22/07/2022
লিখছেন শঙ্খ চিল
উনি শাসকগোষ্ঠীর হোতা হয়েও "চাকরি চাই-চাইকরি চাই" বললেন। উনি আসলে এতে কি বললেন আর কি বললেন না?
উনি যা বললেন না তা হলো;-উনি যে ব্যবস্থাটার চৌকিদারী করছেন সেই ব্যবস্থাটাকে পাহারা দিতে যতটুকু দরকার তার বাইরে বেশি কিচ্ছু মাত্র চাকরি বাকরি আর সম্ভব নয়। কারণ লগ্নিকারিরা মানুষের চাহিদা দেখে বা তৈরি করে উৎপাদন করে। আর মানুষের চাহিদা থাকা বা তৈরি করা তখনই সম্ভব হয় যখন পণ্য হিসেবে লগ্নিকারির মুনাফার মূল্য যুক্ত উৎপন্ন কেনার ক্ষমতা মানুষের থাকে। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থার ধারায় আমাদের দেশেও মানুষের জীবন জীবিকার অবস্থা কৃচ্ছতা সাধন করতে করতে ক্রয় ক্ষমতার শেষ সীমায় ক্রমতলমুখী আজ। বর্তমানে সারা দুনিয়া সমেত আমাদের দেশেও মানুষেরই তৈরি ৮৪ শতাংশ সম্পদের উপরে ৯৯ শতাংশ মানুষেরই কোনো অধিকার নেই। মাত্র ১ শতাংশ লগ্নিপতি সেই সম্পদের মালিক। অর্থাৎ স্থাবর অস্থাবর মিলিয়ে মাত্র ১৬ শতাংশ সম্পদের অবশিষ্ট নিয়ে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করতে থাকা ৯৯ শতাংশ মানুষের কোনসা চাহিদা ও কোনসা মুনাফার জন্যে উৎপাদন ও উৎপাদন ভিত্তিক শিল্প, কারখানা বা কর্মসংস্থান সম্ভব? এই অবস্থায় ইতিমধ্যেই ৮৪ শতাংশ সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া ঐ ১ শতাংশ লগ্নিপতিরা ৯৯ শতাংশ জনগণের মাত্র ১৬ শতাংশ উচ্ছিষ্টের জন্য বিনিয়োগ করার বোকামি করবে কেন? তাই যেই মানুষের কেনারই ক্ষমতা নেই সেই মানুষদের জন্য উৎপাদনে বিনিয়োগ করা মুনাফাকামী লগ্নিকারীদের কর্ম্ম নয়। আর শাসকগোষ্ঠীর তাবেদার হিসেবে এটা উনিও জানেন না বা বোঝেন না তা নয়। বরং এই সরল সত্যিটাকেই যে যত বেশি গুলিয়ে দিতে পারে সেই তত বেশি শাসকগোষ্ঠীর সেরা দালালির চাকরির ছাড়পত্রটা আদায় করতে পারে। সেই চাকরির লক্ষ্যেই মড়িয়া উনি "চাকরি চাই-চাকরি চাই" বলে ক্ষেপে উঠেছেন সম্ভবত। তাই ক্ষমতায় বসেও উৎপাদন ভিত্তিক শিল্প, কারখানা, কর্মসংস্থান ও চাকরি বাকরির হাস্যকর দাবী, অদ্ভুত স্বপ্ন দেখানো, গল্প শোনানো স্রেফ মানুষকে ধাপ্পা দেওয়ার খেলো লুচ্চাবাজী ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। তখন উনি নিশ্চয়ই নিজের দালালির চাকরিটার দাবি ছাড়া লুচ্চামিটা করেননি নিশ্চয়ই। সে দিক দিয়ে উনি নিজেও শাসকগোষ্ঠীর পক্ষের বখড়া খোড় বাটোয়ারার তীব্র প্রতিযোগিতায় সর্বদাই চাকরি হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে আরও বিশ্বস্ততার সঙ্গে আরও বড়ো আরও দক্ষতার সঙ্গে চাকরির সঙ্গত দাবির পক্ষে চেল্লাবেন এটাই স্বাভাবিক। নচেৎ ওনার কাছে জনগণের সঙ্গত চাকরির দাবিটার উনি কি জবাব দেবেন?
তাহলে এই "চাকরি চাই-চাকরি চাই" হুক্কহুয়া রবে উনি বললেনটা কি? অর্থাৎ এর পরেও এর অর্থ দাড়ায় এই যে;- জমি আন্দোলনের কাঁধে চেপেই ক্ষমতায় আসীন, চালু ব্যবস্থার সবচেয়ে চালু ও স্থূল বিদূষক হিসেবে যে কথাটা উনি সরাসরি বলতে পারেন না হেজিয়ে, ভেজিয়ে সেই কথাটাই বললেন উনি। যা করতে গিয়ে একেবারে লেজেগোবরে অবস্থা আরকি। অর্থাৎ চাকরি বাকরি ও তথাকথিত কর্মসংস্থানের নামে পণ্য রূপে উদ্বৃত্ত মূল্যযুক্ত উৎপন্নের উপভোক্তা হিসেবে খোদ উৎপাদক ও সম্পদের ন্যায়সঙ্গত মালিক-ঐ ক্রয় ক্ষমতা হীন জনগণকেই তাদের সমাজ ও প্রকৃতি থেকে উপড়ে ফেলা। উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি করতে সক্ষম কিন্তু সর্বোচ্চ মুনাফা ভিত্তিক চালু ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার জন্যই তা কিনতে ও মুনাফা তৈরি করতে অপারগ তথাকথিত ক্রয় ক্ষমতা হীন, বেকার, অযথা মজুদ শ্রম শক্তির উৎস হিসেবে খোদ জনগণকেই সমূলে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ ও ধ্বংস করে লগ্নিপতিদের স্বপক্ষে সরাসরি তাদের জমি-জিরেত ও প্রাকৃতিক সম্পদকে লুঠ করার অশুভ ঈঙ্গিত এ। এই- ই হচ্ছে আসল NRC। এই-ই হচ্ছে তাঁর শাসকগোষ্ঠীর স্বপক্ষে চাকরি চাওয়ার আসল তাৎপর্য। শাসকগোষ্ঠীর আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে তথাকথিত বড়ো পক্ষ দিচ্ছে না বলে, উনি দিতে পারছেন না এমন ভান করে বিষয়টাকে ঘুড়িয়ে দিতে চাইলেন উনি। আর ভোটার হিসেবে জনগণ ও শাসকদের কাছে একটু নাক পেঁচিয়ে দাবি করে রাখলেন তথাকথিত বড়ো পক্ষ হিসেবে নিজের চাকরির প্রশ্নটা।
মানুষের ক্রয় ক্ষমতা তৈরি হয় উৎপাদনে শ্রম দেওয়ার জন্য অত্যন্ত সাধারণভাবে বেঁচেবর্তে থাকার জন্য ন্যূনতম যেটুকু দরকার, সেটুকুর সমপরিমাণ মুনাফার মূল্য যুক্ত পণ্য হিসেবে তাদেরই তৈরি উৎপন্নের একটা অংশ কিনতে পারা মজুরি ভিত্তিক ক্ষমতার মাধ্যমে। কিন্তু চালু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দ্রুতই মানুষেরই সৃষ্টি হিসেবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সহ যাবতীয় আশির্বাদকে সর্বোচ্চ মুনাফা ভিত্তিক সংকীর্ণ ক্ষমতার খোটায় তথাকথিত ক্রয় ক্ষমতা হিসেবে মানুষের মজুরি ভিত্তিক উৎপাদনের সুযোগকেই করে তোলে তাদেরই সৃষ্টির তুলনায় অত্যন্ত সঙ্কোচিত। তথাকথিত ক্রয় ক্ষমতা হীন বাজার হিসেবে উদ্বৃত্ত সৃষ্টিকারী সুবিপুল উৎপাদিকা শক্তির ভিত্তি হিসেবে খোদ মানুষই হয়ে পরে অত্যন্ত অক্ষম, অসহায়, সীমায়িত, সীমাবদ্ধ ও নিঃস্প্রান বেকার বাহিনীর হতাশাগ্রস্থ জনগণের ভাণ্ডারে।
তাই এই ব্যবস্থার তল্পিবাহীরা এর ক্ষমতায় বসে নিজেরা এর এই স্ববিরোধকে ঢাকা দিতে এমন হাস্যকৌতুক ছাড়া আর কিছুই পারবে না,-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একেবারেই কিছু পারেননা তা নয়। তারা যা পারেন তা হলো;- নিজেদের হাসির খোড়াক হিসেবে পিড়ীত জনগণকে খানিকটা অন্তত বিনোদন দিতে। এবং তাই-ই দিচ্ছেন এরা নির্দ্বিধায়।
আপাতত যা দাড়িয়েছে, তাতে উৎপাদিকা শক্তির খানিক সুরাহা করতে চালু পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের নাটবল্টু খানিকটা ঢিলা না করলে প্যাঁচ কাটার উপক্রম সমাসন্ন। তার জন্য পুঁজি ও মুনাফার একটা মর্যাদাকর সিলিং না হলেই নয়। যেমন কেউ দাবি তুলতেই পারেন;-ব্যক্তিগত পুঁজির পরিমান ৫০০ কোটি, গোষ্ঠী পুঁজির পরিমাণ ১০০০ কোটি ও বহুজাতিক পুঁজির পরিমাণ ২০০০ কোটি টাকার বেশি হতে পারবে না। সাধারন ব্যবহারিক স্বাচ্ছন্দের জন্য ন্যূনতম নির্ধারিত পরিমাণের বেশি জমি, বাড়ি ও উপকরণ মূলক উপাদান রাখা যাবেনা। এর প্রতিশোধ ও প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ আকাঙ্ক্ষীত ও সমাজ নির্ধারিত বিকাশের বদলে বিনিয়োগ ও উৎপাদন উদ্যোগ বিমুখতার নিয়ন্ত্রণে ঐ যার যার নির্ধারিত পুঁজি ও সম্পত্তির অধিকারও খর্ব করা হবে নির্দিষ্ট সময় অন্তর পর্যবেক্ষণের মানদণ্ডে। আর সেই জন্যই দরকার হতে পারে শ্রম দিবসের যতটা সম্ভব কম শ্রম সময় নির্ধারণের মাধ্যমে উৎপাদনে যতটা সম্ভব বেশি মানুষকে যুক্ত করে সর্বোচ্চ মুনাফার যতটা সম্ভব অংশ সবচেয়ে বেশি মানুষের মধ্যে চুঁইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। যেমন যদি দৈনিক ৪ ঘন্টা কাজের সময় নির্ধারিত করা যায় তাহলে ৮ ঘন্টায় একজন আর ১২ ঘন্টায় অতিরিক্ত আরও দুজন বেকারের কর্মসংস্থান অনায়াসেই করা যায়। ও যতটা সম্ভব সর্বোচ্চ মজুরি নির্ধারিত না হলে ক্রয় ক্ষমতা, চাহিদা ও উৎপাদনের একটা নূন্যতম সুষম বিন্যাস ছাড়া তা একেবারে ঘাটাঘাটি হয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাই যাতে না লাটে উটে যায় তার জন্যই এমন কিছু একটা ব্যবস্থা না হলেই কি আর চলে! কোনো বিপ্লব টিপ্লবের গল্প সল্প নয় কিন্তু। বরং বদলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্যই কি এমন একটা উপপ্লব মার্কা জঙ্গিয়ানা সত্যিই খুব বেশি ক্ষমার অযোগ্য পাপ-টাপ কিছু একটা হয়ে যাবে কি? সত্যিকার স্থিতাবস্থাপন্থীদের জন্য তো এমন একটা কিছুই দরকার। আপাতত এবং এক্ষুনি। যদিও সর্বোচ্চ মুনাফাবাদী ও ন্যূনতম মজুরি ভিত্তিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এমন কাঠালের আমসত্বের চক্রবুহ্যেই প্রানপাত হওয়ার ১৬ আনার মধ্যে ১৮ আনাই সম্ভাবনাই নিশ্চিত, তবুও দেখুন না কেউ প্রস্তাবটা পেরে একবার। পুঁজিবাদের জন্যই। অগত্যা তারা না মানলে.....সে তো অন্য কথা। আপনারই কি ব্যপারটা খুব একটা যুতসই মনে হচ্ছে?
তাই ক্ষমতার অলিন্দে বসেও আজ যারা "চাকরি চাই-চাকরি চাই" বলে জনগণকে পেটে খোচা মেরে হাসাচ্ছেন, তারাই কিন্তু আবার জনগণের একটা বিশাল অংশকে বিভ্রান্ত করেই এইসব ছলাকলা করতে সাহস ও রসদ পাচ্ছেন। কিন্তু জনগণ বেশিদিন এই ভাড়ামীর সঙ্গে থাকবে না, সে সব্বাই জানে। তাই কাল তাদেরই একাংশ যদি এমনই ভয়ানক কিছু জঙ্গি স্লোগান-টোগান নিয়েও হাজির হন;-আমরা অবাক হব কি?....
প্রোফাইল লিঙ্ক-
https://www.facebook.com/shankha.chil.526