Bonmohotsob

Bonmohotsob Tree Plantation

05/08/2026
18/07/2026

সমুদ্রে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক দূষণ করে কোন দেশ? অনেকেই মনে করেন, যে দেশ সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক তৈরি করে, সেই দেশই এই তালিকার শীর্ষে থাকবে। কিন্তু বাস্তবটা সম্পূর্ণ আলাদা। এই তালিকা তৈরি হয়েছে এমন প্লাস্টিক বর্জ্যের ভিত্তিতে, যা ঠিকমতো সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার না হওয়ায় নদীপথে ভেসে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে পৌঁছে যায়। তাই এখানে প্লাস্টিক উৎপাদনের পরিমাণ নয়, বরং অব্যবস্থাপিত প্লাস্টিক বর্জ্যের সমুদ্রে পৌঁছনোর পরিমাণই বিবেচনা করা হয়েছে।

এই তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে ফিলিপিন্স, এরপরেই রয়েছে ভারত। এছাড়াও মালয়েশিয়া, চিন, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ এবং থাইল্যান্ডও রয়েছে প্রথম দশে। এই প্রতিবেদনে জানবে কোন দেশ থেকে বছরে কত মেট্রিক টন প্লাস্টিক সমুদ্রে পৌঁছয়, কেন এই দেশগুলি তালিকার শীর্ষে রয়েছে এবং কীভাবে নদীপথ আজ বিশ্বের প্লাস্টিক দূষণের অন্যতম বড় উৎস হয়ে উঠেছে।

----

প্রতি বছর কোটি কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য পৃথিবীর নদী, খাল এবং সমুদ্রে পৌঁছে পরিবেশের জন্য বড় সংকট তৈরি করছে। কিন্তু সমুদ্রে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক দূষণকারী দেশ বলতে ঠিক কী বোঝায়? অনেকেই মনে করেন, যে দেশ সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক তৈরি করে, সেই দেশই সবচেয়ে বেশি সমুদ্র দূষণ করে। বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। বিজ্ঞানীরা যে তালিকা প্রকাশ করেছেন, সেটি তৈরি হয়েছে এমন প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণের ভিত্তিতে, যা ঠিকমতো সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার না হওয়ার কারণে নদীপথে ভেসে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে পৌঁছয়। এই গবেষণা অনুযায়ী, সমুদ্রে নদীপথে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য পৌঁছয় ফিলিপিন্স থেকে। প্রতি বছর দেশটি থেকে প্রায় ৩,৫৬,৩৭১ মেট্রিক টন প্লাস্টিক সমুদ্রে গিয়ে মেশে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত, যেখানে থেকে বছরে প্রায় ১,২৬,৫১৩ মেট্রিক টন প্লাস্টিক নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে পৌঁছয়। এরপর রয়েছে মালয়েশিয়া, যার পরিমাণ ৭৩,০৯৮ মেট্রিক টন। চতুর্থ স্থানে থাকা চিন থেকে সমুদ্রে পৌঁছয় ৭০,৭০৭ মেট্রিক টন প্লাস্টিক, আর পঞ্চম স্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়ার পরিমাণ ৫৬,৩৩৩ মেট্রিক টন।

এই তালিকায় এরপর রয়েছে মিয়ানমার, যেখানে থেকে বছরে প্রায় ৪০,০০০ মেট্রিক টন প্লাস্টিক সমুদ্রে পৌঁছয়। সপ্তম স্থানে রয়েছে ব্রাজিল, যার পরিমাণ ৩৭,৭৯৯ মেট্রিক টন। অষ্টম স্থানে ভিয়েতনাম, যেখানে থেকে ২৮,২২১ মেট্রিক টন প্লাস্টিক নদীপথে সমুদ্রে যায়। নবম স্থানে বাংলাদেশ, যার পরিমাণ ২৪,৬৪০ মেট্রিক টন, আর দশম স্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড, যার পরিমাণ ২২,৮০৬ মেট্রিক টন। এই দশটি দেশের পর বিশ্বের বাকি সব দেশের সম্মিলিত অবদান প্রায় ১,৫৬,০১২ মেট্রিক টন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই তথ্যগুলি প্রকাশিত হয়েছে নদীপথে সমুদ্রে পৌঁছনো প্লাস্টিক বর্জ্যের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে, যা এখনও এই বিষয়ে সর্বাধিক স্বীকৃত আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলির মধ্যে অন্যতম।

তবে এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বোঝা জরুরি। এই তালিকা কোনও দেশের মোট প্লাস্টিক উৎপাদনের হিসাব নয়। বরং যে প্লাস্টিক বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তি করা যায়নি এবং নদীর স্রোতে ভেসে সমুদ্রে পৌঁছেছে, কেবল সেই পরিমাণই এখানে ধরা হয়েছে। ফলে কোনও দেশের জনসংখ্যা, নদীর সংখ্যা, দীর্ঘ উপকূলরেখা, বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা—সব মিলিয়েই এই পরিসংখ্যান তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ফিলিপিন্সে হাজার হাজার নদী ও বিস্তীর্ণ উপকূলরেখা রয়েছে। সেই সঙ্গে বহু এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি থাকায় প্লাস্টিক সহজেই নদীতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে পৌঁছে যায়। ভারতের ক্ষেত্রেও একইভাবে বড় জনসংখ্যা, অসংখ্য নদী এবং বহু শহরে অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব শুধু সমুদ্রের জলে সীমাবদ্ধ নয়। সামুদ্রিক কচ্ছপ, মাছ, তিমি, ডলফিন এবং অসংখ্য সামুদ্রিক পাখি প্লাস্টিককে খাবার ভেবে গিলে ফেলে অথবা ফেলে দেওয়া জাল ও প্লাস্টিকের মধ্যে আটকে প্রাণ হারায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় প্লাস্টিকের টুকরো ভেঙে অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়, যেগুলিকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। ইতিমধ্যেই এই মাইক্রোপ্লাস্টিক সামুদ্রিক খাবার, পানীয় জল এমনকি মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশেও শনাক্ত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখনও এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, প্লাস্টিক দূষণ কমাতে শুধু পুনর্ব্যবহার বাড়ালেই হবে না। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, কার্যকর বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, নদীতে বর্জ্য পৌঁছনো রোধ করা, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি—এই সব পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর হলে তবেই সমুদ্রে প্লাস্টিক পৌঁছনোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

18/07/2026

ভারতের উন্নয়নের গতি যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে বনভূমি নিয়ে কঠিন প্রশ্ন। জুলাই ২০২৩ থেকে মে ২০২৬-এর মধ্যে সরকারি নথি অনুযায়ী ২৮ লক্ষেরও বেশি গাছ কাটার বা অপসারণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে খনি প্রকল্প, পাশাপাশি রয়েছে জলবিদ্যুৎ, পুনর্বাসন এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ।

এই সময়ে ২২,০০০ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের ছাড়পত্র পেয়েছে। অন্যদিকে উত্তরাখণ্ডে হাজার হাজার গাছ কাটার প্রস্তাব ঘিরে শুরু হয়েছে প্রতিবাদ, আবার গ্রেট নিকোবর, হাসদেও অরণ্য ও কেন–বেতওয়া প্রকল্পও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। উন্নয়ন কি বনভূমির বিনিময়ে এগোবে, নাকি দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ? সরকারি তথ্য, প্রকল্পভিত্তিক পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি নিয়েই আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

-----

জঙ্গল শুধু গাছের সমষ্টি নয়। একটি বনভূমির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য প্রাণী, পাখি, নদীর উৎস, মাটির উর্বরতা, বৃষ্টির চক্র এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা। অথচ গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বনভূমি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেই অনুমোদনের সরকারি নথি বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চমকে দেওয়া তথ্য। জুলাই ২০২৩ থেকে মে ২০২৬—এই প্রায় তিন বছরের মধ্যে দেশে ২৮ লক্ষেরও বেশি গাছ কাটার বা অপসারণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই অনুমোদনের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়েই রয়েছে খনি প্রকল্প, যার জন্য একাই প্রায় ১৩.৫ লক্ষ গাছ কাটার ছাড়পত্র মিলেছে। অর্থাৎ, দেশের উন্নয়নের বর্তমান গতিপথে বনভূমির উপর সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করছে খনিজ সম্পদ আহরণের প্রকল্পগুলিই।

এই তথ্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছে কেন্দ্রের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের অধীন বনভূমি সংক্রান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়ার সরকারি নথি থেকে। সংশ্লিষ্ট সময়ে বনভূমিকে অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য মোট ২৮৮টি প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে ২৪২টি প্রস্তাব অনুমোদন পায়। অর্থাৎ, অনুমোদনের হার ছিল ৮০ শতাংশেরও বেশি। এই প্রকল্পগুলির জন্য মোট ২২,০০০ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সংখ্যার বিচারে এটি শুধু কয়েকটি প্রকল্পের গল্প নয়, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলতে থাকা অবকাঠামো, জ্বালানি, খনিজ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলির সম্মিলিত চিত্র।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খনি প্রকল্প সবচেয়ে বেশি বনভূমি এবং গাছের উপর প্রভাব ফেলেছে। প্রায় ১৩.৫ লক্ষ গাছ এই খাতের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যার জন্য প্রায় ৯.৩ লক্ষ গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এরপর রয়েছে পুনর্বাসন প্রকল্প, যেখানে প্রায় ২.৩ লক্ষ গাছ প্রভাবিত হওয়ার অনুমোদন মিলেছে। এছাড়া রাস্তা নির্মাণ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, রেলপথ, প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত প্রকল্পও এই তালিকায় রয়েছে। শুধু এই প্রথম তিনটি খাতই মোট অনুমোদিত গাছের প্রায় ৯০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে, যা স্পষ্টভাবে দেখায় কোন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প বনভূমির উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।

সব প্রকল্প যে বিশাল আকারের ছিল, এমন নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৩৯টি প্রকল্পে বনভূমি ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ১০ হেক্টরের কম। ৫৫টি প্রকল্পে তা ছিল ১১ থেকে ১০০ হেক্টর, ৩৫টি প্রকল্পে ১০১ থেকে ৫০০ হেক্টর, ৯টি প্রকল্পে ৫০১ থেকে ১,০০০ হেক্টর, এবং মাত্র ৪টি প্রকল্পে বনভূমির পরিমাণ ১,০০০ হেক্টরের বেশি। অর্থাৎ, অসংখ্য ছোট ও মাঝারি প্রকল্পের পাশাপাশি কয়েকটি বিশাল প্রকল্পও সামগ্রিক পরিসংখ্যানে বড় ভূমিকা নিয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পগুলির মধ্যে অন্যতম ছত্তীসগঢ়ের সুরগুজা জেলার কেন্টে এক্সটেনশন ওপেনকাস্ট কয়লা খনি প্রকল্প। সরকারি নথি অনুযায়ী, এই একটিমাত্র প্রকল্পেই ৪ লক্ষেরও বেশি গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কয়লা উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত এই প্রকল্প বহুদিন ধরেই পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। একইভাবে ওড়িশার সিজিমালি বক্সাইট প্রকল্পও বনভূমি ব্যবহারের কারণে বিশেষভাবে আলোচিত। প্রায় ৭০০ হেক্টর বনভূমি এই প্রকল্পের আওতায় পড়লেও সরকারি বৈঠকের কার্যবিবরণীতে গাছের নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। যদিও সেখানে মাটি ক্ষয়, জলধারার উপর প্রভাব এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

রাজ্যভিত্তিক চিত্রও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। অরুণাচল প্রদেশে একাধিক বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে সর্বাধিক সংখ্যক গাছ কাটার অনুমোদনের ঘটনা সামনে এসেছে। সরকারি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই রাজ্যে ৫ লক্ষেরও বেশি গাছ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। অন্যদিকে ছত্তীসগঢ়, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক এবং রাজস্থানেও খনি প্রকল্পের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বনভূমি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয় যে বনভূমির উপর চাপ কোনও একটি রাজ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের বিভিন্ন খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

এই তালিকায় মধ্যপ্রদেশের কেন–বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছর ধরে আলোচনায় থাকা এই প্রকল্পের একটি অংশ পান্না টাইগার রিজার্ভ এবং সংলগ্ন বনাঞ্চলের উপর প্রভাব ফেলবে বলে বিভিন্ন পরিবেশগত মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে বনভূমি ব্যবহারের পাশাপাশি হাজার হাজার গাছ অপসারণের প্রয়োজন হবে বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সরকারের মতে, এই প্রকল্প বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে জলসংকট কমাতে সাহায্য করবে, কৃষিতে সেচের সুযোগ বাড়াবে এবং পানীয় জলের প্রাপ্যতা উন্নত করবে। অন্যদিকে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বাঘ, শকুন, ঘড়িয়ালসহ বহু প্রজাতির আবাসস্থলের উপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সতর্কভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এই পরিসংখ্যানের মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সময়ে বিবেচিত ৮৪টি প্রকল্পে গাছ কাটার সংখ্যা শূন্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আবার ১৪টি প্রকল্পে গাছের সংখ্যা আদৌ উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ, সব ক্ষেত্রেই তথ্য সমানভাবে নথিভুক্ত হয়নি। ফলে বনভূমির প্রকৃত প্রভাব নিয়ে আরও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই তুলে আসছেন পরিবেশ গবেষকরা। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলির বক্তব্য, প্রতিটি প্রকল্পই নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনের ভিত্তিতেই এগিয়েছে।

জুলাই ২০২৬-এ উত্তরাখণ্ডে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা গোটা দেশের নজর আবার বনভূমি রক্ষার বিতর্কের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। সাধারণত এই সময় রাজ্যে ‘হরেলা’ উৎসব পালন করা হয়, যেখানে মানুষ গাছ লাগিয়ে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। কিন্তু এ বছর বহু মানুষ সেই উৎসব পালন করেন ‘ব্ল্যাক হরেলা’ হিসেবে। কারণ, দেরাদুনের কাছে শিবালিক সংরক্ষিত বনাঞ্চলে একটি সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য ৪,৩৬৯টি গাছ কাটার প্রস্তাব ঘিরে তীব্র বিরোধ শুরু হয়। ভানিয়াওয়ালা–ঋষিকেশ সড়ক চওড়া করার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে পরিবেশপ্রেমী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন সংগঠন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এই বনাঞ্চল শুধু গাছের সমষ্টি নয়, এটি হাতিসহ বহু বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ। তাই বিকল্প পথের সম্ভাবনা পুরোপুরি বিবেচনা না করে বনভূমির উপর চাপ বাড়ানো উচিত নয়।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল বহু মানুষের গাছ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়া। অনেকের কাছেই এই দৃশ্য ফিরিয়ে এনেছিল চিপকো আন্দোলনের স্মৃতি, যেখানে কয়েক দশক আগে উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলে সাধারণ মানুষ গাছকে আলিঙ্গন করে বন রক্ষার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। যদিও বর্তমান পরিস্থিতি এবং সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এক নয়, তবুও প্রতীকী প্রতিবাদের এই ছবি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—উন্নয়নের জন্য বনভূমি কতটা ব্যবহার করা উচিত এবং সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পরিবেশগত ক্ষতির মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে।

উত্তরাখণ্ডের ঘটনাই একমাত্র নয়। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বৃহৎ প্রকল্পকে ঘিরে একই ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম গ্রেট নিকোবর সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় একটি আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ পরিকাঠামো এবং নতুন টাউনশিপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি মূল্যায়নে জানানো হয়েছে, এই প্রকল্পের ফলে প্রায় ৯.৬৪ লক্ষ গাছ প্রভাবিত হতে পারে। সরকারের মতে, ভারত মহাসাগর অঞ্চলে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াতে এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বহু বিজ্ঞানী এবং পরিবেশ গবেষকের আশঙ্কা, দ্বীপের প্রাচীন উষ্ণমণ্ডলীয় অরণ্য, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একইভাবে ছত্তীসগঢ়ের হাসদেও অরণ্য বহু বছর ধরেই কয়লা খনি সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে আলোচনায় রয়েছে। এই অরণ্যকে মধ্য ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ বনাঞ্চল হিসেবে ধরা হয়। এখানে হাতি, চিতাবাঘ, ভালুকসহ বহু বন্যপ্রাণীর আবাস রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে কয়লা প্রকল্পের জন্য ২.৪ লক্ষেরও বেশি গাছ কাটার পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের একাংশ বন ও জীবিকার সুরক্ষার দাবি তুলেছেন, আবার সরকার ও শিল্পমহলের বক্তব্য, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অঞ্চল উন্নয়ন এবং পরিবেশ—দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতের অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গাছের সংখ্যা দিয়ে বনভূমির মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। একটি প্রাকৃতিক বন তৈরি হতে কয়েক দশক, কখনও কখনও শতাব্দীও লেগে যায়। সেখানে অসংখ্য উদ্ভিদ, অণুজীব, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং কীটপতঙ্গ পরস্পরের উপর নির্ভর করে একটি জটিল বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলে। বড় আকারের খনি, বাঁধ, রাস্তা বা বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পের কারণে বনভূমি ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে গেলে বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ ভেঙে যায়। এর ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘর্ষ বাড়তে পারে, নদীর জলধারার উপর প্রভাব পড়তে পারে, মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বনভূমির কার্বন ধরে রাখার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।

তবে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক জানিয়েছে, বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের অনুমতি কোনও ক্ষেত্রেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয় না। প্রতিটি প্রকল্পকে পরিবেশগত মূল্যায়ন, বনভূমি ব্যবহারের যৌক্তিকতা, বন্যপ্রাণীর উপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং বিভিন্ন আইনি শর্ত পূরণের পরই অনুমোদন দেওয়া হয়। এছাড়া বনভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণমূলক বনসৃজন করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। অর্থাৎ, যতটা বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহৃত হবে, তার পরিবর্তে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী অন্যত্র নতুন বনসৃজনের ব্যবস্থা করতে হয়। সরকারের দাবি, অবকাঠামো, সড়ক, বিদ্যুৎ, জলসম্পদ, খনিজ এবং শিল্পোন্নয়নের মতো প্রকল্প দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জনজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কিন্তু পরিবেশ গবেষকদের একাংশের বক্তব্য, ক্ষতিপূরণমূলক বনসৃজন এবং একটি প্রাকৃতিক বন একই জিনিস নয়। নতুন করে রোপণ করা গাছ কয়েক বছরের মধ্যে বড় হলেও, বহু দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রাকৃতিক অরণ্যের জীববৈচিত্র্য, মাটির গঠন, জলধারণ ক্ষমতা এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এত সহজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাঁদের মতে, বনভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু কতগুলি গাছ কাটা হবে তা নয়, সেই বনাঞ্চলের পরিবেশগত গুরুত্ব, বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

জুলাই ২০২৩ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের সরকারি নথি তাই শুধু ২৮ লক্ষেরও বেশি গাছ, ২২,০০০ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি, ২৮৮টি প্রস্তাব, ২৪২টি অনুমোদন বা ১৩.৫ লক্ষ গাছের খনি প্রকল্প—এই পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উত্তরাখণ্ডের প্রতিবাদ, ছত্তীসগঢ়ের খনি, ওড়িশার বক্সাইট, মধ্যপ্রদেশের নদী সংযোগ প্রকল্প, অরুণাচল প্রদেশের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং গ্রেট নিকোবরের মতো বৃহৎ পরিকল্পনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের এই ঘটনাগুলি একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয়, ভারতের উন্নয়নের প্রতিটি বড় পদক্ষেপের পাশাপাশি বনভূমি সংরক্ষণের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব নিয়ে সামনে উঠে আসছে।

18/07/2026

34 বছর ধরে সে এমন সব জায়গায় হেঁটেছে, যেখানে যেতে অনেকেই ভয় পেত।

আজ কাজিরাঙা বিদায় জানাচ্ছে তার সবচেয়ে সাহসী রক্ষকদের একজনকে।

1960 সালে জন্ম নেওয়া জয়মালা 1992 সালে কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানে আসে। এরপর টানা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যকে রক্ষা করার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করে।

জয়মালা শুধু একটি টহলদারি হাতি ছিল না।

বন্যা, ঘন জঙ্গল, উদ্ধার অভিযান কিংবা চোরাশিকারবিরোধী টহল—প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতিতে সে বনরক্ষী ও মাহুতদের নির্ভরযোগ্য সঙ্গী ছিল। তার শক্তি, সাহস এবং অটুট বিশ্বস্ততার ওপরই সবাই ভরসা করতো।

অনেকেই আজও 2004 সালের সেই ঘটনার কথা মনে করে, যখন টহলের সময় একটি বাঘ হঠাৎ লাফিয়ে জয়মালার ওপর দিয়ে চলে গিয়েছিল।

সেই ছবিটি সারা বিশ্বের নজর কেড়েছিল। কিন্তু সেটি ছিল শুধু একটি মুহূর্ত—জয়মালার পুরো জীবনটাই কেটেছে সেই জঙ্গলকে রক্ষা করতে, যেটাকে সে নিজের ঘর মনে করত।

প্রায় এক বছর ধরে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করলেও জয়মালার সাহস ও মনোবল কখনও ভেঙে পড়েনি।

5 জুলাই কাজিরাঙা তাকে শেষ বিদায় জানায় ‘Guard of Honour’-এর মাধ্যমে—যে সম্মান সাধারণত সবচেয়ে সাহসীদের জন্যই রাখা হয়।

ভালো থেকো, জয়মালা। তুমি ছিলে বলেই কাজিরাঙার জঙ্গল আরও নিরাপদ ছিল। 🌿🐘



[Kaziranga National Park, Joymala Elephant, Wildlife Conservation, Forest Protection, Assam Wildlife, Wildlife India]

14/06/2026

১৯৭০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৫ হাজার ৪৯৫টি প্রজাতির ৩৪ হাজার ৮৩৬টি বন্যপ্রাণী জনসংখ্যার তথ্য বিশ্লেষণ করে ডব্লিউডব্লিউএফের লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্ট জানাচ্ছে, পর্যবেক্ষণাধীন বন্যপ্রাণীর গড় জনসংখ্যা কমেছে ৭৩ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, আর মিষ্টি জলের প্রাণীদের ক্ষেত্রে পতন পৌঁছেছে ৮৫ শতাংশে।

----

পৃথিবীর বন্যপ্রাণী কি সত্যিই শেষ হয়ে যাচ্ছে? গত কয়েক মাসে সমাজমাধ্যমে এই প্রশ্নটি নতুন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কারণ, ডব্লিউডব্লিউএফের প্রকাশিত লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, মাত্র পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীর পর্যবেক্ষণাধীন বন্যপ্রাণীর গড় জনসংখ্যা কমেছে ৭৩ শতাংশ। যদিও এটি ২০২৬ সালের নতুন কোনো প্রতিবেদন নয়, এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে। তবু প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান এবং সতর্কবার্তা আজও সমানভাবে আলোচিত, কারণ এটি ১৯৭০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তনের হিসাব তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদনটি তৈরি করতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ৩৪ হাজার ৮৩৬টি বন্যপ্রাণী জনসংখ্যার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মোট ৫ হাজার ৪৯৫টি প্রজাতি, যেমন স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী এবং মাছ। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা জরুরি। ৭৩ শতাংশ হ্রাস মানে এই নয় যে পৃথিবীর ৭৩ শতাংশ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা ৭৩ শতাংশ প্রজাতি আর অস্তিত্বে নেই। এর অর্থ হলো, পর্যবেক্ষণ করা প্রাণীগুলির জনসংখ্যার গড় আকার ১৯৭০ সালের তুলনায় ২০২০ সালে ৭৩ শতাংশ কমে গেছে। কোনো কোনো প্রজাতির সংখ্যা বেড়েছে, কিছু স্থিতিশীল থেকেছে, আবার বহু প্রজাতির সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি পতন দেখা গেছে লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে। সেখানে পর্যবেক্ষণাধীন বন্যপ্রাণীর গড় জনসংখ্যা কমেছে ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ, অর্ধশতাব্দীর মধ্যে এই অঞ্চলের বহু প্রাণী তাদের আগের সংখ্যার মাত্র পাঁচ শতাংশে নেমে এসেছে। আফ্রিকায় এই পতন ৭৬ শতাংশ, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৬০ শতাংশ, উত্তর আমেরিকায় ৩৯ শতাংশ এবং ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় ৩৫ শতাংশ।

আবাসভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে মিষ্টি জলের পরিবেশে। নদী, হ্রদ এবং জলাভূমির প্রাণীদের গড় জনসংখ্যা কমেছে ৮৫ শতাংশ। স্থলভাগের প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই পতন ৬৯ শতাংশ এবং সামুদ্রিক প্রাণীদের ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ। গবেষকদের মতে, বাঁধ নির্মাণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন, দূষণ, অতিরিক্ত জল উত্তোলন এবং জলবায়ুর পরিবর্তন মিষ্টি জলের প্রাণীদের অস্তিত্বকে দ্রুত সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হলো আবাসস্থলের ক্ষয় এবং ধ্বংস। বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদনের জন্য বনভূমি, তৃণভূমি ও জলাভূমিকে কৃষিজমিতে রূপান্তর করার ফলে অসংখ্য প্রাণী তাদের স্বাভাবিক পরিবেশ হারাচ্ছে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত শিকার ও আহরণ, বহিরাগত প্রজাতির আগ্রাসন, বিভিন্ন রোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনও বড় ভূমিকা পালন করছে। জলবায়ুর পরিবর্তন একদিকে তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে খরা, দাবানল ও বন্যার মতো ঘটনাকে আরও ঘন ঘন ঘটাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে গোটা জীবজগতের ওপর।

ডব্লিউডব্লিউএফ আরও সতর্ক করেছে যে পৃথিবীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশব্যবস্থা এমন এক অবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব নাও হতে পারে। আমাজন অরণ্যের কিছু অংশ, প্রবাল প্রাচীর এবং নানা বনাঞ্চল ইতিমধ্যেই সেই সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, ২০৩০ সালের আগে নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবে এবং মানুষ কতটা সুস্থ পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারবে।

11/06/2026

খনির মুনাফায় ডুববে অরণ্য,
উচ্ছেদ হবেন আদিবাসীরা
৬ লক্ষ গাছ কাটার ছাড়পত্র দিয়ে হাতির করিডোরে কয়লা তোলার পথ খুলেছে কেন্দ্র — বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কায় শতাধিক আদিবাসী পরিবার, পরিবেশকর্মীরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতিতে l

মধ্যপ্রদেশের সিঙ্গরৌলি জেলার গভীর অরণ্যে এখন শুধু পাখির ডাক নয়, শোনা যাচ্ছে উচ্ছেদের আশঙ্কায় কাঁদতে থাকা শত শত আদিবাসী পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয় আদানি গোষ্ঠীর সংযুক্ত সংস্থা মহান এনার্জেনের ধিরৌলি কয়লা খনি প্রকল্পে ২০২৫ সালের মে মাসে দ্বিতীয় পর্যায়ের অরণ্য ছাড়পত্র মঞ্জুর করার পর থেকেই এই আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে।

প্রায় ১,৩৯৭ হেক্টর বনভূমিতে ছড়িয়ে থাকা এই প্রকল্প এলাকায় ৬ লক্ষেরও বেশি গাছ কেটে ফেলা হবে। ২,৮০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের জন্য যে ভূমি ব্যবহার করা হবে, সেই ৭,০০০ একরের এলাকাটি ২০১১ সালে তৎকালীন ইউপিএ সরকারই "নো-গো জোন" হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কারণ এখানে রয়েছে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ড — এই তিন রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত হাতির সংরক্ষিত করিডোর।

পরিবেশকর্মী অজয় দুবে জাতীয় সবুজ ট্রাইব্যুনালে (এনজিটি) এই ছাড়পত্রকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলে এনজিটি ২৫৯ দিনের বিলম্বের কারণ দেখিয়ে আবেদন খারিজ করে দেয়। এনজিটি আইনের ১৬ ধারা অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ছাড়পত্র আপলোডের দিন থেকেই সময়সীমার গণনা শুরু হয় — যা দুবে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

২১ মে ২০২৬-এ সুপ্রিম কোর্ট দেরির যুক্তি শুনে আর্জিকারীদের পিটিশন প্রত্যাহার করে হাইকোর্টসহ অন্য আইনি পথে যাওয়ার অনুমতি দেয়। এর ফলে মামলার দরজা বন্ধ হয়নি — আইনি লড়াই এখনও জারি।

কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশ এই প্রসঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়ে লিখেছেন, "মোদানি সাম্রাজ্যের জন্য এই ঘন বনাঞ্চল উন্মুক্ত করা হচ্ছে, যা ২০১১ সালে নিষিদ্ধ ছিল।" তিনি আরও জানান, সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক আরাবল্লি মামলার মতোই এই বিষয়ে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট যথাযথ সংবেদনশীলতা দেখাবেন বলে তিনি আশাবাদী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দশকের পর দশক ধরে সিঙ্গরৌলি অঞ্চলে খনি ও তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের জেরে ইতিমধ্যেই ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে গেছে। নতুন এই প্রকল্প সেই ক্ষতিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। গাছ পড়ার আগেই আদালত এই মামলার যোগ্যতাভিত্তিক বিচার করবে কিনা — এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।




















11/06/2026

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বহু আন্দোলনের কথা ইতিহাসে লেখা আছে, কিন্তু ছোটনাগপুরের উলগুলান ছিল আলাদা। এটি শুধু শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়, জমি হারানো, বন থেকে উচ্ছেদ হওয়া এবং নিজের পরিচয় বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রামও ছিল। মাত্র পঁচিশ বছরের জীবনে বিরসা মুন্ডা এমন এক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে নীতি বদলাতে বাধ্য করেছিল। তাঁর মৃত্যু জেলের ভেতরে হলেও, তাঁর লড়াই আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে আজও জীবন্ত।

----

উনিশ শতকের শেষভাগে ছোটনাগপুর মালভূমির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জমি, বন আর জীবিকার অধিকারকে কেন্দ্র করে যে প্রবল আলোড়ন তৈরি হয়েছিল, ইতিহাস তাকে চেনে ‘উলগুলান’ নামে। মুন্ডারি ভাষায় এই শব্দের অর্থ মহা তোলপাড় বা মহা আলোড়ন। এই আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিলেন বিরসা মুন্ডা, যাঁর নাম আজও আদিবাসী প্রতিরোধের অন্যতম বড় প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। ১৮৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর বর্তমান ঝাড়খণ্ডের উলিহাতু গ্রামে তাঁর জন্ম। পরবর্তী মাত্র পঁচিশ বছরের জীবনে তিনি এমন এক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন, যা ব্রিটিশ শাসনকে ছোটনাগপুরে তাদের নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছিল।

তুমি যদি সেই সময়ের ছোটনাগপুরের দিকে তাকাও, দেখবে আদিবাসী সমাজের প্রধান ভরসা ছিল খুন্তকাট্টি ব্যবস্থা। এই প্রথায় জমির অধিকার কোনও একক ব্যক্তির নয়, গোটা বংশ বা গোষ্ঠীর হাতে থাকত। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন ভূমি জরিপ, রাজস্ব আদায় এবং জমিদারি কাঠামো চালু করার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। বাইরের জমিদার, মহাজন ও মধ্যস্বত্বভোগীরা ক্রমশ জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। বহু আদিবাসী পরিবার নিজেদের চাষের জমি হারিয়ে ঋণের বোঝায় ডুবে যায়। অনেককে বাধ্য হয়ে বেগার শ্রম বা ঋণশ্রমে জড়িয়ে পড়তে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বন সংক্রান্ত নতুন আইন। যেসব বন থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাঠ, ফল, শিকার এবং অন্যান্য সম্পদ সংগ্রহ করা হত, সেসবের ওপরও নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

এই অবস্থার বিরুদ্ধে ১৮৫৮ সাল থেকেই মুন্ডা নেতারা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাতে শুরু করেছিলেন। জমির অধিকার রক্ষা এবং শোষণের বিরুদ্ধে এই দীর্ঘ সাংবিধানিক আন্দোলন ‘সারদারি লড়াই’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু বহু বছর ধরে আবেদন, দরখাস্ত এবং আলোচনার পরেও বাস্তব পরিবর্তন খুব কমই দেখা যায়। ক্রমশ হতাশা বাড়তে থাকে। এই পটভূমিতেই বিরসা মুন্ডার উত্থান ঘটে।

শৈশবে তিনি লুথেরান মিশন স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। কিছু সময় খ্রিস্টধর্মের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি সেই পথ থেকে সরে এসে নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর প্রচারে মুন্ডা সমাজের ঐতিহ্য, সামাজিক সংস্কার এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্ন একসঙ্গে উঠে আসে। তিনি মদ্যপান ও নানা সামাজিক কুপ্রথার বিরোধিতা করেন। একই সঙ্গে তিনি ‘দিকু’ নামে পরিচিত বহিরাগত শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এই দিকুদের মধ্যে জমিদার, মহাজন, সরকারি কর্মচারী এবং মিশনারি প্রতিষ্ঠান—সবাই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে ‘ধরতি আবা’ বা পৃথিবীর পিতা বলে সম্মান জানাতে শুরু করে।

১৮৯৫ সালে বিরসার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকলে ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁকে গ্রেপ্তার করে। রাষ্ট্রদ্রোহ ও উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগে তাঁকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৮৯৭ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি নতুন উদ্যমে আন্দোলন শুরু করেন। এবার তাঁর বক্তব্য আরও স্পষ্ট ছিল। তিনি কর ও খাজনা না দেওয়ার আহ্বান জানান এবং ‘আবুয়া রাজ’ বা নিজেদের শাসনের ধারণা সামনে আনেন। এর অর্থ ছিল ব্রিটিশ শাসনের পরিবর্তে আদিবাসীদের নিজস্ব অধিকারভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

১৮৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। বিরসার অনুসারীরা একাধিক পুলিশ ফাঁড়ি ও প্রশাসনিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর আক্রমণ চালায়। এর পর শুরু হয় গেরিলা ধাঁচের প্রতিরোধ। বিদ্রোহ দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ডোম্বারি বুরু পাহাড় ছিল এই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র। সেখানে ব্রিটিশ বাহিনীর গুলিতে বহু আদিবাসী নারী ও পুরুষ নিহত হন। সঠিক সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও হতাহতের সংখ্যা কয়েকশো পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। একই সময়ে শতাধিক আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দমন অভিযান চালানো হয়।

অবশেষে ১৯০০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি চক্রধরপুরের কাছে জামকোপাই জঙ্গলে বিরসা মুন্ডাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে রাঁচি সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন ১৯০০ সালের ৯ জুন তাঁর মৃত্যু হয়। সরকারি নথিতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হলেও সেই মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন বহু বছর ধরে আলোচিত হয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল প্রায় পঁচিশ বছর।

উলগুলান সামরিকভাবে দমন করা হলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। ব্রিটিশ প্রশাসন বুঝতে পারে যে ছোটনাগপুরে জমির প্রশ্ন উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। সেই চাপের ফলেই পরবর্তী সময়ে ভূমি-সংক্রান্ত সংস্কারের পথ তৈরি হয় এবং ১৯০৮ সালে ছোটনাগপুর টেন্যান্সি আইন কার্যকর করা হয়। এই আইন আদিবাসী জমি অ-আদিবাসীদের কাছে হস্তান্তরের ওপর গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। মাত্র কয়েক বছরের আন্দোলন ছোটনাগপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একটি পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে দেয়, যার প্রভাব আজও অনুভূত হয়।

11/06/2026

ছত্তীসগড়ের হাসদেও আরন্দকে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু কয়লা উত্তোলনের নতুন অনুমোদনকে ঘিরে আবারও সামনে এসেছে বন, বন্যপ্রাণী, নদী ও বননির্ভর মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন। পরিবেশবিদদের মতে, যে বন তৈরি হতে শতাব্দী লেগেছে, তার একটি বড় অংশ কয়েক বছরের মধ্যেই বদলে যেতে পারে খনিখাতে।

----

ছত্তীসগড়ের সুরগুজা অঞ্চলে অবস্থিত হাসদেও আরন্দ প্রায় এক লক্ষ সত্তর হাজার হেক্টর বিস্তৃত একটি ঘন বনভূমি, যা মধ্য ভারতের বৃহত্তম অবিচ্ছিন্ন শাল বনাঞ্চলগুলির মধ্যে অন্যতম বলে পরিচিত। এই অঞ্চল শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়, বরং বহু বন্যপ্রাণী, নদী অববাহিকা এবং বননির্ভর আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জটিল জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা। বহু বছর ধরে কয়লা খনির সম্প্রসারণ নিয়ে বিতর্ক চললেও ২০২৬ সালের ২৮ মে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে আসে কেণ্টে এক্সটেনশন ওপেনকাস্ট কয়লা প্রকল্প। ওই দিন পরিবেশ মন্ত্রকের বন উপদেষ্টা কমিটি প্রকল্পটির জন্য স্টেজ-১ বা প্রাথমিক বন অনুমোদনের সুপারিশ করে।

সরকারি নথি ও প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের জন্য প্রায় এক হাজার সাতশো চল্লিশ হেক্টর বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে অনুমান করা হচ্ছে যে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় চার লক্ষ আটচল্লিশ হাজার গাছ কাটা পড়তে পারে। এই সংখ্যাটি নিয়ে পরিবেশবিদদের উদ্বেগ বিশেষভাবে বেড়েছে, কারণ গাছ হারানোর পাশাপাশি বনাঞ্চলের ধারাবাহিকতাও ভেঙে যেতে পারে। প্রকল্পটি রাজস্থান রাজ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নিগমের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে এবং খনি উন্নয়ন ও পরিচালনার সঙ্গে আদানি গোষ্ঠীর ভূমিকার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাসদেও আরন্দের গুরুত্ব শুধু বনসম্পদে সীমাবদ্ধ নয়। এই অঞ্চল হাতির চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথগুলির কাছাকাছি অবস্থিত। প্রস্তাবিত খনি এলাকা লেমরু হাতি করিডর থেকে মাত্র ৩.৬ কিলোমিটার দূরে। বন উপদেষ্টা কমিটির পর্যবেক্ষণেও উল্লেখ করা হয়েছে যে খনির কাজ হাতির স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবেশ গবেষকদের মতে, করিডর সংকুচিত হলে হাতির দল বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয় এবং তখন গ্রামাঞ্চলে প্রবেশের ঘটনা বাড়তে পারে, যার ফলে মানুষ ও হাতির সংঘাতও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই বনাঞ্চল হাতি ছাড়াও চিতাবাঘ, স্লথ ভালুক এবং অসংখ্য পাখি, সরীসৃপ ও ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাসস্থল। জীববৈচিত্র্য সংক্রান্ত সমীক্ষায় এলাকাটিকে পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমীক্ষায় মাটিক্ষয় এবং গালিচ্যুতির ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা বড় আকারের খনি কার্যক্রম শুরু হলে আরও বাড়তে পারে। বনভূমির ঘন আচ্ছাদন কমে গেলে বৃষ্টির জল ধরে রাখার ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং তার প্রভাব আশপাশের জলপ্রবাহের ওপরও পড়তে পারে।

পরিবেশবিদদের আরেকটি বড় উদ্বেগ জলসম্পদকে ঘিরে। হাসদেও নদী ব্যবস্থার সঙ্গে এই বনাঞ্চলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে বাঙ্গো বাঁধের জলসংগ্রহ অঞ্চলের একটি অংশও এই বনভূমির প্রভাবাধীন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন বনভূমি বৃষ্টির জল শোষণ, সংরক্ষণ এবং ধীরে ধীরে নদী ও জলাধারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে বড় পরিসরে বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে জলপ্রবাহের ধরণেও পরিবর্তন আসতে পারে।

হাসদেও আরন্দের বিভিন্ন গ্রামে বসবাসকারী আদিবাসী সম্প্রদায় বহু প্রজন্ম ধরে বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি, খাদ্য, বনজ ফল, ঔষধি উদ্ভিদ এবং দৈনন্দিন জীবিকার একটি বড় অংশ এই বন থেকেই আসে। তাই খনি সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ শুধু পরিবেশগত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত। অন্যদিকে সরকার ও প্রকল্প সমর্থকদের বক্তব্য, দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম বজায় রাখতে কয়লা এখনও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎস। সেই কারণেই তারা খনির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছে। তবে পরিবেশবিদদের দাবি, ক্ষতিপূরণমূলক বৃক্ষরোপণ নতুন গাছ তৈরি করতে পারলেও শতাব্দীপ্রাচীন একটি প্রাকৃতিক বন, তার জীববৈচিত্র্য, নদীসংযোগ, বন্যপ্রাণীর পথ এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

Address

Karunamoyee Ghat Road
Kolkata
700082

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Bonmohotsob posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category