22/08/2026
জাতীয় শিক্ষার স্বপ্ন থেকে মতাদর্শগত আধিপত্য: যাদবপুর, বামপন্থা এবং প্রশ্নহীন প্রগতিশীলতার রাজনীতি
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে বুঝতে হলে প্রথমেই তার বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ফিরে তাকাতে হবে তার জন্মের ইতিহাসের দিকে। কারণ যাদবপুরের ইতিহাস নিছক একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়। এর শিকড় প্রোথিত বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় আত্মমর্যাদার সংগ্রামে এবং ভারতীয়দের নিজেদের হাতে, নিজেদের প্রয়োজন ও আদর্শ অনুযায়ী একটি স্বাধীন শিক্ষাব্যবস্থা নির্মাণের আকাঙ্ক্ষায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাস থেকেই জানা যায়, ১৯০৫ থেকে ১৯০৬ সালের জাতীয়তাবাদী উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে গড়ে উঠেছিল ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন, বেঙ্গল। উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শিক্ষাকে জাতীয় আদর্শ এবং জাতীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে পরিচালিত করা। শিক্ষার মাধ্যমে আত্মনির্ভরতা, আত্মমর্যাদা এবং জাতীয় শক্তির ভিত নির্মাণই ছিল সেই উদ্যোগের প্রাণকেন্দ্র।
সেই প্রতিষ্ঠানগত ধারাই প্রথমে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, পরে কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৫৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ লাভ করে। এই ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আজ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
যে প্রতিষ্ঠানের জন্মের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে জাতীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, স্বদেশি আত্মনির্ভরতা এবং নিজের শিক্ষার ওপর নিজের অধিকার, সেই প্রতিষ্ঠান কীভাবে সময়ের প্রবাহে এমন এক শক্তিশালী বামপন্থী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে উঠল, যেখানে অনেকের চোখে একটি বিশেষ বিশ্বদৃষ্টি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় স্বাভাবিক, প্রগতিশীল এবং নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে?
প্রশ্নটি কখনোই এই নয় যে যাদবপুরে বামপন্থী ছাত্র থাকবে কি থাকবে না। একটি গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কসবাদী, সমাজতন্ত্রী, জাতীয়তাবাদী, উদারপন্থী, রক্ষণশীল এবং অন্যান্য সমস্ত মতের ছাত্রেরই সমান জায়গা থাকা উচিত।
প্রকৃত প্রশ্নটি অন্যত্র। কোনো একটি মতাদর্শ কি দীর্ঘকাল ধরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ভাষা, রাজনৈতিক বৈধতা এবং এমনকি ‘কোন চিন্তাটি প্রগতিশীল’ এই নৈতিক বিচারবোধের ওপরও একধরনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে?
‘মগজধোলাই’ শব্দটি ব্যবহার করা সহজ। কিন্তু তা বিশ্লেষণকে শক্তিশালী করার বদলে অনেক সময় দুর্বল করে দেয়। এর চেয়ে অনেক বেশি যথাযথ শব্দ হলো মতাদর্শগত আধিপত্য।
আন্তোনিও গ্রামশির চিন্তাকেই যদি এখানে প্রয়োগ করি, তাহলে দেখা যায় ক্ষমতা কেবল পুলিশ, প্রশাসন, আইন বা রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। ক্ষমতা সংস্কৃতির মধ্য দিয়েও কাজ করে। ভাষার মধ্য দিয়ে কাজ করে। শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কাজ করে। এমনকি কোন ধারণাকে সমাজ ‘স্বাভাবিক বোধ’ বলে গ্রহণ করবে, সেটিও ক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
এই তত্ত্বের আলোতেই যাদবপুরের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পরীক্ষা করা যেতে পারে। যদি কোনো একটি মতাদর্শ এতটাই সাংস্কৃতিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে যে তার বিরোধিতা করলেই কাউকে সহজে প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক, দক্ষিণপন্থী কিংবা ফ্যাসিবাদী বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা তৈরি হয়, তবে তাকে নিছক মুক্তচিন্তার বিজয় বলা কঠিন।
বরং তখন প্রশ্ন ওঠে, পুরোনো কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কি নতুন এক ধরনের বৌদ্ধিক অনুগত্য তৈরি হয়েছে? নতুন এক মতাদর্শগত একরৈখিকতা?
এখানেই বামপন্থার সবচেয়ে বড় দাবি এবং সবচেয়ে গভীর স্ববিরোধ পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়। বামপন্থা ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার রাজনীতি। রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করা। পুঁজিকে প্রশ্ন করা। সামাজিক বৈষম্যকে প্রশ্ন করা। প্রথাগত কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করা।
কিন্তু সেই রাজনীতিই যখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হয়, তখন তাকে প্রশ্ন করবে কে? যে মতাদর্শ সারাজীবন ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী’ থাকার নৈতিক দাবি করে, সেটি যখন নিজেই একটি ক্যাম্পাস-প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তখন তার বিরুদ্ধে মতভিন্নতা কি একই মর্যাদা পায়? নাকি প্রতিবাদ তখনও পবিত্র, কিন্তু কেবল সেই প্রতিবাদই পবিত্র যা প্রচলিত বামপন্থী অভিধানের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করে? প্রশ্নটি এখানেই। মতভিন্নতার অধিকার কি সর্বজনীন, নাকি মতাদর্শনির্ভর?
এই বিতর্ককে আরও গভীর করে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের নিজস্ব ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিতর্কটি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। সেই সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী), অর্থাৎ সিপিআই(এম), অস্তিত্বশীল ছিল না। সিপিআই(এম) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৪ সালে। তার পূর্বসূরি ছিল অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিআই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে সিপিআই যুদ্ধকে মূলত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর পারস্পরিক সংঘর্ষ হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু ১৯৪১ সালে নাৎসি জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করার পর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পাল্টে যায়। যুদ্ধকে তখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংগ্রাম হিসেবে দেখা শুরু হয়।
সেখানেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট কৌশলের মধ্যে একটি গভীর টানাপোড়েন তৈরি হয়। ১৯৪২ সালে যখন ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়, তখন ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নটি আর কোনো বিমূর্ত তাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল না। সেটি ছিল একটি পরাধীন জাতির ওপর থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্বের অবসান ঘটানোর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক দাবি।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে একটি কঠিন প্রশ্ন থেকে যায়। একটি ভারতীয় রাজনৈতিক দলের কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভারতীয় জাতীয় মুক্তির তাৎক্ষণিক প্রয়োজন কতটা অগ্রাধিকার পাবে, আর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট রাজনীতির কৌশলগত প্রয়োজন কতটা?
এর উত্তর নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক অবশ্যই থাকবে। সিপিআইয়ের পক্ষেও যুক্তি রয়েছে। তাদের কাছে নাৎসিবাদের পরাজয় ছিল বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ও মানবিক কর্তব্য। কিন্তু সমালোচনার জায়গাটিও সমানভাবে বাস্তব। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বৃহৎ গণঅভ্যুত্থানের মুহূর্তে তাদের অবস্থান জাতীয়তাবাদী মূলধারার সঙ্গে গভীর বিরোধ সৃষ্টি করেছিল।
ফলে এই ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে বামপন্থাকে ভারতের স্বাধীনতার একমাত্র কিংবা সর্বোচ্চ নৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা ঐতিহাসিকভাবে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
এরপর আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৬৪ সালে সিপিআই থেকে সিপিআই(এম)-এর জন্ম কোনো সামান্য নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তিগত সংঘাতের ফল ছিল না। ভারতীয় রাষ্ট্রের চরিত্র কী, শ্রেণিগত জোট কেমন হবে, কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ সংসদীয় না বিপ্লবী, এসব মৌলিক প্রশ্নে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল।
এক অংশ মনে করেছিল বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নির্দিষ্ট প্রগতিশীল শক্তির সঙ্গে কাজ করা সম্ভব। অন্য অংশ সেই অবস্থানকে সংশোধনবাদী প্রবণতা হিসেবে সমালোচনা করেছিল।
সিপিআই(এম)-এর নিজস্ব কর্মসূচিতেও মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ এবং ‘জনগণের গণতান্ত্রিক রূপান্তর’-এর ভাষায় রাজনৈতিক লক্ষ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কিন্তু ইতিহাস সেখানে থেমে থাকেনি। পরবর্তী সময়ে সিপিআই এবং সিপিআই(এম) আবার বৃহত্তর বাম ঐক্যের অংশ হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কৌশলগত সহযোগিতা হয়েছে। ভারতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় কংগ্রেসের সঙ্গেও বিষয়ভিত্তিক সহযোগিতা কিংবা নির্বাচনী সমঝোতার নজির রয়েছে।
জোট করা নিজে কোনো ভণ্ডামি নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জোট প্রয়োজনীয় হতে পারে। রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবতার সঙ্গে বদলাবে, সেটিই স্বাভাবিক।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন জন্ম নেয়। যে মতাদর্শ নিজেই বাস্তব রাজনীতিতে সময়, পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল, জোট এবং অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে, সেই মতাদর্শকে ছাত্রসমাজের সামনে প্রায় অপরিবর্তনীয় নৈতিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হবে কেন?
রাজনৈতিক নমনীয়তা কোনো অপরাধ নয়। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন নিজের নমনীয়তার নাম হয় ‘দ্বান্দ্বিক রাজনীতি’, আর প্রতিপক্ষের নমনীয়তার নাম হয় ‘সুবিধাবাদ’। নিজের জোট হয় ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজন’, প্রতিপক্ষের জোট হয় ‘আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’।
নিজের কৌশলগত পশ্চাদপসরণ হয় ‘বাস্তববাদ’, আর প্রতিপক্ষের কৌশলগত পরিবর্তন হয় ‘নীতিহীনতা’। তখন আর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ থাকে না। থাকে দ্বৈত মানদণ্ড। ইতিহাসের কাঠগড়ায় বিচার যদি হয়, তবে সেই বিচার সকলের জন্য সমান হওয়া উচিত।
যাদবপুরের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক কর্মী তৈরির কারখানা হওয়ার কথা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্ন করতে শেখানো। সে সত্য রাষ্ট্রের হতে পারে। বাজারের হতে পারে। বামপন্থার হতে পারে। ডানপন্থার হতে পারে। জাতীয়তাবাদের হতে পারে। আন্তর্জাতিকতাবাদেরও হতে পারে।
কিন্তু কোনো ক্যাম্পাসে যদি দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক শক্তি, সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক, শিক্ষক-ছাত্র বৌদ্ধিক পরিসর, সাহিত্য-সংস্কৃতির ভাষা এবং প্রতিবাদের নিজস্ব শব্দভাণ্ডার মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শগত পরিবেশ গড়ে ওঠে, তাহলে নতুন প্রজন্ম সেই পরিসরের বাইরেও সমান স্বাধীনতায় চিন্তা করার সুযোগ পাচ্ছে কি না, প্রশ্নটি একেবারেই বৈধ।
প্রমাণ ছাড়া বলা উচিত নয় যে যাদবপুরের প্রতিটি ছাত্র কিংবা শিক্ষক ‘মগজধোলাই’-এর শিকার। সেটি হবে দুর্বল, অতিরঞ্জিত এবং অবিচারপূর্ণ অভিযোগ। কিন্তু এটুকু পরীক্ষা করাই যায় যে ক্যাম্পাসের প্রধান রাজনৈতিক সংস্কৃতি মতাদর্শগত বহুত্বকে বাস্তবে সমান বৈধতা দেয় কি না।
কেউ বামপন্থী হলে তিনি স্বভাবতই ‘রাজনৈতিকভাবে সচেতন’, আর অন্য মতের হলে তিনি স্বভাবতই ‘কম বুদ্ধিমান’ কিংবা ‘পশ্চাৎপদ’, এমন এক অলিখিত ধারণা কি কোথাও কাজ করে? ‘প্রগতিশীল’ শব্দটির একচেটিয়া মালিকানা কি কোনো একটি রাজনৈতিক ধারার হাতে চলে গেছে?
জাতীয়তাবাদ মানেই কি পশ্চাৎপদতা? আন্তর্জাতিকতাবাদ মানেই কি নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব? রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করলেই কি প্রগতিশীল হওয়া যায়? রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি দিলেই কি প্রতিক্রিয়াশীল হতে হয়? এই প্রশ্নগুলো বুদ্ধিবিরোধী নয়। বরং এটাই প্রকৃত বৌদ্ধিক অনুসন্ধান।
এই আলোচনায় ‘আজাদি’ শব্দটিরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যাদবপুরের ঐতিহাসিক শিকড়ে যে স্বাধীনতার ধারণা ছিল, তার কেন্দ্রে ছিল ঔপনিবেশিক শাসন থেকে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ। ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনের স্বপ্ন ছিল জাতীয় নিয়ন্ত্রণে শিক্ষা এবং আত্মনির্ভরতা।
অন্যদিকে সমকালীন ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ‘আজাদি’ শব্দটি নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়। সামাজিক নিপীড়ন থেকে মুক্তি। জাতপাতের বৈষম্য থেকে মুক্তি। পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে মুক্তি। অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্তি। কখনো কখনো রাষ্ট্র এবং জাতিরাষ্ট্রের ধারণাকেও মৌলিকভাবে প্রশ্ন করার ভাষা হিসেবে। এই সব অর্থকে এক করে দেখা ভুল। কিন্তু প্রশ্ন করা ভুল নয়।
কোন আজাদি? কার কাছ থেকে আজাদি? কিসের জন্য আজাদি? এবং সেই আজাদির রাজনৈতিক গন্তব্য কোথায়? স্লোগান কখনো যুক্তির বিকল্প হতে পারে না। ‘আজাদি’ নিঃসন্দেহে শক্তিশালী একটি শব্দ। কিন্তু রাজনীতিতে শক্তিশালী শব্দের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তার সুনির্দিষ্ট অর্থ।
ঔপনিবেশিক পরাধীনতার বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তি এবং একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে একই প্রকৃতির শত্রু হিসেবে কল্পনা করা এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রের সমালোচনা গণতন্ত্রের অপরিহার্য অঙ্গ। রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করা নাগরিকের অধিকার।
কিন্তু রাষ্ট্র, সমাজ, জাতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর পরিবর্তে কী ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কল্পনা করা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলার অধিকারও সমানভাবে গণতান্ত্রিক।
এরপর আসে একবিংশ শতাব্দীতে সনাতনী কমিউনিস্ট রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি। মার্কসের রাজনৈতিক দর্শন এবং পরবর্তীকালের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী রাষ্ট্রগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে যে বিরাট দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তাকে উপেক্ষা করা যায় না।
মার্কসবাদী চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল, শ্রেণিশোষণের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের দমনমূলক চরিত্রও ক্রমে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। কিন্তু ইতিহাসে বহু একদলীয় কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের পথ অন্য প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিপ্লবের নামে প্রথমে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ হয়েছে। তারপর একটি অগ্রবর্তী দল রাষ্ট্রের ওপর প্রায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ক্রমে দল এবং রাষ্ট্রের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক বহুত্ব সংকুচিত হয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পথও সংকীর্ণ হয়েছে।
চীন এই স্ববিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমকালীন উদাহরণগুলোর একটি। আজকের চীনকে ধ্রুপদি কমিউনিজম দিয়ে ব্যাখ্যা করা অবশ্যই অতিসরলীকরণ হবে। সেখানে বাজার রয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোগ রয়েছে। বিশ্ববাণিজ্যের সঙ্গে গভীর সংযোগ রয়েছে। বিশাল প্রযুক্তিগত ও শিল্পোন্নয়ন ঘটেছে।
কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির একদলীয় কর্তৃত্ব। ২০১৮ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতির জন্য আগে বিদ্যমান পরপর দুই মেয়াদের সীমাও তুলে দেওয়া হয়। এখানেই প্রশ্নটি আরও গভীর হয়।
যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে বাজারের বহু পদ্ধতি গ্রহণ করা যায়, ব্যক্তিগত পুঁজির ভূমিকা স্বীকার করা যায় এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়া যায়, তাহলে রাজনৈতিক বহুত্ব, উন্মুক্ত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ ও নিয়মিত ক্ষমতা হস্তান্তরের ধারণাকে গ্রহণ করা যাবে না কেন?
তাহলে কি মতাদর্শ সত্যিই বিবর্তিত হচ্ছে? নাকি অর্থনৈতিক বাস্তববাদকে গ্রহণ করে রাজনৈতিক একাধিপত্যকে আরও কার্যকরভাবে সুরক্ষিত করা হচ্ছে?
এখানেই বৌদ্ধিক সততার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যকে অস্বীকার করা যেমন অসৎ হবে, তেমনই সোভিয়েত ইউনিয়নের শিল্পায়ন কিংবা কিউবার জনস্বাস্থ্যের কিছু সাফল্যকেও ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া চলে না।
একইভাবে বামপন্থার ঐতিহাসিক অবদানও অস্বীকার করা যায় না। শ্রমিকের অধিকার। কৃষকের প্রশ্ন। জমির অসমতা। সামাজিক বৈষম্য। সরকারি শিক্ষা। জনস্বাস্থ্য। অনিয়ন্ত্রিত পুঁজির ক্ষমতা। শোষণ এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিবাদ। এই সমস্ত ক্ষেত্রে বামপন্থী আন্দোলন পৃথিবীজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলেছে।
বামপন্থার সমালোচনা করার জন্য এই অবদান অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং সবচেয়ে শক্তিশালী সমালোচনা এখান থেকেই শুরু হতে পারে। যে মতাদর্শ অন্যের ক্ষমতাকে এত গভীরভাবে প্রশ্ন করে, সে কি নিজের ক্ষমতাকেও একই গভীরতায় প্রশ্ন করতে প্রস্তুত?
যে রাজনীতি শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলে, সে কি নিজের সংগঠনের ভেতরের স্তরবিন্যাস, অসহিষ্ণুতা এবং মতভিন্নতার জায়গা পরীক্ষা করবে? যে রাজনীতি গণতন্ত্রের কথা বলে, সে কি নিজের রাজনৈতিক দুর্গের ভেতরে মতাদর্শগত প্রতিযোগিতাকে সমান মর্যাদা দেবে? যে রাজনীতি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদের সমালোচনা করে, সে কি একদলীয় কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর কর্তৃত্ববাদী অভিজ্ঞতাকেও একই নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের বৌদ্ধিক সততা যাচাই হয়।
যাদবপুরের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্ম হয়েছিল স্বাধীন চিন্তা, জাতীয় আত্মনির্ভরতা এবং ঔপনিবেশিক বৌদ্ধিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রকল্প থেকে।
এই উত্তরাধিকার কোনো একবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনের স্বপ্নকে যেমন কেবল বামপন্থার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বলে দাবি করার অধিকার কারও নেই, তেমনই কোনো দক্ষিণপন্থী বা জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবেও তাকে দেখা উচিত নয়।
যাদবপুরের প্রতিষ্ঠাতাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার সম্ভবত কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ ছিল না। ছিল আরও মৌলিক কিছু। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের চিন্তা করার অধিকার। সুতরাং যাদবপুরে বামপন্থার সমালোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা এই নয় যে ‘সব বামপন্থী খারাপ’ অথবা ‘সব ছাত্রকে মগজধোলাই করা হয়েছে’।
এই ধরনের বক্তব্য আবেগ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু যুক্তির ভিত দুর্বল করে। প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত অন্য। কেন কোনো একটি মতাদর্শ নিজেকে প্রশ্নাতীত প্রগতিশীলতার মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে? কেন জাতীয়তাবাদ, উদারবাদ, রক্ষণশীলতা কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দর্শনকে সমান বৌদ্ধিক গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনার জায়গা দেওয়া হবে না? কেন প্রতিবাদের অধিকার কেবল তখনই সবচেয়ে পবিত্র হয়ে উঠবে, যখন সেই প্রতিবাদ একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শগত শব্দভাণ্ডারের মধ্যে প্রকাশিত হবে?
যে বামপন্থা সত্যিই মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করে, তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বামপন্থার বিরুদ্ধেও মুক্তচিন্তার অধিকার রক্ষা করা। যে বামপন্থা আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তাকে নিজের আধিপত্যের সম্ভাবনাকেও স্বীকার করতে হবে। যে বামপন্থা ইতিহাসকে প্রশ্ন করতে শেখায়, তাকে নিজের ইতিহাসকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে হবে।
‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনকে ঘিরে বিতর্ক। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে ভারতীয় জাতীয়তার টানাপোড়েন। সিপিআই এবং সিপিআই(এম)-এর বিভাজন। পরবর্তী কালের রাজনৈতিক সমঝোতা। একদলীয় কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। এসব কোনো নিষিদ্ধ অধ্যায় হতে পারে না। ইতিহাসকে যদি প্রশ্ন করতেই হয়, তবে নিজের ইতিহাসকেও করতে হবে।
যাদবপুরে বামপন্থার উপস্থিতি সমস্যা নয়। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন বামপন্থাকেই সেখানে চিন্তার একমাত্র বৈধ প্রবেশপত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো মতাদর্শের দুর্গ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক জায়গা, যেখানে মার্কসকে প্রশ্ন করা যাবে। গান্ধীকে প্রশ্ন করা যাবে। আম্বেদকরকে প্রশ্ন করা যাবে। সাভারকরকে প্রশ্ন করা যাবে। নেহরুকে প্রশ্ন করা যাবে। রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করা যাবে। অরবিন্দকে প্রশ্ন করা যাবে। উদারবাদকে প্রশ্ন করা যাবে। পুঁজিবাদকে প্রশ্ন করা যাবে। জাতীয়তাবাদকে প্রশ্ন করা যাবে। সমাজতন্ত্রকেও প্রশ্ন করা যাবে।
কোনো ধারণা শুধু পুরোনো বলে বাতিল হবে না। আবার কোনো ধারণার গায়ে ‘প্রগতিশীল’ তকমা থাকলেই সেটি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যাবে না। যাদবপুরের সামনে প্রকৃত প্রশ্ন তাই বাম বনাম ডান নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো বৌদ্ধিক স্বাধীনতা বনাম মতাদর্শগত একাধিপত্য। প্রশ্ন জাতীয়তাবাদ বনাম আন্তর্জাতিকতাবাদও নয়। প্রশ্ন হলো, কোনো রাজনৈতিক ধারণা কি নিজের দেশের ইতিহাস, বাস্তবতা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সৎভাবে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে?
প্রশ্ন প্রগতিশীলতার দাবি বনাম প্রতিক্রিয়াশীলতার অভিযোগও নয়। প্রশ্ন হলো, কে সত্যিই নিজের বিরুদ্ধেও সমালোচনার অধিকার রক্ষা করতে প্রস্তুত?
আর শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সম্ভবত এটাই যে রাজনীতি সারাজীবন ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার দাবি করে, সেই রাজনীতি যখন নিজেই কোনো প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক ক্ষমতায় পরিণত হয়, তখন তাকে প্রশ্ন করার অধিকার কার?
যাদবপুরের ইতিহাসকে সত্যিই সম্মান করতে হলে এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত কোনো একটি নির্দিষ্ট মতবাদে নিঃশর্ত আনুগত্য ছিল না।
তার শিক্ষা ছিল নিজের চিন্তার ওপর নিজের অধিকার। তার শিক্ষা ছিল বৌদ্ধিক আত্মমর্যাদা। তার শিক্ষা ছিল প্রশ্ন করার সাহস। এবং সম্ভবত তার সবচেয়ে গভীর শিক্ষা ছিল এটিই কোনো বিদেশি, রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক কিংবা প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধিক আধিপত্যের কাছে নিজের চিন্তার স্বাধীনতাকে সমর্পণ না করা।