22/09/2026
"বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
দীন যে, দীনের বন্ধু ! "
-----‐-- মাইকেল মধুসূদন দত্ত ।
বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাগুরু, গদ্যকার, সমাজ সংস্কারক, দীনবন্ধু ও দানবীর দয়ারসাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০৭ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করতে চলেছে পাটুলি স্ট্রিট লাইব্রেরি।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন "দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষত্ব।" তাঁর অজেয় পৌরুষের জন্য তিনি একান্ত নির্ভীক, বড় বড় রাজা মহারাজা থেকে হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ কারসাহেব পর্যন্ত সকলেই ঐ তালতলার চটির কাছে মাধা নিচু করেছেন। তিনি ছিলেন সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে। কোন ক্ষুদ্রতা, নীচতা, নিষ্ফল আড়ম্বর তাঁর মনুষত্বকে কখনো ছোট করতে পারেনি। তাই ২০৬ বছর অতিক্রান্ত হয়েও তিনি আজ সমান ভাবে অম্লান, অমর হয়ে আছেন বাঙালী জাতির হৃদয়ে ও মননে।
আজকের এই মিথ্যার, সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি, সহিংসতা, আত্মস্বার্থে অতিমাত্রায় নিমজ্জিত হওয়া, ভোগবিলাসে মত্ত থেকে পরিবেশ বিনাশ করা ও বিপুল বাণিজ্যিকীকরণের যুগে বিদ্যাসাগর কতটা প্রাসঙ্গিক? বর্ণপরিচয়ে তাঁর ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ উপদেশ কি আজকের ছেলেমেয়েদের মনে দাগ কাটবে? তাঁর নীতির পাঠের থেকে হয়তো কেউ মুখ ফিরিয়ে নেবে। এই প্রজন্মের অনেকেই হয়ত তাঁকে চিনবে না, তাঁর সাদা চাদর পরিহিত দীপ্ত আবক্ষ মূর্তি ধুলায় লুণ্ঠিত হওয়াই আজকের রীতি। অথচ বাংলার আত্মসম্মান রক্ষার জন্য বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করা আজ বিশেষ প্রয়োজন। বাংলার শিক্ষা ও সমাজের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র উন্মুক্ত ও উদার মননের প্রতীক। তাঁর বিদ্যা ও দয়া, কোনওটাই ভুলবার নয়।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর বক্তৃতা শুরু করেছিলেন বিদ্যাসাগরের চরিত্রের সর্বপ্রধান গুণের কথা বলে— “যে গুণে তিনি পল্লী-আচারের ক্ষুদ্রতা, বাঙালীজীবনের জড়ত্ব সবলে ভেদ করিয়া একমাত্র নিজের গতিবেগপ্রাবল্যে কঠিন প্রতিকূলতার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া— হিন্দুত্বের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে— করুণার অশ্রুজলপূর্ণ উন্মুক্ত অপার মনুষ্যত্বের অভিমুখে আপনার দৃঢ়নিষ্ঠ একাগ্র একক জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন।
বিদ্যাসাগরের ২০৭ তম জন্মবর্ষে যদি আমরা সঙ্কীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে জীবনকে আবার অপার মনুষ্যত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারি, তবে সেটাই হবে এই অনন্য ব্যক্তিত্বের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা অর্পণ।