21/05/2026
আমার অনুধাবন ক্ষমতায় সম্ভবত ধার কমে এসেছে। নিজেকে ধিক জানিয়ে লেখা টা শুরু করলাম।
আমি ও Rik Chowdhury মল্লিকার্জুনা স্বামীর দর্শনে এতটাই টেন্সড ছিলাম, তার একটা ভ্যালিড কারণ ও ছিল বটে, ব্যাপার টা হলো খুব সকালে বেড়ানো এবং অনেক রাতে ফেরা ছাড়াও, ঘুম ভাঙা ও সারা দিনের ৫০০ কিমির হারভাঙ্গা ধকল, সাথে পুজোর ব্যাপারগুলো ও থাকা।
দেখা গেল আমাদের থেকেও বেশি সতর্ক ছিল আমাদের ড্রাইভার, তার নাম আজমল, হায়দ্রাবাদের ছেলে, ভোর ৫ টাতেই এসে হাজির, আমরা তারই ফোনে ঘুম থেকে উঠে গুছিয়ে নিয়ে স্নান টান সেরে বেরোতে প্রায় সকাল ৬ টা বাজিয়ে ফেললাম। রাস্তা তখনও অন্ধকার।
এক দীর্ঘ যাত্রাময় দিনের শুরু হলো হাইওয়ে তে উঠে। মসৃণ, পিচ্ছিল রাস্তায় গাড়িতে বসে একটু ঝিমঝিম ভাব এসেছে এমন সময় Jyotirmay Pal এর ফোন এলো। হতচকিত হয়ে ফোনটা ধরলাম, যে আশঙ্কা করেছিলাম, তাই.... ওর বাবা খুবই অসুস্থ দেখে আমি মহারাষ্ট্রে বেরিয়েছিলাম, বেচারির আজ সকালেই পিতৃবিয়োগ হয়েছে। খুবই খারাপ লাগছিলো। কারণ আমি প্রায় ২০০০ মাইল দূরে, সংগত কারণে ওর কাছে পৌঁছে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো উপায় নেই।
রাস্তায় একটু চা পান করে ভারাক্রান্ত মনটা হাল্কা করে গাড়িতে বসলাম, আরো ঘন্টাখানেক যাওয়ার পরে রাস্তায় একটা ভ্যান গাড়ির ওপরে তৈরী দোকানে দক্ষিণ ভারতীয় প্রাতরাশটা করার পরে গাড়ি আরও এগিয়ে চলল। প্রায় ৩ ঘন্টা চলার পরে হাইওয়ে থেকে ডানদিকে একটা বাঁক নিয়ে তুলনায় ছোট একটা রাস্তায় গাড়িটা প্রবেশ করে এগোতে থাকলো। এদিকটায় ছোট ছোট বাড়ি, দোকান, কিছু চাষ জমি আর ফাঁকা মাঠ, আরও আধ ঘন্টা চলার পরে, একটা জনপদ পেরিয়ে গাড়ি এসে থামলো তুলনায় ফাঁকা একটা স্থানে, এখানে ড্রাইভার আমাদের ফ্রেস হয়ে নিতে বলে খাবার জল কিনতে গেল, এবং ফিরে এলো, তার থেকে জানলাম এখানে ৫ লিটারের নিচে জল বিক্রি হয় না, তাই সে জল আনতে পারেনি। তাকে পয়সা দিয়ে পুনরায় পাঠানো হলো, এবং ফিরে আসার পরে গাড়ি কিছুটা এগিয়ে একটা চেকপোষ্টের সামনে এসে পৌঁছলো, এটাই হলো নাল্লামুলা অরণ্যের প্রবেশদ্বার, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা দুটো রাজ্যের অন্তবর্তী এই বনাঞ্চল, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঘের আবাসস্থল ও বটে এবং ডোর নালা, শিখরম ও মান্নানুর গেট দিয়ে প্রবেশের অনুমতি মেলে। চেকপোস্ট থেকে ১০০ টাকার এন্ট্রি টিকিট কাটা হলো, ফরেস্ট গার্ডেরা জানালা দিয়ে গাড়ির ভেতরে কোনো প্লাস্টিকের বস্তু বা বর্জ্য পদার্থ আছে কি না দেখে গাড়ি এগোনোর অনুমতি দিল।
প্রবেশের কিছু পরেই এর ব্যাপ্তি চোখে পড়লো, প্রায় ৩৭০০ বর্গকিমি ব্যাপী এই অরণ্য নান্দিয়াল, প্রকাশম, পালনাড়ু, নালগোন্দা ও মেহেবুবনগর, এই ৫ টি জেলার মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ এক বনভূমি। দুদিকে দিগন্তব্যাপী মাঠ, শাল, পাহাড়ি অঞ্চল টি আমরাবাদ, শ্রী শৈলম, পেড্ডাচেরেভু, শিবাপুরম ও নেক্কান্তি নামের মালভূমি দ্বারা গঠিত এক সুপ্রাচীন ভুখন্ড, যা পূর্বঘাট পর্বতমালার এক অংশবিশেষ, লক্ষ বছর পূর্বে আগ্নেয় লাভার উদগীরণে তৈরী হয়েছে। পাহাড়ের ওপর মৌসুমী বায়ুর ধাক্কার প্রবাহে সৃষ্ট কৃষ্ণা নদীধারার প্রবাহ নাগার্জুনাসাগরে থমকে গিয়ে উছলে পড়েছে, এবং তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশের বিভাজন রেখাকে উপেক্ষা করে বঙ্গপসাগরের দিকে বয়ে চলেছে।
উত্তরে হায়দ্রাবাদ থেকে আমরা দক্ষিণের দিকে চলেছি, এই শ্রী শৈলম পেরিয়ে আরও কিছু মাইল গেলে তিরুপতি পর্বতমালায় পৌঁছে যাওয়া যাবে। দক্ষিণে বাসবপূরাম ও চেলামা দিয়েও শ্রী শৈলম আসার পথ রয়েছে, আর কাছাকাছি রেল স্টেশন কুম্বম ও মার্কাপুর, এই রেলপথে একটি দীর্ঘ টানেল আছে, যা লেপার্ড দের আস্থানা ও বটে ।
অরণ্যভূমি প্রবেশের প্রায় কিছু পরেই আমরাবাদ ব্যাঘ্র প্রকল্পের শুরু। একটি সুসজ্জিত গেট, একটা বাঘের মূর্তি, আর তেলেঙ্গানা ভাষায় লেখা প্রস্তুরফলক। অন্ধ্রর রায়ালাসেমা এবং তেলেঙ্গানার নাগারকুরনুল এর পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত। অরণ্যটির বৈশিষ্ট্য হলো এর কোর অঞ্চল বাফারের তুলনায় বেশি, বাফার অঞ্চলে কিছু গ্রাম দেখা যায়। এই গ্রামের অধিবাসিরা দক্ষিণে গাজুলাপল্লী ও উত্তরে এপ্পালাপাদ্দি বা আত্মাকুড় দিয়েও অরণ্যে প্রবেশ করে থাকে।
আমরাবাদ এর জঙ্গলটির দক্ষিনাঞ্চল ঘন অরণ্যপূর্ণ, দক্ষিনাঞ্চলের দ্রাবিদিয়ন অরণ্যগুলির মতোই শুষ্ক, পর্ণমোচি অরণ্য। অনেক গুলো প্রজাতির ছত্রাক দেখলাম, তারমধ্যে ব্ল্যাক ফাংগাস চোখে পড়লো যা অন্য বড়ো গাছের শেকড়ে জন্মায়। ফার্ণের মধ্যেও অনেক গুলো প্রজাতির দেখা মিললো, যার মধ্যে ড্রায়প্টেরিস অন্যতম।
এছাড়া, বাঁশ, চন্দন, জুঁই, সেগুন, অর্জুন এবং দীর্ঘ সভান্না ঘাসের সমারোহ সহ, বাঘ, লেপার্ড, স্লথ ভাল্লুক, সম্বর, চৌশিঙ্গা, চিনকারা, নীলগাই সহ অনেক হরিণ প্রজাতির সঙ্গে পাইথন, কোবরা জাতীয় সাপ এবং মনিটর লিজার্ড বা গোসাপ ও আছে বলে জানলাম, যদিও আমরা শুধুমাত্র Rhesus প্রজাতির বাঁদর বহুসংখ্যায় দেখেছি, আর কোনো প্রাণী আমাদের চোখে পড়েনি।
প্ৰখ্যাত অরণ্যপ্রেমী কেনেথ আন্ডারসন এই অরণ্যে অনেকগুলি অভিযান করেছিলেন, তারমধ্যে পেদ্দেচেরেভু এবং মার্কাপুরের কাছে দ্বিগুভামেট্টার অভিযান দুটি অসাধারণ। জঙ্গলে সাধারণ মানুষের গাড়ি ছাড়া প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ হলেও এখানের আদিবাসী সম্প্রদায়, যারা চেঞ্চচু নামে পরিচিত তাদের জঙ্গলে অবাধ প্রবেশাধিকার। এরা এখনও পর্যন্ত সেভাবে সভ্যতার সাথে মিলে যেতে পারেনি। আমরা অরণ্যে প্রবেশের ঠিক আগে একটা চেঞ্চচু দলকে চেকপোস্ট পার হয়ে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলাম, তাদের হাতে গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া কিছু খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য বর্জ্য বস্তু দেখে মনে হয়েছিল এরা হয়তো বনকর্মীদের এইভাবে সাহায্য করে থাকে। তবে এই চেঞ্চচু রা শুধু অন্ধ্রে নয়, এরা কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, ছত্রিসগড় এবং উরিষ্যয় ও থাকে বলে শুনেছি।
জঙ্গলে যেমন গাড়ি থামানো, ৩০ কিমি এর বেশি গতিতে গাড়ি চালানো, হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ ;তেমনি জীবজন্তুদের কোনো কিছু খেতে দেয়া ও কঠোরতার সাথে নিষেধ থাকলেও প্রচুর খাবার বাঁদর, হরিণ ও অন্যান্য তৃণভোজীদের জন্য চলমান গাড়ি থেকে ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে দেখলাম। প্রায় ৩০ কিমি দীর্ঘ এই জঙ্গল সকাল ৬টা থেকে - রাত ৮ টা পর্যন্ত পর্যন্ত প্রবেশের জন্য খোলা থাকে। রাত ৯ টায় বন্ধ হয়ে যায়।
জঙ্গল শেষ হলে আমাদের গাড়ি এক পাহাড়ি খাড়া রাস্তায় উঠতে শুরু করলো, পাহাড়ের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে প্রায় ৮০০-৯০০ মিটার উঠতে উঠতে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িকে পাশ দিতে অনেক ক্ষেত্রেই খাদের দিকে ঝুঁকে দাঁড়াতে হচ্ছিল, আমরা প্রায় ৪ ঘন্টার রাস্তা পাড়ি দিয়ে এই পাহাড়ে উঠেছিলাম। এখান থেকে গুগল ম্যাপ অনুযায়ী আরও প্রায় ৫০ কিমি পথ বাকি রয়েছে।
অসমান, সু উচ্চ এই পাহাড়িপথে অনেক চন্দন ও জুঁই ফুলের লম্বা লম্বা গাছ দেখলাম, এই জুঁই ফুলের মালা দিয়ে এই শিবের পূজা দেওয়া হয় বলে মল্লিকার্জুনা স্বামী নামে ভগবান পূজিত হন। পাহাড়ের ধাপে কিছু চাষ জমি দেখলাম, প্রধানত ধান চাষে ব্যবহৃত হয়েছে, কাটা খড়ের নুটি গুলো দেখে বুঝতে পারলাম। দূরে চোখে পড়লো মাল্লেলা থির্থম জলধারা, এবং আক্ষা মহাদেবীর গুহা ;এগুলো পেরিয়ে একটা চুলের কাঁটার মতো বাঁকে এসে গুগল জানালো এই স্থানটি ইগালাপেন্টা, সত্যিই, অসাধারণ.... এইখান থেকে শৈলশীর্ষের এবং গভীর উপত্যকা দুই স্থানের দৃশ্যপট অতিমাত্রায় নয়নাভিরাম।
গাড়ি আরও ২০০ মিটার ওঠার পরে পৌঁছলাম শ্রী শৈলম ভিউ পয়েন্টে।
আমি দুঃখিত, এখানে ভিডিওটা আপলোড করতে পারলাম না, তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশের প্রধান জল এবং জলবিদ্যুৎ সরবরাহ কারী এই ড্যাম সত্যিই এক আশ্চর্যের বস্তু। ১৬০ ফুট উচ্চ থেকে হয়ে চলা এক অবিরত বারিধারার শীতের সকালের এক তরঙ্গপ্রবাহের সরলতা বর্ষাকালীন ভয়ঙ্কর তীব্রতার যে উন্মাদ বারিপাত ঘটিয়ে থাকে তা ভেবেও চকিত হয়ে যাচ্ছিলাম।
আমরা শ্রী শৈলম ঘাট ধরে এগিয়ে চলেছিলাম, ডানদিকে বাঁক নিয়ে কৃষ্ণা নদীর ল-ম্বা ব্রিজ পেরিয়ে এপারে এসে একটা বড়ো জলবিদ্যুৎ জেনারেশন হাউসের সামনে দিয়ে ঘুরে লিঙ্গলাগাট্টু তে এসে উপস্থিত হলাম। এটাই এখানকার মাছের আড়ৎ। বাজার এলাকা টাতে সকাল থেকে মাছ বিক্রি চলে, তখন একটু বেলা ছিল, তাও কিছু শুটকি মাছ নিয়ে কয়েকজন মেছেনি কে বসে থাকতে দেখলাম, তারা হাতে একটা প্লাস্টিক মোড়া লাঠি নিয়ে মাছি তাড়াচ্ছিল।
লিঙ্গমপেট রোড ধরে গাড়ি আরও এগোনোর পরে সাক্ষী গণপতি স্বামীর মন্দির, সেখান থেকে ১ কিমি মতো দূরত্ব হলো অন্ধ্রপ্রদেশের সরকারি বাস টার্মিনাল, আরও ৩০০ মিটার এগোলে পাহাড়ের একদম শীর্ষদেশে মল্লিকার্জুনা স্বামীর মন্দিরের মূল প্রবেশ তোরণ দ্বার।