘরসংসার অবহেলা করলে চলবে না! আর যারা নিতান্তই অর্থনৈতিক কারণেই চাকুরিজীবী, তাদের তো কথাই নেই। ঘর - বা'র একসঙ্গে সমান দক্ষতায় চালাতে পারলে, তবেই তো তুমি আদর্শ নারী। বিজ্ঞাপনে দেখেন না বলিউডের সুন্দরী তারকা বলছেন " আমরা নারী, আমরা সব পারি।" না, আমরা সব পারি না, নারী বা পুরুষ পরিচয়ের আগেও আমরা একজন মানুষ। তাই একজন স্বাভাবিক মানুষ ঠিক যতটা পারেন, আমরাও ঠিক ততটাই পারি। আমাদের উপর ' অতি মানুষের ' তকমা আরোপ করে সাধ্যাতিরিক্ত বোঝা চাপানো এবার বন্ধ হোক। চাকুরিজীবী পুরুষ মানেই ছুটির দিন সামান্য সময় হলেও আড্ডা, ক্লাব। সেখানে চাকুরিরতা মহিলার ছুটির দিন মানেই সারা সপ্তাহের ফেলে রাখা কাজ কিভাবে শেষ করা যায়, তার ব্যবস্থা করা। জানি, এসব কথা বললেই আপনার কপালে জুটবে " নারীবাদী " তকমা, যেটা মনে হয় " মাওবাদী"র থেকেও ভয়ঙ্কর। কারণ অন্য মহিলাদের ড্যাশিপুসি দেখতে যতই ভালো লাগুক, দিনের শেষে নিজের স্ত্রী কে কিন্তু হতে হবে সাবমিসিভ, বাধ্য, অনুগত। তা না হলে বাংলা ভাষার অবস্থা দেখুন না _ স্ত্রী যদি স্বামীগত প্রাণ হন, তবে তিনি " পতিব্রতা", যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। অপরপক্ষে, স্বামী যদি স্ত্রীর কথা শুনে চলেন তবে তিনি " স্ত্রৈণ", যা অত্যন্ত লজ্জা ও নিন্দার। একইভাবে " সৎ" শব্দটি ব্যবহৃত হয় ইংরাজি " honest" শব্দটির প্রতিশব্দ হিসেবে, অথচ" সৎ " শব্দটির স্ত্রী লিঙ্গ হল " সতী " অর্থাৎ যিনি নিজের স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না। " সৎ " শব্দটিতে কিন্তু কোথাও স্ত্রীর প্রতি অনুগত পুরুষ বোঝায় না। জানি না, বাংলা ভাষার চর্চাকারী রা এটা লক্ষ্য করেছেন কি না। আজ তাই সময় এসেছে ভাষা, ভাবনা ও যাপন কে নতুন আঙ্গিকে দেখার। নারী পুরুষের সমানাধিকার তখন আর তাহলে শুধু কথার কথা থাকবে না, প্রকৃতপক্ষেই বাস্তবায়িত হবে

19/02/2025

শুভ্রাকে তার সহকর্মীরা একটু সমঝেই চলে। এমনিতে শুভ্রা খুবই ভালো মানুষ _ শিক্ষিতা, ভালো বক্তা এবং অসম্ভব পরোপকারী। কিন্তু মেজাজ টি কিঞ্চিৎ উচ্চ গ্ৰামের। কন্ঠটিও জোরদার, যাকে তাকে যৎপরোনাস্তি হক্ কথা শুনিয়ে দিতে তিনি দ্বিধা করেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই কথা ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করে, উদ্দিষ্ট ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট সকলকেই যথেষ্ট অস্বস্তিতে ফেলে _ কিন্তু শুভ্রা এই বিষয়ে নির্বিকার। তিনি যে উচিৎ (?) কথা বলতে ছাড়েন না এবং প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক সকলের সব বিষয়ে মাথা গলিয়ে সে বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত দিতে পারেন, একথা ভেবে তিনি খুবই আত্মতৃপ্তি লাভ করেন।সহকর্মীরা খুবই বিবেচক, আড়ালে আবডালে নিজেদের মধ্যে এই নিয়ে হাসি মশকরা করলেও কেউ কিছু তেমন সিরিয়াসলি নেয় না।
সুনীতাদি ' স্কুলে চাকরি করেন। সর্বদাই তার মনের মধ্যে একটা আশঙ্কা কাজ করে যে কর্তৃপক্ষ এবং সহকর্মীরা সকলেই তাকে সবসময় বিপদে ফেলার জন্য তৎপর হয়ে রয়েছে। শুধু বাইরের লোক নয়, পরিবারের লোকজন, পাড়া প্রতিবেশী এমনকি সহযাত্রীরাও সব্বাই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, তাকে নিয়ে বিরূপ আলোচনা করছে। পৃথিবীর যা কিছু খারাপ, সব শুধু তার সাথেই হয় এবং তার মত দুর্ভাগ্য আর কারোর নেই। বলা বাহুল্য, এগুলোর কোনোটারই বাস্তব সত্যতা নেই। তা সে যাই হোক, সুনীতাদি ' তার বিরুদ্ধে হওয়া এইসব অবিচারের যোগ্য জবাব সবাইকেই দেন।ফলে প্রায় প্রত্যেকের কাছেই তিনি অপ্রিয়, খুব প্রয়োজন না হলে কেউ তার সাথে তেমন মেলামেশা করতে চায় না। অথচ সুনীতাদি ' যে মানুষ হিসাবে খারাপ, সে কথা কিন্তু বলা যায় না। লোকের আপদে বিপদে যথেষ্ট এগিয়ে আসেন, সাধ্যমত সাহায্য করেন। কিন্তু সব কিছুর মধ্যেই একটা তীব্রতা, উগ্ৰতা লক্ষ্য করা যায়। তাই খুব প্রয়োজন না হলে তার সাহায্য নিতেও লোকে অপছন্দ করে।
রিয়া একজন বছর পঁচিশের তরুণী। কিন্তু ইচ্ছে করে সে তার পোশাক আশাক, চালচলন সব কিছুতে পুরুষের অনুকরণ করে। না, না, রিয়া কোনো তৃতীয় লিঙ্গের বা অন্য কোনো বিশেষ ধরণের মানুষ নয়, সে একশো শতাংশ - ই নারী। কিন্তু পৃথিবীর তাবৎ নারীদের প্রতি রাগে ( পড়ুন, অভিমানে ) , সে নিজের নারী স্বত্বাকেই অস্বীকার করতে চায়। চলনে বলনে সে এমন একটা পুরুষালি ভাব ধারণ করে ( অর্থাৎ মস্তানি দেখায়) যে তার বান্ধবীরা সবাই তাকে বেশ সমঝে চলে।স্কুলে পড়াকালীন সে ক্লাসের মধ্যে স্বঘোষিত নেত্রী ছিল। তার 'দাদাগিরির' চোটে ক্লাসের মেয়েরা সব তটস্থ, নালিশ করারও উপায় নেই, রিয়ার বলিষ্ঠ হাতের মার কে সবাই ভয় পায়। ফলে অচিরেই এই ছোট্ট মেয়েটি সর্বত্র জোর করে আধিপত্য বজায় রাখতে চাইলেও আদপে একেবারেই বন্ধুহীন।
শুভ্রা, সুনীতা, রিয়া এরকম আরো কত নাম চারিদিকে ছড়িয়ে আছে যাদের মধ্যে একটা যোগসূত্র হল যে এরা প্রত্যেকেই দুর্মুখ, সমাজ ও সংসারের প্রতি এদের একটা অসম্ভব তীব্র ক্ষোভ আছে এবং প্রয়োজন অপ্রয়োজনে তার বহিঃপ্রকাশও ঘটে ।না, আরেকটা সাদৃশ্যও আছে _ এরা প্রত্যেকেই আমাদের তথাকথিত সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে কুশ্রী, কুরূপা। যদিও মানুষের দৈহিক সৌন্দর্য কোনোদিনই তার হাতে নেই, তবুও এই বিষয়টা নিয়ে তাকে নির্মম, বর্বর ভাবে আক্রমণ করতে মানুষ একটুও ভাবে না।একটি কিশোরী মেয়েকে ( মূলতঃ মেয়েরাই এর শিকার, যদিও কখনো কখনো ছেলেরাও এর হাত থেকে রেহাই পায়না) কি অবলীলায় তার গায়ের রং, উচ্চতা, মুখশ্রীর সৌন্দর্য এই রকমের বিভিন্ন বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করা যায়! কখনো পোশাক নির্বাচনের সময় - " না, না,ঐ রংটা তোর গায়ের রংয়ের সঙ্গে যাবে না, কালোদের ওটা মানায় না " , কখনো বা পরিচিত জনের সহানুভূতির মোড়কে নির্মমতা - " এ মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে তো বেশ বেগ পেতে হবে দেখছি " বা দেখা হলেই - " বাপরে, দিন দিন একেবারে হাতির মতো মোটা হচ্ছিস " _ এরকম হাজারো অপমানকর মন্তব্যের ঝড় বয়ে যায়। একবারও কেউ ভেবে দেখে না একটি কিশোরী বা তরুণী এই সব শুনে কিভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়, তার মনোজগতে এর কি অসীম প্রভাব পড়ে! তার আত্মবিশ্বাস কমে যায়, হীনমন্যতা বোধ আসে, সামাজিক মেলামেশা করতে সে আড়ষ্ট বোধ করে এবং ক্রমশঃ নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে থাকে।তারই ফলস্বরূপ পরবর্তী জীবনে সে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, যে সমাজ তাকে একদা হেয় করেছে সেই সমাজের প্রতি তার প্রতিশোধস্পৃহা জাগে। তখন আমরা তাকে অভদ্র বলি, তাকে নিয়ে সমালোচনা করি _ কিন্তু কেউ একবারও ভেবে দেখি কি এর পিছনে কারণ টা কি আছে? কেন আজকের দিনে দাঁড়িয়েও একটি মেয়ের মূল্যায়ন শুধুমাত্র তার গায়ের রং বা অন্যান্য দৈহিক সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে করা হবে? কেন তার মেধা, মনন গুরুত্ব পাবে না? অত্যন্ত কৃতি মেয়েও যদি তথাকথিত সুন্দরী না হয়, তাহলে তারও বিয়ে দিতে সমস্যা হয়? এই " বডি শেমিং" ( যথার্থ বাংলা প্রতিশব্দ টি আমার জানা নেই) আর কতদিন আমরা মেনে নেব? যিনি এই কাজ টা করছেন,' শেম ' তো তার পাবার কথা! তার বদলে একটি নিরীহ মেয়ে কেন এর শিকার হয়ে তার জীবন তছনছ করবে? ভাবুন, ভাবার সময় হয়েছে।

12/02/2025

সুপর্ণা দাশগুপ্ত কে একজন রীতিমত শিক্ষিতা মহিলা বলা যায়। ছয়ের দশকে এম. এ. বি. এড. পাশ, তা-ও একজন মহিলা, বিশেষ দেখা যেত না। তাই সেই সময়ের নিরিখে সুপর্ণা অবশ্যই উচ্চশিক্ষিতা। সুপর্ণা নিজেও এই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। সে কারণেই কারোর সাথে মতানৈক্য হলেই তিনি তাকে " অশিক্ষিত, আনকালচার্ড " বলে থাকেন। সুপর্ণা স্বেচ্ছায় চাকরি বাকরি করেন নি। তিনি আকণ্ঠ সংসারী - নিজের পরিবারে দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে থাকাটাই তাঁর জীবনের প্রিয় ব্যসন।
শ্বশুর শাশুড়ি বিহীন শ্বশুরবাড়িতে বিয়ে হয়ে এসে সুপর্ণা কে বছর দুয়েক ভাসুর জায়ের অভিভাবকত্বে সংসার করতে হয়েছিল। সেই দুবছরের দুঃসহ (?) কষ্টের স্মৃতি তিনি সারাজীবন মনে রেখেছেন এবং সময় সুযোগ পেলেই সকলকে এ বিষয়ে গল্প করে জানিয়ে দেন যে জীবনে কত কষ্ট- ই না তিনি করেছেন। স্বামীটি অত্যন্ত সজ্জন, স্ত্রীর সমব্যথী। তাই স্ত্রীর সম্মান ও মানসিক শান্তির কথা ভেবে স্বতন্ত্র পরিবারে থাকার উপযোগী যথেষ্ট আয় না থাকলেও সেই ব্যবস্থা করেন।নিজস্ব সংসারে সুপর্ণা একচ্ছত্র কর্ত্রী এবং বলতে গেলে তিনিই এই সংসারের প্রধান চালিকাশক্তি। বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় সুপর্ণা এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন
মেয়ে হওয়ায় দুজনেই যথেষ্ট খুশি হলেও একটা ছেলে না থাকলে সংসার ঠিক পূর্ণ হয়না, বংশ রক্ষা হয়না - এই সব ভাবনা থেকেই সম্ভবতঃ তারা দ্বিতীয় সন্তানের পরিকল্পনা করেন এবং ভগবানের অসীম কৃপায় এবার একটি পুত্র সন্তান জন্মায়। সুপর্ণা অবশ্য খুবই উদারচেতা মানুষ। প্রকাশ্যে তিনি সারাজীবন ই সবাইকে বলে এসেছেন যে 'ছেলে' 'ছেলে'করে তার অন্য মহিলাদের মত অবসেশান নেই,তার দ্বিতীয় সন্তানটি মেয়ে হলেও তার কোনো অসুবিধা ছিল না।
তা সে যাই হোক, ছেলেটি সামান্য বড় হতেই সুপর্ণা মেয়েকে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন যে সে এখন কিন্তু বড় দিদি, তাই এখন থেকে আর কোনো আবদার বা বায়না করা তাকে মানাবে না। যা কিছু ভালো ভালো, সেগুলো এখন সব ভাইয়ের প্রাপ্য, কারণ মেয়েটি তো গত চার পাঁচ বছর ধরে এগুলো পেয়েই এসেছে, এখন ভাইকে এসব না দিলে সে দিদিকে ভালোই বাসবে না। মেয়েটি তো আহ্লাদে ডগোমগো, একে তো দিদি হয়ে পদোন্নতি হয়েছে, তায় আবার ভাইয়ের ভালোবাসা পাওয়ার এত সহজ একটা রাস্তা আছে!
সেই সেদিন থেকে শুরু হল মেয়েটির ছাড়ার গল্প _ মহত্বের লোভ দেখিয়ে চলল তার একের পর এক ত্যাগের পালা। মায়ের পাশে শোওয়া ছাড়তে হল,ভালো খাবার, ভালো পোশাকের অভ্যাস ছাড়তে হল, এমনকি লেখাপড়ার জন্য নতুন বই কেনার আশাও ছাড়তে হল, পুরণো বই দিয়েই কাজ চালানো শিখতে হল। না, সেদিন কিন্তু মেয়েটা এগুলো ছেড়ে দিতে হয়েছে বলে একটুও দুঃখিত হয়নি, কারণ তাকে লোকের প্রশংসা পাওয়ার এক দারুণ লোভ দেখানো হয়েছিল । একটি ছোট্ট বাচ্চার ব্রেন ওয়াশ করে এটাই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে এসব না করলে বড়ই নিন্দা হবে আর লোক নিন্দার মত খারাপ কি-ই বা আছে! ভাইয়ের হাতে মার খেয়ে নালিশ করার রাস্তাও বন্ধ ছিল, কারণ সুপর্ণা সব সময়ই বলতেন দিদিরা ভাইয়ের হাতে মার না খেলে সত্যি সত্যি দিদি হয়ে উঠতে পারে না। তাই দিদি হওয়ার প্রবল আকাঙ্খায় বোকা মেয়েটা সেই থেকে সবেতেই শুধু চুপ করে থাকতে শিখল।
ছেলে মেয়ে দুজনেই লেখাপড়ায় ভালো, সুপর্ণা তাদের নিয়ে যথেষ্ট গর্বিত। কিন্তু তিনি অনেক পরিশীলিত মানুষ, বোকার মত সরাসরি কোনো গর্ব প্রকাশ করেন না, তবে কথার ফাঁকে ফাঁকে তাদের সাফল্যের কথা এবং অবশ্যই এই সাফল্যের কৃতিত্ব যে তাঁরই প্রাপ্য সেটা জানিয়ে দেন। তবে যে বিষয়টা তিনি জানান না তা হল ভাইয়ের পড়াশোনার যা কিছু দেখভাল, তার দায়িত্ব তিনি মেয়ের হাতেই তুলে দিয়েছেন - যদিও মেয়েটিও তখন নেহাৎই ছাত্রী। না, দুই ভাই বোনের কারোরই কোনো গৃহশিক্ষক ছিল না, কারণ সুপর্ণার মতে গৃহশিক্ষক তাদেরই প্রয়োজন যারা লেখাপড়ায় দুর্বল। ভালো ছাত্র ছাত্রীরা গৃহশিক্ষকের সাহায্য ছাড়াই ভালো রেজাল্ট করবে এবং সেখানেই তাদের ক্রেডিট। মেয়েটি যেহেতু বড়, তাই তাকে পড়ায় সাহায্য করার কেউ নেই, ভালো ছাত্রী হওয়ার সুবাদে স্কুলের শিক্ষিকাদের অনুরোধ করে, এমনকি তাদের বাড়ি অবধি গিয়ে সে তার পড়াশোনা জেনে নেয়, কিন্তু ভাইটির ক্ষেত্রেও নিজের পড়াশোনার সময় থেকে যেভাবেই হোক সময় বার করে নোটস্ বানানো, প্রশ্নপত্র তৈরি করে দেওয়া, খাতা কারেকশন করা এসব সমস্ত বিষয়ই তাকেই করতে হত।তার জন্য হয়তো তার নিজের অবসরের সামান্য সময়টুকুও তাকে ত্যাগ করতে হত, তবু এই নিয়ম লঙ্ঘনের কোনো উপায় ছিল না। না, না, সুপর্ণা কোনো জোরাজোরি করতেন এ অপবাদ কখনোই দেওয়া যাবে না। তিনি শুধু মেয়ের কাছে তাঁর দেখা বিখ্যাত সব " মহান " দিদিদের গল্প শোনাতেন, যারা শুধু ভাইকে মানুষ করবে বলে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছে। বলা বাহুল্য, এইসব ' দিদি ' দের শুধুমাত্র সুপর্ণা - ই চিনতেন, বাস্তবে এদের কোনো অস্তিত্ব আছে কিনা,তা যথেষ্ট সন্দেহজনক। সুপর্ণার বুদ্ধির তারিফ না করে উপায় নেই _ কি সুন্দর সম্পূর্ণ অহিংস পদ্ধতিতে তিনি একটি কিশোরী মেয়ের মগজ ধোলাই করে তাঁর স্বার্থসিদ্ধি করে নিলেন!
মেয়েটি মাধ্যমিক পরীক্ষা দিল। তৎকালীন ধারণা অনুযায়ী সমস্ত ভালো ছাত্র ছাত্রীরা সায়েন্স নিয়েই পড়বে, এটা স্বতঃসিদ্ধ ছিল। সুপর্ণাও তাই পরীক্ষা শেষ হওয়ার সামান্য কয়েকদিন পরেই মেয়েকে পড়াশোনা শুরু করার নির্দেশ দিলেন এবং উচ্চমাধ্যমিকে সায়েন্স যে গৃহশিক্ষক ছাড়া পড়া প্রায় অসম্ভব, সেটা স্বীকার করে চারজন গৃহশিক্ষকের ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু গোল বাঁধলো মাসের শেষে। এতজন শিক্ষক কে পারিশ্রমিক দিতে গিয়ে তিনি অনুভব করলেন বড্ড বেশি খরচ হয়ে যাচ্ছে, বিশেষতঃ ছেলেটিও আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মাধ্যমিক দেবে _ মেয়ের পিছনে খরচ না করলেও ছেলের বেলা সেটা করা সম্ভব নয় কারণ ওটা এক ধরণের ইনভেস্টমেন্ট। তাই এবারও সুপর্ণা মেয়েটিকে খুব সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে আর্টস নিয়ে পড়লেও ভবিষ্যতে অনেক সুযোগ আছে। সেই ইন্টারনেট বিহীন যুগে এ কথা যাচাই করার অন্য কোনো উপায়ও ছিল না, বড়দের কথাই ছিল বেদবাক্য। ফলে রীতিমত উজ্জ্বল রেজাল্ট করা মেয়েটি অনেকের বিস্মিত প্রশ্নকে উপেক্ষা করে আর্টস নিয়েই ভর্তি হল। এবার আর কোনো গৃহশিক্ষকের খরচ নেই, বরং সেই খরচটা বাঁচিয়ে ছেলের জন্য সাতটি গৃহশিক্ষকের ব্যবস্থা করা সম্ভব হল।শুধু তাই নয়, ঐ পনের বছরের মেয়েটিকে দিয়ে শুরু করানো হল টিউশনি, যা পরবর্তীকালে বাড়তে বাড়তে প্রায় নাভিশ্বাস ওঠার যোগাড়।
নিজের পড়ার সময় পায় না মেয়েটা, অবসরের তো প্রশ্নই নেই _ দিনের বেলা স্কুল বা পরবর্তী কালে কলেজ, ফিরে এসেই দেখা অজস্র ছাত্র ছাত্রীতে ভর্তি ঘর, আলাদা করে খাওয়ার সময়টুকুও নেই, পড়াতে পড়াতেই কোনোরকমে খাওয়া আর সেটা চলল রাত্রি প্রায় ন'টা সাড়ে ন'টা অবধি। এরপর নিজের পড়াশোনা নিয়ে বসা। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন সময়াভাবে বাসে ট্রেনেও পড়া তৈরি করতে হয়েছে।কোনো কোনো দিন সকালেও পড়ার ব্যাচ, ছুটির দিনেও রেহাই নেই _ রবিবারে সারাদিনে অন্ততঃ গোটা চারেক ব্যাচ। ভালো ছাত্রী হওয়ার দরুণ ছাত্র ছাত্রীর ঢল লেগেই থাকত কিন্তু কেউ কখনো একবারের জন্যও ভাবেনি একজন সদ্য তরুণী তার জীবনের সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়ে কিসের আশায় এই প্রাণান্তকর জীবন যাপন করছে! ওই রোজগারের একটি পয়সাও তো তার নিজের অধিকারে ছিল না। ভাইয়ের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পড়ার বিপুল খরচ, তা ছাড়াও সংসারের শখ শৌখিনতা মেটাবার যন্ত্র হয়ে উঠছিল মেয়েটা। তবুও সুপর্ণা প্রায়ই সখেদে বলতেন " আমার মেয়েটা বড় না হয়ে ছেলেটা বড় হলে কাজ দিত। মেয়ে আর কদিন! বিয়ে হয়ে তো শ্বশুরবাড়ি চলেই যাবে। আমার সংসারেত আর কাজে লাগবে না।" সেইসঙ্গে কোন্ কোন্ " মহান" মেয়েরা সারাজীবন বিয়ে না করে,চাকরি করে সংসারের দেখাশোনা করবে বলে মনস্থ করেছে তারও দীর্ঘ তালিকা দিতেন।
বিহার, উত্তরপ্রদেশ বা রাজস্থানের মত রাজ্যে কন্যা ভ্রূণ হত্যা বা কন্যা সন্তান জন্মানোয় পরিবারের হাহুতাশের কথা আমরা প্রায়শঃই শুনে থাকি। একই পরিবারে জন্মানো একটি ছেলে ও একটি মেয়ের মধ্যে নির্লজ্জ ভাবে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় এবং মেয়েদের কে এমনভাবেই শিক্ষা দেওয়া হয় যে তারা এই বৈষম্য কে খুব স্বাভাবিক ভাবেই গ্ৰহণ করে। ছেলেরা সবাই বংশের প্রদীপ আর মেয়ে মাত্রই " পরায়া ধন" _ তাদের পিছনে খরচ করা মানে স্রেফ অপচয়। না , আমরা বাঙালিরা ঠিক খোলাখুলি ভাবে এই ধরণের পার্থক্য অবশ্যই করিনা।কিন্তু আমাদের বাঙালি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারেও লিঙ্গ বৈষম্যের যে চোরা স্রোত বয়ে যায়, তা এতই সূক্ষ্ম যে আপাতদৃষ্টিতে হয়তো চোখেই পড়ে না। কখনো ছেলের পাতে মাছের বড় টুকরো দিয়ে, শুধু ছেলের জন্য প্রতিদিন মিষ্টি বরাদ্দ করে অথবা ছেলের আবদারের মহার্ঘ জিনিস কিনে দিয়ে ( অবশ্যই মেয়েকে বঞ্চিত করে ) এই বৈষম্যের ধারা চলতে থাকে। আমরা মুখে যতই ছেলে মেয়ের সমান অধিকারের কথা বলি না কেন, বাস্তবে কিন্তু মেয়েদের বঞ্চনার সূচনা তাদের অত্যন্ত কাছের মানুষজনের হাত ধরেই হয়। আজ মনে হয় আমাদের সকলেরই এই বিষয়ে ভাবার সময় এসেছে _ কিভাবে একটি শিশুকে এই লিঙ্গ বৈষম্যের হাত থেকে বাঁচিয়ে তাকে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক মানসিক স্বাস্থ্য দেওয়া যায় তা ভাবা দরকার ।নাহলে সারা জীবন-ই হয়ত সে এই ক্ষোভের বোঝা বহন করে চলবে, যা কোনো ভাবেই কাঙ্খিত নয়।

05/02/2025

গত শতকের নয়ের দশকের কথা। পশ্চিমবঙ্গে তখন উদারনৈতিক, প্রগতিশীল (?) রাজনৈতিক দলের সরকার। অসীম বাবু সেই দলের শুধু একজন সক্রিয় কর্মী -ই নন, এলাকার দাপুটে নেতা, নাগরিক কমিটির প্রেসিডেন্ট _ এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠনের সেক্রেটারি অথবা প্রেসিডেন্ট। এলাকায়, এমনকি জেলা স্তরেও তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত, জনপ্রিয় এবং প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত। শুধু নিজের পরিবারই নয়, আত্মীয় -স্বজন, বন্ধু বান্ধব সকলেই যেকোনো পারিবারিক বিষয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর মতামত না নিয়ে কোনো কাজ করেন না। অসীম বাবুর আত্মবিশ্বাস প্রবল, প্রায়ই তিনি সগৌরবে বলে থাকেন, " লোকে বলে একাই একশো। কিন্তু আমি একাই শুধু একশো নই, হাজার। " তাঁর নিজের পরিবারে তাঁর স্থান প্রায় হিটলারের কাছাকাছি এবং তিনি সেটা খুব উপভোগও করেন।
পরিবারটি কোনো এক সময় একান্নবর্তী থাকলেও বর্তমানে সদস্য সংখ্যা মাত্র চার _ স্ত্রী আর দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। পুত্রটি কলেজে পড়াকালীন সহপাঠিনীর প্রেমে পড়ল এবং কিছুদিন বাদে মায়ের মারফৎ বাবাকে সংবাদটি জানাল ( বাবা কে সরাসরি জানাবার মত সাহস সে তখনো সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি)। এই পরিবারে এই ধরণের ঘটনা প্রায় বিপ্লবের সমান, কারণ আজ অবধি প্রেমজ বিবাহ তো দূরে থাক, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাত্র পাত্রীর প্রথম দেখা ছাদনাতলাতেই। কিন্তু অসীম বাবু বিচক্ষণ মানুষ _ যুগের হাওয়া যে বদলেছে সেটা তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্বীকার করেন, বিশেষতঃ মেয়েটির প্রোফাইল বিবেচনা করে তিনি বিষয়টি ভেবে দেখার সিদ্ধান্ত নেন।শুধু তাই নয়, সেই সময়ের পক্ষে এক ভয়ানক দুঃসাহসিক প্রস্তাব করেন যে তিনি একা মেয়েটির সাথে দেখা করবেন এবং সেটাও বাড়ির বাইরে কোনো এক জায়গায়। আজকের দিনে এই বিষয়টি তে অবাক হবার কিছু না থাকলেও সেদিনের বিচারে, বিশেষতঃ মফস্বল শহরে তো এরকম ঘটনা প্রায় বিরল। ছেলেটির মুখ থেকে একথা জেনেই মেয়েটি তো একেবারে মুগ্ধ! এত আধুনিক মনের মানুষ তার শ্বশুর মশাই হতে চলেছেন! না জানি কি অসাধারণ আলোকপ্রাপ্ত পরিবারের সে অংশ হতে চলেছে! নির্দিষ্ট দিনে দেখা হওয়ার পর তো মুগ্ধতা একদম চরমে। অসীম বাবু তাকে জানিয়েছেন যে যেহেতু তার অ্যাকাডেমিক রেকর্ড অত্যন্ত ভালো , সেই কারণে সে যতদিন খুশি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে শুধু নয়, চাইলে সারা জীবনও পড়াশোনা নিয়ে থাকতে পারে। সংসারের ওইসব আলু - পটলের হিসাব দেখার জন্য তো তিনি আর তাঁর স্ত্রী রইলেনই।ব্যক্তি স্বাধীনতাকে অসীম বাবু ভীষণ শ্রদ্ধা করেন এবং তিনি চান মহিলারা সকলে স্বাধীন ভাবে, স্বনির্ভর হয়ে বাঁচুক। বিয়ের কথা পাকা করতে গিয়ে তিনি ভাবী বেয়াই বাড়িতে জানিয়ে এলেন যে তাঁর বাড়িতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ঘর আছে, যার একটি তিনি পুত্রবধূর পড়াশোনার জন্য ছেড়ে দেবেন। আর দেনা পাওনা, যৌতুকের তো প্রশ্নই ওঠেনা _ ওসব প্রণামী ট্রনামী তারা নিজেরাই ব্যবস্থা করবেন। সত্যি বলতে কি, এই বিষয়টায় অসীম বাবু অক্ষরে অক্ষরে তাঁর কথা রেখেছিলেন। বৌভাতের পরের দিনই নতুন বৌকে ডেকে নির্দেশ দিয়ে দিলেন " তুমি কাল যে সব উপহার, টাকা পয়সা পেয়েছ, সব তোমার মায়ের হাতে তুলে দাও। আর তোমার আলমারির চাবিটা মৌ কে ( ননদ ) দিয়ে দাও। আমাদের বাড়ির বৌ রা বিয়ের চার বছর না পুরোলে আলমারির চাবি হাতে পায়না।" ব্যাপারটা যথেষ্ট আপত্তিজনক হলেও নতুন বৌ সহজাত ভদ্রতা বোধে চুপচাপ সেই নির্দেশ পালন করে, যদিও পরবর্তীকালে সেই প্রগতিশীলতার ধ্বজাধারী মানুষটির আরো অনেক দাঁত - নখ দেখা বাকি ছিল।
বাড়ির বৌয়ের এক এবং অদ্বিতীয় পোশাক শাড়ি এবং সাথে মাথায় ঘোমটা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এম. এ. পাঠরতা বৌমাটি বছর তিনেক বাদে ক্ষীণ আপত্তি তুলেছিল যে শ্বশুর ভাসুর কে দেখে এইসব ঘোমটা দেওয়া ব্যাপারটা আসলে তাঁদের পক্ষেই অপমানজনক, কারণ ঐসব আত্মীয়রা বাড়ির বৌদের প্রতি কুদৃষ্টি দিত বলেই এই ঘোমটা প্রথার প্রচলন _ কিন্তু অসীম বাবুর মত একজন সর্বজ্ঞ, উদারমনস্ক মানুষ এইসব বালখিল্যের কথায় কর্ণপাত করবেন এটাতো কল্পনারও অতীত _ কারণ চূড়ান্ত সামন্ততান্ত্রিক, স্বৈরাচারী জীবনযাপন তো প্রগতিশীলতার ই অপর নাম! যদিও পরবর্তীতে তাঁর কন্যা বিয়ের অব্যবহিত পরেই শাড়ি বাদ দিয়ে অন্য সবরকম পোশাক পরে যখন ঘুরে বেড়ায়, তখন তিনি এ ব্যাপারে আপত্তিজনক কিছু দেখেন না। দ্বিচারিতা কোন্ পর্যায়ে পৌঁছলে একই বিষয়ে ব্যক্তিভেদে কিভাবে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নেওয়া যায়, অসীম বাবু তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
অসীম বাবু চেনা অচেনা অনেক মানুষের থেকে আহ্বান পান তাদের পারিবারিক সমস্যার সমাধানের জন্য _ শোনা যায় যে বিচার তিনি নাকি খুব দক্ষতার সাথেই করে থাকেন। কিন্তু তাঁর নিজের পরিবারে স্ত্রী এবং কন্যা যখন অন্য পরিবার থেকে আসা তাঁর কন্যাসম পুত্রবধূটির উপর নির্যাতন চালায়, তখন মহাভারতের ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর কোনো তফাৎ থাকে না।
না, না, উনি বিনা বিচারেই রায় দিয়ে দেন , এ অপবাদ কেউ দিতে পারবে না। কিন্তু ঘটনা যা- ই ঘটুক না কেন, রায় কি হবে আগেই জানা। ওনার স্ত্রী বা কন্যা সর্বদাই " বেনিফিট অফ ডাউট" পেয়ে যাবেনই। এ বিষয়ে ওনার একটা স্পষ্ট বক্তব্য আছে _ " দেখ বৌমা, তোমার কথায় যুক্তি আছে আমি মানছি। কিন্তু কি বলতো, ও তো আমার মেয়ে, ছোট থেকে কোলে পিঠে করে মানুষ (?) করেছি। তাই ওকে আমরা কিছু বলতে পারব না।" ভাবখানা এই যে, বৌমাটি একেবারে জন্মেই বৌ হবার মত বড় হয়ে গেছে, তার আর কোনো ছেলেবেলা ছিল না। তাই পরবর্তী কালে এই বিচার নামক প্রহসনটি থেকে বৌমাটি যথাসম্ভব দূরত্ব রাখতেই চেষ্টা করত।
যে অসীম বাবু বাড়ির মহিলাদের লেখাপড়া, স্বনির্ভরতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার বড় পৃষ্ঠপোষক বলে নিজেকে জাহির করতেন, কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তিনি এই সবগুলোরই অসম্ভব পরিপন্থী। নিজের স্ত্রী সম্পর্কে গর্বভরে বলতেন " নিজস্ব মতামত বলে তো কিছু ছিল না! যেমন চালিয়েছি, তেমনি চলেছে। " সেই চালানোর নমুনা হল সকালে বাড়িতে কোন্ ডাল রান্না হবে সেই বিষয় থেকে শুরু করে পুত্রবধূর লেখাপড়া কবে শেষ হবে, সেই বিষয়ের শেষ কথা বলবেন একমাত্র অসীম বাবু-ই। মুক্তমনা বলে পরিচিত এই মানুষটি বাড়ির কাজের মেয়েটি " মেথর " সম্প্রদায়ভূক্ত বলে তাকে প্রায় অচ্ছুৎ করে রাখেন। পুত্রবধূর চাকরি করাতে তার ঘোরতর আপত্তি, তিনি ও তাঁর স্ত্রী এ বিষয়ে যতদূর সম্ভব অসহযোগিতা করতে ছাড়েন না, এমনকি কোন্ কোন্ দিন তার অফিসে যাওয়ার দরকার নেই, সে বিষয়েও তিনিই সিদ্ধান্ত নিতে চান _ সেই তিনিই পুত্রবধূর রোজগারের অর্থে যথেষ্ট দাবি করেন। সেক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত ন্যায্য ভাবে বলে থাকেন - " তোমরা দুজনে রোজগার কর, দুজনে আলাদা আলাদা টাকা দেবে।" ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের পূজারী মানুষটি যে এভাবেই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য কে মর্যাদা দেবেন, সে আর আশ্চর্য কি!

আসলে অসীম বাবু একা নন। আমাদের অনেকের মধ্যেই এই
অসীম বাবুরা লুকিয়ে আছেন,
যারা বহির্জগতে প্রগতিশীলতার নামাবলী চাপিয়ে একেকটি ছোটখাটো সামন্ত প্রভু। মানুষ এদের কাছে প্রতারিত হয়, মানুষের কাছে একটা অত্যন্ত উজ্জ্বল ভাবমূর্তি তৈরি করে আসলে তারা তার বিপরীত কাজ করেন। এদের চিনে নিন, আর পারলে এদের মুখোশ টা নির্মম ভাবে খুলে দিন।

29/01/2025

গোস্বামী বাবু মানুষটিকে আমার বেশ ভালোই লাগত। শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান, অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী। দেখা হলেই সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি, সংস্কৃতি নিয়ে বেশ উচ্চমানের আলোচনা করেন। কয়েকদিন আগে আমাকে দেখেই বললেন, " শুনুন, শুনুন, আপনার সাথে একটা দরকারি কথা আছে। আমার ভাগ্মে, বুঝলেন, হীরের টুকরো ছেলে। খুব বড় চাকরি করে, বিদেশ ঘুরে এসেছে। এখন বয়স প্রায় তিরিশ হতে চলল, তো আমরা একটু বিয়ে থা এর কথা ভাবছি। আপনার সন্ধানে কোনো ভালো মেয়ে থাকলে দেখবেন না!" এহেন ভালো ছেলের কথা শুনলে যেকোনো বিবাহযোগ্যা কন্যার মায়ের ই হৃদয় কিঞ্চিৎ
বিচলিত হবেই। কিন্তু আমার কন্যাটি গত সাত বছর যাবৎ তার পড়াশোনা ও পরবর্তী কালে চাকরি সূত্রে দিল্লি নিবাসী এবং সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে আগামী দুবছর তার বিয়ে নিয়ে কোনো কথাই উত্থাপন করা যাবে না, কারণ সে চাকরির পাশাপাশি আরেকটি উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই একটু সখেদেই বললাম, " আমার মেয়ে তো আর এখনি বিয়ে করবে না, নাহলে আমার মেয়ের সাথেই সম্বন্ধ করে ফেলতাম"। সাথে সাথেই গোস্বামী বাবু হাঁ হাঁ করে উঠলেন _ " না, না, আপনার মেয়ে চলবে না। ওসব দিল্লি টিল্লি তে থাকা মেয়ে, আমাদের কালচারের সাথে মিলবে না। আপনি অন্য মেয়ে দেখুন।"
চমকটা একটু জোরদার হলেও যথাসম্ভব বিনীত ভাবে বলার চেষ্টা করি _ " আপনি আমার মেয়ের কালচার সম্পর্কে জানেন? কিরকম একটু বলুন তো"
কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হয়ে গোস্বামী বাবু আবার শুরু করেন " না, মানে, ঐসব চাকরি করা মেয়ে টেয়ে আমাদের ফ্যামিলিতে ঠিক চলে না। তার উপর এত বছর ধরে দিল্লিতে একা একা আছে _ এই ধরণের মেয়ে বুঝলেন না, ঐ আর কি! তাছাড়া আমার ভাগ্নে মোটা টাকা রোজগার করে। তার বৌয়ের আবার চাকরি করার দরকার কি ? দুজনেই চাকরি করলে ঘর সংসার দেখাশোনা টা করবে কে ? না, না, আপনি একটু ঘরোয়া মেয়ে খুঁজুন।"
এরপর আর চুপ করে থাকা সম্ভব হল না। বলেই ফেললাম _ " গোস্বামী বাবু, আপনার কি ধারণা যে যেসব মহিলারা চাকরি করেন, তাদের স্বামীরা সব বেকার বা খুবই স্বল্প আয়ের? একজন পুরুষের যদি স্বনির্ভর হওয়া টা বাধ্যতামূলক হয়, তবে একজন মহিলা তা হবেন না কেন? নাকি মেয়েরা সর্বদা পরনির্ভর হয়ে থাকুক, এটাই আপনাদের মত মানুষদের ইচ্ছা? যে সব মহিলারা চাকরি করেন, তারা যে ঘরটা ও দেখেন, ঘরে - বাইরে ব্যালান্স করতে করতে যে তাদের প্রাণ বেরিয়ে যায়, সে খবর কি আপনার জানা আছে? আজ ২০২৫ সালে এসেও স্ত্রীকেই শুধু ' ঘরোয়া ' হতে হবে, স্বামীকে নয়? অথচ ঘর টা তো দুজন মিলেই বানিয়েছে! আর আপনি দূর রাজ্যে পরিবার ছেড়ে থাকা মেয়েদের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করছেন? একবারও ভেবে দেখেছেন এরা জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ অবধি সংসারের সব দায়ভার একাই বহন করে চলেছে? যেসব মেয়েরা পরিবারের সাথে থাকে, তাদের বেশিরভাগকেই তো এগুলো করতে হয় না। তাহলে যারা এই সম্পূর্ণ দায়ভার গুলো নেয়, তাদের তো কৃতিত্ব প্রাপ্য। তার বদলে কেন তাদের প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা হবে? কই, আপনার ভাগ্নেও তো কিছুদিন বিদেশে ছিল বললেন, একবারও তো ভাবেননি সে একা থাকাকালীন কোনোরকম অনৈতিক জীবন যাপন করেছে! তাহলে একটি মেয়ের ক্ষেত্রে সেটি অন্যরকম হবে কেন? আমার মনে হয় আপনি দৃষ্টিটা একটু উপরের দিকে দিন, তাহলেই আর এত সমস্যা হবে না।"
গোস্বামী বাবু নেহাৎই বড় অমায়িক মানুষ। এতপরেও উনি আবারো বললেন _ " তাহলে আপনি কিন্তু একটু মেয়ের খোঁজ পেলে জানাবেন "। চলে যাবার জন্য ঘুরে গিয়েও আবার ফিরে তাকালাম _ " সরি গোস্বামী বাবু। আমি শুধু আত্মসম্মান সম্পন্ন, মাথা উঁচু করে বাঁচা মানুষদের সাথেই পরিচয় রাখি। আপনার রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ী কোনো পাত্রী আমার জানা নেই। ভালো থাকবেন। "

Address

Chandannagar
Chandannagar
712136

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when চোখের আলোয় posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category