31/07/2026
শহীদ উধম সিং (শের সিং) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অগ্নিযুগের শহীদ ও মার্ক্সবাদী বিপ্লবী। ১৯১৯ সালের নির্মম জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর, ১৯৪০ সালে লন্ডনে গিয়ে ওই গণহত্যার মূল খলনায়ক পাঞ্জাবের প্রাক্তন গভর্নর মাইকেল ও'ডোয়ায়ারকে গুলি করে হত্যা করে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
নিচে কমরেড উধম সিং-এর জীবন, আদর্শ এবং ঐতিহাসিক অবদানের বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
# # ১. প্রাথমিক জীবন ও এতিমখানার দিনগুলো
* জন্ম ও নাম পরিবর্তন: উধম সিং ১৮৯৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের সাঙ্গরুর জেলার সুনাম গ্রামে একটি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশবের নাম ছিল শের সিং।
* অনাথ আশ্রমের জীবন: মাত্র তিন বছর বয়সে তাঁর মা এবং ১৯০৭ সালে তাঁর বাবা মারা যান। অনাথ হয়ে যাওয়ার পর তিনি এবং তাঁর বড় ভাই অমৃতসরের 'সেন্ট্রাল খালসা অনাথ আশ্রমে' আশ্রয় নেন। সেখানেই শিখ ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাঁর নাম বদলে রাখা হয় উধম সিং।
# # ২. জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ও প্রতিজ্ঞা (১৯১৯)
১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে রাওলাট অ্যাক্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সমবেত সাধারণ মানুষের মাঝে কিশোর উধম সিং তাঁর অনাথ আশ্রমের বন্ধুদের সাথে জল পরিবেশন করছিলেন। সেই সময় পাঞ্জাবের তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও'ডোয়ায়ারের আদেশে জেনারেল ডায়ার নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে। উধম সিং অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও এই রক্তগঙ্গা তাঁর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে এবং তিনি দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে মাতৃভূমির এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন।
# # ৩. বিপ্লবী আদর্শ ও সমাজতন্ত্রে দীক্ষা
* গদর পার্টির অন্তর্ভুক্তি: ১৯২৪ সালে উধম সিং আমেরিকার প্রবাসী ভারতীয়দের বিপ্লবী সংগঠন গদর পার্টি (Ghadar Party)-তে যোগ দেন। এই সময় থেকেই তাঁর মধ্যে প্রবল সমাজতান্ত্রিক চেতনা এবং মার্ক্সবাদী মতাদর্শের বিকাশ ঘটে।
* ভগত সিং-এর প্রভাব: উধম সিং বিপ্লবী ভগত সিংকে নিজের আদর্শ এবং "সেরা বন্ধু" মনে করতেন। ভগত সিং-এর নেতৃত্বাধীন 'হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন' (HSRA) এর সাথেও তাঁর যোগাযোগ ছিল। ১৯২৭ সালে ভগত সিং-এর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি অস্ত্রসহ ভারতে ফেরার পথে ধরা পড়েন এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ১৯৩১ সালে যখন ভগত সিং-এর ফাঁসি হয়, উধম সিং তখন জেলে ছিলেন।
# # ৪. লন্ডনে মিশন ও প্রতিশোধ (১৯৪০)
১৯৩১ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে কড়া নজরদারি এড়িয়ে তিনি জার্মানি হয়ে ১৯৩৪ সালে লন্ডনে পৌঁছান। সেখানে নাম পরিবর্তন করে সাধারণ শ্রমিকের কাজ করার পাশাপাশি তিনি সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকেন।
* ঐতিহাসিক হত্যাকাণ্ড: দীর্ঘ ২১ বছরের অপেক্ষার পর, ১৯৪০ সালের ১৩ মার্চ লন্ডনের ক্যাক্সটন হলের (Caxton Hall) এক সভায় মাইকেল ও'ডোয়ায়ার বক্তব্য রাখছিলেন। উধম সিং একটি বইয়ের পাতা কেটে তার ভেতর রিভলভার লুকিয়ে সভাকক্ষে ঢোকেন এবং ও'ডোয়ায়ারকে লক্ষ্য করে পরপর দুটি গুলি চালিয়ে তাঁকে ঘটনাস্থলেই হত্যা করেন।
# # ৫. আত্মসমর্পণ, বিচার ও ফাঁসি
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর উধম সিং পালিয়ে যাওয়ার কোনো চেষ্টা করেননি এবং বীরের মতো আত্মসমর্পণ করেন।
* রাম মোহাম্মদ সিং আজাদ: ব্রিটিশ হেফাজতে থাকাকালীন তিনি নিজের নাম বলেন "রাম মোহাম্মদ সিং আজাদ" (Ram Mohammad Singh Azad)। এই নামটি তিনি নিজের হাতে ট্যাটুও করিয়েছিলেন, যা ভারতের তিনটি প্রধান ধর্ম (হিন্দু, মুসলিম, শিখ) এবং সর্বজনীন স্বাধীনতার ("আজাদ") প্রতীক ছিল।
* আদালতে নির্ভীক জবানবন্দি: বিচার চলাকালীন তিনি বলেছিলেন, "আমি ও'ডোয়ায়ারকে মেরেছি কারণ ও এটাই পাওয়ার যোগ্য ছিল। ও আমার দেশের মানুষের আত্মাকে পিষে দিতে চেয়েছিল, তাই আমি প্রতিশোধ নিয়েছি। আমি মরতে ভয় পাই না।"
* শহীদান: ১৯৪০ সালের ৩১ জুলাই লন্ডনের পেন্টনভিল কারাগারে (Pentonville Prison) এই মহান বিপ্লবীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
# # ৬. অবশেষ ও উত্তরাধিকার
১৯৭৪ সালে ভারত সরকারের প্রচেষ্টায় তাঁর দেবাশেস যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীন ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়। পাঞ্জাবের সু নামের মাটিতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় এবং তাঁর চিতাভস্ম শতদ্রু (Sutlej) নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়—যে নদীতে শহীদ ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেবের চিতাভস্ম বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল।
ঐতিহাসিকদের মতে, কমরেড উধম সিং শুধুমাত্র একজন প্রতিশোধ গ্রহণকারী ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের এক অন্যতম মুখ, যিনি সাম্রাজ্যবাদের খোদ কেন্দ্রস্থলে গিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন।