09/10/2025
হারিয়ে যাওয়া পূজোর রাত
কলকাতার বাইরের উত্তর ২৪ পরগনার একটা ছোট্ট গ্রাম বাবরের হাট, — নদীর ধারে, কাঁচা রাস্তার পাশে এক মাটির ঘর।
সেই ঘরে থাকে সুখেন্দু দাস। সুখেন্দু দিনমজুরের কাজ করে, সারাটা দিন রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরিয়ে কোনোরকমে সংসার চালায়।
তার স্ত্রী শান্তা, ছেলে বিল্টু (৯ বছর) আর মেয়ে সিউলি (৬ বছর) — এই ছোট্ট পরিবারটাই তার পৃথিবী।
দুর্গাপুজো এলে তাদের গ্রামের পুজোও হয় বটে, তবে বাচ্চাদের চোখে ছিল শুধু একটাই স্বপ্ন —
“কলকাতার বড় বড় ঠাকুর দেখা।” আলো ঝলমলে প্যান্ডেল, বিশাল প্রতিমা, আর হাজারো মানুষের ভিড়…
সুখেন্দু জানে, জামা নতুন নেই, পকেটে টাকাও বেশি নেই।
তবুও সুখেন্দু সবাইকে বললো , চল এবার পুজোতে তোদের কলকাতা নিয়ে যাই… দেখবি খুশিতে থাকবি। খাওয়া-দাওয়া নাই বা হোক, মন ভরবে।”
পঞ্চমীর সকাল।
গ্রামের কাঁচা পথ দিয়ে হেঁটে তারা বাবর হাট স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে, শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছলো। পঞ্চমী রাতের কলকাতা।
শিয়ালদহ স্টেশন থেকে হাঁটতে হাঁটতে বউবাজার, কলেজ স্কোয়ার, হাতিবাগান।
চারদিকে আলোর সাগর! সিউলি চোখ বড় বড় করে বলে, “বাবা, এরকম আলো আগে কখনো দেখিনি!”
বিল্টু খুশিতে লাফায়, মায়ের আঁচলে টান দিয়ে ঠাকুর দেখায়।
কিন্তু সেই আনন্দ বেশি ক্ষণ থাকে না। ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায় সুখেন্দু
বাগবাজারের প্যান্ডেলে ঢোকার সময় প্রচণ্ড ভিড়। ঠেলাঠেলির মাঝে এক পলকে সিউলির হাত ছুটে যায়।, শান্তা কিছুই বুঝতে পারে না —
আর যখন বুঝতে পারে, তখন সুখেন্দু নেই।
“বাবা কই?” — বিল্টু চিৎকার করে কাঁদে।
টিউলিপ ভয়ে জড়সড়, শান্তা কাঁদছে।
বহু মানুষ, হাজারো মুখ — যেন অচেনা মানুষের সমুদ্র,কারো কাছে খোঁজখবর করতে সাহস পায় না।
পুলিশের দিকে এগোতে গিয়ে ভয় পায় —
"ওরা যদি ধরে নিয়ে যায়, যদি বলে চুরি করতে এসেছে?"।
সারারাত ধরে খোঁজ চলে — গলির পর গলি, প্যান্ডেলের পর প্যান্ডেল।
কেউ বলে শোভাবাজারে দিকে দেখুন, কেউ বলে মহিষরাজার প্যান্ডেলে একজন বসেছিল…
একটু খাবার কেনার টাকাও নেই তাদের কাছে।
ক্লান্তিতে সিউলির চোখ লাল, বিল্টু ক্লান্ত —
আর শান্তা , শুধু একটাই কথা বলে:
“আমার লোকটারে খুঁজে দাও… আমরা শুধু ঠাকুর দেখতে এসেছিলাম।”
অন্যদিকে, সুখেন্দু পথ ভুলে হেঁটে হেঁটে উত্তরে চলে গেছে। ভয়ে, আতঙ্কে, কষ্টে খোঁজখবর করতে করতে ক্লান্ত হয়ে একটা প্যান্ডেলের এক কোণে বসে —
মানুষের মুখের ভিড়ে স্ত্রী আর সন্তানদের মুখ খুঁজে বেড়ায়।
কান্না চেপে রাখে, বুকের ভেতরে ঝড়।
খাওয়া হয়নি, চোখে ঘুম নেই।
অবশেষে ক্লান্ত হয়ে, পায়ের ব্যথায় কাতর হয়ে একটা লাইটিং এর পাশে বসে ঘুমিয়ে পড়ে।
ভোরের আলোয় পুনর্মিলন
ভোর পাঁচটা বাজে।
প্যান্ডেলের লাইট নিভে এসেছে, ঢাকও থেমেছে।
সুখেন্দু হঠাৎ চোখ মেলে দেখে — পাশে তিনটা মুখ। সিউলি , বিল্টু আর তার স্ত্রী শান্তা।
চোখে জল, মুখে কথা নেই।
বিল্টু বাবার গলা জড়িয়ে ধরে, সিউলি কাঁদতে কাঁদতে বাবার গালে হাত বুলিয়ে দেয়।
শান্তা কাঁদতে কাঁদতে বলে — “তোমাকে ছাড়া আমরা প্রায় মোরেই গেছিলাম। সুখেন্দু তখনো নির্বাক , শুধু বলে—-শোনো বউ – আমাদের ভাগ্যো ভালো… ঠাকুর আমাদের একসাথে ফিরিয়ে দিলেন।” শান্তার সাথে ছেলে, মেয়েরা বলল : “বাবা আমাদের ক্ষমা করে দিও” শান্তু এগিয়ে এসে বলল = আমাদের গ্রামের মাঠের পূজো অনেক ভালো। ইচ্ছে মতন ঘুরতে পারি। এই আলোর ঝলকানির মধ্যে আমাদের কাকু,কাকিমা, জ্যাঠাই,জ্যেঠিমা, দাদা,দিদি, এমনকি গ্রামের গুরুমশাই ( পাঠশালার শিক্ষক মশাই) কেউ থাকে না। চারিদিকে অচেনা অজানার মানুষের মধ্যে কিছু দৃষ্টি অসোহায় নারীর বিশ্বাসকে যেনো অপসংস্কৃতির অন্ধকার জগতে নিয়ে যেতে চায়। এই ঝলমলে আলোর মধ্যে কিছু অন্ধকারো আছে।
সকাল আটটার ট্রেন।
শিয়ালদহ স্টেশান থেকে সুখেন্দু পরিবার নিয়ে ফিরে যায় গ্রামের দিকে।
আজ বাড়ি ফিরে সকলের কিন্তু বুকে শান্তি।
নতুন জামা নেই, ঠাকুর দেখা অসপূর্ণ — তবু একটাই জিনিস পেয়েছে…নিজদের পরিবার। একটা অটুট বন্ধন। শেষ কথা:
দুর্গাপুজো মানে শুধু আনন্দ নয়,
আলোর ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া অন্ধকারকেও আলোকিত করে ভালোবাসা।
সুখেন্দুর পুজোতে প্রতিমা দেখা হয়নি,
কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ছিল —
ভোরবেলার সেই পুনর্মিলন।
আজকের গল্প লেখার উদ্দেশ্য কিন্তু Just time pass আর কিছুই নয়। 🙏 নমস্কার। সকলে ভালো থাকবেন। মিন্টু চক্রবর্তী।
হারিয়ে যাওয়া পূজোর রাত
কলকাতার বাইরের উত্তর ২৪ পরগনার একটা ছোট্ট গ্রাম বাবরের হাট, — নদীর ধারে, কাঁচা রাস্তার পাশে এক মাটির ঘর।
সেই ঘরে থাকে সুখেন্দু দাস। সুখেন্দু দিনমজুরের কাজ করে, সারাটা দিন রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরিয়ে কোনোরকমে সংসার চালায়।
তার স্ত্রী শান্তা, ছেলে বিল্টু (৯ বছর) আর মেয়ে সিউলি (৬ বছর) — এই ছোট্ট পরিবারটাই তার পৃথিবী।
দুর্গাপুজো এলে তাদের গ্রামের পুজোও হয় বটে, তবে বাচ্চাদের চোখে ছিল শুধু একটাই স্বপ্ন —
“কলকাতার বড় বড় ঠাকুর দেখা।” আলো ঝলমলে প্যান্ডেল, বিশাল প্রতিমা, আর হাজারো মানুষের ভিড়…
সুখেন্দু জানে, জামা নতুন নেই, পকেটে টাকাও বেশি নেই।
তবুও সুখেন্দু সবাইকে বললো , চল এবার পুজোতে তোদের কলকাতা নিয়ে যাই… দেখবি খুশিতে থাকবি। খাওয়া-দাওয়া নাই বা হোক, মন ভরবে।”
পঞ্চমীর সকাল।
গ্রামের কাঁচা পথ দিয়ে হেঁটে তারা বাবর হাট স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে, শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছলো। পঞ্চমী রাতের কলকাতা।
শিয়ালদহ স্টেশন থেকে হাঁটতে হাঁটতে বউবাজার, কলেজ স্কোয়ার, হাতিবাগান।
চারদিকে আলোর সাগর! সিউলি চোখ বড় বড় করে বলে, “বাবা, এরকম আলো আগে কখনো দেখিনি!”
বিল্টু খুশিতে লাফায়, মায়ের আঁচলে টান দিয়ে ঠাকুর দেখায়।
কিন্তু সেই আনন্দ বেশি ক্ষণ থাকে না। ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায় সুখেন্দু
বাগবাজারের প্যান্ডেলে ঢোকার সময় প্রচণ্ড ভিড়। ঠেলাঠেলির মাঝে এক পলকে সিউলির হাত ছুটে যায়।, শান্তা কিছুই বুঝতে পারে না —
আর যখন বুঝতে পারে, তখন সুখেন্দু নেই।
“বাবা কই?” — বিল্টু চিৎকার করে কাঁদে।
টিউলিপ ভয়ে জড়সড়, শান্তা কাঁদছে।
বহু মানুষ, হাজারো মুখ — যেন অচেনা মানুষের সমুদ্র,কারো কাছে খোঁজখবর করতে সাহস পায় না।
পুলিশের দিকে এগোতে গিয়ে ভয় পায় —
"ওরা যদি ধরে নিয়ে যায়, যদি বলে চুরি করতে এসেছে?"।
সারারাত ধরে খোঁজ চলে — গলির পর গলি, প্যান্ডেলের পর প্যান্ডেল।
কেউ বলে শোভাবাজারে দিকে দেখুন, কেউ বলে মহিষরাজার প্যান্ডেলে একজন বসেছিল…
একটু খাবার কেনার টাকাও নেই তাদের কাছে।
ক্লান্তিতে সিউলির চোখ লাল, বিল্টু ক্লান্ত —
আর শান্তা , শুধু একটাই কথা বলে:
“আমার লোকটারে খুঁজে দাও… আমরা শুধু ঠাকুর দেখতে এসেছিলাম।”
অন্যদিকে, সুখেন্দু পথ ভুলে হেঁটে হেঁটে উত্তরে চলে গেছে। ভয়ে, আতঙ্কে, কষ্টে খোঁজখবর করতে করতে ক্লান্ত হয়ে একটা প্যান্ডেলের এক কোণে বসে —
মানুষের মুখের ভিড়ে স্ত্রী আর সন্তানদের মুখ খুঁজে বেড়ায়।
কান্না চেপে রাখে, বুকের ভেতরে ঝড়।
খাওয়া হয়নি, চোখে ঘুম নেই।
অবশেষে ক্লান্ত হয়ে, পায়ের ব্যথায় কাতর হয়ে একটা লাইটিং এর পাশে বসে ঘুমিয়ে পড়ে।
ভোরের আলোয় পুনর্মিলন
ভোর পাঁচটা বাজে।
প্যান্ডেলের লাইট নিভে এসেছে, ঢাকও থেমেছে।
সুখেন্দু হঠাৎ চোখ মেলে দেখে — পাশে তিনটা মুখ। সিউলি , বিল্টু আর তার স্ত্রী শান্তা।
চোখে জল, মুখে কথা নেই।
বিল্টু বাবার গলা জড়িয়ে ধরে, সিউলি কাঁদতে কাঁদতে বাবার গালে হাত বুলিয়ে দেয়।
শান্তা কাঁদতে কাঁদতে বলে — “তোমাকে ছাড়া আমরা প্রায় মোরেই গেছিলাম। সুখেন্দু তখনো নির্বাক , শুধু বলে—-শোনো বউ – আমাদের ভাগ্যো ভালো… ঠাকুর আমাদের একসাথে ফিরিয়ে দিলেন।” শান্তার সাথে ছেলে, মেয়েরা বলল : “বাবা আমাদের ক্ষমা করে দিও” শান্তু এগিয়ে এসে বলল = আমাদের গ্রামের মাঠের পূজো অনেক ভালো। ইচ্ছে মতন ঘুরতে পারি। এই আলোর ঝলকানির মধ্যে আমাদের কাকু,কাকিমা, জ্যাঠাই,জ্যেঠিমা, দাদা,দিদি, এমনকি গ্রামের গুরুমশাই ( পাঠশালার শিক্ষক মশাই) কেউ থাকে না। চারিদিকে অচেনা অজানার মানুষের মধ্যে কিছু দৃষ্টি অসোহায় নারীর বিশ্বাসকে যেনো অপসংস্কৃতির অন্ধকার জগতে নিয়ে যেতে চায়। এই ঝলমলে আলোর মধ্যে কিছু অন্ধকারো আছে।
সকাল আটটার ট্রেন।
শিয়ালদহ স্টেশান থেকে সুখেন্দু পরিবার নিয়ে ফিরে যায় গ্রামের দিকে।
আজ বাড়ি ফিরে সকলের কিন্তু বুকে শান্তি।
নতুন জামা নেই, ঠাকুর দেখা অসপূর্ণ — তবু একটাই জিনিস পেয়েছে…নিজদের পরিবার। একটা অটুট বন্ধন। শেষ কথা:
দুর্গাপুজো মানে শুধু আনন্দ নয়,
আলোর ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া অন্ধকারকেও আলোকিত করে ভালোবাসা।
সুখেন্দুর পুজোতে প্রতিমা দেখা হয়নি,
কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ছিল —
ভোরবেলার সেই পুনর্মিলন।
আজকের গল্প লেখার উদ্দেশ্য কিন্তু Just time pass আর কিছুই নয়। 🙏 নমস্কার। সকলে ভালো থাকবেন। মিন্টু চক্রবর্তী।