29/07/2026
আজ ২৯ জুলাই। বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ দিবস।
আমার প্রিয় লেখক শ্রদ্ধেয় সমীরণ দাস লিখিত "নিঃসঙ্গ ঈশ্বর" উপন্যাস থেকে।
অভিযান পাবলিশার্স ..........
শরীরটা দুর্বল হয়ে পড়েছে, ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বিদ্যাসাগর। বেশিরভাগ সময়ই চিকিৎসা করান কখনও হোমিয়োপ্যাথি, কখনও অ্যালোপ্যাথি, কখনও কবিরাজি। কিন্তু উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয় না। বিদ্যাসাগরের মন পড়ে থাকে কর্মাটাড়ের গরিব, সরল, অসহায় মানুষগুলোর মধ্যে। শিবপ্রসন্ন ভট্টাচার্য হাইকোর্টের উকিল। মাঝে মাঝে আসেন বিদ্যাসাগরের কাছে। একদিন বললেন, আপনি মনে হয় কর্মাটাড়ে গিয়ে থাকলেই ভালো থাকেন। অনেকদিন এসেছেন, আবার কয়েকদিন ঘুরে আসতে পারেন।
বিদ্যাসাগর কথা না বলে কয়েক মুহূর্ত উদাসভাবে তাকিয়ে থাকেন। তারপর বলেন, কেন ভালো থাকি জানো? এখানকার ভদ্রবেশধারী ভণ্ড আর্য সন্তানদের থেকে ওখানকার অশিক্ষিত সাঁওতালরা অনেক ভালো। তারা কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করে না। তারা অকৃত্রিমভাবে ভালোও বাসতে পারে।
আবার কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন বিদ্যাসাগর। ফের বলেন, ওখানে গেলে ভালো থাকি বটে, কিন্তু মাঝে মাঝে খুব খারাপও লাগে। ওখানে এক সের চালের ভাত, আধ সের ডাল, আধ সের আলু আর এক সের মাংস যে লোকগুলো খেতে পারে, তাদের পোয়াটাক ভুট্টার ছাতু খেয়ে থাকতে হয়, তার বেশি জোটে না। অথচ আমি ওদের মাঝখানে বসে দিব্যি খাওয়া-দাওয়া করছি- সহ্য করতে পারি না। এতদিন ওদের মধ্যে থেকেও কাজের কাজ তেমন কিছুই করতে পারিনি।
শিবপ্রসন্ন কথাগুলো শুনতে শুনতে তাকিয়ে দেখেন, বিদ্যাসাগরের চোখে জল। দিনে দিনে বিদ্যাসাগরের অসুস্থতা বাড়ে। বাদুড়বাগানের বাড়ি থেকে বের হতে পারেন না। শরীর সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত ডাক্তারের ওষুধ ছাড়াও আফিম সেবন করেন। তবুও পেটের অসুখের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে যকৃতের ব্যথা। ডাক্তার বললেন, লোকজনের সঙ্গে কথা-বলা, মেলামেশা কমাতে হবে। বিদ্যাসাগর বললেন, এই বাড়িতে থাকলে সেটা সম্ভব নয়।
ফের মনে পড়ে গেল মধুসুদনের কথা। তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল উত্তরপাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে। কিছু দিন সুস্থ থাকার পর মৃত্যু হয়েছিল আলিপুরের সরকারি হাসপাতালে। আমারও কি একই দশা হবে?
কিছুদিন পর যকৃতের ব্যথা আবার বেড়ে ওঠে। ক্যানসার ধরা পড়ে। আফিম সেবন বন্ধ করে অন্য ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই ওষুধে ব্যথা না কমে বাড়তে থাকে। নিয়মিত চিকিৎসার জন্য শ্বেতাঙ্গ ডাক্তার বার্চ ও ম্যাকোলেনকে আনানো হয়। স্থায়ী নার্সের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ছোটোখাটো শরীরটা আরও ছোটো ও লোলচর্মসার হয়ে গেছে। বুকের পাঁজরের হাড় বেরিয়ে পড়েছে, নিশ্বাস-প্রশ্বাসে সেই পাঁজর কামারের হাপরের মতো ওঠে-নামে। এখন তিনি বেশিরভাগ সময়ই আচ্ছন্নের মতো পড়ে থাকেন। বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা মারা গিয়েছিলেন মায়ের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর। বিদ্যাসাগর বিড়বিড় করেন, এক সময় আপনাকে অনেক কটু কথা বলেছি বাবা, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।
মায়ের কথা মনে পড়ে, স্ত্রীর কথা মনে পড়ে। ওরা মৃত্যুর সময় ইঙ্গিতে বলে গিয়েছিলেন নারায়ণকে ক্ষমা করতে। নারায়ণও ক্ষমা চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। এতদিন পর নারায়ণকে দেখতে ইচ্ছা করে বিদ্যাসাগরের। একটা পুরোনো অ্যালবাম আছে টেবিলের দেরাজের মধ্যে। সেই অ্যালবামে অনেকের ছবি আছে --- বাবার ছবি, মায়ের ছবি, ভাইদের ছবি, নারায়ণের ছবি, মেয়েদের ছবি। বিদ্যাসাগর হেমলতাকে ডাকেন, হেম? মা?
হেমলতা বাবার ডাক শুনে দ্রুত ছুটে আসে। বিদ্যাসাগরের একটা হাত সোজা উঁচু হয়ে আছে, সেই হাত যেন কাউকে খুঁজছে। কাউকে ডাকতে চাইছে, কাউকে ধরতে চাইছে। হেমলতা ছুটে এসে বাবার হাত জড়িয়ে ধরে, জানে বাবাই তার একমাত্র আশ্রয়। বাবার থেকে বড়ো আশ্রয় আর কেউ হয় না। বলে, কী বলছ বাবা?
আমাদের একটা অ্যালবাম ছিল, মনে আছে?
হেমলতা বলল, হ্যাঁ বাবা, মনে আছে।
ওই অ্যালবামটা একবার এনে দিবি?
হেমলতা জানে অ্যালবামটা থাকে বাবার টেবিলের দেরাজে। বাবা মাঝে মধ্যে ওটা দেখে। বলল, এনে দিচ্ছি বাবা, এক্ষুনি এনে দিচ্ছি।
হেমলতা অ্যালবাম এনে দিলে বিদ্যাসাগর ছবিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। নারায়ণের ছবির দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলেন। বলেন, নারায়ণকে খবর দে, ওকে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে।
খবর পেয়ে নারায়ণ চলে এল ভবসুন্দরীকে সঙ্গে নিয়ে। এই বাড়িতে নারায়ণ আগে একবার এসেছে, কিন্তু ভবসুন্দরী এই প্রথম। নীচে বিশাল চেহারার শ্রীমন্ত কাঁদছে। বৈঠকখানায় অনেক লোক, তারা একবার বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা করতে চায়। কিন্তু ডাক্তারের নির্দেশে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। ওরা সাধারণ মানুষ, দূর-দূর থেকে এসে বিদ্যাসাগরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ চোখ মুছছে, উচ্চৈঃস্বরে কাঁদছে, কেউ বুক চাপড়াচ্ছে। মাঝেমধ্যে শ্বেতাঙ্গরা আসছেন, রাজা-মহারাজারাও আসছেন। সেইসব মানুষদের পাশ দিয়ে দ্রুতপায়ে নারায়ণ ওপরে উঠে বাবার পাশে বসে কাঁদতে শুরু করল। ভবসুন্দরীও চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে কাঁদতে থাকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হেমলতার দুই পুত্র ছোট্ট সুরেশ ও জ্যোতিষ বিভ্রান্তভাবে তাকিয়ে থাকে। তারা জানে, দাদু আর বাঁচবে না। কিন্তু না-বাঁচার গুরুত্ব যে কতখানি, সেটা ওরা জানে না। বিদ্যাসাগর চোখ বন্ধ করে পড়ে ছিলেন বিছানার ওপর, মাঝে মাঝে যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত হয়ে উঠছে। নারায়ণ ডাকল, বাবা? ও বাবা?
বিদ্যাসাগর চোখ মেলে তাকালে নারায়ণ চলে আসে মুখের কাছে। বিদ্যাসাগর হাত তোলার চেষ্টা করলে নারায়ণ সেই হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে, কষ্ট হচ্ছে বাবা?
পুরোনো কথা ভুলে বিদ্যাসাগর আঁকড়ে ধরেন ছেলের হাত। এই ছেলে একসময় বিধবা-বিবাহ করে তাঁর মুখ উজ্জ্বল করেছিল। অন্যের নিন্দার হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। ওকে পরিত্যাগ করে কি আমি লঘু পাপে গুরু দণ্ড দিয়েছি? বললেন, না রে। তুই এসে গেছিস, আর কষ্ট নেই।
নারায়ণের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে? ভাবে, বাবা কি আমাকে ক্ষমা করে দিচ্ছেন? উইল পালটে এই বাড়ির উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যাবেন আমাকে? সে ফের বলে, বাবা, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।
বিদ্যাসাগর হাত বাড়ান ভবসুন্দরীর দিকে। ভবসুন্দরীও চোখের জল ফেলতে ফেলতে সেই হাত জড়িয়ে ধরলে বিদ্যাসাগর বলেন, আমার দাদুভাই প্যারীমোহন কেমন আছে?
ভবসুন্দরী আরও জোরে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, ভালো আছে বাবা। আপনি সুস্থ হয়ে উঠুন তাড়াতাড়ি।
বিদ্যাসাগর তখনও অন্য হাতে নারায়ণের হাত ধরে আছেন। চোখ বন্ধ করে বলেন, আমার জীবনটা ব্যর্থ হয়ে গেল।
নারায়ণ বিচলিত হয়ে বলল, কেন বাবা ওই কথা বলছেন? এই দেশে আপনার মতো সফল পুরুষ কেউ নেই। যে-কোনো লোক আপনার নাম শুনলে কপালে হাত ঠেকায়?
অস্থিরভাবে বিদ্যাসাগর বললেন, তাহলে আমি বহুবিবাহ রোধ করতে পারলাম না কেন? বহুবিবাহ রোধ না করতে পারলে বালবিধবা তো বাড়তেই থাকবে।
নারায়ণ বলে, আপনি যেটুকু করেছেন, সেটুকুর জন্যই দেশের মানুষ আপনাকে মাথায় করে রাখবে।
ভুল, নারায়ণ, ভুল! কত লোক আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, আমাকে অপমান করেছে, তুই জানিস না। কিছু লোক আমার বিরোধিতা করেছে, আমি হিন্দু হয়েও হিন্দুর মতো ধর্মাচরণ করিনি বলে। কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে একটা পয়সা দান করিনি। আমি যা করেছি, মানুষের জন্য করেছি। তবুও এই হতাশার মধ্যেও শান্তি পাই যখন ভাবি রাজা রাধাকান্ত দেবের মতো মহা পরাক্রমশালী মানুষের বিরোধিতা সত্ত্বেও বিধবা-বিবাহ আইন পাস করাতে পেরেছিলাম। বহুবিবাহ বিরোধী আইনও হয়তো পাস করাতে পারতাম যদি বঙ্কিমের মতো লেখকেরা আমার পাশে দাঁড়াত। বঙ্কিমের মতো আচরণ কিন্তু মধুসূদন করেনি। সেজন্যই সে অনন্য।
নারায়ণ কথা বলে না। তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে। পাশে ভবসুন্দরীও তাকিয়ে থাকেন বিদ্যাসাগরের দিকে। বিদ্যাসাগর ফের বলেন, রামকৃষ্ণ পরমহংস এসেছিলেন আমার এই বাড়িতে। আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলে আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমি কোনো উত্তর দিইনি। কেন জানিস? দুঃখী মানুষের প্রার্থনায় ঈশ্বর সাড়া দেন না।
নারায়ণ বলে, তবুও আপনি দেশের জন্য যা করেছেন, আর কেউ করেনি। বিদ্যাসাগর বলেন, আমি আশা করেছিলাম বিধবা-বিবাহকে শাস্ত্রসম্মত প্রমাণ করতে পারলেই এদেশের লোক সেটা অবনত মস্তকে গ্রহণ করবে, কিন্তু আমার সে বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেছে। এদেশে শাস্ত্র ও দেশাচার এক পথে না চলে পরস্পর ভিন্ন পথে চলেছে।
বিদ্যাসাগর দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, ধন্য রে দেশাচার। তোর কী অনির্বচনীয় মহিমা! তুই তোর অনুগত ভক্তদের দুর্ভেদ্য দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে একাধিপত্য কায়েম করেছিস। আমি পারিনি পুরোপুরি সেই একাধিপত্য ভাঙতে।
নারায়ণ কথা বলে না, চারিদিকে নৈঃশব্দ্য জাগে। বিদ্যাসাগর আবার বলেন, আমার আরও একটা দুঃখ কী জানিস নারায়ণ?
নারায়ণ কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, কী বাবা?
আমার ছেলে হয়ে তুই কী করে বিধবার সম্পত্তি গ্রাস করতে গিয়েছিলিস?
নারায়ণ আবার বিদ্যাসাগরের পা জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন বাবা।
বিদ্যাসাগর কথা বলেন না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে শুয়ে কর্কট রোগের যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকেন। মায়ের কথা, স্ত্রীর কথাও মনে পড়ে, বিড়বিড় করেন, তোমাদের শেষ ইচ্ছা আমি রাখব। ক্ষমা করব নারায়ণকে। পালটে দেব ইচ্ছাপত্র। এটাই হয়তো শেষ সময়, এখন না পালটালে আর সময় পাওয়া যাবে না। তখন একটা চিঠি এসে পৌঁছোল। বীরসিংহ জননীর পত্র। চমকে উঠলেন বিদ্যাসাগর, কে বীরসিংহ জননী? তিনি তো আমারও জননী!
চিঠি শেষ করে বিদ্যাসাগর কাঁদতে শুরু করেন। চিৎকার করে বলতে থাকেন, মা। আমার বীরসিংহ মা। আমি এতদিন তোমাকে ছেড়ে থেকে অন্যায় করেছি। বুঝতে পারিনি তোমার মর্মবেদনা। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো, আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।
বিদ্যাসাগরের কান্না, তাঁর গলার স্বর চারদিক আচ্ছন্ন করে। ছুটে আসে হেমলতা, বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, কী হয়েছে বাবা? কাঁদছ কেন? কষ্ট হচ্ছে? বিদ্যাসাগর ওঁর কথার উত্তর না দিয়ে বলেন, একটা কাগজ দে, কলম দে। আমি চিঠি লিখব দীনবন্ধু ও শম্ভুচন্দ্রকে।
হেমলতা কাগজ এনে দিলে বিদ্যাসাগর তাকান নারায়ণের দিকে। এই অবস্থায় তাঁর পক্ষে উঠে বসে কিছু লেখা সম্ভব নয়। বলেন, বাবা নারায়ণ, চিঠিটা লেখো। নারায়ণ লিখতে শুরু করে।
শ্রীশ্রীহরি শরণম
প্রিয় দীনবন্ধু ও শম্ভুচন্দ্র,
আমি প্রায় সতের বছর বীরসিংহে পদার্পণ করিনি। ভেবেছিলাম আর কখনো যাব না। কিন্তু আমার সেই সিদ্ধান্তে ভুল ছিল। আমি "বীরসিংহ জননী"-র চিঠি পেয়ে সেই ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি আমার মায়ের প্রতি অবিচার করেছি। এখন আমি খুবই অসুস্থ, একটু সুস্থ হয়ে উঠলেই চলে যাব আমার জননীর কাছে। গিয়ে তাঁর পা ধরে ক্ষমা চেয়ে আসব। আর ভুল হবে না, মা তাঁর এই অভাগা সন্তানকে নিশ্চয়ই ক্ষমা করবেন।
শুভার্থিনঃ
শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র শর্মণঃ
কিন্তু শরীর আর সুস্থ হল না। শ্রাবণ মাসের চার তারিখ তিনি গোপালচন্দ্র শাস্ত্রীকে বললেন নতুন উইলের ব্যবস্থা করার কথা।
এখন লোকজনের আসা আরও বেড়ে গেছে। যাঁরা এক সময় তাঁর চরম বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরাও আসছেন। বিদ্যাসাগর কখনও একটু-আধটু কথা বলতে পারেন, কখনও পারেন না। কয়েকদিন পর উইল তৈরি হল, সাক্ষীরাও তৈরি। গোপালচন্দ্র বললেন, পণ্ডিতমশাই, সই করুন।
বিদ্যাসাগর তাকালেন। নানা রকম ভাষা ফুটে উঠল তাঁর সেই দৃষ্টিতে, তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, না, থাক।
বিদ্যাসাগর এখন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। একটু একটু করে নাড়ির স্পন্দন কমছে। সকলেই বুঝে গেছেন কী ঘটছে। ঘরের মধ্যে, ঘরের বাইরে অনেকেই চোখ মুছছেন, হাউ হাউ করে কাঁদছেন। অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে চলেছেন চিরনিঃসঙ্গ এক প্রবীণ। একবার চোখ মেলে তাকালেন, সেই চোখের দৃষ্টিতে অতলান্ত গভীরতা। কাকে যেন খুঁজছেন। এক দিকের দেয়ালে ভগবতী দেবীর ছবি। বিদ্যাসাগর ভাষাহীন চোখে তাকালেন মায়ের মুখের দিকে, তারপরই শেষ নিশ্বাস ফেললেন।
আর তিনি তাকাবেন না কোনো দিকে।..............