24/05/2020
*আত্ম সুরক্ষা*
পুলক কুমার বেরা (২৪/০৫/২০২০)
বেশ কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছিল যে এই বিষয়টা নিয়ে একটু স্টাডি করি কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছিল না। যদিও সময়ের দাবি এবং লক ডাউন সেই সুযোগ, কিন্তু তাও মনে তেমন ভরসা আসছিলো না, যাইহোক, গুগলের উপর নির্ভর করে একটু একটু শুরু করলাম এবং মাসখানি যাওয়ার পর আবার মনে হল, না এ বোধহয় আমার দ্বারা সম্ভব নয়! আগেকার সময়ে একটু আধটু এই নিয়ে যা বা পড়েছিলাম তাও মনে আসছে না অথবা যেটুকু বা আসছে তার সাথে এখন গুগল মশাইয়ের বক্তব্য একটুও মেলানো যাচ্ছে না। ভাবলাম, অনেক হয়েছে ছেড়ে দিই, কিন্তু লক ডাউনও তো দেখছি শেষ হচ্ছে না, অগত্যা কি আর করা, দেখা যাক এর কোন শেষ পাই কি না! এইভাবে যখন হাবুডুবু খাচ্ছি হঠাত একটু আলোর রেখা দেখা গেল এবং তা একদিন নিজের কর্মক্ষেত্রে একটি বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। আলোচনা হচ্ছিল উদ্ভিদের আত্ম সুরক্ষা বিষয়ে, এমন এমন বিরূপ পরিস্থিতি আমাদের চোখের সামনে চারপাশে রয়েছে যাকে বলে কিনা স্ট্রেস কন্ডিশন সেখানে কোন উদ্ভিদ তার প্রয়োজনীয় ন্যূনতম জল, খাদ্য, আলো ইত্যাদি না পেলেও কিভাবে বেঁচে থাকে? আবার গাছেরও তো প্রাণ আছে, অতএব তার রোগ অসুখ বিসুখও আছে, তাহলে তারাই বা নিজের থেকে সুরক্ষা কিভাবে দেয়? কেউ তো তাদের কোন ভাইরাস রোগ হলে ওষুধও দেয় না, ভ্যাকসিন বা টিকাও দেয় না, তাহলে তারাই বা কি করে বেঁচে ওঠে? নিশ্চয়ই ওদের কোন আত্ম সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে এবং তার পিছনে নিশ্চয় বিজ্ঞানও আছে! অতএব মানুষ এত উন্নত প্রাণী তার আত্ম সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তাই এবার ভাবলাম, না আর ভেবে লাভ নেই, এই বিষয়টার একটা শেষ দেখতেই হবে। এখন শেষ দেখতে পেলাম কি না, পারলাম কি না তা জানি না তবে এই কদিনে যা মনে হয়েছে তাইই তুলে ধরার চেষ্টা করছি দুটি পর্বে, আজ প্রথম পর্ব যেখানে এই আত্ম সুরক্ষা কি, কাকে বলে, কিভাবে তা কাজ করে এইসব একটু জানার এবং জানানোর চেষ্টা করবো, আর দ্বিতীয় পর্বে এই আত্ম সুরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখতে বা বাড়াতে আমাদের কি করণীয় তা আলোচনা করবো। আশা করি হয়তো কারোর খুব একটা ভালো লাগবে না, লাগার কথাও না, কিন্তু কি করি উপায়ও তো নেই কারন এটাই যে এখন সময়ের দাবী।
বর্তমান সময়ের এই মহামারীর ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে সারা পৃথিবী যখন একরকম গৃহবন্দী, স্বাভাবিক জীবন যখন বিপর্যস্ত এবং করোনা সংক্রমণ আটকাতে যখন চিকিৎসা ব্যবস্থা হিমশিম এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিরুপায় দিন গুনছে তখন বলা যেতেই পারে যে আধুনিক জীবনযাত্রা এবং মানব সভ্যতা চরম সংকটে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে এটা কি স্বাভাবিক নাকি সত্যি অস্বাভাবিক? যদি স্বাভাবিক হয় তাহলে এর সমাধান হিসেবে সেরকম কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা বেরিয়ে আসছে না কেন? তাহলে কি মানব জাতি আজ সত্যি অসহায় নাকি বর্তমান মানব সভ্যতা এতদিন এগোনোর নামে আসলে এতটাই পিছিয়ে পড়েছে যে অদূর ভবিষ্যতে তার পতন অবশ্যম্ভাবী এবং নতুন সভ্যতার সূচনা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র? আর যদি অস্বাভাবিক হয় তাহলে এর জন্য আসলে কে বা কারা দায়ী এবং কি করলে আবার সবকিছু স্বাভাবিকের দিকে ফিরে আসবে? আমাদের দেশে পরিযায়ী প্রান্তিক মানুষ তথা শ্রমিকের দল যেভাবে হাঁটতে হাঁটতে তাদের নিজস্ব বাসস্থানের ঠিকানায় আধুনিক তথা যান্ত্রিক দুনিয়ার সাহায্য ছাড়া পৌঁছাতে বাধ্য হচ্ছে তা সে যতই কষ্ট হোক না কেন তেমনি সমগ্র মানব জাতি কি পারবে সেইরকম সকল যান্ত্রিক তথা আধুনিক ব্যবস্থাকে অস্বীকার করে পিছনের দিকে হাঁটতে নিজের সঠিক এবং নিরাপদ অবস্থান খুঁজে পাওয়ার জন্য? জানি খুব কঠিন প্রশ্ন এবং একরকম অসম্ভব কিন্তু বিগত কয়েক মাসের করোনা মোকাবিলার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে সেই অসম্ভব কিন্তু সম্ভাবনার দিকে অনেকটা এগিয়ে গেছে এবং একেই বোধহয় বলে সম্মানের সাথে পিছন ফেরা তথা ঘরে ফেরা। এখন বর্তমান মানব সভ্যতাকেও বোধহয় আবার পিছনের দিকে ফিরতে হবে, লক ডাউন হয়তো তারই ইঙ্গিত। আচ্ছা এর আগেও তো এরকম অনেক মহামারী মানুষ জাতি ফেস করেছে, অনেক প্রাণহানিও হয়েছে কিন্তু একটা সময় পরে তার মোকাবিলাও করা গেছে কোন না কোনভাবে তাবলে তো এমন লক ডাউন হয়েছে বলে জানা যায় নি? অতীতে কখনো কখনো কোন দেশ বা কয়েকটা দেশ বা কোন দেশের কিছু এলাকা সংক্রমিত হয়েছে কিন্তু এভাবে তো একরকম পুরো পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ এভাবে একসাথে আক্রান্ত হয় নি? ভীষণ অদ্ভুত এক অবস্থা সত্যি! সভ্যতার এতখানি অগ্রগতির পরেও কিনা একটা ছোট্ট ভাইরাসের কাছে মানুষ এতখানি অসহায়, সকলের এভাবে নাকানি চোবানি? সত্যি ভাবা যাচ্ছে না! যাইহোক, এসব ক্ষেত্রে মানুষ যাদের বেশী ভরসা করে থাকে সেই ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থকর্মী, তারাই যখন যথেষ্ট আতঙ্কিত তখন সাধারন মানুষ তো আতঙ্কিত হতে বাধ্য। কিন্তু কেন? তাহলে কি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মানে রেজিস্ট্যান্স বা ইমিউনিটির ওপরে কোনরকম আস্থা আর নেই? আজকে কিন্তু সময় এসেছে আমাদের আত্মবিশ্বাস তথা আত্ম সুরক্ষা তথা আত্ম প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আবার নতুন করে জাগিয়ে তোলার বা বাড়িয়ে তোলার তা নাহলে কিন্তু এই মারণ ভাইরাসের মোকাবিলা করা সত্যি কঠিন বিষয় কেননা এভাবে অনির্দিষ্টকাল লক ডাউন চলা বা মেনে নেওয়া আজকের দিনে মোটেই বাস্তবে সম্ভব নয়, আর যেহেতু ওষুধের মাধ্যমে ভাইরাস রোগের চিকিৎসা এখনো অবধি তেমন কার্যকরী বলা যায় না এবং ভ্যাকসিন বা টীকা বের হলেও এই ভাইরাসের ক্ষেত্রে তা কতটা ও কতদিন কার্যকরী থাকবে তাও অনেকটাই অনিশ্চিত, তাই হয়তো আমাদের এই ভাইরাসকে যদি সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় তাহলে এর বিরুদ্ধে আমাদের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা তথা ইমিউনিটির উপর আস্থা অবশ্যই রাখতে হবে এবং তা বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে। হয়তো এই মারণ ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের এই ইমিউনিটি একমাত্র পারবে আমাদের সুরক্ষা দিতে এবং মানব সভ্যতাকে আবার তার স্বাভাবিক নিয়মে ফিরিয়ে আনতে যাতে ভবিষ্যতে লক ডাউনের মত পরিস্থিতি হবে না এবং আর পাঁচটা সাধারন ভাইরাসের মতো সামান্য চিকিৎসায় এই রোগের উপশম সম্ভব হবে।
এখন দেখা যাক এই আত্ম সুরক্ষা ব্যবস্থা বা ইমিউনিটি আসলে কি? ইমিউনিটি হলো এক ধরনের শারীরবৃত্তীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা যে নিজের থেকেই শরীরের মধ্যে বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে সচেতন ও সজাগ থাকে এবং বাইরের কোন জীবাণুকে দেখামাত্র চিহ্নিত করে, আটকানোর চেষ্টা করে, মেরে ফেলার চেষ্টা করে অথবা এতটাই দমিয়ে রাখে যে সেই জীবাণু শরীরে কোন রোগের সৃষ্টি করতে পারে না অথবা রোগ সৃষ্টি করতে পারলেও শরীরের তেমন ক্ষতি করতে পারে না। কথায় আছে, শরীরং ব্যাধি মন্দিরং অর্থাৎ কিনা শরীর থাকলেই রোগ ব্যাধিও থাকবে, এটা একটা চিরন্তন সত্য এবং অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে শরীর থাকবে অথচ রোগ জীবাণু শরীরে থাকবে না, এমনটা হতে পারে না। কিন্তু এই কথাটা যদি একটু গভীরে ভাবা যায় তাহলে দেখা যাবে, শরীর থাকলে অবশ্যই তার ইমিউনিটিও থাকবে মানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও থাকবে এবং সে প্রয়োজনমতো রোগ দমনও করবে তা নাহলে শরীরের পক্ষে এতরকম রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকা সত্যি অসম্ভব, তাইতো এই মারণ ভাইরাসের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে যাদের ইমিউনিটি দুর্বল তারাই তাড়াতাড়ি হেরে যাচ্ছে এবং তাদের কেউ কেউ মারাও যাচ্ছে, আর যাদের ইমিউনিটি যথেষ্ট ভালো তারা কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই ভাইরাসকে জয় করে আবার সুস্থ্য হয়ে উঠছে এবং সবাইকে আশার আলো দেখাচ্ছে, আতঙ্কিত না হবার সূচনা দিচ্ছে।
এখন দেখা যাক এই ইমিউনিটি কিভাবে কাজ করে? সাধারনত তিন ভাবে এই ইমিউনিটি বা আত্ম সুরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করে থাকে-
১) এড়িয়ে যাওয়া বা এসকেপ করাঃ এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বাইরের রোগ জীবাণু যাতে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে তার ব্যবস্থা করে, প্রবেশের ছিদ্রপথগুলিকে সুরক্ষিত করার জন্য সেখানে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে যাতে ঢোকা মাত্র চিনে ফেলা যায় এবং তাকে মেরে ফেলা যায় বা আবার তাকে ওই ছিদ্রপথ দিয়েই বাইরে বের করে দেওয়া যায়।
২) সহনশীলতা গড়ে তোলাঃ এখানে রোগ জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেও প্রতিরোধ ব্যবস্থা এমন গড়ে তোলা থাকে যে শরীর তাকে সয়ে নিতে পারে অর্থাৎ শরীরে রোগ জীবাণু থাকা সত্ত্বেও খুব একটা ক্ষতি করতে পারে না আত্ম সুরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী থাকায়।
৩) দমন বা নিয়ন্ত্রনঃ এই ব্যবস্থায় যখন কোন জীবাণু সত্যি সত্যি শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করে এবং শরীরের ক্ষতি করতে শুরু করে তখন তাকে চিহ্নিত করে, বড়সড় ক্ষতি করার আগে নিষ্ক্রিয় করা হয় অথবা মেরে ফেলা হয় যাতে সে কখনোই মারণকারী হয়ে উঠতে না পারে।
এখন এই ইমিউনিটি সিস্টেম বা আত্ম সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা মানুষের শরীরে কাদের নিয়ে কাজ করে? এটা এক ধরনের জটিল কর্মকাণ্ড, যার মধ্যে শরীরের মধ্যেকার কিছু কিছু কোষ বা কলা (কোষ সমষ্টি), তাদের উৎপাদিত নানারকম প্রোটিন তথা অ্যামিনো অ্যাসিড ও এরকমই কিছু বিশেষ জৈব রাসায়নিক বস্তু একসাথে মিলে রোগ জীবাণুদের বিরুদ্ধে আত্ম সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং তাদের আক্রমণের হাত শরীরকে রক্ষা করে তথা ইমিউনিটি প্রদান করে। শরীরের মধ্যে অনেক ধরনের কোষ বা কোষ সমষ্টি (কলা) থাকে এবং তাদের প্রত্যেকের বিভিন্ন রকম নির্দিষ্ট কাজও থাকে, সুরক্ষা প্রদানের কাজের সাথে সবাই যুক্ত থাকে না। কিন্তু যারা এই কাজে অংশ গ্রহণ করে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো-
১) শ্বেত রক্তকণিকাঃ রক্তের এই অন্যতম উপাদান, শ্বেত রক্তকণিকা, হাড়ের মজ্জায় উৎপন্ন হয়ে রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এদের প্রধান কাজই হলো বাইরে থেকে আসা বা আগন্তুক যে কোন ধরনের জীবাণুকে খুঁজতে থাকা এবং দেখামাত্র তাদের চিহ্নিত করে আক্রমণ করা। শ্বেত রক্তকণিকাকে লিউকোসাইটও বলা হয়। এই শ্বেত কণিকা রক্ত জালিকা ছাড়াও লিম্ফ্যাটিক জালিকার দ্বারা সারা শরীরে প্রবাহিত হয়ে থাকে যা শিরা বা ধমনীর সমান্তরাল এক প্রবাহ মাধ্যম। এদের কাজ যেমন একদিকে জীবাণু শত্রুকে খুঁজে বের করা তেমনি দেখামাত্র তাদের চিহ্নিত করা, আটকানোর চেষ্টা করা এবং মেরে ফেলা। আবার এই সময়কালে শ্বেত কণিকার একটা বড়ো কাজ হলো নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং অন্য কণিকাদের বার্তা পাঠানো যাতে তারাও তা করতে পারে। সাধারনত শ্বেত কণিকা শরীরের বিভিন্ন অংশে আগে থেকেই জমানো থাকে। যে সব জায়গায় এরা জমানো থাকে তাদের লিম্ফয়েড অরগ্যান বলে। যেমন-
ক) থাইমাসঃ এই গ্রন্থি ঘাড়ের নীচে এবং ফুসফুসের ওপরে অবস্থিত থাকে। এটি রক্তের পরিমান নিয়ন্ত্রণ করে, টি লিম্ফোসাইটস (T. Cell) তৈরী করে এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
খ) স্প্লিনঃ এই গ্রন্থি পেটের উপরের দিকে বাঁ পাশে থাকে। এখানে রক্ত শোধনের কাজ হয়, ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত লোহিত কণিকাদের নষ্ট করা হয় এবং জীবাণু ধ্বংস করা হয়। এই গ্রন্থির মধ্যেও অ্যান্টিবডি ও লিম্ফোসাইট থাকে যার মাধ্যমে এই জীবাণুদের নষ্ট করা হয়।
গ) মজ্জাঃ এই গ্রন্থি সকল হাড়ের কেন্দ্রে অবস্থান করে। এর মধ্যে স্পঞ্জি টিস্যু বা নরম কোষ সমষ্টি থাকে এবং রক্তের লোহিত কণিকা, শ্বেত কণিকা ও প্লেটলেট তৈরী করে।
ঘ) লিম্ফ নোডসঃ এই ক্ষুদ্র গ্রন্থিগুলি সারা শরীর জুড়ে থাকে এবং লিম্ফ্যাটিক জালিকার দ্বারা সংযুক্ত থাকে। এরা লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সরু টিউবের মতো জালিকার এই ছড়ানো প্রবাহ মাধ্যমের সাহায্যে শ্বেত কণিকা দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং গুরত্ব সহকারে প্রতিরোধের কাজ করে, যেমন- শরীরে তরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, ক্যানসার কোষকে প্রতিরোধ করে, ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করে, কোষের দ্বারা সৃষ্ট দুষিত পদার্থকে নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের অসুবিধা আটকায় এবং অন্ত্র থেকে খাদ্যের কিছু ফ্যাট জাতীয় অংশ শোষন করে।
শ্বেত কণিকা বা লিউকোসাইট মূলত দুই ধরনের হয়, যেমন-
ক) ফ্যাগোসাইটস- এই ধরনের কোষ জীবাণুকে ঘিরে ধরে, শোষণ করে, ভেঙে ফেলে ও শেষে খেয়ে ফেলে। এরাও আবার অনেক রকমের হয়-
a)নিউট্রোফিলসঃ এরা সাধারনত ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে,
b)মনোসাইটসঃ এরা সাইজে খুব বড়ো হয় এবং জীবাণু ধ্বংস করা ছাড়াও অনেক রকমের কাজ করে থাকে।
c)মাস্ট সেলসঃ এরাও অনেক রকম কাজ করে। ক্ষত সারায়, জীবাণুর থেকে শরীরকে সুরক্ষা দেয়।
খ) লিম্ফোসাইটস- এরা হাড়ের মজ্জায় থাকে, আগের জীবাণু যারা শরীরে আক্রমণ করেছিল তাদের চিনে রাখে, কিছু আবার এমনি মজ্জায় থাকে ও বি লিম্ফোসাইটস (B. Cells) উৎপন্ন করে, বাকিরা থাইমাসে মাথা গুঁজে থাকে এবং টি সেল রূপে কাজ করে। এরাও দুই ধরনের হয়-
a)B. Cells: এরা অ্যান্টিবডি উৎপন্ন করে এবং T. Cells দের সঙ্কেত পাঠিয়ে সজাগ করে।
b)T. Cells: এরা ক্ষতিগ্রস্ত কোষদের ধ্বংস করে এবং অন্য শ্বেত কণিকাদের বার্তা পাঠায়।
২) অ্যান্টিবডিঃ এগুলি কোন কোষ থেকে তৈরী হওয়া নানান জৈব রাসায়নিক বস্তু যা রোগ প্রতিরোধে কাজে লাগে। এই অ্যান্টিবডির কাজ হলো জীবাণু বা জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট টক্সিনকে(রাসায়নিক বিষ জাতীয় পদার্থ) চিহ্নিত করে নষ্ট করা। জীবাণুর গায়ে যে অ্যান্টিজেন লেগে থাকে বা যে টক্সিন জীবাণুর গা থেকে নিঃসৃত হয় তাকে এরা প্রথমে চিহ্নিত করে এবং তারপর তাদের আক্রমণ করে ধংস করে যাতে ওইসব অ্যান্টিজেন বা টক্সিন শরীরের কোন ক্ষতি করতে না পারে।
৩) কমপ্লিমেন্ট সিস্টেমঃ এখানে বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন থাকে যারা সম্মিলিতভাবে অ্যান্টিবডির মতো কাজ করে এবং জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
৪) অন্যান্য সিস্টেমঃ অন্যদের মধ্যে স্কিনের ব্যাকটেরিয়া দমন করার ক্ষমতা থাকে ও অন্য জীবাণুদের প্রবেশে বাধা দেয়। ফুসফুসের মিউকাস জীবাণুদের ট্র্যাপ করে এবং সিলিয়ার সাহায্যে বাইরে বের করে থাকে। পাকস্থলীর অ্যাসিড অনেক জীবাণুদের মেরে ফেলে এবং এর মিউকাস স্তর অনেক অ্যান্টিবডি ধরে রাখে।
এখন দেখা যাক যে এই ইমিউনিটি সিস্টেম কিভাবে রেসপন্স করে বা কাজ করে?
B-Cells অ্যান্টিবডি নিঃসরণ করে, এই অ্যান্টিবডি অ্যান্টিজেনকে আবদ্ধ করে বা লক করে। অ্যান্টিবডি যে কোন ধরনের কোষের প্রোটিনকে চিনতে পারে যেগুলো তার ওপর লেগে থাকে। অ্যান্টিজেন হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোন ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, টক্সিন বা অন্য কোন বাইরের বস্তু, এছাড়াও নিজের শরীরের কোন মৃত বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষও হতে পারে। B-Cells এর কাজই হলো অ্যান্টিজেনকে চিহ্নিত করা এবং সেখানে অ্যান্টিবডি নিঃসরণ করা। অ্যান্টিবডি হলো বিশেষ ধরনের প্রোটিন যারা নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনকে লক করে বা আবদ্ধ করে। প্রতিটি B-Cell এক নির্দিষ্ট ধরনের অ্যান্টিবডি উৎপন্ন করে, যেমন কেউ নিমুনিয়া ব্যাকটেরিয়া, আবার কেউ কোন এক ভাইরাসের জন্য অ্যান্টিবডি তৈরী করে থাকে যারা বিশেষ ওই অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধেই শুধু কাজ করে। অ্যান্টিবডি হলো এক ধরনের জৈব রাসায়নিক বস্তু এবং এক বৃহৎ পরিবারের সদস্যের মতো যাদের বলা হয় ইমিউনোগ্লোবিউলিন্স(Ig), যেমন-
ক) Ig G: এরা শুধুমাত্র জীবাণুকে চেনার কাজটুকু করে এবং মার্কিং যাতে অন্যেরা তাকে চিনতে পারে ও ডিল করতে পারে।
খ) Ig M: এরা ব্যাকটেরিয়াকে হত্যা করে।
গ) Ig A: এরা চোখের জল, লালারস জাতীয় তরল অংশে জমা হয় ও জীবাণুদের শরীরে ঢুকতে বাধা দেয় বা শরীরের থেকে বাইরে বের করে দিতে সাহায্য করে।
ঘ) Ig E: এরা প্যারাসাইট বা পরজীবীর থেকে সুরক্ষা দেয় এবং এলার্জি নষ্ট করে।
ঙ) Ig D: এরা B-Cell এর শরীরে বাঁধা থাকে আর তাদের ঠিক সময়ে সুরক্ষা কাজে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
অ্যান্টিবডি কিন্তু জীবাণুকে পুরোপুরি মারতে পারে না বরং চিহ্নিত করে এবং লক করে রাখে। মেরে ফেলার কাজটা কিন্তু করে ফ্যাগোসাইটস। T-Cell আবার অনেক ধরনের হয়-
a) Helper T-Cell: এরা সুরক্ষা প্রতিক্রিয়ার সংযোগ রক্ষাকারী এবং কিছু অন্য কোষের সাথেও সংযোগ রক্ষা করে। কিছু আবার B-Cellকে অ্যান্টিবডি উৎপাদনে উদ্দীপনা দেয়, আবার কিছু কিছু অন্য T-Cellদের আকর্ষণ করে অথবা ফ্যাগোসাইটসদের আমন্ত্রণ করে।
b) Killer T-Cell: এরা অন্য কোষদের আক্রমণ করে। ভাইরাসের জন্য এরা আবার খুব কার্যকরী। অচেনা কোন ভাইরাসকে অথবা ভাইরাস আক্রান্ত কোষদের দেখামাত্র এরা আক্রমণ করে ও নষ্ট করে।
সর্বোপরি আত্ম সুরক্ষাঃ মানুষের শরীরের স্কিন বা চামড়া হলো প্রথম স্তরের সুরক্ষা বলয়। বাইরের থেকে আসা যে কোন ধরনের বস্তু বা জীবাণুর জন্য এটাই হলো প্রথম বাধা। মানুষের এক একজনের সুরক্ষা বলয় যদিও একেক রকম তবুও এটা বলা যায় যে পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় এই সুরক্ষা বলয় সবথেকে শক্তিশালী। তার আগে যেমন শৈশবে বা তার পরে যেমন বার্ধক্যে এই সুরক্ষা বলয় কিন্তু অনেক দুর্বল থাকে এবং সেজন্য সুরক্ষাও কম হয়ে থাকে। শৈশবকালে যেমন অনেক জীবাণুর আক্রমণের সম্ভাবনা বেশী থাকে, তেমনি ওইসময় সেইসব জীবাণুর প্রতি সহনশীলতা ও সুরক্ষা বলয়ও গড়ে ওঠে প্রতিক্রিয়া স্বরূপ। সেই সময় থেকে কোন অ্যান্টিবডি একবার উৎপন্ন হলে শরীরে তার কপি রয়ে যায় এবং সেই জীবাণু আবার কখনো ফিরে এলে দরকারে সেই অ্যান্টিবডি আবার দ্রুত উৎপন্ন হতে পারে ও সুরক্ষার কাজ করতে পারে। যেমন গুটিবসন্ত(স্মল পক্স) বা জলবসন্ত(চিকেন পক্স) এর অ্যান্টিবডি শিশুকালে একবার তৈরী হয়ে থাকলে তা পরবর্তী কালে সারা জীবন ওই শিশুকে সুরক্ষা দিতে পারে এবং ভ্যাকসিন এই জন্যই ব্যবহৃত হয় ও অ্যান্টিবডি তৈরী করে শরীরকে রোগের থেকে সুরক্ষা দেয়। সাধারণত তিন ধরনের ইমিউনিটি মানুষের শরীরে বর্তমান থাকে এবং শরীরকে সুরক্ষা দান করে, যেমন-
ক) জন্মগতঃ জন্মসূত্রে আমরা কিছু ইমিউনিটি পেয়ে থাকি এবং তা প্রথম থেকেই আমাদের বাইরের জীবাণুর হাত থেকে সুরক্ষা দেয়। চামড়া সহ গলা ও পৌষ্টিক নালীর মিউকাস মেমব্রেন এর প্রধান উদাহরণ।
খ) অভিযোজনগতঃ জন্মের পর থেকে আমরা বিভিন্ন জীবাণুর সংস্পর্শে আসি, ফলে তার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ শরীরে প্রচুর অ্যান্টিবডি তৈরী হতে শুরু করে এবং ওইসব জীবাণুদের শত্রু হিসেবে চিনে মেমোরিতে সংরক্ষণ করতে থাকে। এইভাবে ওদের একটা লিস্ট তৈরী হয়ে যায় এবং পরে তাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে সুরক্ষা দান করে।
গ) সংগৃহীতঃ এখানে পরোক্ষভাবে অন্যের ইমিউনিটির মাধ্যমে সুরক্ষার ব্যবস্থা হয়ে থাকে। যেমন শিশু যখন মায়ের থেকে অ্যান্টিবডি সংগ্রহ করে এবং সুরক্ষা লাভ করে প্লাসেন্টা বা মায়ের দুধের মধ্যে দিয়ে তখন তা কিন্তু কিছুদিনের জন্য সুরক্ষা দান করে যদিও এটা বেশীদিন স্থায়ী হয় না।
ঘ) ইমিউনাইজেশনঃ যখন পরিশোধিত অ্যান্টিজেন বা দুর্বল করা জীবাণুকে ভ্যাকসিন হিসেবে মানুষের শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তখন শরীর খুব একটা অসুস্থ হয় না অথচ শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরী হয়ে যায় এবং তার কপি শরীরে সেভ হয়ে থাকে, এই পদ্ধতিকে ইমিউনাইজেশন বলে। পরে যখন সেই একই জীবাণু সক্রিয়ভাবে শরীরে রোগ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে তখন ওই তৈরী হওয়া অ্যান্টিবডি সক্রিয় হয়ে দ্রুত তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
প্রথম পর্বে আজ এই পর্যন্ত। পড়ে যদি ভালো লেগে থাকে বা না লেগেও থাকে, তাও কমেন্ট করে জানাবেন এবং দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে এই আত্ম সুরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখতে বা বাড়াতে আমাদের কি করণীয় তা নিয়ে আলোচনা চলবে।
***