10/03/2026
#সাবিত্রী_বাই_ফুলে_এক_বিরলতম_উজ্জল_নারী #চরিত্র
#১০মার্চ_প্রয়াণ_দিবসে_শ্রদ্ধার্ঘ্য।
"আত্মবিশ্বাসকে জীবনের অঙ্গ করে নাও, জ্ঞানের সম্পদ আহরণে নিজেকে সর্বদা নিয়োজিত রাখো-- জ্ঞানের অভাবে প্রাণী বাক্যহীন থাকে--- সব সময়ই জ্ঞানার্জনের জন্য সচেষ্ট থাক। শূদ্র-অতি শূদ্রদের ইংরেজি শিক্ষার মধ্য দিয়ে সব দুর্দশা দূর করার সুযোগ রয়েছে----- ব্রাহ্মণদের সব কর্তৃত্ব ও কুশিক্ষা ছুঁড়ে ফেলে দাও, ইংরেজি শিক্ষার মধ্য দিয়ে জাতপাতের শিকল ভেঙে ফেল।"
সাবিত্রীবাই ফুলে
যে কোনও দেশের দলিত শ্রেণির অস্তিত্বরক্ষার লড়াই বরাবর অত্যন্ত কঠিন ও কঠোর। সাবিত্রীবাই ফুলে ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি সমাজে মেয়েদের শিক্ষার বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও মেয়েদের শিক্ষিত করার ব্রত নিয়েছিলেন। তিনি ১৮৩১ সালের ৩ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার নাইগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। সাবিত্রীবাই ফুলে ভারতের প্রথম মহিলা শিক্ষিকা। একুশ শতকে পৌঁছেও যখন দেখা যায় জাতপাত ছুঁতমার্গের তেমন সুরাহা হয়নি, তখন সহজেই অনুমান করা যায়, উনিশ শতকের এক নিম্নবর্গীয় দলিত মহিলার লড়াই কতখানি কঠিন হয়ে উঠেছিল। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সাবিত্রীবাই এর শিক্ষা ও ভূমিকাকে মুছে ফেলতে সব সময় শাসকবর্গ। তাঁর কর্তৃত্ব ও মানুষের কল্যানে নিয়োজিত জীবন আজও অমলিন । এমনই একজন ব্যক্তি যিনি শুধুমাত্র নারী শিক্ষার জন্য সংগ্রাম করেননি, নারী শিক্ষার জন্য বিভিন্ন বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। বাংলায় যখন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিরলশ প্রচেষ্ঠায় নারী শিক্ষার বিস্তারের জন্য সংগ্রাম চলছে, প্রায় সমসাময়িক সময়ে সাবিত্রীবাই ফুলে ও জ্যেতিবারাও ফুলের অকান্ত পরিশ্রমে মহারাষ্ট্রের দলিত সমাজকে শিক্ষার আলোয় আনার প্রয়াস। সাবিত্রীবাই ছিলেন একে মহিলা ও দলিত। জীবনের প্রতি পদে অপমান বয়ে বেড়িয়েছেন। সমাজ-সংস্কারমূলক কাজ করতে গিয়ে স্বামীর সঙ্গে একত্রে বিতাড়িত হয়েছেন তথাকথিত সমাজ থেকে। সতীদাহ বা বাল্যবিবাহের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সমাজের উচ্চবর্ণের কট্টর কুসংস্কারাচ্ছন্ন শ্রেণির কাছে অপমানিত হয়েছেন। কিন্তু কোনও কিছুই তাঁকে নিরস্ত করতে পারেনি।
১৮৪৮ সালে মহারাষ্ট্রের ভিডেওয়ারায় প্রথম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন সাবিত্রীবাই। ১৮৪৮ থেকে ১৮৫২ সালের মধ্যে আরও পাঁচটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় তাঁর উদ্যোগ এবং অক্লান্ত পরিশ্রমে। এর মধ্যে প্রথম তিনটি বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৮৫১ সালের ৩ জুলাই, ১৭ নভেম্বর এবং ১৮৫২ সালের ১৫ মার্চ। এই কাজে তিনি বরাবর স্বামীর সহযোগিতা পেয়েছেন। প্রথম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের সময়
মাত্র আট জন ছাত্রী নিয়ে শুরু করেন আর ১৮৫১ সালের মধ্যে তিনটি বালিকা বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ জন। স্কুলে তিনিই ছিলেন প্রধানশিক্ষিকা।সাবিত্রীবাই তাঁর জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়েই সমাজের মহিলাদের বিপন্নতা আরও স্পষ্ট ভাবে বুঝতে পারেন। ১৮৫২ সালে তিনি ‘মহিলা সেবা মণ্ডল’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য সক্রিয় হয় সাবিত্রীবাইয়ের নেতৃত্বে। উনিশ শতকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিধবা মহিলাদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারে তাদের ঠাঁই তো হতই না, উপরন্তু অপরিচিত পুরুষের কুদৃষ্টির শিকার তাঁরা হতেন আকছার। ১৮৬৩ সালে সাবিত্রীবাই বিধবা সন্তানসম্ভবা মহিলাদের জন্য একটি আশ্রম গড়ে তোলেন, যেখানে তাঁরা নিরাপদে সন্তানের জন্ম দিতে পারবেন। সাবিত্রীবাই নিজের জীবনে মাতৃত্বের আস্বাদ পান যশবন্ত নামক এক ব্রাহ্মণসন্তানকে দত্তক নিয়ে।
১৮৭৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সত্যশোধক সমাজ’। এই সমাজের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সীমিত খরচে বিনা পণে পুরোহিতবর্জিত বিবাহ। এতে পুরোহিত সম্প্রদায় তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু প্রান্তিক মানুষের জীবনে এতে কিছুটা সুবাতাস বইতে শুরু করে। শুধুমাত্র সমাজ-সংস্কারমূলক কাজই নয়, কবিতার মাধ্যমে দরিদ্র প্রান্তিক নিরক্ষর মানুষকে লেখাপড়া শিখতেও উদ্বুদ্ধ করতেন তিনি। মনুর বিধানের বিরুদ্ধেও কলম ধরেছেন তিনি। ১৮৫৪ সালে মরাঠি ভাষায় লেখা তাঁর কবিতা সঙ্কলন ‘কাব্যফুলে’ প্রকাশিত হয়। ১৮৯২ সালে প্রকাশিত হয় ‘স্পিচেস অব মাতশ্রী সাবিত্রীবাই’। এটি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বক্তৃতার সংকলন।
নিজের ভালমন্দ ভুলে গিয়ে মানুষের সেবার জন্য আত্মোৎসর্গ করেছিলেন তিনি। উনিশ শতকের শেষে বিশ্ব জুড়ে তখন বিউবোনিক প্লেগের মড়ক। মহামারি-আক্রান্তদের সেবার জন্য পালিত পুত্র যশবন্তকে নিয়ে তিনি একটি দাতব্য চিকিৎসালয় খুলেছিলেন। মানুষের সেবা করতে গিয়েই তাঁর মৃত্যু হয়। পাণ্ডুরঙ্গ গায়কোয়াড় নামে এক ব্যক্তির কিশোর বয়সি ছেলের শরীরে প্লেগের সমস্ত লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ছেলেটিকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে তাকে পিঠে নিয়ে হাসপাতালে ছুটেছিলেন তিনি। নিজের কথা ভাবার মতো অবকাশ তাঁর ছিল না। ছেলেটির প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসায় অচিরেই তাঁর শরীরে রোগলক্ষণ প্রকট হয়। ১৮৯৭ সালের ১০ মার্চ এই রোগেই তিনি মারা যান।
আসুন প্রয়াণ দিবসে এই মহীয়শী নারীর জীবন সংগ্রাম থেকে শিক্ষা গ্রহনে ব্রতী হই।