18/07/2026
ভারতের উন্নয়নের গতি যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে বনভূমি নিয়ে কঠিন প্রশ্ন। জুলাই ২০২৩ থেকে মে ২০২৬-এর মধ্যে সরকারি নথি অনুযায়ী ২৮ লক্ষেরও বেশি গাছ কাটার বা অপসারণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে খনি প্রকল্প, পাশাপাশি রয়েছে জলবিদ্যুৎ, পুনর্বাসন এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ।
এই সময়ে ২২,০০০ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের ছাড়পত্র পেয়েছে। অন্যদিকে উত্তরাখণ্ডে হাজার হাজার গাছ কাটার প্রস্তাব ঘিরে শুরু হয়েছে প্রতিবাদ, আবার গ্রেট নিকোবর, হাসদেও অরণ্য ও কেন–বেতওয়া প্রকল্পও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। উন্নয়ন কি বনভূমির বিনিময়ে এগোবে, নাকি দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ? সরকারি তথ্য, প্রকল্পভিত্তিক পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি নিয়েই আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
-----
জঙ্গল শুধু গাছের সমষ্টি নয়। একটি বনভূমির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য প্রাণী, পাখি, নদীর উৎস, মাটির উর্বরতা, বৃষ্টির চক্র এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা। অথচ গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বনভূমি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেই অনুমোদনের সরকারি নথি বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চমকে দেওয়া তথ্য। জুলাই ২০২৩ থেকে মে ২০২৬—এই প্রায় তিন বছরের মধ্যে দেশে ২৮ লক্ষেরও বেশি গাছ কাটার বা অপসারণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই অনুমোদনের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়েই রয়েছে খনি প্রকল্প, যার জন্য একাই প্রায় ১৩.৫ লক্ষ গাছ কাটার ছাড়পত্র মিলেছে। অর্থাৎ, দেশের উন্নয়নের বর্তমান গতিপথে বনভূমির উপর সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করছে খনিজ সম্পদ আহরণের প্রকল্পগুলিই।
এই তথ্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছে কেন্দ্রের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের অধীন বনভূমি সংক্রান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়ার সরকারি নথি থেকে। সংশ্লিষ্ট সময়ে বনভূমিকে অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য মোট ২৮৮টি প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে ২৪২টি প্রস্তাব অনুমোদন পায়। অর্থাৎ, অনুমোদনের হার ছিল ৮০ শতাংশেরও বেশি। এই প্রকল্পগুলির জন্য মোট ২২,০০০ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সংখ্যার বিচারে এটি শুধু কয়েকটি প্রকল্পের গল্প নয়, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলতে থাকা অবকাঠামো, জ্বালানি, খনিজ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলির সম্মিলিত চিত্র।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খনি প্রকল্প সবচেয়ে বেশি বনভূমি এবং গাছের উপর প্রভাব ফেলেছে। প্রায় ১৩.৫ লক্ষ গাছ এই খাতের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যার জন্য প্রায় ৯.৩ লক্ষ গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এরপর রয়েছে পুনর্বাসন প্রকল্প, যেখানে প্রায় ২.৩ লক্ষ গাছ প্রভাবিত হওয়ার অনুমোদন মিলেছে। এছাড়া রাস্তা নির্মাণ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, রেলপথ, প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত প্রকল্পও এই তালিকায় রয়েছে। শুধু এই প্রথম তিনটি খাতই মোট অনুমোদিত গাছের প্রায় ৯০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে, যা স্পষ্টভাবে দেখায় কোন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প বনভূমির উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।
সব প্রকল্প যে বিশাল আকারের ছিল, এমন নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৩৯টি প্রকল্পে বনভূমি ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ১০ হেক্টরের কম। ৫৫টি প্রকল্পে তা ছিল ১১ থেকে ১০০ হেক্টর, ৩৫টি প্রকল্পে ১০১ থেকে ৫০০ হেক্টর, ৯টি প্রকল্পে ৫০১ থেকে ১,০০০ হেক্টর, এবং মাত্র ৪টি প্রকল্পে বনভূমির পরিমাণ ১,০০০ হেক্টরের বেশি। অর্থাৎ, অসংখ্য ছোট ও মাঝারি প্রকল্পের পাশাপাশি কয়েকটি বিশাল প্রকল্পও সামগ্রিক পরিসংখ্যানে বড় ভূমিকা নিয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পগুলির মধ্যে অন্যতম ছত্তীসগঢ়ের সুরগুজা জেলার কেন্টে এক্সটেনশন ওপেনকাস্ট কয়লা খনি প্রকল্প। সরকারি নথি অনুযায়ী, এই একটিমাত্র প্রকল্পেই ৪ লক্ষেরও বেশি গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কয়লা উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত এই প্রকল্প বহুদিন ধরেই পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। একইভাবে ওড়িশার সিজিমালি বক্সাইট প্রকল্পও বনভূমি ব্যবহারের কারণে বিশেষভাবে আলোচিত। প্রায় ৭০০ হেক্টর বনভূমি এই প্রকল্পের আওতায় পড়লেও সরকারি বৈঠকের কার্যবিবরণীতে গাছের নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। যদিও সেখানে মাটি ক্ষয়, জলধারার উপর প্রভাব এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
রাজ্যভিত্তিক চিত্রও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। অরুণাচল প্রদেশে একাধিক বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে সর্বাধিক সংখ্যক গাছ কাটার অনুমোদনের ঘটনা সামনে এসেছে। সরকারি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই রাজ্যে ৫ লক্ষেরও বেশি গাছ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। অন্যদিকে ছত্তীসগঢ়, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক এবং রাজস্থানেও খনি প্রকল্পের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বনভূমি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয় যে বনভূমির উপর চাপ কোনও একটি রাজ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের বিভিন্ন খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এই তালিকায় মধ্যপ্রদেশের কেন–বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছর ধরে আলোচনায় থাকা এই প্রকল্পের একটি অংশ পান্না টাইগার রিজার্ভ এবং সংলগ্ন বনাঞ্চলের উপর প্রভাব ফেলবে বলে বিভিন্ন পরিবেশগত মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে বনভূমি ব্যবহারের পাশাপাশি হাজার হাজার গাছ অপসারণের প্রয়োজন হবে বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সরকারের মতে, এই প্রকল্প বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে জলসংকট কমাতে সাহায্য করবে, কৃষিতে সেচের সুযোগ বাড়াবে এবং পানীয় জলের প্রাপ্যতা উন্নত করবে। অন্যদিকে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বাঘ, শকুন, ঘড়িয়ালসহ বহু প্রজাতির আবাসস্থলের উপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সতর্কভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এই পরিসংখ্যানের মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সময়ে বিবেচিত ৮৪টি প্রকল্পে গাছ কাটার সংখ্যা শূন্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আবার ১৪টি প্রকল্পে গাছের সংখ্যা আদৌ উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ, সব ক্ষেত্রেই তথ্য সমানভাবে নথিভুক্ত হয়নি। ফলে বনভূমির প্রকৃত প্রভাব নিয়ে আরও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই তুলে আসছেন পরিবেশ গবেষকরা। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলির বক্তব্য, প্রতিটি প্রকল্পই নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনের ভিত্তিতেই এগিয়েছে।
জুলাই ২০২৬-এ উত্তরাখণ্ডে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা গোটা দেশের নজর আবার বনভূমি রক্ষার বিতর্কের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। সাধারণত এই সময় রাজ্যে ‘হরেলা’ উৎসব পালন করা হয়, যেখানে মানুষ গাছ লাগিয়ে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। কিন্তু এ বছর বহু মানুষ সেই উৎসব পালন করেন ‘ব্ল্যাক হরেলা’ হিসেবে। কারণ, দেরাদুনের কাছে শিবালিক সংরক্ষিত বনাঞ্চলে একটি সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য ৪,৩৬৯টি গাছ কাটার প্রস্তাব ঘিরে তীব্র বিরোধ শুরু হয়। ভানিয়াওয়ালা–ঋষিকেশ সড়ক চওড়া করার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে পরিবেশপ্রেমী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন সংগঠন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এই বনাঞ্চল শুধু গাছের সমষ্টি নয়, এটি হাতিসহ বহু বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ। তাই বিকল্প পথের সম্ভাবনা পুরোপুরি বিবেচনা না করে বনভূমির উপর চাপ বাড়ানো উচিত নয়।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল বহু মানুষের গাছ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়া। অনেকের কাছেই এই দৃশ্য ফিরিয়ে এনেছিল চিপকো আন্দোলনের স্মৃতি, যেখানে কয়েক দশক আগে উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলে সাধারণ মানুষ গাছকে আলিঙ্গন করে বন রক্ষার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। যদিও বর্তমান পরিস্থিতি এবং সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এক নয়, তবুও প্রতীকী প্রতিবাদের এই ছবি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—উন্নয়নের জন্য বনভূমি কতটা ব্যবহার করা উচিত এবং সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পরিবেশগত ক্ষতির মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে।
উত্তরাখণ্ডের ঘটনাই একমাত্র নয়। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বৃহৎ প্রকল্পকে ঘিরে একই ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম গ্রেট নিকোবর সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় একটি আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ পরিকাঠামো এবং নতুন টাউনশিপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি মূল্যায়নে জানানো হয়েছে, এই প্রকল্পের ফলে প্রায় ৯.৬৪ লক্ষ গাছ প্রভাবিত হতে পারে। সরকারের মতে, ভারত মহাসাগর অঞ্চলে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াতে এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বহু বিজ্ঞানী এবং পরিবেশ গবেষকের আশঙ্কা, দ্বীপের প্রাচীন উষ্ণমণ্ডলীয় অরণ্য, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একইভাবে ছত্তীসগঢ়ের হাসদেও অরণ্য বহু বছর ধরেই কয়লা খনি সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে আলোচনায় রয়েছে। এই অরণ্যকে মধ্য ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ বনাঞ্চল হিসেবে ধরা হয়। এখানে হাতি, চিতাবাঘ, ভালুকসহ বহু বন্যপ্রাণীর আবাস রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে কয়লা প্রকল্পের জন্য ২.৪ লক্ষেরও বেশি গাছ কাটার পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের একাংশ বন ও জীবিকার সুরক্ষার দাবি তুলেছেন, আবার সরকার ও শিল্পমহলের বক্তব্য, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অঞ্চল উন্নয়ন এবং পরিবেশ—দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতের অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গাছের সংখ্যা দিয়ে বনভূমির মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। একটি প্রাকৃতিক বন তৈরি হতে কয়েক দশক, কখনও কখনও শতাব্দীও লেগে যায়। সেখানে অসংখ্য উদ্ভিদ, অণুজীব, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং কীটপতঙ্গ পরস্পরের উপর নির্ভর করে একটি জটিল বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলে। বড় আকারের খনি, বাঁধ, রাস্তা বা বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পের কারণে বনভূমি ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে গেলে বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ ভেঙে যায়। এর ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘর্ষ বাড়তে পারে, নদীর জলধারার উপর প্রভাব পড়তে পারে, মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বনভূমির কার্বন ধরে রাখার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
তবে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক জানিয়েছে, বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের অনুমতি কোনও ক্ষেত্রেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয় না। প্রতিটি প্রকল্পকে পরিবেশগত মূল্যায়ন, বনভূমি ব্যবহারের যৌক্তিকতা, বন্যপ্রাণীর উপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং বিভিন্ন আইনি শর্ত পূরণের পরই অনুমোদন দেওয়া হয়। এছাড়া বনভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণমূলক বনসৃজন করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। অর্থাৎ, যতটা বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহৃত হবে, তার পরিবর্তে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী অন্যত্র নতুন বনসৃজনের ব্যবস্থা করতে হয়। সরকারের দাবি, অবকাঠামো, সড়ক, বিদ্যুৎ, জলসম্পদ, খনিজ এবং শিল্পোন্নয়নের মতো প্রকল্প দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জনজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কিন্তু পরিবেশ গবেষকদের একাংশের বক্তব্য, ক্ষতিপূরণমূলক বনসৃজন এবং একটি প্রাকৃতিক বন একই জিনিস নয়। নতুন করে রোপণ করা গাছ কয়েক বছরের মধ্যে বড় হলেও, বহু দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রাকৃতিক অরণ্যের জীববৈচিত্র্য, মাটির গঠন, জলধারণ ক্ষমতা এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এত সহজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাঁদের মতে, বনভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু কতগুলি গাছ কাটা হবে তা নয়, সেই বনাঞ্চলের পরিবেশগত গুরুত্ব, বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
জুলাই ২০২৩ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের সরকারি নথি তাই শুধু ২৮ লক্ষেরও বেশি গাছ, ২২,০০০ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি, ২৮৮টি প্রস্তাব, ২৪২টি অনুমোদন বা ১৩.৫ লক্ষ গাছের খনি প্রকল্প—এই পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উত্তরাখণ্ডের প্রতিবাদ, ছত্তীসগঢ়ের খনি, ওড়িশার বক্সাইট, মধ্যপ্রদেশের নদী সংযোগ প্রকল্প, অরুণাচল প্রদেশের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং গ্রেট নিকোবরের মতো বৃহৎ পরিকল্পনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের এই ঘটনাগুলি একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয়, ভারতের উন্নয়নের প্রতিটি বড় পদক্ষেপের পাশাপাশি বনভূমি সংরক্ষণের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব নিয়ে সামনে উঠে আসছে।