03/06/2026
শুধু হকাররা নয়, বুলডোজারের সামনে আজ আক্রান্ত বাংলার মেহনতি জনগণ
ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলার নতুন সরকার একটাই বিষয় এখনও স্পষ্ট করে বলতে পেরেছে, তা হল এই যে বাংলার গরীব মেহনতি মানুষের জীবন জীবিকা স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র যায় আসে না। সত্যিই এই বিজেপি পার্টিকে বাহবা দিতে ইচ্ছে করে কখনো কখনো। কি স্পষ্টভাবে তারা দেখিয়ে দেয় যে তাদের পুঁজি কেবল ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতি, তাদের আনুগত্য কেবল দেশি-বিদেশি কর্পোরেট ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতি; এবং তারপরও কি সুন্দরভাবে নিজেদের মেশিনারি/টুলকিট দিয়ে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করে তারা!
ক্ষমতায় আসার পর বাংলা জুড়ে বিজেপি মেতেছে হকার উচ্ছেদ অভিযানে। এই বিষয়ে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। বছর দুয়েক আগে তৃণমূল সরকার ঠিক একইভাবে কলকাতা জুড়ে হকার উচ্ছেদে নেমেছিল। তখন আমি একটি পোস্ট করায় আমার পোস্টের নীচে এক কচি তিনু এসে লিখেছিল, "ইউরোপে থেকে বড় বড় কথা বোলো না, ইউরোপে কি হকার আছে?" ইত্যাদি।
ভারতে হকারি কেউ যেচে, শখে করতে চায় না। কারখানা থেকে ছাঁটাই হয়ে, অথবা বন্ধ কারখানার মধ্যবয়স্ক শ্রমিকরা, অথবা চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে তিরিশের কোঠায় পৌঁছানো বেকার যুবকেরা, অথবা দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে হেরে যাওয়া তরুণেরা আর কোন উপায় না পেয়ে রাস্তায় একটা দোকান দেয়। গোটা দেশে যেই চরম গ্রামীণ সংকট, যার ফলে চাষবাস করে লাভের মুখ দেখার স্বপ্ন আজ অতীত, তাও চালনা করে হাজার হাজার মানুষকে শহরে এসে একটা দোকান দিয়ে কিছু করে খেতে। এই দোকানগুলি, এই মানুষগুলো একটা সম্পূর্ণ প্যারালাল অর্থনীতি চালান, যার ক্রেতাদের একটা বড় অংশও এই নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত শ্রেণীরই মানুষ।
না, একটা সুন্দর পরিচ্ছন্ন শহরের আশা করাটা কোন অন্যায় কাজ না। কিন্তু গরিবী-বেকারত্ব দূরীকরণের কোনরকম প্ল্যান না নিয়ে, এই মানুষগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে তাঁদের উপার্জনের একমাত্র পথকে রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়া অমানবিক, নৃশংস, দানবীয়। ইউটিউবে যেই "উন্নত" দেশগুলোর ভিডিও দেখে উচ্চ-মধ্যবিত্ত বাঙালির নাল-ঝোল পড়ে, সেই দেশগুলোর সরকার এই ধরনের কাজ কল্পনাও করতে পারেনা। বরং গত তিন বছরে দশ-বারোটা দেশ ঘুরে দেখেছি, প্রায় সব বড় শহরেই মিউনিসিপ্যালিটি নিজেই স্ট্রিট ভেন্ডর, ফার্মার্স মার্কেট ইত্যাদির জন্য আলাদা বাজেট রাখে, শহরের সৌন্দর্যায়নের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে শহরের হকারেরা।
মাফ করবেন, কিন্তু দারিদ্র্যকে অ্যাড্রেস না করে শহরকে "সুন্দর" করার এই কুৎসিত পরিকল্পনা, শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মত করে রাজনীতি করে দেশকে উন্নত করা যায় বলে আমি মনে করি না, বরং আমরা যে স্বাধীনতার পরেও কতটা অনুন্নত, আমাদের দেশের রাজনীতি যে দেশকে কতটা পিছনে নিয়ে যাচ্ছে, তাই পরিষ্কার করে দেখিয়ে দেয় বারবার। শহরকে সত্যিকারের সুন্দর করতে গেলে সবার আগে বেকারত্ব দূর করার, ধনী-দরিদ্রের এই চরম বৈষম্য ঘোচানোর লং টার্ম পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। শহরের ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট-ডিজপোজালে ফোকাস করে সেই এরিয়ায় কর্ম সংস্থানও করা যায়। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় যেই পার্টিই ক্ষমতায় আসে, তারা দেশের প্রতি নয়, বরং তাদের যারা ফান্ডিং দেয় শুধু তাদের প্রতিই দায়বদ্ধ। আর তাই এই ব্যবস্থায় কোন পার্টিই দেশকে সত্যিকারের উন্নত দেশে পরিণত করার কথা ভাবেও না।
ব্যক্তিগতভাবে ২০১৭ সালে যুব ওয়ার্ল্ড কাপের আগে সল্টলেকে তৃণমূলের বস্তি-হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামিল হওয়া আমার প্রথম ছাত্র রাজনীতির বাইরে সংগঠিত রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। আজ প্রায় দশ বছর বাদে যারা যারা এই নারকীয় হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রাস্তায় আছেন এই মুহূর্তে, তাঁরা সবাই আমার কমরেড। নিজেদের মধ্যেকার বিতর্ক আমরা থামাবো না, কিন্তু তাই বলে মেহনতি মানুষের পাশে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানোতে যেন কোন খামতি না থাকে।
যেই আপার কাস্ট, উচ্চ মধ্যবিত্ত বাঙালি এখনও শমীকবাবুর মেকি-রাবীন্দ্রিক বক্তৃতায় আহা উহু করছেন, বিজেপি-তৃণমূলের নাটকে মগ্ন হয়ে আছেন, মুসলমান-ঘুসপেটিয়াদের "টাইট" দেওয়ার খবর গোগ্রাসে গিলছেন, তাদের প্রতি আর রাগও হয়না, বরং করুণা হয়। এই হকারদের জায়গায় যেই গুজ্জু-মেড়ো কর্পোরেটদের ঝাঁ চকচকে দোকান বসবে এবার স্টেশনগুলোতে, সেখানে খাবার বা কেনাকাটা করার সামর্থ্য এই বাঙালিদের অধিকাংশেরই নেই। অর্থনীতিতে টান পড়ছে, শিক্ষা ব্যবস্থা লাটে, নিজেদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ সঙ্কটে, এই অবস্থাতেও যেই জোকাররা ফেসবুকে বিজেপির সপক্ষে পোস্ট করে, সেই উজবুকদের দেখে হাসবো না কাঁদব সত্যিই বুঝতে পারি না।
আর সঙ্ঘ-বিজেপির কর্মীদের একটাই কথা বলব। কেবল কলকাতাতেই হকারের সংখ্যা দেড় লক্ষেরও বেশি। গোটা বাংলায় হয়ত তিন লক্ষের কাছাকাছি। আপনাদের সরকারের সিদ্ধান্তে আজ খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে এই প্রতিটি পরিবার, অর্থাৎ দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ। আমি না হয় নাস্তিক, আপনারা তো ভগবানে বিশ্বাস করেন শুনেছি। এই লক্ষ লক্ষ মানুষের অভিশাপ, অভিসম্পাত আপনাদের ধর্মে সইবে তো?
@হিন্দোল মজুমদার