08/06/2026
# # # প্ল্যাটফর্মের টিকিট মাসি: এক অন্তহীন অপেক্ষার গল্প
স্টেশনে রোজ ভিক্ষে করত বুড়িটা। আসল নাম কেউ জানত না, সবার কাছে সে ছিল শুধুই 'টিকিট মাসি'।
বুড়ির গলায় একটা প্লাস্টিকের মোড়কে সযত্নে ঝোলানো থাকত একটা পুরোনো ট্রেনের টিকিট। ১৯৮৭ সালের হাওড়া থেকে বর্ধমান লোকালের টিকিট, গায়ে লেখা ভাড়া—চার টাকা। কেউ জিজ্ঞেস করলেই ফোকলা দাঁতের মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে সে বলত, "আমার ছেলে আসবে গো। এই ট্রেনেই আসবে।"
এই অবিচল অপেক্ষার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক না-বলা ইতিহাস, যা এই স্টেশনের ইট-পাথর ছাড়া আর কেউ মনে রাখেনি।
# # # # অতীত: ১৯৮৭ সালের সেই অভিশপ্ত দিন
বুড়ির আসল নাম ছিল বিমলা। স্বামী মারা যাওয়ার পর লোকের বাড়ি হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে, আধপেটা খেয়ে একমাত্র ছেলে খোকনকে বড় করেছিল সে। খোকন ছিল পড়াশোনায় তুখোড়, মায়ের সব কষ্টের একমাত্র উপশম।
১৯৮৭ সালের এক মেঘলা সকাল। খোকনের সেদিন বর্ধমানে একটা সরকারি চাকরির পরীক্ষা ছিল। সকাল থেকে উঠে উনুনের আঁচে ছেলের জন্য নিজের হাতে ভাত আর মাছের ঝোল রেঁধেছিল বিমলা। স্টেশনে ছেলেকে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিল সে।
ট্রেনে ওঠার ঠিক আগে খোকন মায়ের হাত দুটো ধরে বলেছিল, *"মা, এই চাকরিটা পেলেই তোমার সব কষ্ট আমি দূর করে দেব। পাস করে প্রথম মাইনে পেয়েই তোমার জন্য একটা লাল পেড়ে গরদের শাড়ি আনব। তুমি এই স্টেশনেই থেকো, আমি যেন ট্রেন থেকে নেমেই প্রথম তোমায় দেখি।"*
বিমলা সেদিন ছেলের দেওয়া সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল। দুপুরের ভাত বেড়ে স্টেশনের এক কোণে বসেছিল সে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল। কিন্তু হাওড়া-বর্ধমান লোকাল আর ফিরে এল না।
মাঝরাতে স্টেশনে খবর এল, বর্ধমান লাইনে এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। লাইনচ্যুত হয়ে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে গোটা ট্রেন। বিমলা পাগলের মতো ছুটেছিল পুলিশ স্টেশনে, হাসপাতালে। কিন্তু সারি সারি চাদর ঢাকা নাম-গোত্রহীন লাশের ভিড়ে সে তার খোকনকে খুঁজে পায়নি। পুলিশ বলেছিল, ওই বেওয়ারিশ লাশের দলা পাকানো স্তূপে হয়তো তার ছেলেও আছে।
কিন্তু একজন মায়ের মন তা মানতে নারাজ। বিমলা চিৎকার করে বলেছিল, *"আমার খোকার লাশ আমি নিজের চোখে দেখিনি! ও মরতে পারে না। ও আমাকে কথা দিয়েছে, ও ফিরবেই!"*
সেইদিন থেকে বিমলার আর বাড়ি ফেরা হয়নি। খোকনের কিনে দেওয়া একটা অবিক্রিত টিকিট সে বুক পকেটে রেখে দিয়েছিল। সেই টিকিট বুকে চেপে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মটাই হয়ে উঠল তার সংসার। বিমলা হয়ে গেল 'টিকিট মাসি'।
# # # # আমার স্মৃতিতে টিকিট মাসি
আমি যখন কলেজে পড়তাম, তখন রোজ এই স্টেশন দিয়েই যাতায়াত করতাম। রোজ টিকিট মাসিকে দেখতাম আর দু'টাকা করে দিতাম। একদিন আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না।
"মাসি, কতদিন ধরে তুমি এখানে বসে আছো?"
বুড়ি হাসল। সেই মায়াবী, ফোকলা দাঁতের হাসি। বলল, **"৩৮ বছর বাবা।"**
সব শুনে আমার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। "শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা... ৩৮ বছর ধরে একটা মানুষ শুধু একটা কথার ওপর ভরসা করে বসে আছে?"
স্টেশনের শেডটাই ছিল তার ঘর। প্ল্যাটফর্মের কলতলায় স্নান, আর দোকানদাররা দয়া করে যা দিত, তা-ই ছিল তার খাবার। কিন্তু তার চোখ সারাক্ষণ খুঁজত সেই হাওড়া-বর্ধমান লোকালকে।
# # # # অপেক্ষার অবসান
একদিন সকালে স্টেশনে গিয়ে দেখি বুড়ি নেই। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। স্টেশন মাস্টারকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ওনার কথা।
উনি মাথা নিচু করে বললেন, *"কাল রাতে মারা গেছে বুড়িটা। ওই ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চেই বসে ছিল। হাতে ধরা ছিল সেই পুরোনো টিকিটটা। পুরসভা বডি নিয়ে গেছে মর্গে, বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে ওরাই সৎকার করে দেবে।"*
আমি আর এক মুহূর্ত দাঁড়াইনি। সোজা ছুটলাম মর্গে।
ভেতরে গিয়ে দেখি, সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা শান্ত মুখ। সমস্ত অপেক্ষার ক্লান্তি যেন মুছে গেছে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাতের মুঠোয় তখনো শক্ত করে ধরা সেই ১৯৮৭ সালের টিকিট।
আমি টিকিটটা নিলাম। প্লাস্টিকের মোড়ক থেকে বের করে ভাঁজ খুলতেই চমকে উঠলাম। টিকিটের পেছনে অস্পষ্ট, কাঁপা হাতে কিছু একটা লেখা:
> *খোকা,*
> *তুই যদি কখনো ফিরিস, আমি হয়তো আর থাকব না রে।*
> *তোর জন্য ভাত বেড়ে রাখতাম রোজ। আজও রেখেছি। ১নং প্ল্যাটফর্মের তিন নম্বর বেঞ্চের নিচে একটা টিফিন কৌটো আছে।*
> *৩৮ বছর ধরে আমি রোজ ভাত বেড়েছি। রোজ সেই ভাত নষ্ট হয়েছে, আর আমি রোজ আবার নতুন করে বেড়েছি। যদি আসিস, ভাতটা একটু গরম করে নিস বাবা। আর আমাকে ক্ষমা করিস। তোকে এই স্টেশনে একা ছেড়ে চলে গেলাম।*
> *ইতি,*
> *তোর মা।*
>
# # # # শেষ চিহ্ন
চোখ দিয়ে তখন অঝোরে জল পড়ছে। আমি মর্গের বাইরে বেরিয়ে পাগলের মতো ছুটে গেলাম স্টেশনের সেই ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। তিন নম্বর বেঞ্চের নিচে হাত বাড়াতেই আঙুলে ঠেকল একটা পুরোনো, জং ধরা স্টিলের টিফিন কৌটো।
কাঁপা হাতে কৌটোর ঢাকনা খুললাম। ভেতরে পড়ে আছে চাল। ৩৮ বছরের পুরোনো, পোকা ধরা, বিবর্ণ, শুকনো চাল। ৩৮ বছরের এক মায়ের না-মেটা ভালোবাসা, না-ফুরোনো অপেক্ষা।
আমি সেদিন ওই ভিড় প্ল্যাটফর্মে বসে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম।
আজও আমি সেই স্টেশন দিয়ে যাই। রোজ হাজার হাজার মানুষের পা পড়ে সেখানে। কিন্তু ওই তিন নম্বর বেঞ্চটা আজও খালি পড়ে থাকে। কেউ ওখানে বসে না।
তাই বলি, তোমার মা যদি কাজের ফাঁকে হঠাৎ ফোন করে বিরক্ত করে জিজ্ঞেস করে, **"খেয়েছিস বাবা?"**—দয়া করে বিরক্ত হয়ো না। কারণ একদিন এই 'খেয়েছিস' শব্দটা শোনার জন্য, তোমাকে হয়তো ৩৮টা বছর প্ল্যাটফর্মে বসে থাকতে হতে পারে।
দূর আকাশের তারা এবং জীবিত সন্তানের মৃত প্রতীক্ষা
টিকিট মাসির সেই জং ধরা টিফিন কৌটো আর ৩৮ বছরের পুরোনো চালগুলো আমাকে রাতের পর রাত ঘুমোতে দেয়নি। মাসির খোকা আর কোনোদিন ফেরেনি, কারণ নিয়তি তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়েছিল। সে চেয়েছিল মায়ের কাছে ফিরতে, কিন্তু পারেনি।
অথচ, এই শহরের বুকেই এমন অনেক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট আছে, যেখানে হাজার হাজার 'টিকিট মাসি' আর 'টিকিট মেসো'রা রোজ অপেক্ষা করে। তাদের সন্তানরা ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায়নি। তারা বেঁচে আছে। বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে সাত সমুদ্র তেরো নদী পারের কোনো এক ঝকঝকে শহরে—নিউ ইয়র্ক, লন্ডন বা সিডনিতে।
সেই স্টেশনের তিন নম্বর বেঞ্চটায় সেদিন বসেছিলাম আনমনে। পাশেই এসে বসলেন এক ভদ্রলোক। পরনে দামি পাঞ্জাবি, চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা, হাতে দামি স্মার্টফোন। কিন্তু মুখের রেখায় এক অদ্ভুত একাকিত্ব।
ভদ্রলোক একটু ইতস্তত করে আমার দিকে ফোনটা এগিয়ে দিলেন। "বাবা, আমাকে একটু সাহায্য করবে? এই হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলটা কীভাবে করে একটু দেখিয়ে দেবে? ছেলের নাম্বারটা সেভ করা আছে— 'রৌনক'।"
আমি হাসিমুখে কলটা মিলিয়ে দিলাম। ওপারে রিং হচ্ছে। ভদ্রলোকের চোখেমুখে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। একটু বাদেই কল ধরল বছর পঁয়ত্রিশের এক যুবক। ব্যাকগ্রাউন্ডে বিদেশের কোনো এক বরফে ঢাকা রাস্তা।
"হ্যালো বাবা! বলো, কী ব্যাপার? এনি ইমার্জেন্সি?" ওপার থেকে ব্যস্ত গলা ভেসে এল।
ভদ্রলোক কাঁচুমাচু মুখে বললেন, "না রে, কোনো বিপদ নয়। আজ তোর মায়ের জন্মদিন তো। গত তিন বছর তো আসিসনি। তাই তোর মা বলছিল, যদি তোকে একবার চোখের দেখা দেখতে পেত..."
"ওহ নো! হ্যাপি বার্থডে টু মা। বাবাকে একটু বুঝিয়ে বলো না, আমার এখানে এখন সকাল, পরপর তিনটে মিটিং। উইকেন্ডে আমি ঠিক কল করব। আর হ্যাঁ, মায়ের নার্সিংয়ের টাকাটা আমি ট্রান্সফার করে দিয়েছি। চেক করে নিও। রাখি এখন, লেট হয়ে যাচ্ছে!"
স্ক্রিনটা অন্ধকার হয়ে গেল। ছেলেটা একবার মায়ের মুখটাও দেখল না।
ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা পকেটে রাখলেন। আমার দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বললেন, "খুব বড় কোম্পানিতে চাকরি করে তো, বড্ড ব্যস্ত। মাসে মাসে লাখ টাকা পাঠায় আমাদের জন্য। কোনো অভাব রাখেনি।"
বলেই ভদ্রলোক উঠে পড়লেন। তার হাঁটার ভঙ্গিতে এক চরম ক্লান্তি। আমি জানি, বাড়ি ফিরে তিনি তার অসুস্থ স্ত্রীকে গিয়ে মিথ্যা বলবেন, "ছেলে তোমাকে অনেক ভালোবাসা পাঠিয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে আমাদের দেখতে আসবে।"
আমার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। টিকিট মাসির চেয়েও কি এঁদের যন্ত্রণাটা আরও বেশি নয়?
মাসি জানত না তার ছেলে বেঁচে নেই। একটা মিথ্যা আশাকে আঁকড়ে সে ৩৮ বছর বাঁচার রসদ পেয়েছিল। কিন্তু এই বাবা-মায়েরা? এঁরা জানেন এঁদের সন্তানরা দিব্যি বেঁচে আছে। ডলার বা পাউন্ডের কোনো অভাব নেই। অভাব শুধু একটু সময়ের। অভাব শুধু একটা স্পর্শের।
এঁদের অপেক্ষা কোনো ট্রেনের জন্য নয়, একটা ফোনের রিংটোনের জন্য। একটা ভিডিও কলের জন্য। এরা রোজ ক্যালেন্ডারের পাতা গোনেন, আর ছেলেমেয়েরা বিদেশ থেকে পাঠায় শুধু দামি উপহার আর নার্সিং হোমের বিল।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দামি ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে যখন এঁরা দূরের আকাশ দেখেন, তখন এঁরাও যেন এক একজন 'টিকিট মাসি' হয়ে যান। শুধু এদের হাতের টিকিটটা হাওড়া-বর্ধমানের নয়, সেটা একটা না-কাটা ফ্লাইটের টিকিট, যে ফ্লাইটে করে তাদের সন্তানরা কোনোদিন ফিরে আসবে না।
পাখিরা যেমন ডানা গজানোর পর বাসা ছেড়ে উড়ে যায়, আধুনিক জীবনের এই সফল সন্তানরাও তেমনি উড়ে গেছে। তারা শিকড় ভুলেছে, আকাশ চিনতে গিয়ে।
টিকিট মাসির ছেলেটা আসতে চেয়েও আসতে পারেনি। আর আজকের এই ছেলেমেয়েরা ইচ্ছে করলেই আসতে পারে, শুধু আসার 'সময়' তাদের নেই।
> **পরিশেষ:**
> বাবা-মায়ের জন্য পাঠানো টাকা বা দামি উপহার কখনো তাদের একাকিত্ব ঘোচাতে পারে না। আপনার একটা আলিঙ্গন, একটু পাশে বসে গল্প করা—এর চেয়ে দামি কোনো রেমিট্যান্স আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। সময় থাকতে বাবা-মাকে সময় দিন। কারণ, একবার সেই সময় ফুরিয়ে গেলে, কোটি ডলার দিয়েও আর একটা মুহূর্ত কেনা যাবে না।