07/06/2026
ব্যান কালচারে চার্লি চ্যাপলিন থেকে দেব আনন্দ, পিট সিগার থেকে কিশোর কুমার, তাহলে আমীর খান থেকে অনির্বাণ হলে সমস্যা কোথায়?
চার্লি চ্যাপলিন। ব্যান হয়েছিলেন। ভাবতে পারেন? দেখুন, তিনি কিন্তু কখনও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন না, তবু তাঁর চলচ্চিত্র তাঁকে সন্দেহের মুখে ফেলেছিল। “লিটল ট্র্যাম্প”-এর স্রষ্টা চ্যাপলিন “মডার্ন টাইমস”, “দ্য গ্রেট ডিক্টেটর” এবং “মসিয়ে ভেরদু” প্রভৃতি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পুঁজিবাদী ও শিল্পসমাজকে তীব্র ব্যঙ্গ করেছিলেন। ব্যাস সরকারি রোষানল শুরু হল।
অবস্থা এতদূর গড়িয়েছিল যে, ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন(FBI) চ্যাপলিনের ওপর দুই হাজার পাতারও বেশি দীর্ঘ একটি নথি সংকলন করেছিল। ফলে ১৯৫২ সালে ব্রিটিশ নাগরিক চ্যাপলিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার জন্য ভিসা অব্দি পাননি। প্রতিবাদে, একমাত্র ১৯৭২ সালে অস্কার গ্রহণের জন্য সংক্ষিপ্ত সফর ছাড়া, চ্যাপলিন আর কখনও যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখেননি।
এবার আসুন দেব আনন্দের কথায়। সাল ১৯৭৫। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক এবং সঞ্জয় গান্ধী দেব আনন্দকে দূরদর্শনে এসে সরকারের জরুরি অবস্থার সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে সমর্থন করার জন্য চাপ দেন। দেব আনন্দ অত্যন্ত নির্ভীকভাবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং স্বৈরাচারী নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।
ফলে কী হল? ইন্দিরা গান্ধী সরকার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল দূরদর্শনে দেব আনন্দের সমস্ত সিনেমা সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছিল। এমনকি সরকারি গণমাধ্যমে তাঁর নাম উচ্চারণ বা উল্লেখ করার ওপরও অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। এছাড়া তাঁর চলচ্চিত্র 'দেশ পরদেশ' তৈরির সময়েও সরকার পদে পদে বাধা সৃষ্টি করে।
প্রতিবাদে ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের পর দেব আনন্দ চলচ্চিত্র জগতের কিছু মানুষকে জুটিয়ে 'ন্যাশনাল পার্টি অফ ইন্ডিয়া' নামে নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং কংগ্রেসের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি নির্বাচনী প্রচারে নেমেছিলেন।
পিট সিগার আর “দ্য উইভার্স” কে না জানে! এঁকে নিয়েও ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন তদন্ত করে। পরে তাঁর নাম “রেড চ্যানেলস” নামের একটি প্রভাবশালী পুস্তিকায় প্রকাশিত হলে তাঁকে ব্ল্যাক লিস্টেড করা হয়। সিগারকে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান পরিবেশন থেকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১৯৫২ সালে “দ্য উইভার্স” তাদের রেকর্ডিং চুক্তি হারানোর পর ভেঙে যায়।
এছাড়া তিনি সরকারের একটি প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায়, তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেস অবমাননার দশটি অভিযোগ আনা হয় এবং তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। পরে সেই অভিযোগপত্র বাতিল হয়ে যায়, কিন্তু ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তিনি কার্যত টেলিভিশন থেকে নির্বাসিতই থেকে গিয়েছিলেন।
কিশোর কুমারের সঙ্গেও একই গল্প। ১৯৭৬ সালের শুরুতে সঞ্জয় গান্ধীর নির্দেশে কংগ্রেস সরকার তাদের বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচির প্রচারের জন্য দিল্লিতে 'গীতওঁ ভরি শাম' নামক একটি বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সরকারের পক্ষ থেকে কিশোর কুমারকে সেখানে গান গাওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে তিনি কোনো রাজনৈতিক প্রচারের অংশ হবেন না।
তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ভি. সি. শুক্লা রেগে গিয়ে অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং দূরদর্শনে কিশোর কুমারের সমস্ত গান বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন। তাঁর গানের ক্যাসেট ও গ্রামোফোন রেকর্ড বিক্রির ওপরও নজরদারি শুরু হয়। পরবর্তীতে চলচ্চিত্র জগতের তীব্র প্রতিবাদ এবং মোহাম্মদ রফির মতো শিল্পীদের মধ্যস্থতায় সরকার এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়। নিষেধাজ্ঞা ওঠার পর অল ইন্ডিয়া রেডিওতে তাঁর প্রথম প্রচারিত গানটি ছিল “দুখী মন মেরে”।
এবার কংগ্রেস নয়, বিজেপি। গুজরাটের বিজেপি। ২০০৬ সালে মেধা পাটেকরের নেতৃত্বে চলা 'নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন'-এর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আমীর খান। নর্মদা নদীর ওপর তৈরি সর্দার সরোবর বাঁধের উচ্চতা বাড়ানোর ফলে যে হাজার হাজার আদিবাসী পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছিল, আমীর তাদের পুনর্বাসনের দাবিতে সোচ্চার হন।
ফলে বিজেপি এবং তাদের যুব সংগঠন ভারতীয় জনতা যুব মোর্চা তাঁকে "গুজরাট-বিরোধী" ও "উন্নয়ন-বিরোধী" বলে তকমা দেয়। তারা দাবি করেছিল আমির খানকে গুজরাটের জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করায় তাঁর নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা 'ফানা' গুজরাটে প্রদর্শনের বিরুদ্ধে তীব্র সহিংস আন্দোলন শুরু হয়। প্রেক্ষাগৃহ ভাঙচুর করার হুমকি দেওয়ায় গুজরাট থিয়েটার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন নিজেদের সুরক্ষার্থে সিনেমাটি পুরো রাজ্যে স্ক্রিন করতে অস্বীকৃতি জানায়। এর ফলে সিনেমাটি গুজরাটে এক প্রকার অঘোষিত সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল।
তাহলে তৃণমূলের কী দোষ? আর অনির্বাণ তো প্রথম বাঙালি নন যিনি ব্যান হলেন। ১৯৬৫ সালে উৎপল দত্ত বিখ্যাত রাজনৈতিক নাটক 'কল্লোল'-এর জন্য তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সরকার তাঁর ওপর খড়গহস্ত হয়েছিল। এমনকি তাঁকে গ্রেফতার করে প্রায় ৭ মাস প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি রাখা হয়েছিল। নকশালবাড়ি আন্দোলনের সমর্থনে লেখা তাঁর বিতর্কিত নাটক 'তীর'-এর কারণে ১৯৬৭ সালে তাঁকে আবারও গ্রেফতার করা হয়।
১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধী সরকারের তীব্র সমালোচনা করে তিনি তিনটি নাটক লেখেন—ব্যারিকেড, দুঃস্বপ্নের নগরী এবং এবার রাজার পালা। কংগ্রেস সরকার এই তিনটি নাটকই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু উৎপল দত্ত তো দমে যাননি, তিনি কলকাতার প্রকাশ্য রাস্তায় 'স্ট্রিট থিয়েটার' বা পথনাটকের মাধ্যমে সরকারের স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে যান।
সুতরাং অনির্বাণ যে পথ বেছেছেন, তিনি হালআমলেও ব্যান হতেই পারেন। যাই হোক, সময় বলবে কী হবে না হবে, আমার আপনার তো দম নেই, এঁর আছে। এখন আপনারা সালিশি সভা না বসিয়ে মনের কথা বলুন দিকি, এঁকে কি রাষ্ট্র ছাড়বে?
নাকি ইনি নিজের পথ বদল করতে পারবেন?