05/08/2026
১৯৭৪ সালে কলকাতায় ছাত্র সংগঠনের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি আহুত এক সভায় স্বাধীনতা আন্দোলনের আপসহীন ধারার বিপ্লবী, বিশিষ্ট মার্কসবাদী দার্শনিক কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, ‘সমাজের মধ্যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবার শক্তি ব্যক্তি হিসাবে যদি আমার মধ্যে না থাকে, তাহলে আমি মানুষ নামেরই যোগ্য নই। অন্তত এইটুকু নৈতিক মান তো মানুষের মধ্যে আগে গড়ে উঠবে, তারপরে তো তার ন্যায়-অন্যায় বিচারের ক্ষমতার প্রশ্ন। কারণ কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায় এ ঠিকমতো বিচার করতে পারা একটা জটিল বিষয়, জ্ঞানের বিষয়, শিক্ষার বিষয়। কিন্তু আমি যেটাকে অন্যায় বলে মনে করি, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবার সাহস যদি আমার না থাকে এই ভয়ে যে, পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে, বা আমার চাকরিটা চলে যাবে, অথবা আমি নিজে যদি একটা অন্যায় করি এবং সেটা করতে আমার এতটুকু বিবেকে না লাগে, তাহলে তো আমি মানুষই নই।’
সেই একই বছরের ১২ জানুয়ারী, কটকে সর্বভারতীয় ছাত্র সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশের ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘লড়াই একটা প্রয়োজনীয় কথা, সংগঠনও একটা প্রয়োজনীয় কথা। এ দুটো বাদ দিয়ে শেষপর্যন্ত কিছুই হবে না। কিন্তু তার আগে আর একটা বড় কথা আছে। সে কথা হচ্ছে, আদর্শ ঠিক করা, নীতি ঠিক করা, লড়াইয়ের রাস্তা ঠিক করা, লড়াইয়ের উদ্দেশ্য ঠিক করা — সমাজজীবনে, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে মূল রোগ কী, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা।’
প্রকাশ্য সমাবেশে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আদর্শের কথা যদি ঠিকও হয়, বড়ও হয়, সত্যও হয়, রাস্তাও যদি ঠিক বাতলাতে পারি, তবুও নৈতিক বল এবং উন্নত সাংস্কৃতিক মান ছাড়া সেই রাস্তায় এগোবার শক্তি কোনও মানুষ অর্জন করতে পারে না। একটা বড় আদর্শ, উন্নত আদর্শ এবং সমস্যা সমাধানের সঠিক রাস্তাও যদি কতকগুলো নৈতিক অধঃপতিত মানুষের হাতে পড়ে, তবে তার দ্বারা দেশের মঙ্গল হতে পারে না, আন্দোলনও সফল হতে পারে না। বরং ক্ষতি হয়। ...আমি যে কথাটা বলতে চাইছি তা হচ্ছে, শুনতে, বলতে আদর্শ যত ভালই মনে হোক, সেই আদর্শের আসল মর্মবস্তু নিহিত থাকে তার সাংস্কৃতিক-নৈতিক মানের উপর। এইখানেই তার অগ্নিপরীক্ষা।’ দেশব্যাপী চলমান উত্তাল ছাত্র আন্দোলনে আমাদের শিক্ষক কমরেড শিবদাস ঘোষের অমূল্য এই শিক্ষা আগামী চলার পথে আলোকবর্তিকা।