08/11/2024
আমার বাবা : পৃথিবীর পাঠশালার এক অক্লান্ত গ্রন্থাগারিক
(লিখছেন রাতুল গুহ)
আমার বাবা শ্রী অমল কৃষ্ণ গুহ শারীরিকভাবে পৃথিবী ছেড়ে গেছেন, তার প্রায় এক মাস হল। এই এক মাস সময় বহু মানুষ বাবার খোঁজ নিয়েছেন, বাবার সঙ্গে তাদের নানান স্মৃতির কথা আমাকে জানিয়েছেন.. তাদের প্রত্যেককে আমার এবং আমাদের পরিবারের তরফ থেকে কৃতজ্ঞতা। যারা তাদের ব্যস্ততার কারণে আমাদের সঙ্গে তেমন করে যোগাযোগ করে উঠতে পারেননি, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা। আমাদের সঙ্গে ফোনে বা শারীরিকভাবে যোগাযোগ করার সুযোগ না পেলেও, তারা নিশ্চয়ই মনে মনে বাবার কথা ভেবেছেন, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
ফরিদপুর, রায়গঞ্জ, বাটানগর, কলকাতা.. আমার বাবার যৌবন কেটেছে খানিকটা যাযাবরের মতোই। ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার কিন্তু মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শেষ অবধি তা হয়ে ওঠেনি। পারিবারিক দায়বদ্ধতার কারণে অতি দ্রুত জীবিকার সন্ধান । কয়েকটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করে শেষে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকে সম্মানের প্রবেশ । জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাবা গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করতো, “ আমি রিজার্ভ ব্যাংকের এমপ্লয়ী। ” কর্মজী বনে প্রবেশ করা সত্ত্বেও বাবার পড়াশোনা থেমে থাকে নি। আমরা গর্বের সঙ্গে বলি আমাদের বাবা সেই সময়কার এম এ পাস। এম এ তে বাবার বিষয় ছিল মডার্ন হিস্ট্রি।
প্রথাগত পড়াশোনার বাইরে সাহিত্য জগতে ছিল বাবার অবাধ বিচরণ। বাংলা সাহিত্য এবং ইংরেজি সাহিত্যেরও এমন বই বিরল যা বাবা পড়েনি বা যে বই আমাদের বাড়িতে আসেনি।
ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি যে কোন বিষয়েই কোন জিজ্ঞাসা থাকলে আমি এবং বহু ক্ষেত্রে আমার বন্ধুদেরও নিশ্চিত উত্তরের ঠিকানা আমার বাবা । সত্যজিৎ রায়ের গল্পে যেমন পড়েছি গোয়েন্দাগিরির ক্ষেত্রে যে কোন কিছু নিশ্চিত ভাবে জানার জন্য ফেলুদা সিধুজ্যাঠার উপর ভরসা করত , আমরাও নানা ক্ষেত্রে তেমন ভরসা করতাম বাবার উপর। রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাস , নরেন মিত্রের ছোট গল্প আর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ছিল বাবার খুব প্রিয়। নিজের ছিন্নমূল অতীতের জন্যই হয়তো অতিপ্রিয় ছিল অতীন বন্দোপাধ্যায়ের ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’। বাবার শোকেসে পাশাপাশি থাকতো মধুবংশীর গলি আর পাবলো নেরুদার কবিতা। হেমিংওয়ে, টলস্টয়, ডেন কার্নেগী বাবাকে সমানভাবে আকৃষ্ট করতো।
সাহিত্যের বাইরে আরও যে দুটো বিষয়ে বাবার প্রবল আগ্রহ আমাকে অবাক করত তা হল ভ্রমণ এবং খেলাধুলা । বাবা যেহেতু রিজার্ভ ব্যাংকের কো-অপারেটিভ সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন, তাই বহু মানুষ বাবার কাছে আসতেন বেড়াতে যাওয়ার জন্য হলিডে হোমের বুকিং করাতে । হলিডে হোমের বুকিং এর পাশাপাশি যে জায়গায় বেড়াতে যাবে তার পুঙ্খানুপূর্ণ বর্ণনা তারা যেমন শুনে উপকৃত হতেন, তেমনি বাবার মুখে শুনে আমাদেরও মানস ভ্রমণ হয়ে যেত সেই ছোটবেলা থেকেই। কত ফুটবল, ক্রিকেট, লন টেনিস খেলা আমি, আমার দাদা এবং আমাদের বন্ধুরা আমাদের সামনের ঘরে বসে একসঙ্গে দেখেছি তার হিসেব নেই। মাঝরাত অব্দি জেগে দেখা সেই খেলায় বাবা থাকতো আমাদের সঙ্গী। নিয়ম-কানুন ও খেলার ইতিহাসের যে কোন খুঁটিনাটিতে আমাদের ভরসা বাবা। ইন্টারনেটহীন সেই জীবনে আমাদের প্রত্যেকের বাবা কাকা দাদারা একেক জন ছিলেন জ্ঞান ও উৎকর্ষের প্রচ্ছন্ন লাইব্রেরী, ভাবনার অন্তহীন সার্চ ইঞ্জিন।
বাবা ও আমাদের মধ্যে ছিল একটা সম্ভ্রম আর সমীহের পর্দা। এটা শুধুমাত্র আমি, দাদা বা আমাদের বন্ধুদের ক্ষেত্রে নয়, আমার কাকুদেরও দেখেছি কোথাও যেন একটা শ্রদ্ধার দূরত্ব রেখে চলে। বাবা সামনের ঘরে শুয়ে বই পড়লে আমাদের বন্ধুরা আসতো পিছনের সিঁড়ির দরজা দিয়ে, যাতে আসার সময় সরাসরি বাবার সঙ্গে দেখা না হয়। আমি আর দাদাও ব্যতিক্রম নয়। বাবাকে কোন কিছু জানাতে হলে আমাদের সেতু হোতো মা।
শ্রদ্ধা ও সমীহের পর্দা থাকা সত্ত্বেও বাবা কোন কিছু আমাদের উপর চাপিয়ে দেননি । বরং যে কোন নতুনে উৎসাহ দিতেন সর্বদা। কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় আমরা যখন প্রথম লিটল ম্যাগাজিন বের করি, বা বইমেলায় সেই লিটিল ম্যাগাজিনের টেবিল পাওয়ার জন্য কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, সে বিষয়ে আমরা বাবার কাছে অবাধে পরামর্শ চাইতাম। নিজেও ‘কবিতা সীমান্ত’, ‘কৃশাণু’ ইত্যাদি সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে গর্বিত বোধ করতেন । বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতেন, যদিও নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস কখনো কারোর উপর চাপিয়ে দেওয়ার নূন্যতম চেষ্টাও করেননি।
বাবা একইসঙ্গে সেরিব্রাল অ্যাটাক , কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এবং ক্যান্সারের যন্ত্রণা বহন করে চলছিল। বিভিন্নভাবে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল প্রতিদিন। তবে আমার কেমন যেন মনে হয় শরীরের রক্তের থেকেও অনেক বেশি রক্তক্ষরণ হচ্ছিল বাবার ভিতরে ভিতরে, বছর দুয়েক আগে আমার মা কোভিডে চলে যাওয়ার পর থেকে। মা একইসঙ্গে ছিল বাবার হৃদয় এবং দৃষ্টি। এখানে একটা কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে। আমার মাও কিন্তু একজন অদ্ভুত মানুষ ছিলেন। বাবা, পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশীদের নিয়েই আষ্টেপৃষ্ঠে ছিল তার জীবন। বই পড়ার জন্য নিজের একটা চশমাও কখনো মাকে কিনতে দেখিনি । বাবার পুরনো , হাতলভাঙ্গা চশমাটাই নাকি মায়ের চোখে সবথেকে বেশি ‘সেট’ করে, এমনটাই মা আমাদের বলতো । মা-বাবার এই পঞ্চাশ বছরের একসঙ্গে থাকায় যে ছেদ কোভিড এনেছিল মাকে দু বছর আগে কেড়ে নিয়ে , সেই যন্ত্রণা বাবার কাছে ক্যান্সারের থেকেও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই সাতই অক্টোবর, আমার জন্মদিনের ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় মা বাবাকে নিজের কাছে নিয়ে গেল , সব যন্ত্রণার অবসান করিয়ে । চলে যাওয়ার আগের দিনও কিন্তু বাবা আমাকে তার সবথেকে প্রিয় উপন্যাস যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ থেকে বিভিন্ন লাইন ‘কোট’ করে বলেছেন। তাই বাবার চলে যাওয়াকে আমার কখনোই মৃত্যু মনে হয় না। মনে হয় মা ডাক দিয়েছে এক নতুন ভ্রমণের .. আর বাবা, ‘জাস্ট যাচ্ছি’ বলে মায়ের হাত ধরে সেই অপূর্ব ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সের দিকে এগিয়ে গেল। পিছনে রয়ে গেলাম আমরা, এই নশ্বর পৃথিবীতে পার্থিব চাওয়া পাওয়া নিয়ে।
বাবাকে কখনো কোল্ড ড্রিঙ্ক খেতে দেখি নি। কিন্তু চলে যাওয়ার কিছুদিন আগে আমার থেকে বা আমার বৌদির থেকে বা আমার দাদার ছেলে পুচকুর থেকে কখনো কখনো একটু একটু কোল্ড ড্রিঙ্ক খেতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। ছোটরা বড় হয় আর বড়রা ছোট , এইতো জীবনচক্রের সারসত্য। শেষদিকে বাবা নিজের জন্মস্থানের কথা, বাবা মায়ের কথা, আত্মীয়দের কথা, ছেলেবেলার কথা খুব বলতো । এখন বোধহয় আলোকবর্ষ দূরের সেই অনির্বচনীয় পৃথিবীতে বাবা তার নিজের বাবা-মা আর আমার মাকে সঙ্গে নিয়ে কোন এক অপূর্ব নীলকন্ঠ পাখির খোঁজ করছে। কোন একদিন তোমার এই খোঁজে আমি, আমরাও সামিল হবো বাবা.. শুধু শক্ত করে আমাদের হাতটা ধরে থেকো তখন , যেমন এখন ধরে আছো মায়ের ..
বাবা পড়তে খুব ভালোবাসতো , আগেও বলেছি। সেই অভ্যেস দানা বেধেছিল আমার মায়ের মধ্যে, আমার দাদার মধ্যে, আমার মধ্যেও। আত্মীয় পরিচিতর সীমানা অতিক্রম করে, বহু আধা পরিচিত, অপরিচিত মানুষও যে বাবাকে শ্রদ্ধা করত তার একটা কারণ যেমন বাবার অবগুণ্ঠিত অথচ পলিমাটির মতো নরম হৃদয়, আরেকটা কারণ অবশ্যই তার অগাধ পাণ্ডিত্য, অপরিসীম পড়াশোনা । রবীন্দ্র রচনাবলী থেকে বিশ্বকোষ, তিথিডোর থেকে দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন, এসবই বাবা রেখে গেছে উত্তর অধিকার হিসাবে। বাবার খুব ইচ্ছে ছিল একটা লাইব্রেরী করার .. চেষ্টা করব কোন একদিন যদি একটা লাইব্রেরী তৈরি করতে পারি সবার জন্য .. জ্ঞান প্রজ্ঞা দর্শন উদারতার বৈষম্যহীন বন্টনের দায়.. এর থেকে বড় উত্তরাধিকার আর কীই বা হতে পারে...