11/07/2025
"মৃত্যু বলে কিছু হয় না।
মানুষ তখন মারা যায়, যখন আমরা তাঁদের ভুলে যাই।" আমরা ভুলিনি আপনাকে, মাস্টারমশাই।
🙏 পরম শ্রদ্ধেয় দ্বিজেন্দ্র নাথ দাস মহাশয়
আজ তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে না থাকলেও,তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এই অঞ্চলের প্রতিজন মানুষের হৃদয়ে চিরজীবী। তিনি প্রমাণ করে গেছেন "একজন শিক্ষক কেবল পঠন-পাঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন, তিনি সমাজ গঠনের প্রধান কারিগর।"যদিও তাহার কাছ থাকে শিক্ষা গ্রহণ করি নাই কিন্তু তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞ বন্ধু,তিনি ছিলেন শিক্ষকের থেকেও বড় কিছু — একজন আলোকবর্তিকা হিসেবে দেখেছি।
একজন সমাজসেবক, এক আদর্শবান মানুষ, যাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি চালিয়ে গেছেন এই মহান কাজ। মাষ্টারমশাই শুধু বইয়ের পড়া শেখাননি, শেখিয়েছেন আদর্শ, নৈতিকতা, এবং মানুষের জন্য বাঁচার মর্ম।
শহর অঞ্চলের থেকে অত্যন্ত দূরের পিছিয়ে পড়া গ্রাম গৌরাং নদীর সমীপে চারপাশে ছড়ানো সবুজ ধানক্ষেত, বিশাল মাঠ, মাটির পথ, খাল বিল আর সন্ধ্যায় কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকা নিঃস্তব্ধতা । তিতাগুড়ির পার্ট (2)অঞ্চলের অত্যন্ত এক গ্রামের বিশাল মাঠের কোণায় ছায়াময় গাছের নিচে এক খড়কুটোর নির্মিত বিদ্যালয়ের নাম "৫৭৮ নং তিতাগুরী সেবা আশ্রম এলপি স্কুল" —সেখানেই সকালবেলা বেজে উঠত ছেলেমেয়েদের কোলাহল।এই গ্রামেই খড়কুটোর ঘরে এক সময় শিক্ষক হিসাবে নিয়োজিত দ্বিজেন্দ্র নাথ দাস মহাশয়—
পুরনো কাঠের চেয়ারে বসে থাকা খর্বকায় সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক শান্ত মানুষ, হাতে কাঠের স্কেল আর চোখে প্রজ্ঞার দীপ্তি
তিনি আমাদের গ্রামের মাস্টারমশাই
দ্বিজেন্দ্র নাথ দাস মহাশয়—এই নামটি শুধুমাত্র একজন শিক্ষকের পরিচয় নয়, বরং এক মহান মানুষ, যিনি আমাদের গ্রামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি আমাদের গ্রামের মাস্টারমশাই, যাঁর জীবন, আদর্শ ও নিষ্ঠা আজও প্রতিজন মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে গাঁথা।
এই অঞ্চলের মানুষ, সমাজ এবং বিদ্যালয়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসায় তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর শিক্ষা-সেবা শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই অনেকেই জীবনের সঠিক পথ খুঁজে পেয়েছে।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই গ্রামেই ছিলেন— বিদ্যালয়, ছাত্র ছাত্রী এবং অঞ্চলর মানুষের ও মাটির সঙ্গেই তাঁর আত্মিক বন্ধন ছিল। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনও এই গ্রাম ছেড়ে যাননি। কারণ তিনি শুধু শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন এই সমাজের পথপ্রদর্শক, অভিভাবক, বন্ধু।
আজ তিনি আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে না থাকলেও, তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও স্মৃতি আমাদের জীবনের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।
—গ্রামের সকলের প্রিয় “মাষ্টারমশাই”।
তাঁর ক্লাসে পাঠ্যবই থাকত ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি পাঠ ছিল জীবনের শিক্ষা। "সত্য বলো, ন্যায়ের পাশে থাকো, মানুষের পাশে দাঁড়াও"—এই ছিল তাঁর পাঠ্যক্রমের আসল মূল কথা। আলো-আঁধারির গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল, যেখানে বিদ্যুৎ আসেনি, রাস্তা ধুলোয় ঢাকা—সেই অন্ধকারে তিনিই শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক নতুন প্রজন্ম।সেই অন্ধকারে তিনিই প্রথম আলো হয়ে উঠেছিলেন।
তিনি ছিলেন সাধারণ একজন মানুষ, কিন্তু তাঁর কাজ ছিল অসাধারণ। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, চোখে চশমা আর হাতে একটি সাধারন ঘড়ি সঙ্গি ছোট সাইকেল আর কাঠের ডান্ডার ছাতা—এই ছিল তাঁর পরিচিত রূপ। কিন্তু তাঁর চোখের গভীরতা আর মুখের বিশ্লেষণ ভাব যে কোনো মানুষকে আকৃষ্ট করত। তিনি ছিলেন শুধু একজন শিক্ষক নন, ছিলেন এক প্রজন্ম গড়ার কারিগর।
মাষ্টারমশাইয়ের ঘর ছিল বইয়ের গন্ধে ভরা। তাঁর কণ্ঠে ছিল মাধুর্য, আর কথায় ছিল প্রজ্ঞার ছাপ। গ্রামের প্রতিটি বেক্তি তাঁর হাত ধরেই অক্ষরের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে আজ তাদের বয়স ইং ২০২৫ শতিকায় ষাট (৬০) থেকে সত্তর (৭০) বছরের উর্ধ্বে। তিনি নিজেই হাতে খাতা-কলম তুলে দিয়েছেন অনেকের কাছে। অনেক সময় দেখা যেত, ছাত্ররা যখন স্কুল ফাঁকি দিয়ে মাঠে কাজ করতো, তখন তিনি নিজের সন্তানের মতো মাষ্টারমশাই নিজেই খবর নিতেন। যাঁরা খুবই দরিদ্র সংসারে জটিলতা তাঁদের পাশে দাঁড়াতেন, এবং তাদের দেখে চোখে জল এনে বলতেন—"তোরা মানুষ হ, এটাই আমার সব চেয়ে বড় পুরস্কার।"বিনিময়ে কিছু চাইতেন না। বলতেন— “এরা একদিন আলো হবে, তখনই আমার পরিশ্রম সার্থক হবে।”
তিনি শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। মানুষের জীবন, সমাজ, সংস্কার—এই তিনটি বিষয় তাঁর পাঠদানকে পূর্ণতা দিত। স্কুল ছুটির পর তিনি কৃষকদের সঙ্গে মাঠে কাজ করতেন, বাজারে শাকসবজি বিক্রি করতেন, আবার রাতে কোন বাড়িতে মাদুর পেতে কোনো এক পরিবারের সাথে শিক্ষা, সমাজব্যবস্থা এবং ধর্মীয়, আলোচনা করে ছাত্রদের সঙ্গে অভিভাবক দের উৎসাহিত করতেন এবং প্রতিটি মানুষের সঠিক পথ দেখিয়ে গিয়েছেন।
গ্রামবাসীরা বলত—
“এই লোকটা যেন মানুষ না, আলোর প্রদীপ।”সময় গড়িয়ে যায়। তাঁর পড়ানো ছাত্ররা কেউ শিক্ষক, প্রফেসার কেউ ডাক্তার, কেউ পুলিশ,কেউ সৈনিক অফিসার কেউ আবার সরকারি কর্মচারী হয়েছে। আবারো তার মধ্যে অনেকেরেই ছাত্র ছাত্রী "স্বর্গগামী" হয়েছেন। কিন্তু মাষ্টারমশাই একই রকম রয়ে গেলেন—সাধারণ, নিঃস্বার্থ আর আপনভোলা। তাঁর ঘর ছিল সকলের জন্য উন্মুক্ত। শীতের সকালে কেউ এসে বসেছে চা খেতে, আবার সন্ধ্যায় কেউ এসেছে বুদ্ধি পরামর্শ নিতে—সবার জন্য তিনি ছিলেন এক আশ্রয়।
তাঁর দেহ আজ নেই, কিন্তু তাঁর ছায়া ছড়িয়ে আছে গ্রামের প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি মুখে, প্রতিটি মননে।০০/০০/২০২৫—এই পবিত্র দিনে, সেই আলোকবর্তিকাটি নিভে গেছে।
তাঁর দেহাবসানে অঞ্চলের মানুষদের সাথে আকাশ যেন আরও নিঃসঙ্গ হয়েছে। সকালের পাঠশালাটি যেন আজ স্তব্ধ। তাহার অগনন ছাত্রছাত্রীরা শুভচিন্তক চোখ মুছছে, বৃদ্ধ কৃষক মাটির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন, আর দূরের গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে যেন প্রকৃতিও কাঁদছে।তাঁর অকালপ্রয়াণ শুধুই একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এক সমাজের হৃদয়ে তৈরি করেছে অপূরণীয় শূন্যতা।
তবুও, তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন—একটি খাতার পাতায়, একটি পুরোনো পাঠশালার বেঞ্চিতে, প্রতিজন শিক্ষার্থীদের চোখে প্রথম অক্ষর শেখার আনন্দে।আজ আমরা তাঁর চরণে শ্রদ্ধা জানাই—
> “মাষ্টারমশাই, আপনাকে আমরা কোনোদিন ভুলবো না।
আপনার দেখানো পথেই আমরা চলব।
আপনার আদর্শই হবে আমাদের জীবনের দিশা।” আপনার দেখানো পথেই আমরা চলতে চাই।
ভগবানের চরণে প্রার্থনা করি—
তাঁর বিদেহী আত্মা চিরশান্তিতে বিরাজ করুক।
ॐ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ
🙏 হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে