11/07/2026
সরকারি প্রকল্পে শিশু, গর্ভবতী মহিলা এবং অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিল বিশেষ পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ফোর্টিফায়েড চাল। কিন্তু সেই চালই যদি ইথানল তৈরির বদলে অন্য পথে ঘুরে আবার সরকারি ব্যবস্থাতেই ফিরে আসে? মধ্যপ্রদেশে ঠিক এমনই এক অভিযোগ ঘিরে শুরু হয়েছে বড় তদন্ত। অভিযোগের অঙ্ক প্রায় ১,১৬০ কোটি টাকা।
তদন্তে উঠে এসেছে সরকারি গুদাম, ইথানল কারখানা, চালকল এবং পরিবহণ ব্যবস্থার এক জটিল যোগসূত্রের অভিযোগ। কীভাবে একই চাল থেকে বারবার লাভের হিসাব তৈরি হয়েছে, কেন এই ঘটনাকে শুধু আর্থিক নয়, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত বলা হচ্ছে, আর এখন পর্যন্ত তদন্তে কী কী তথ্য সামনে এসেছে—এই প্রতিবেদনে রইল সেই পুরো ঘটনা সহজ ভাষায়।
----
মধ্যপ্রদেশে এমন এক কেলেঙ্কারির অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে ইথানল তৈরির আড়ালে সরকারি ফোর্টিফায়েড চাল ঘুরে বেড়িয়েছে এমনভাবে, যেন একই চাল দিনের বেলা সরকারি গুদামে আর রাতে অন্য কোথাও চাকরি করতে চলে যেত! অভিযোগের অঙ্ক প্রায় ১,১৬০ কোটি টাকা। এই চাল আসলে সাধারণ চাল নয়। এতে মেশানো থাকে লৌহ, ফলিক অ্যাসিড এবং ভিটামিন বি-১২, যাতে শিশু, গর্ভবতী মহিলা এবং অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের পুষ্টির ঘাটতি কিছুটা হলেও পূরণ করা যায়। অথচ অভিযোগ বলছে, সেই চালই সরকারি উদ্দেশ্য পূরণ না করে লাভের হিসাব মেলাতে ব্যবহার করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় ৫ লক্ষ মেট্রিক টন, অর্থাৎ ৫০ লক্ষ কুইন্টাল ফোর্টিফায়েড চাল সরকারি ভর্তুকিতে ইথানল প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিকে দেওয়া হয়েছিল। প্রতি কুইন্টাল চালের সরকারি মূল্য ছিল ২,৩২০ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী এই চাল থেকে ইথানল তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ, কিছু ইথানল কারখানা সেই চাল ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত চালকলগুলির কাছে প্রায় ২,৮০০ টাকা প্রতি কুইন্টাল দরে বিক্রি করে দেয়। কাগজে-কলমে চালের গন্তব্য এক, কিন্তু বাস্তবে তার রাস্তা নাকি একেবারেই অন্যদিকে ঘুরে যায়।
এরপর শুরু হয় আরও চমকে দেওয়া অংশ। অভিযোগ অনুযায়ী, চালকলগুলি সেই একই চাল নতুন বস্তায় ভরে আবার সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দেয়। অর্থাৎ যে চাল একবার সরকার কম দামে দিয়েছিল, সেটাই আবার অন্য পরিচয়ে সরকারি গুদামে ফিরে আসে। এতে চালকলগুলিকে নতুন করে ধান ভেঙে চাল তৈরির খরচ বহন করতে হয় না, অথচ সরকারি ব্যবস্থার কাছ থেকে চাল সরবরাহের সুবিধাও পাওয়া যায়। অন্যদিকে, যে ধান থেকে চাল তৈরির কথা ছিল, সেটি আলাদা করে বাজারে বিক্রি করার সুযোগও তৈরি হয়। একই চাল থেকে বারবার লাভের এই অভিযোগ শুনলে মনে হয়, চালও বোধহয় ভাবছিল—“আজ আবার কোথায় ডিউটি?”
এই গোটা বিষয়টি সামনে আসে ২ জুন ২০২৬-এর একটি ঘটনার পর। সেদিন বালাঘাট জেলার নাওগাঁও এলাকা থেকে তিনটি ট্রাকে সরকারি চাল ছিন্দওয়ারা জেলার একটি ইথানল কারখানায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার মধ্যে ২৪২ কুইন্টাল চাল বোঝাই একটি ট্রাক নির্দিষ্ট গন্তব্যে না পৌঁছে একটি চালকলে ধরা পড়ে। তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও বাড়ে, কারণ বাকি চালানগুলিও ঘোষিত গন্তব্যে পৌঁছেছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এই ঘটনাকেই বড় তদন্তের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এরপর মধ্যপ্রদেশ পুলিশ একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে। এখনও পর্যন্ত ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১২টি ট্রাক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তদন্তে ৪০ জনেরও বেশি ব্যক্তি, যার মধ্যে ইথানল কারখানার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, চালকলের মালিক এবং পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত লোকজন রয়েছেন, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্তের পরিধি বালাঘাট, ছিন্দওয়ারা এবং সেওনি জেলাতেও বিস্তৃত হয়েছে।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, এত বড় পরিসরে চাল অন্যত্র পৌঁছে যাওয়া শুধুমাত্র কয়েকজন পরিবহণ কর্মীর পক্ষে সম্ভব নয়। কোন গুদাম থেকে কত চাল বেরোল, কোথায় পৌঁছনোর কথা ছিল, বাস্তবে কোথায় গেল এবং পরে কীভাবে আবার সরকারি ব্যবস্থায় ফিরে এল—এই পুরো শৃঙ্খল খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চাল বরাদ্দ, পরিবহণের নথি, চালকলের নথিপত্র এবং সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থার বিভিন্ন তথ্য এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ফোর্টিফায়েড চাল। এই চাল বিশেষভাবে পুষ্টিহীনতা, রক্তাল্পতা এবং ভিটামিনের ঘাটতি কমানোর উদ্দেশ্যে সরকারি প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়। তাই অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হলে এটি শুধু আর্থিক অনিয়মের ঘটনা হবে না, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য নির্ধারিত খাদ্য ব্যবস্থার উপরও বড় আঘাত হিসেবে ধরা হবে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা জরুরি। ১,১৬০ কোটি টাকা ক্ষতির অঙ্ক এবং ৫ লক্ষ মেট্রিক টন চালের হিসাব সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ তদন্তকারী দল এখনও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং এই অভিযোগগুলির চূড়ান্ত সত্যতা বা আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এখনও সরকারি তদন্তে নিশ্চিত করা হয়নি।